বাজেট প্রতিক্রিয়া

অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে করণীয়

সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছে। এ বাজেটের অর্থায়ন হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

দেখা গেছে, ব্যাংক খাত ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে বড় অংশ বাজেট বাস্তবায়ন হয়। ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ নেয়ায় ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট তৈরি হয় এবং ব্যক্তি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ পায় না। দীর্ঘদিন ধরে সহজলভ্য ব্যাংক ঋণ উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারবিমুখ করেছে। কিন্তু এর ফল এখন স্পষ্ট। ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি তহবিল ব্যবহার ব্যাংক খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজারের শক্তিশালী উপস্থিতি থাকা জরুরি ছিল, যা অর্থনীতিকে একটি বিকল্প ও টেকসই অর্থায়ন কাঠামো দিতে পারত। পুঁজিবাজারে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কারণে এটি সে উৎস হতে পারেনি। দেশের পুঁজিবাজারের যাত্রা পাঁচ দশকের। অথচ পুঁজির জোগানের দিক থেকে এখনো তলানিতে রয়ে গেছে পুঁজিবাজার। অর্থনীতির আকার বিবেচনায় নিলে দেখা যায় যে বিশ্বের আর কোথাও পুঁজিবাজার থেকে এত কম অর্থায়ন হয়নি। তার ওপর দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসেনি।

সারা বিশ্বে শিল্পায়নে মূলধনের জোগান আসে পুঁজিবাজার থেকে। যদিও বাংলাদেশে এ মূলধনের প্রধান উৎস ব্যাংক খাত। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের অবদান যৎসামান্য। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ব্যাংক ঋণের ৪৩ শতাংশ বা ৭ লাখ ৬৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা অর্থায়ন করা হয়েছে শিল্প খাতে। এর মধ্যে ৪ লাখ ২৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা মেয়াদি ঋণ এবং ৩ লাখ ৪১ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা চলতি মূলধন। দেখা যাচ্ছে, শিল্প খাতে পুঁজিবাজারের তুলনায় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়েছে সাত গুণেরও বেশি অর্থ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা, যার প্রায় ৩১ শতাংশই শিল্প খাতে। স্বল্পমেয়াদি আমানতের অর্থ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ করার কারণে ব্যাংকগুলোকেও সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করা হলে সেটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর তহবিল সংগ্রহ ব্যয়কেও অনেকাংশে কমিয়ে দিত।

নির্বাচিত সরকার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের শীর্ষ পদে পরিবর্তন এনেছেন। চেয়ারম্যানসহ যে চার নতুন নেতা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তাদের চেয়ে ভালো কেউ হতে পারতেন বলে আমার তেমন মনে হয়নি। কিন্তু তাদের যোগ দেয়াতেই পুঁজিবাজার চাঙ্গা হয়ে যাবে বা বিনিয়োগকারীর স্বার্থ দীর্ঘকালে রক্ষিত হবে ভাবলে বোকামি হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার আজ যে দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক নীতির মূল স্রোত-মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও শিল্পায়ন কৌশল থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, সেটি কোনো আকস্মিক বা সাময়িক ঘটনা নয়। এটি বহু বছরের নীতিগত ভুল, কাঠামোগত দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা এবং গভীর আস্থাহীনতার যৌথ ফল। একটি কার্যকর পুঁজিবাজার সাধারণত একটি দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন গঠন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ প্রবাহের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশে পুঁজিবাজার এখনো সেই কৌশলগত মর্যাদা পায়নি। ফলে এটি অর্থনীতির কেন্দ্রীয় অবকাঠামোর অংশ না হয়ে ক্রমেই একটি প্রান্তিক, সীমিত ও দুর্বল প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের প্রায় সব সফল শিল্পোন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির অভিজ্ঞতা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগের সবচেয়ে কার্যকর উৎস হলো পুঁজিবাজার। কারণ শিল্পায়ন স্বভাবতই দীর্ঘমেয়াদি, ঝুঁকিনির্ভর ও ধৈর্যসাপেক্ষ। ব্যাংক খাত, বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি আমানতনির্ভর ব্যাংকিং কাঠামো, শিল্পায়নের এ দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। অথচ বাংলাদেশে শিল্প অর্থায়নের প্রধান উৎস এখনো ব্যাংক ঋণ। এ ব্যাংক নির্ভরতা শুধু আর্থিক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে না, বরং অর্থনীতির কাঠামোগত ভারসাম্যও দুর্বল করছে। এর মূল কারণ পুঁজিবাজারকে কখনই কৌশলগতভাবে শিল্পায়নের অর্থায়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও নীতিগত উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্বলতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রতীক হলো ২০২৫ সালে একটি নতুন আইপিও না আসা। এটি নিছক বাজার মন্দা নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকেত। আইপিও মানে শুধু নতুন শেয়ার নয়, এর অর্থ নতুন উদ্যোক্তা, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ। যখন একটি অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় নতুন আইপিও বন্ধ থাকে, তখন সেটি বোঝায় উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারকে আর কার্যকর মূলধন সংগ্রহের প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করছেন না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপর। অর্থাৎ আইপিও সংকট আসলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক গতিশীলতার সংকট।

বর্তমান সরকার অতীতের অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, শেয়ারবাজার কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অপব্যবহারকে উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছে। এ ব্যাখ্যায় সত্যতা আছে, কিন্তু বাস্তবতা আরো গভীর। কারণ আস্থাহীনতার শিকড় শুধু অতীতের কারসাজিতে নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ব্যর্থতায়। বাজারে মানসম্মত, বড় এবং সুশাসিত কোম্পানির ঘাটতি, জটিল ও ব্যয়বহুল আইপিও প্রক্রিয়া, নীতিমালার ঘন ঘন পরিবর্তন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারাবাহিকতার অভাব, সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারকে উদ্যোক্তাদের জন্য অনিশ্চিত করে তুলেছে। একজন ভালো উদ্যোক্তা যদি নিশ্চিত না হন যে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তিনি পূর্বানুমেয় নীতি, ন্যায্য মূল্যায়ন ও স্থিতিশীল বাজার পাবেন, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংক ঋণ, প্রাইভেট ইকুইটি বা বিকল্প অর্থায়নের দিকে ঝুঁকবেন। এখানেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সংকট বিনিয়োগযোগ্য মানসম্মত ইকুইটির ঘাটতি। একটি বাজারের গভীরতা নির্ভর করে তার তালিকাভুক্ত কোম্পানির গুণগত মান, আকার ও বৈচিত্র্যের ওপর। আমরা প্রায়ই সার্কিট ব্রেকার, মার্জিন ঋণ, টিকিট সাইজ বা লেনদেন নীতির মতো কারিগরি সংস্কার নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু এগুলো মূল সমস্যার প্রান্ত ছোঁয় মাত্র। প্রকৃত প্রশ্ন হলো বাজারে নতুন, বড়, লাভজনক ও বিশ্বাসযোগ্য কোম্পানি কোথায়?

এ বাস্তবতায় লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত গেম চেঞ্জার হতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাভুক্তি বাজারে গভীরতা বাড়াবে, বিনিয়োগযোগ্য মানসম্মত ইক্যুইটির ঘাটতি কমাবে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ফিরিয়ে আনবে এবং বাজারে আস্থার নতুন ভিত্তি তৈরি করবে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে করপোরেট গভর্ন্যান্স, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। সরকারের জন্যও এটি ব্যাংক ঋণ বা বাজেটনির্ভরতার বাইরে বাজারভিত্তিক মূলধন সংগ্রহের একটি টেকসই পথ হতে পারে।

তবে শুধু নতুন কোম্পানি আনলেই হবে না, প্রয়োজন সমন্বিত সংস্কার। প্রথমত, আইপিও প্রক্রিয়াকে দ্রুত, স্বচ্ছ, সময়সীমাবদ্ধ ও পূর্বানুমেয় করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর প্রণোদনা ও নীতিগত স্থিতিশীলতার মাধ্যমে ভালো কোম্পানিকে বাজারে আসতে উৎসাহিত করতে হবে। তৃতীয়ত, পেনশন ফান্ড, বীমা, প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কেবল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক নয়, বাজার উন্নয়নমুখী হতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কারসাজি, প্রতারণা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত, দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা জরিমানার বিপরীতে মাত্র ৫ কোটি টাকা আদায় হওয়া আমাদের প্রয়োগ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এটি হয় শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন ভিত্তি হিসেবে পুনর্জন্ম নেবে, নয়তো সীমিত লেনদেননির্ভর, আস্থাহীন ও প্রান্তিক সেকেন্ডারি মার্কেটে পরিণত হবে। একটি দুর্বল পুঁজিবাজার মানে শুধু বিনিয়োগকারীর ক্ষতি নয়, এর অর্থ শিল্পায়নের গতি মন্থর হওয়া, ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ, কর্মসংস্থান সংকোচন এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সক্ষমতা দুর্বল হওয়া। তাই এখন আর খণ্ডিত সংস্কারের সময় নয়। প্রয়োজন দ্রুত, সাহসী, সমন্বিত ও বিশ্বাসযোগ্য নীতিগত রূপান্তর। কারণ একটি দেশের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিশেষ করে শিল্পায়ন ও টেকসই প্রবৃদ্ধি কখনই একটি দুর্বল পুঁজিবাজারের ওপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান

আরও