গত গ্রীষ্মে নাইজেরিয়ার ইয়োব প্রদেশের স্পেশালাইজড হসপিটাল ডামাতুরুতে চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে এক পুরুষ রোগী এক নারী স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর হামলা চালান। দুঃখজনক হলেও সত্য, নাইজেরিয়ায় বিশেষ করে নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য এ ধরনের অভিজ্ঞতা নতুন নয়। কাদুনা ও আবিয়া প্রদেশের হাসপাতালগুলোয় পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ দুই প্রদেশে যথাক্রমে ৬৪ শতাংশ ও ৮৮ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে, চিকিৎসা পেশার প্রথম বছরই নাইজেরিয়ার একটি শিশু ওয়ার্ডে কর্মরত অবস্থায় আমিও (লেখক) এক অভিভাবকের হামলার শিকার হয়েছিলাম।
শুধু নাইজেরিয়া নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গত পাঁচ বছরে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়া, চীন, চেক প্রজাতন্ত্র, ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, স্পেন, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৮ সালে ইতালির ১১ শতাংশ নার্স কর্মক্ষেত্রে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং ৪ শতাংশ নারীকে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হুমকি দেয়া হয়েছিল। প্রায় অর্ধেক নার্স জানিয়েছেন, তারা মৌখিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
এ ধরনের প্রতিবেদন আংশিক চিত্র তুলে ধরে। অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতাকে ‘পেশার অংশ’ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হামলার পর করণীয় বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মানবিক সহমর্মিতা। ফলে অনেকেই অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত হন। ২০০৪ সালে যখন আমি (লেখক) আক্রান্ত হই তখন অন্য এক রোগীর স্বজন দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে আমার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগতে পারত। তখনো আমি হামলাকারীর পরিবারের প্রতি সহানুভূতির কারণে আইনি ব্যবস্থা নিইনি। কারণ পরিবারটি তখন সন্তান অসুস্থতা ও মৃত্যুর শোকে ছিল। ধারণা করা হয়, স্বাস্থ্য খাতে সহিংসতার শিকার অর্ধেকেরও কম মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে এসব ঘটনা রিপোর্ট করেন।
এ প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, কর্মজীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় ৩৮ শতাংশ শারীরিক সহিংসতার শিকার হন, যার বেশির ভাগই ঘটান রোগী বা তাদের স্বজনরা। তবে এ পরিসংখ্যানে মৌখিক হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। জীবনরক্ষার কাজে নিয়োজিত অবস্থায় এবং সীমিত সম্পদ ও প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও তা বহু স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রায়ই সহ্য করতে হয়।
সহিংসতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বড় অংশ তরুণী, যাদের দিন-রাত দুই বেলায়ই দায়িত্ব পালন করতে হয় এমন পরিবেশে, যেখানে সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন মাদক বা অ্যালকোহল সেবনকারী ব্যক্তি ও মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগীও। অন্যদিকে জনবল ও সম্পদের ঘাটতির কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রায়ই অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করেন। পান না প্রাপ্য পারিশ্রমিক কিংবা মানসম্পন্ন ও সময়মতো চিকিৎসা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। দীর্ঘসময়ের অপেক্ষা রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে বাড়িয়ে তোলে চাপ ও ক্ষোভ, যারা প্রায়ই অলৌকিক ফলাফলের প্রত্যাশা করেন। এর সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষাহীনতা যুক্ত হয়ে সহিংসতাকে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিত্যদিনের ঝুঁকিতে পরিণত করেছে।
দুর্যোগ, সংঘাত কিংবা মানবিক সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে তারা রাজনৈতিক কিংবা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতেও পরিণত হতে পারেন। কভিড-১৯ মহামারীর সময় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, ভাইরাস নিয়ে ভ্রান্ত তথ্য এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি ‘অমানবিক’ দৃষ্টিভঙ্গি (অর্থাৎ তখন তাদের মানুষ নয়, কেবল সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে) তখন সহিংসতার মাত্রা হঠাৎ করেই বাড়িয়ে তুলেছে।
এসব অভিজ্ঞতার ফলে স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেককেই উদ্বেগ, বিষণ্নতা, কাজের প্রতি অনীহা, ট্রমাজনিত মানসিক চাপ (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার) ও অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার হওয়া মনোরোগের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত নার্সদের প্রায় ৭৬ শতাংশ পরবর্তী সময়ে বিষণ্নতার লক্ষণ অনুভব করেছেন।
স্বাস্থ্যকর্মীদের সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে রোগীদের ওপরও। কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি ও কর্মী বদলির হার বেড়ে সমস্যা আরো জটিল আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম স্বাস্থ্যসেবা খাতে আগ্রহ কম দেখাচ্ছে। অথচ বিশ্ব এখন স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতির মুখোমুখি, যা ২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটিতে পৌঁছবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করছে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, সহিংসতা প্রতিরোধ ও মোকাবেলার বিষয়গুলোকে কর্মীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদেরকে চাপপূর্ণ পরিস্থিতিকে সহজ করে আনার মতো যোগাযোগ দক্ষতা তৈরি এবং সহিংস পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো উচিত। দলভিত্তিক প্রশিক্ষণ সমন্বিত প্রতিক্রিয়া শক্তিশালী করতে সাহায্য করে এবং একে অন্যের ওপর হামলার সময় সহকর্মীরা কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
এছাড়া বর্তমান কর্মী সুরক্ষা আইনগুলোর কার্যপরিধি এবং প্রয়োগ শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘জিরো-টলারেন্স’ নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে, যার মধ্যে থাকবে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ, ঘটনার রিপোর্ট ও তদন্ত এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের স্পষ্ট প্রক্রিয়া। সম্প্রতি স্পেশালাইজড হসপিটাল ডামাতুরুতে ঘটা হামলার পর অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সতর্কতা হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হলে তা স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা বিপন্ন হলে তারা দ্রুত সতর্কবার্তা দিতেও সক্ষম হবে।
এছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি মোকাবেলায় দৃঢ় উদ্যোগ নেয়া জরুরি। এর মধ্যে একটি পদ্ধতি হলো টাস্ক-শিফটিং বা টাস্ক-শেয়ারিং। এর মাধ্যমে কিছু দায়িত্ব আংশিক বা পুরোপুরি কম যোগ্য কর্মীদের হাতে দেয়া হয়, যাতে উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মীরা তাদের দক্ষতার প্রয়োজনীয় কাজগুলোয় মনোনিবেশ করতে পারে। এরই মধ্যে এ পদ্ধতি ২৩টি সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশে বিভিন্ন সেবার মান উন্নয়নে সহায়ক হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে এইচআইভি/এইডস, যক্ষ্মা, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, মানসিক স্বাস্থ্য, চোখের যত্ন, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা।
প্রতিটি মানুষের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে। যখন আমরা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য এ অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তখন শুধু তাদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত করি না। তাদের সেবাগ্রহীতা সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
আদাএজে ওরেহ: নাইজেরিয়ার রিভার্স স্টেটের হেলথ কমিশনার; কফি আনান গ্লোবাল হেলথ লিডারশিপ ফেলো ও অ্যাসপেন গ্লোবাল ইনোভেটরস সিনিয়র ফেলো
ভাষান্তর: দিদারুল হক