অভিমত

ক্রমাগত নেতিবাচক প্রচারণা পোশাক শিল্পকে বড় সংকটের মুখে ফেলতে পারে

গত কয়েক বছরে একের পর এক রাজনৈতিক, আর্থিক ও এখন জ্বালানি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ কীভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা তৈরি করছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প গত কয়েক বছরে একের পর এক বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলির পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। এর পর পরই আলোচনায় আসে ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, যা ব্যবসা ও উৎপাদনের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। সর্বশেষ জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা। 

প্রতিটি সংকটের ধরন আলাদা। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রেতার দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো একসঙ্গে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করতে পারে—বাংলাদেশ কি আগের মতোই একটি নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল সোর্সিং গন্তব্য?

প্রশ্নটির গুরুত্ব এখানেই যে পোশাকের বাজারে প্রতিযোগিতা শুধু পণ্যের মান, দাম কিংবা লিড টাইমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন আন্তর্জাতিক ক্রেতা যখন কোনো দেশ থেকে পণ্য নেন, তখন তিনি জানতে চান সেখানে উৎপাদন কতটা নির্ভরযোগ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা স্থিতিশীল এবং আগামী মৌসুমেও সেই দেশ তার চাহিদা পূরণ করতে পারবে কিনা। এ আস্থায় সামান্য ফাটলও ভবিষ্যতে পোশাক অর্ডারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সিদ্ধান্তের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

গত কয়েক বছরে একের পর এক রাজনৈতিক, আর্থিক ও এখন জ্বালানি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ কীভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা তৈরি করছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

একটি নেতিবাচক খবর হয়তো একা কোনো ক্রেতাকে বাংলাদেশ থেকে সরে যেতে বাধ্য করবে না। কিন্তু একের পর এক নেতিবাচক বার্তা যদি যেতে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে এমন একটি সামগ্রিক ধারণা তৈরি হতে পারে—নির্ভরযোগ্য সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশ কি আগের মতোই আছে।

আন্তর্জাতিক সোর্সিংয়ের সিদ্ধান্ত সাধারণত একদিনে নেয়া হয় না। সিদ্ধান্ত একদিনে নেয়া না হলেও সেটি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে পারে। একজন ক্রেতা হয়তো আজ অর্ডার বাতিল করবেন না। কিন্তু নতুন অর্ডারের ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

অনেক সময় কোনো দেশের একটি সংকট যতটা ক্ষতি করে, সংকটের অতিরঞ্জিত বা ভুল উপস্থাপন তার চেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ বর্তমান জ্বালানি সংকটটি যেভাবে বহির্বিশ্বে উপস্থাপিত হয়েছে তা আলোচনা করা যেতে পারে। গাজীপুরের একটি কারখানায় হাত দিয়ে আয়রন করার মতো একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। গ্যাসের অভাবে কোনো কারখানায় হাত দিয়ে আয়রন করা হচ্ছে—এমন একটি সংবাদ যদি যথাযথ যাচাই ছাড়া প্রকাশিত হয়, সেটি দেশের ভেতরে হয়তো একটি চাঞ্চল্যকর খবর। কিন্তু আন্তর্জাতিক একজন ক্রেতার কাছে এর অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে শিল্প খাতে উদ্বেগ আছে—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে জ্বালানি সরবরাহ, মূল্য ও নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়েই কমবেশি অনিশ্চয়তা রয়েছে। বর্তমান জ্বালানি সংকটেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বন্ধ হয়ে যায়নি। উদ্যোক্তারা পরিস্থিতি সামলে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংকটের মধ্যেও কমপ্লায়েন্স ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে পাশ কাটিয়ে উৎপাদন করা হচ্ছে না। অর্থাৎ সংকট আছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের কারখানাগুলো অনিরাপদ, অস্থিতিশীল কিংবা নন-কমপ্লায়েন্ট হয়ে পড়েছে।

তাই সবসময় সমস্যার বাস্তবতা তুলে ধরার পাশাপাশি তার মোকাবেলার সক্ষমতাও তুলে ধরা জরুরি। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি শুধু তার সমস্যার সমষ্টি নয়। সমস্যা মোকাবেলার সক্ষমতাও সেই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারী, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার ওঠানামা—একের পর এক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই এ শিল্প আজকের অবস্থানে এসেছে। কখনো রফতানি কমেছে, কখনো প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে। কিন্তু উদ্যোক্তারা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের বড় শক্তি এখানেই। তারা প্রতিকূলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে ঘুরে দাঁড়াতে জানেন। জানেন পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে। 

বিশ্ব বাণিজ্যে উত্থান-পতন থাকবেই। কোনো দেশের রফতানি প্রতি বছর একই গতিতে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা কোথাও নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিকূল সময়ে কে কতটা দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। আমাদের পোশাক শিল্পের এ সক্ষমতার কথাটি আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

একইভাবে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর কথাও সামনে আনা দরকার। সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে—এ তথ্য আন্তর্জাতিক মহলে পৌঁছা দরকার। একইভাবে রুগ্‌ণ ও ভগ্নপ্রায় কারখানা পুনরুদ্ধারে সরকারের অর্থায়নের উদ্যোগ, বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং শিল্প ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের প্রচেষ্টাগুলোও সামনে আসা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের গল্প আসলে সংকটের গল্প নয়, বরং সংকট পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। উদ্যোক্তাদের বহু বছরের অদম্য সাহস ও মেধা, শ্রমিকের শ্রম, বিনিয়োগ, উৎপাদন ব্যবস্থায় উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে ক্রমাগত অগ্রগতি এবং শিল্পে নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্সে উন্নতির ফলেই এ দৃঢ় অবস্থান তৈরি হয়েছে। সেই গল্পটিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বলা দরকার।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু পণ্য রফতানি হয় না; রফতানি হয় একটি দেশের প্রতি আস্থাও। আর সেই আস্থা তৈরি হয় বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তথ্যের ভিত্তিতে।

তাই সংকটের কথা বলার সময় সতর্ক হতে হবে, যাতে সত্য আড়াল না হয়। আবার এমন কোনো বয়ানও যেন তৈরি না হয়, যা বাস্তবতার চেয়ে ভিন্ন চিত্র প্রকাশ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ আছে, সন্দেহ নেই। সম্ভাবনাও আছে। সমস্যাকে যেমন অস্বীকার করা ঠিক হবে না, আবার সম্ভাবনাকেও আড়াল করা যাবে না। ক্রেতাকে শুধু বললে হবে না যে আমাদের সমস্যা আছে। তাকে এটাও দেখাতে হবে যে আমরা সমস্যার সমাধান করছি।

কারণ পোশাকের অর্ডার শুধু কারখানার সক্ষমতার ওপর আসে না, আসে আস্থার ওপরও। শিল্প ভালো থাকলে অর্থনীতি ভালো থাকবে, তথা দেশ ভালো থাকবে। আর দেশকে ভালো রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

আশিকুর রহমান তুহিন: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেড গ্রুপ ও সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ

আরও