ব্রেস্ট ক্যান্সার সতর্কতা এবং নারীর মনোজগতের টানাপোড়েন

যেহেতু ব্রেস্ট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে মানসিকতার ভূমিকা অন্যান্য ক্যান্সারের চেয়ে অনেক বেশী তাই তার মনোজগতের বিভিন্ন টানাপোড়েন কাজ করে ।

একমাত্র ক্যান্সার আক্রান্ত নারীই জানে তাকে এ পথ কতটা বেদনা নিয়ে অতিক্রম করতে হয়। ব্রেস্ট ক্যান্সার চিকিৎসা অনেক উন্নত হয়েছে এবং এটি নিরাময়যোগ্য বলা হলেও এটাকে শুধুমাত্র বায়োলজিক্যাল দিক থেকে বিবেচনা করা যায় না। কোন বয়সে ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়েছে, ক্যান্সার কোন স্টেজে আছে, রোগীর পারিবারিক ও আর্থিক অবস্থা, রোগীর স্ট্রেসের সঙ্গে মোকাবেলা করার ধরণ বা খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা, কঠিন সময়ে তার সাপোর্ট সিস্টেম কি, কাছের মানুষগুলোর মনোভাব ইত্যাদি সবকিছুই চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর প্রভাব ফেলে। তাছাড়া একমাত্র ব্রেস্ট ক্যান্সারের ক্ষেত্রেই বডি ইমেজ বা নারীর সৌন্দর্য সরাসরি যুক্ত। এমনিতেই সব ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসার পর কিছু না কিছু দৈহিক পরিবর্তন আসে। কিন্তু ব্রেস্ট ক্যান্সার যেহেতু নারীর সৌন্দর্যে প্রভাব ফেলে তাই অসুখ সংক্রান্ত ভয় এবং মানসিক দ্বন্দ্বের প্রবণতা ও টানাপোড়্ন থাকে দ্বিগুণ যা অন্যদের অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ক্যান্সার চিকিৎসার কারণে কোনো মহিলার চুল পড়ে গেলে বা ব্রেস্ট অপারেশনের মাধ্যমে অপারেশন বা ম্যাসটেকটমি হলে তার শারিরীক কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু তার চুলগুলো যখন ঝরে পড়ে বা নিজের অ্ঙ্গহানির ঘটনা ঘটে তখন তার নিজের ভেতরে যে কষ্ট আর ভাঙ্গাচোরা শুরু হয় তা শুধু ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারে। বাইরের মানুষ তার বাহ্যিক চেহারা নিয়ে প্রশ্ন করে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে আর অনেকে করুণার চোখে তাকায়। তার নারীত্ব যেমন প্রশ্নের মুখে পড়ে তেমনি তার নিজেরও মনে হতে পারে তিনি তার নারীত্ব হারিয়েছেন এবং ছোট চুলে তাকে পুরুষের মত লাগছে। চোখের নীচে কালি, কালো হয়ে যাওয়া, হাত নখ কালো হওয়া সহ অনেক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় শরীরে কেমেথেরাপির পর। যদিও অপারেশনের পর বাহ্যিক চেহারায় বা ত্বকে কোনো পরিবর্তন আসে না। শারিরীক পরিবর্তনের কারণে সমাজের মূলস্রোত থেকে পিছিয়ে পড়ার ভয় কিংবা স্বামীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে এ ভয়ে চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নারীরা নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর চিকিৎসা করানোর ইচ্ছা কমে যায়। এসময় রোগী মানসিক টানাপোড়েনের চরম সীমার মধ্যে অবস্থান করে। এক্ষেত্রে কাছের মানুষ বিশেষ করে স্বামী বা বন্ধু সবচেয়ে বড় নির্ভরতার আশ্রয় হিসাবে থাকতে পারে যা মনের কোণে জমে থাকা দ্বিধা বা ভয় কাটাতে সাহায্য করে। তাছাড়া বাবা মা ভাইবোন ছেলে মেয়ে বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় পরিজন সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে যা রোগীকে চিকিৎসা নিতে দ্বিধা থেকে বের করে আনবে। যেহেতু ব্রেস্ট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে মানসিকতার ভূমিকা অন্যান্য ক্যান্সারের চেয়ে অনেক বেশী তাই তার মনোজগতের বিভিন্ন টানাপোড়েন কাজ করে ।

পরিবারে ব্রেস্ট ক্যান্সারের পূর্ব ইতিহাস থাকলে তাকে জেনেটিক ব্রেস্ট ক্যান্সার বলে যাদের BRCA1, BRCA2 PH54 পজিটিভ থাকে তাদের জেনেটিক মিউটেশনের কারণে এ রোগ অল্প বয়সেই দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে হলিউডের নায়িকা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি একটি যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ডবল ম্যাস্টেকটমি এবং ওভারেক্টমি করে এবং ব্রেস্ট রিকন্স্ট্রাকশন করার মত সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে। এতে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্রেস্ট ক্যান্সার ঠেকিয়ে দেয়া সম্ভব। কিন্তু আমরা অনেকেই কি পেরেছি। অনেকের পরিবারে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বডি ইমেজ নস্ট হবার ভয়ে এ সিদ্ধান্ত নেবার কথা চিন্তা করে না এবং খুব কম মহিলা বডি ইমেজ নষ্ট করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে । আসলে পশ্চিমা নারীদের তুলনায় মন মানসিকতার দিক থেকে আমরা পিছিয়ে এবং কম সাহসী। সুস্থ থাকার চেয়ে বডি ইমেজের প্রতি গুরুত্ব অক্ষুন্ন রাখতে গিয়ে আমরা অনেকেই এ কঠিন অসুখ মোকাবিলা করি। তারপরও এ রোগের ফলে শারিরীক পরিবর্তনের কারণে যে মানসিক চাপ এবং চিকিৎসা পরবর্তীতে পুনরায় রোগীকে সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসা, তাকে আগের মত গুরুত্ব দেয়া এসব কিছুর দায়িত্ব থাকে পরিবার এবং কাছের মানুষদের ওপর। তাছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ভূমিকা অপরিসীম। অসুখজনিত ভয় দূর হলে রোগীর চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়বে। ফলে তার সুস্থতা ত্বরান্বিত হবে। প্রতিটি ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগীকে ভয় না পেয়ে ভাবতে হবে অন্যসব অসুখের মত এটিও একটি অসুখ। অতিরিক্ত চিন্তা বা স্ট্রেস ইমিউনিটিকে প্রভাবিত করে যার ফলে ওষুধের কার্যকারিতা কমতে পারে এবং অসুখ সারতে সময় বেশী লাগতে পারে। পরিবার বন্ধুবান্ধব যদি রোগীর ভরসা জোগাতে পারে তবে তার মনোবল বাড়তে পারে এবং এই রোগ এবং চিকিৎসাজনিত জটিলতা দ্রুত সারাতে পারে।

সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন প্রথমবারের মত ক্যান্সার আক্রান্ত হয় তখন সে রিপোর্টটি বিশ্বাস করতে চায় না। একাধিক রিপোর্টে যদি একই রেজাল্ট আসে তখন কিন্তু তার মেনে নেয়া ছাড়া উপায় থাকেনা। আবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকেই সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। কিন্তু শারীরিকভাবে সুস্থ হবার পরও অনেকে মানসিক অবসাদে ভুগতে পারেন যাদের জন্য মানসিক চিকিৎসা দরকার। একজন মানুষের যখন জীবনের ঝুঁকি থাকে, তখন সে ডিপ্রেশনে যেতেই পারে কিন্তু কেমো চলাকালে অনেকসময় তা বোঝা যায় না। কারণ ডিপ্রেশনের মতো কেমো রোগীর লক্ষণ দ্রুত খিদে, ওজন ও ঘুম কমে যাওয়া। সেক্ষেত্রে অন্যান্য লক্ষণ যেমন নিজেকে গুটিয়ে রাখা, এংজাইটি, হাইপার হয়ে রিএ্যাক্ট করাতে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অধীনে মানসিক চিকিৎসা দিতে হবে। ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগীর মনোজগতের টানাপোড়েন চিকিৎসা এবং সুস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। তাই ডাক্তার এবং প্রিয়জন সবাইকে বোঝাতে হবে চিকিৎসা ঠিকমত হলে রোগী স্বাভাবিক জীবন এবং স্বাভাবিক আয়ু পেতে পারে। ব্রেস্ট ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য এবং সঠিক চিকিৎসা হলে সুস্থভাবে সমাজ, পরিবার এবং কর্মক্ষেত্রে তারা সমানভাবে অবদান রাখতে পারে। সকলে সহমর্মী হোন। বাংলাদেশের নারীরা ব্রেস্ট ক্যান্সার থেকে মুক্ত হোক ।

আয়েশা সিদ্দিকা শেলী: কর কমিশনার

আরও