সময়ের ভাবনা

প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্য সংযোজন কর নিয়ে কিছু কথা

মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহোদয়কে ধন্যবাদ জানাই এই মহামারীকালে জাতীয় সংসদে অর্থ বিল ২০২০ উপস্থাপনের করার জন্য। এ বিলের মাধ্যমে অনেক মূল্যবান পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিছু বিধানের প্রয়োগ সহজ হবে না, অথচ মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আইনের বিধিবিধান পালনের ক্ষেত্রে সহজীকরণ। যেহেতু অর্থবিল ২০২০-এর জাতীয় সংসদে আলোচনা চলমান, তাই এ অবস্থায় নিম্নে দেয়া আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহোদয়কে ধন্যবাদ জানাই এই মহামারীকালে জাতীয় সংসদে অর্থ বিল ২০২০ উপস্থাপনের করার জন্য। এ বিলের মাধ্যমে অনেক মূল্যবান পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিছু বিধানের প্রয়োগ সহজ হবে না, অথচ মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আইনের বিধিবিধান পালনের ক্ষেত্রে সহজীকরণ। যেহেতু অর্থবিল ২০২০-এর জাতীয় সংসদে আলোচনা চলমান, তাই এ অবস্থায় নিম্নে দেয়া আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

ক. আংশিক উপকরণ কর রেয়াত নিয়ে অর্থবিল ২০২০-এর প্রস্তাবনা রহিতকরণ

অর্থবিল ২০২০-এর দফা ৬২ (ক)-তে প্রস্তাবনাটি আইনের প্রয়োগকে সহজ করবে না।  প্রস্তাবনাটি নিম্নরূপ:

‘যে ক্ষেত্রে কোন নিবন্ধিত ব্যক্তি করযোগ্য সরবরাহের নিমিত্ত কোন নির্দিষ্ট কর মেয়াদে যে পরিমাণ উপকরণ ব্যবহার করেন, উক্ত ব্যক্তির প্রাপ্য উপকরণ কর রেয়াত সেই পরিমাণের ভিত্তিতে নিরূপণ করিতে হইবে।’

বাস্তবিক পক্ষে অনেক সময় একটি সংস্থাকে অনেক সময় বাল্ক পরিমাণে কাঁচামাল আমদানি/ক্রয় করা প্রয়োজন। কাঁচামাল ক্রয়নির্ভর করে লিড টাইম, অর্ডারের পরিমাণ, মৌসুমি প্রভাব ইত্যাদির ওপর। চার করমেয়াদের মধ্যে ক্রয়কৃত বা আমদানীকৃত সব সামগ্রী ব্যবহার করা কঠিন হবে এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হবে না। তারা কেনার পরবর্তী চারটি করমেয়াদের মধ্যে দাবি করতে ব্যর্থ হলে ইনপুট ক্রেডিট হারাতে পারেন। যথাযথভাবে কর রেয়াত গ্রহণ করতে না পারলে ব্যবসায়ের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

অনেক সময় একটি পণ্য উৎপাদনে অনেক কাঁচামাল ও মোড়কসামগ্রী ব্যবহার করতে হয়। মূসক রেয়াত ব্যবহারের পরিমাণের ভিত্তিতে নিরূপণ করা হলে সংস্থাগুলোর পক্ষে এর হিসাব সংরক্ষণ করা জটিল হয়ে পড়বে। কখন ক্রয় করা হয়েছে এবং কতটুকু ব্যবহার করা হয়েছে, এর ক্রয়মূল্য কত ছিল, ক্রয়কৃত কোন উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, তার তথ্য রাখার জন্য সংস্থাগুলোকে নতুন করে সফটওয়্যার কাস্টমাইজেশন করতে হবে অথবা ম্যানুয়ালি রেকর্ড রাখতে হবে, যা ব্যবসায়ের ব্যয় বৃদ্ধি করবে।

কাঁচামাল ও মোড়কসামগ্রী ক্রয়ের মূল্য ঘন ঘন ওঠানামা করলে সঠিক গণনা বজায় রাখা কঠিন হবে।

কাঁচামাল ও মোড়কসামগ্রীর পাশাপাশি সংস্থাগুলোকে সেবা গ্রহণ করতে হয়। মাসিক, ত্রৈমাসিক, অর্ধবার্ষিকী, বার্ষিক সেবাগুলো উৎপাদনে কতটুকু ব্যবহার করা হয়েছে, এর হিসাব সংরক্ষণ করা জটিল হয়ে পড়বে।

অর্থবিলের উল্লিখিত বিধান অর্থ আইন, ২০২০ হিসেবে প্রবর্তিত হলে তা ব্যবসাবান্ধব হবে না বলে আমি মনে করি। অনেক ক্ষেত্রে সংস্থাগুলো ও এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে আমদানীকৃত বা ক্রয়কৃত কাঁচামাল ও মোড়কসামগ্রী, উপকরণসামগ্রী ব্যবহার এবং রেয়াত নিয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়ে জটিলতা বাড়বে।

১৯৯১ সালের মূল্য সংযোজন কর আইনে রেয়াত গ্রহণ এত শর্তসাপেক্ষ ছিল না, যার ধারা মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এ বিদ্যমান ছিল।

তাই সরকারের কাছে রেয়াতের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধান বলবৎ রাখার প্রস্তাব করছি।

খ. আপিল ও ট্রাইব্যুনাল দায়েরকালে ১০ থেকে ২০ শতাংশ অর্থ পরিশোধের প্রস্তাবনা রহিতকরণ

‘অর্থবিল ২০২০-এর দফা ৭৫ ও ৭৬ মোতাবেক, মূসক কর্মকর্তা ব্যতীত কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃক আপিল/ট্রাইব্যুনাল দায়ের করিবার ক্ষেত্রে, তাহাকে উক্ত আপিল/ট্রাইব্যুনাল দায়েরকালে তর্কিত আদেশে উল্লিখিত দাবীকৃত করের ২০ (বিশ) শতাংশ পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করিতে হইবে।’

মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৪২ অনুযায়ী যেকোনো পর্যায়ে কেবল ১০ শতাংশ অর্থ জমার মাধ্যমে আপিল করার বিধান ছিল এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের কাছে আপিল করার জন্য কোনো প্রকার অর্থ জমা করার বিধান ছিল না। তাই আপিল কমিশনারেটে ও আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আপিল দায়েরের ক্ষেত্রে দাবীকৃত করের ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ পরিমাণ অর্থ জামানতের প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। ফলে ব্যবসায়ীদের ন্যায়বিচার পাওয়া কষ্টসাধ্য হবে বলে আমরা মনে করি। অন্যদিকে এতে সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে ন্যায়বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে দাবীকৃত করের ৫০ শতাংশ অর্থ প্রদান করতে হবে।

এক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধান বলবৎ রাখার প্রস্তাব করছি।

গ. কেন্দ্রীয় নিবন্ধন কীভাবে আরো ব্যবসাবান্ধব করা যায়

কেন্দ্রীয় নিবন্ধন সম্পর্কিত ধারা ২(৫৭) পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে বার্ষিক বিক্রয় ৩ কোটি টাকার বেশি না হলে ও সাধারণ আদেশ ১৭ মোতাবেক বিক্রয়ের পরিমাণ নির্বিশেষে নিবন্ধন গ্রহণ আইনি বৈধতা পেল। আমরা আশা করেছিলাম মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৫ সংশোধিত হবে এবং অধিকতর ব্যবসাবান্ধব হবে।

বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান হ্রাসকৃত মূসক হার (যেমন এলপি গ্যাস, এইচআর কয়েল থেকে সিআর কয়েল) কিংবা সুনির্দিষ্ট কর হারভিত্তিক (এমএস পণ্য, সুতা, নিউজপ্রিন্ট) মূসকের আওতাধীন পণ্য উৎপাদন করে, কিন্তু এই এসআরও অনুযায়ী এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কেন্দ্রীয় নিবন্ধন গ্রহণ সম্ভব নয়।

২(ঙ)-এর পর ২(চ) প্রস্তাবনাটি নিম্নরূপ: ‘হ্রাসকৃত মূসক হার কিংবা সুনির্দিষ্ট কর হারভিত্তিক মূসকের আওতাধীন যে উৎপাদনকারী এক বা একাধিক স্থানে অভিন্ন বা সমজাতীয় পণ্য উৎপাদনপূর্বক নিজস্ব মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্র বা ডিপো বা ওয়্যারহাউজের মাধ্যমে মূসক পরিশোধপূর্বক সরবরাহ করেন।’

বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান তার একটি উৎপাদনকেন্দ্রে উৎপাদনপূর্বক নিজস্ব মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন ডিপো  বা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে পণ্য সরবরাহ করেন। কিন্তু এসআরও নং ২৬৩-আইন/২০১৯/৭৯/মূসক অনুযায়ী এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কেন্দ্রীয় নিবন্ধন গ্রহণ সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বাস্তবতায় প্রস্তাবটি যুক্তিযুক্ত। একাধিক উৎপাদনস্থল থাকার বাধ্যবাধকতা ব্যবসাবান্ধব নয়।

২(ঙ)-এর প্রতিস্থাপিত প্রস্তাবনাটি নিম্নরূপ: ‘যেক্ষেত্রে কোন উৎপাদনকারী এক বা একাধিক স্থানে অভিন্ন বা সমজাতীয় পণ্য উৎপাদনপূর্বক নিজস্ব মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্র বা ডিপো বা ওয়্যারহাউজের মাধ্যমে হ্রাসকৃত মূসক হার কিংবা সুনির্দিষ্ট কর ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারে মূসক পরিশোধপূর্বক সরবরাহ করেন উহারা কেন্দ্রীয় নিবন্ধনযোগ্য।’

উপরন্তু, ওই উৎপাদনকারী যদি উৎপাদনের পাশাপাশি অভিন্ন বা সমজাতীয় পণ্য আমদানি করেন, তবে তারা কেন্দ্রীয় নিবন্ধন পাবেন কিনা তা পরিষ্কার নয়। তাই ২(ঙ)-এর পর নিম্নরূপ শর্তাংশ যোগ করা যেতে পারে: ‘তবে শর্ত থাকে যে, যেই ক্ষেত্রে কোন উৎপাদনকারী এক বা একাধিক স্থান হইতে অভিন্ন বা সমজাতীয় পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি অভিন্ন বা সমজাতীয় পণ্য আমদানিপূর্বক নিজস্ব মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্র বা ডিপো বা ওয়্যারহাউজের মাধ্যমে ১৫ শতাংশ হারে মূসক পরিশোধপূর্বক সরবরাহ করেন।’

কেন্দ্রীয় নিবন্ধন গ্রহণ ও কর পরিশোধ বিধিমালা, ২০১৯-এর বিধি ২(খ) থেকে ২(ঙ)-তে নিজস্ব মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বিক্রয় ইউনিটের কথা বলা হয়েছে। সব বিক্রয় ইউনিট, বিক্রয়কেন্দ্র বা ডিপো বা ওয়্যারহাউজ নিজস্ব মালিকানায় না-ও থাকতে পারে। এক্ষেত্রে নিজস্ব মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণাধীনের স্থলে নিজস্ব মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণাধীন শব্দটি থাকলে আইন প্রতিপালন সহজ হবে বলে প্রতীয়মান হয়।

মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ২ বা কেন্দ্রীয় নিবন্ধন গ্রহণ ও কর পরিশোধ বিধিমালা, ২০১৯-তে অভিন্ন বা সমজাতীয় পণ্য বা সেবার কোনো সংজ্ঞা প্রদান করা হয়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ১৩ জুন ২০১৯ তারিখে জারীকৃত এসআরও নং ১৮০-আইন/২০১৯/৩৭/ মূসকের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (ন্যায্য বাজারমূল্য নির্ধারণ), বিধিমালা, ২০১৯ জারি করে, যাতে অভিন্ন সরবরাহ বা সমজাতীয় সরবরাহের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ সংজ্ঞাটি শুল্ক মূল্যায়ন (আমদানীকৃত পণ্যের মূল্য নির্ধারণ) বিধি, ২০০০ থেকে নেয়া হয়েছে। আমদানির ক্ষেত্রে অভিন্ন বা সমজাতীয় পণ্য আর উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে সংজ্ঞা এক হওয়া উচিত নয়। আমদানির ক্ষেত্রে কোনো পণ্য অভিন্ন না হলে সামান্য পার্থক্যের কারণে ডিউটি কম বা বেশি হতে পারে, কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে তা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

 

স্নেহাশিষ বড়ুয়া: ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট

 

আরও