অভিমত

ব্যাটারি কারখানা, সিসাদূষণ ও মৃত্যুর দায়

পুরনো, পরিত্যক্ত, অব্যবহূত জিনিসের ব্যবহার নতুন নয়। বিশেষ করে পরিকল্পিতভাবে সম্পদের পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জীবনকে গতিশীল করতে পারে। কিন্তু এ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব হওয়া জরুরি। আর তা না হলে পরিত্যক্ত বর্জ্য পরিবেশ ও প্রাণের জন্য ভয়াবহ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আর এভাবেই দীর্ঘ সময় ধরে পুরনো ও পরিত্যক্ত ব্যাটারি থেকে সিসা আহরণ

পুরনো, পরিত্যক্ত, অব্যবহূত জিনিসের ব্যবহার নতুন নয়। বিশেষ করে পরিকল্পিতভাবে সম্পদের পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জীবনকে গতিশীল করতে পারে। কিন্তু ব্যবহার ব্যবস্থাপনা নিরাপদ পরিবেশবান্ধব হওয়া জরুরি। আর তা না হলে পরিত্যক্ত বর্জ্য পরিবেশ প্রাণের জন্য ভয়াবহ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আর এভাবেই দীর্ঘ সময় ধরে পুরনো পরিত্যক্ত ব্যাটারি থেকে সিসা আহরণ কারখানাগুলো দেশে নিদারুণ দূষণ প্রাণহানি ঘটিয়ে চলেছে। এসব কারখানা গড়ে উঠছে দেশের সর্বত্র, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই। মানছে না বিদ্যমান পরিবেশ আইন। জনস্বাস্থ্য, প্রাণবৈচিত্র্য বাস্তুতন্ত্র তছনছ করে দিচ্ছে। শালবন থেকে হাওর, পাহাড় থেকে নদী অববাহিকা, কৃষিজমি থেকে বন্দর নানা স্থানে গড়ে ওঠা এসব ব্যাটারি কারখানার মাধ্যমে মানুষসহ প্রাণীর শরীরে ঢুকছে সিসার বিষ, প্রতিবেশ ব্যবস্থায় ঘটছে গোলমাল। সব ব্যাটারি কারখানাই গড়ে উঠেছে বসতি এলাকায়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এসব ব্যাটারি কারখানার অধিকাংশেরই কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই, কারখানায় পরিবেশ আইন অনুযায়ী কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি নেই। মাঝেমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব কারখানাকে জরিমানা করছে কিংবা সিলগালা করে বন্ধ করে দিচ্ছে। এভাবে দেশের নানা প্রান্তে গড়ে ওঠা পুরনো ব্যাটারি কারখানার মাধ্যমে যদি দেশের সর্বত্র সিসার বিষ ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা গবাদি প্রাণিসম্পদ, মানুষ থেকে শুরু করে প্রকৃতিতে তৈরি করবে এক নিদারুণ বিশৃঙ্খলা। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সিদ্ধান্ত, নীতিমালা কর্মপরিকল্পনা জরুরি। পুরনো ব্যাটারি সিসাদূষণ বিষয়ে জনসচেতনতা গণমাধ্যম প্রচারণা জোরদার করা জরুরি। দেশে পুরনো, পরিত্যক্ত বর্জ্য সংগ্রহ কুড়ানোর চল দীর্ঘদিনের। কিন্তু দিনে দিনে উপাদান সংগ্রহ, ব্যবহার বাণিজ্য মালিকানায় ভিন্নতা এসেছে। শিল্পী রনবীর টোকাই যা কুড়াত, আজকের ভাঙারিরা কি একই জিনিস সংগ্রহ করে? নিরাপদ পরিবেশবান্ধব নীতি অনুসরণ না করে ভাঙারি আজ এক প্রশ্নহীন বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে। আজ শহর কি গ্রামে মাথায় টুকরি কি ভ্যান নিয়ে পুরনো ব্যাটারি কিনছে শত শত মানুষ। এতসব পুরনো ব্যাটারি ভাঙা হচ্ছে কোনো না কোনো অনুমোদনহীন কারখানায়, আর সেখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ছে সিসার বিষ। মরছে গবাদিপশু, জনস্বাস্থ্য পরিবেশ পড়ছে সংকটে। এমনকি এসব ভাঙারি দোকান মজুদঘরও নিরাপদ নয়। বিভিন্ন সময়ে এসব ভাঙারি দোকানে বিস্ফোরণ ঘটে প্রাণহানির কথাও জানা যায়। ২০২০ সালের ২৭ অক্টোবর মোহাম্মদপুরের বালুর মাঠ বস্তি এলাকার একটি ভাঙারি দোকানে বিস্ফোরণ ঘটে সাতজন গুরুতরভাবে দগ্ধ হয় (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, ২৭/১০/২২) সম্প্রতি দেশের নানা প্রান্তে ব্যাটারি কারখানার সিসাদূষণে একের পর এক মারা গেছে অনেক গরু। স্থানীয় মাঠ, কৃষিজমি, মাটি, পানি হয়েছে বিষাক্ত। রাষ্ট্রীয় গবেষণাগারে প্রমাণিত হয়েছে পুরনো ব্যাটারি কারখানার সিসাদূষণেই এমন ঘটেছে। ব্যাটারি কারখানা সিসাদূষণে দেশের নানা প্রান্তে কী ধরনের দূষণ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তা বোঝার জন্য কিছু ঘটনাকে একত্র করা হয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে পুরনো ব্যাটারি কারখানা স্থাপন এবং সিসাদূষণের ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। কেবল বাণিজ্য, আইন, পুনর্ব্যবহার বা পরিবেশ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সুস্বাস্থ্য প্রতিবেশগত নিরাপত্তা।

চান্দপুর হাওর, কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার চান্দপুর ইউনিয়নের কোনপাড়া গ্রামে ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কয়েক দিনে ৩২টি গরু মারা যায়। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় বলছে স্থানীয় ব্যাটারি কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ঘাস পানিতে বিষক্রিয়া ছড়ানোর কারণে গরুগুলোর মৃত্যু হয়েছে (সূত্র: প্রথম আলো, ৩০//২২) গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, চান্দপুর হাওর বিশাল গোচারণভূমি। এখানে শুকনো মৌসুমে প্রতিদিন শত শত গরু চড়ে বেড়ায়। হাওরে চান্দপুর ইউপি চেয়ারম্যানের একটি ভবন আছে। ভবনে পুরনো ব্যাটারি ভেঙে সিসা সংগ্রহের একটি কারখানা স্থাপন করেন স্থানীয় এক নেতা। আর কারখানা থেকেই বিপজ্জনক সিসাদূষণ ঘটছে এবং একের পর এক গরু নিহত হয়েছে, আহত অবস্থায় আছে বহু গরু। প্রাণিসম্পদ কার্যালয় নিহত গরু, ঘাস, খড় মাটির নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠায়। গত ১০ জানুয়ারি নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টে পুরনো ব্যাটারি কারখানা থেকে সিসাদূষণের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। ১২ জানুয়ারি ভ্রাম্যমাণ আদালত কারখানাটি সিলগালা করে বন্ধ করে দেন এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। কারখানার মালিক মাহফুজুর রহমান টাকা পরিশোধ করেন। ঘটনায় কিশোরগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রধান জ্যেষ্ঠ কেমিস্ট গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ধরনের কারখানা করতে হলে ইটিপি এটিপি প্লান্ট থাকতে হয় এবং এসব কারখানার দূষণ কেবল প্রাণীর মধ্যে নয়, মানুষের শরীরে ক্যান্সার, কিডনি হূদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। 

পাকড়াডাঙ্গা, ফুলবাড়ী, দিনাজপুর

২০২১-এর ডিসেম্বরে দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার পাকড়াডাঙ্গায় অজ্ঞাত কারণে ৩৮টি গরুর করুণ মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নিহত গরু, ঘাস, গোখাদ্য মাটির নমুনা ঢাকায় কেন্দ্রীয় রোগ তদন্ত পরীক্ষাগারে (সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরি/সিডিআইএল) পাঠান। ঢাকার চিফ সায়েন্টিফিক অফিসারের কার্যালয় টেকনোলজি অ্যান্ড জুরিসপ্রুডেন্স অণুবিভাগের চিকিৎসক স্বাক্ষরিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ফুলবাড়ীর উল্লিখিত পাকড়াডাঙ্গার মাটি, আশপাশের জমির ঘাস খড়ের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত সিসার উপস্থিতির কারণে গরুর মৃত্যু ঘটছে। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পাঠানো পাকড়াডাঙ্গার মাটি ঘাসের নমুনায় ৩০ হাজার পিপিবি, খড়ে ৩০ হাজার পিপিবি মাত্রার সিসা পাওয়া গেছে। পাকড়াডাঙ্গায় একটি পুরনো ব্যাটারি ভাঙা কারখানা গড়ে উঠেছিল এবং ব্যাটারি কারখানা থেকেই তীব্র সিসাদূষণ ঘটেছে। ব্যাটারি কারখানার তিন বর্গকিলোমিটার এলাকার আমন মৌসুমের পাকা ধান কৃষকরা ভয়ে কাটেননি। তবে কতদূর অবধি সিসাদূষণ ঘটেছে তা পরীক্ষা করতে স্থানীয় কৃষকরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানিয়েছেন। ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দূষিত খড় পুড়িয়ে ফেলা কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা জানিয়েছিলেন গণমাধ্যমে।

আমাইড়, পত্নীতলা, নওগাঁ

নওগাঁর পত্নীতলার আমাইড় ইউনিয়নের কান্তা কিসমত গ্রামে সাইনবোর্ডবিহীন পুরনো ব্যাটারি ভাঙা কারখানার বর্জ্যে জনজীবন অতিষ্ঠ। স্থানীয় পরিবেশ, মাটি, পানি কারখানার সিসাদূষণে বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। আশপাশে কৃষিকাজে সমস্যা হচ্ছে, গরু-ছাগল সিসার কারণে দূষিত ঘাস খেতে চাইছে না, ঘাস খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধার খায়রুল ইসলাম আমাইড় ইউপি মেম্বার রফিকুল ইসলাম কারখানা নিয়ন্ত্রণ করেন। কারখানার মালিক জানান, কারখানার পরিবেশ ছাড়পত্র নেই  (সূত্র: দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ, /১১/২০২১) 

শালবন, ঘাটাইল, টাঙ্গাইল

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের ধলাপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ আশারিয়াচালা শালবনের ভেতর গড়ে উঠেছে পুরনো ব্যাটারির একটি কারখানা। গাইবান্ধা থেকে শ্রমিকদের এনে রাতের বেলা ব্যাটারি থেকে সিসা বের করা হয়। সিসাদূষণের ফলে এলাকায় বাড়ছে রোগবালাই, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সারের মতো ঝুঁকি (সূত্র: আরটিভি, ১০//২০২০) ধলাপাড়া বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কারখানাটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছিলেন গণমাধ্যমে।

মুছাপুর, বন্দর, নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ বন্দরে এক চাইনিজ ব্যাটারি কারখানার দূষণের কারণে হাজারো মানুষ, স্থানীয় পরিবেশ প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে। মুছাপুর ইউনিয়নের পাতাকাটা, লক্ষ্মণখোলা, দাসেরগাঁর প্রতি ঘরে ঘরে চোখের অসুখ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগবালাই লেগে আছে এবং এলাকাবাসীর অভিযোগ কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে জমিতে ফসল হচ্ছে না, গাছে ফল ধরে না এবং পুকুরেও মাছ বাঁচতে পারছে না (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ২৬//২০১৯) ব্যাটারি কারখানা থেকে অ্যাসিড মিশ্রিত বর্জ্য পানি সিসাযুক্ত ছাই ছড়িয়ে পড়ছে উন্মুক্ত পরিবেশে। গণমাধ্যমকে কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের চারটি ইটিপি প্লান্ট আছে, তবে সামান্য পরিবেশ দূষণ হলেও হতে পারে।

কী আছে আইনে?

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০১০-এর সংজ্ঞায়ন অংশে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্যের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যেকোনো বর্জ্য, যা নিজস্ব ভৌত বা রাসায়নিক গুণগত কারণে বা অন্য কোনো বর্জ্য বা পদার্থের সংস্পর্শে আসার কারণে বিষক্রিয়া, জীবাণু সংক্রমণ, দহন, বিস্ফোরণক্রিয়া, তেজস্ক্রিয়া, ক্ষয়ক্রিয়া বা অন্য কোনো ক্ষতিকর ক্রিয়া দ্বারা পরিবেশের ক্ষতিসাধনে সক্ষম। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০১০-এর নং ধারার () অংশে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য উৎপাদন, আমদানি, মজুদকরণ, বোঝাইকরণ, পরিবহনের ক্ষেত্রে বাধা-নিষেধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, ...পরিবেশের ক্ষতিরোধকল্পে সরকার অন্যান্য আইনের বিধানসাপেক্ষে বিধি দ্বারা ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, ধারণ, মজুদকরণ, বোঝাইকরণ, সরবরাহ, পরিবহন, আমদানি, রফতানি, পরিত্যাগকরণ, ডাম্পিং ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। যদি কেউ ধারা লঙ্ঘন করে তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রথম অপরাধের ক্ষেত্রে অনধিক দুই বছর বা অনধিক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে অন্যূন দুই বছর, অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অন্যূন লাখ, অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড কার্যকর হবে। বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ মাঝেমধ্যে হতে দেখা যায়, কিন্তু তার পরও কীভাবে জনবসতি বাস্তুতন্ত্র বিপন্ন করে বিপজ্জনক এসব কারখানা গড়ে ওঠে সেটাই বিস্ময়কর।

২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে পরিবেশ দূষণকারী পাঁচটি ব্যাটারি কারখানা বন্ধ করে দেয়। রাজফুলবাড়িয়া এলাকার রিজেন্ড ব্যাটারি লিমিটেড জেলটেক ব্যাটারি লিমিটেড নামে দুটি কারখানা সিলগালা করে দেয়া হয় এবং ক্ষতিকর বর্জ্যের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের জন্য সেভেন স্টার ওয়ার্কস কারখানাকে লাখ টাকা জরিমানা করে বন্ধ করে দেয়া হয় (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, ১০//২০২০) ঢাকার আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের রাঙামাটি গাজী খালের পাশে এক যুগ ধরে চলছে পরিত্যক্ত ব্যাটারি ভেঙে সিসা সংগ্রহের একটি কারখানা। ফাতেমা ট্রেডার্স কারখানাটি শুরু করলেও কুষ্টিয়ার সুমন মিয়া এখন এটি ভাড়া নিয়ে চালাচ্ছেন। কারখানার সিসাদূষণে পানি, মাটি জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পড়েছে। গাজীপুরের রায়েদ ইউনিয়নের ভলেশ্বর এবং সিংহশ্রী ইউনিয়নের বড়িবাড়ী এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিবেশ দূষণের জন্য জরিমানাসহ দুটি পুরনো ব্যাটারি কারখানা সিলগালা করে বন্ধ করে দেয় (সূত্র: বার্তা২৪ডটকম, ৩০//২০২০) নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বরপা মাশাবো এলাকার জিইউজো ইন্ডাস্ট্রিজ লি., লিমিনা গ্রুপ রিমসো ব্যাটারি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লি. নামের তিনটি ব্যাটারি কারখানাকে পরিবেশ দূষণের কারণে লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব কারখানা থেকে সিসাদূষণ ঘটছে বলে নানা সময়ে অভিযোগ এসেছে (সূত্র: ঢাকা টাইমস, ১২//২০২১)

সিসাদূষণমুক্ত ভবিষ্যৎ চাই

সিসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত বিশ্বের তিন ভাগের এক ভাগ শিশু। ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা দেশগুলোর ভেতর বাংলাদেশ চতুর্থ। ইউনিসেফ দ্য টক্সিক ট্রুথ : চিলড্রেনস এক্সপোজার পলিউশন আন্ডারমিন্স জেনারেশন অব পোটেনশিয়াল শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন জানায়, বিশ্বজুড়ে প্রতি তিন শিশুর একজন বা প্রায় ৮০ কোটি শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে মাইক্রোগ্রাম বা তারও বেশি। শিশুদের প্রায় অর্ধেকের বসবাস দক্ষিণ এশিয়ায়। বাংলাদেশে আনুমানিক কোটি ৫৫ লাখ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার। কেন এবং কীভাবে শিশুরা সিসাদূষণে আক্রান্ত হচ্ছে? উল্লিখিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে উন্মুক্ত বাতাস এবং আবাসস্থলের কাছাকাছি এলাকায় সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অবৈধ পুনর্ব্যবহারের কারণে সিসার সংস্পর্শে আসছে এত মানুষ। আক্রান্ত হচ্ছে শিশুসহ সব বয়সের মানুষ। কেবল অসুস্থতা বা প্রাণহানি নয়, সিসাদূষণের কারণে বাংলাদেশে বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পাওয়ায় যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তা দেশের জিডিপির দশমিক শতাংশের সমান (সূত্র: ইউনিসেফ, ৩০//২০২০) বাংলাদেশে মোট তিনটি পুরনো ব্যাটারি রিসাইকেল প্লান্টের কথা জানা যায়ফরিদপুরের মধুখালী গাজীপুরে। দেশের সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারি রিসাইকেল প্লান্ট স্থাপিত হয়েছে নড়াইলের উজিরপুর গ্রামে, এখানে মাসে ৫০০ টন সিসা উৎপাদনের ক্ষমতা আছে এবং কারখানাটি পরিবেশবান্ধব (সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল, //২০১৯) পুরনো ব্যাটারি বিপজ্জনক সিসাদূষণ বিষয়ে আমাদের জাতীয় সিদ্ধান্ত জরুরি। জনতত্পরতা সংবেদনশীল কর্মপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে আসুন গড়ে তুলি সিসাদূষণমুক্ত আমাদের ভবিষ্যৎ।

 

পাভেল পার্থ: গবেষক, প্রতিবেশ প্রাণবৈচিত্র্য

আরও