বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার পথে একাধিক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো জীবন্ত মাইলফলক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। এসব জীবন্ত ঘটনার মধ্যে মুজিবনগর সরকার গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মুজিবনগর সরকার গঠন শুধু একটি ঐতিহাসিক পর্ব ছিল না। এ সরকার গঠনের উদ্যোগ গভীর জাতীয় সংকটের সময়ে উদ্ভূত কৌশলগত রাজনৈতিক ও কার্যকর রাষ্ট্র-পরিকল্পনার বাস্তব প্রতিফলন। ইতিহাসের উদার ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে যখন মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক অনিশ্চয়তা, নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিরোধের খণ্ড খণ্ড প্রেক্ষাপট অনিশ্চয়তাই বাড়াচ্ছিল তখন এ সরকার প্রথমবারের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামকে একটি সুসংগঠিত, রাষ্ট্রসদৃশ কাঠামোয় রূপ দিয়েছিল।
একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাত্রে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকাসহ সারা দেশেই ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে এক নির্মম অভিযান পরিচালনা করে। এ ভূখণ্ডের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরাসরি মুছে দেয়ার জন্যই তারা এ অভিযান পরিচালনা করে। এমন প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা বাঙালির প্রতিরোধকে নৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি দেয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দ্বারা গ্রেফতার হওয়ায় এক ধরনের নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়। সারা দেশে প্রতিরোধ যুদ্ধগুলো বিচ্ছিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তৎকালীন সেনা অফিসার মেজর জিয়াউর রহমানসহ আরো অনেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। কিন্তু তবু সমন্বিত নেতৃত্বের অভাব থেকে যায়। এ শূন্যতা পূরণ করার জন্যই একাত্তরের ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। সময়ের নিরিখে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে এ সরকার গঠন ছিল অপরিহার্য।
মুজিবনগর সরকার গঠনের এক সপ্তাহ পর অর্থাৎ ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার কাঠামো যাত্রা শুরু করে। অস্থায়ী এ সরকার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) শপথ নেয়। পাকিস্তানে বন্দি থাকলেও সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান। প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দীন আহমদ। খোন্দকার মোশতাক আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানসহ অন্য নেতারা মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সামরিক দিকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ পান কর্নেল এমএজি. ওসমানী।
মুজিবনগর সরকারের একটি জরুরি বিষয় হলো এ সরকারের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে অভিন্ন কাঠামোর অধীনে আনা হয়। এভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি সমন্বিত কমান্ড ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিরোধমূলক যুদ্ধগুলো সুসংগঠিত ও লক্ষ্যভিত্তিক হয়ে ওঠে। এভাবেই ধীরে ধীরে তা মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। এটি মুক্তিযুদ্ধের একটি বড় অর্জন অবশ্যই। মার্চ ও এপ্রিলের শুরুতে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল তা ছিল বিচ্ছিন্ন, অসংগঠিত এবং অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয়হীন। নিয়মিত বাহিনী, গেরিলা ইউনিট এবং স্থানীয় যোদ্ধাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার এসব বাহিনীকে সেক্টরভিত্তিক কাঠামোয় সংগঠিত করে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। তাছাড়া অস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি যুদ্ধের পরিকল্পনা দেয়। এভাবে গেরিলা ও নিয়মিত দুই ধরনের বাহিনীই কার্যকরভাবে সংগঠিত হতে পারে। সীমান্ত অঞ্চলে ভারতের সহায়তায় প্রশিক্ষণ শিবির, লজিস্টিক সহায়তা এবং কৌশলগত পরিকল্পনা এ সরকারের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়। ফলে যুদ্ধ একটি ধারাবাহিকতা ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা লাভ করে। অস্থায়ী সরকার তথ্যপ্রচার ও জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে এটি মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রচার, পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন তুলে ধরা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়ায়। মুক্তাঞ্চলগুলোতে প্রশাসনিক কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ এবং সীমিত বেসামরিক শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে এটি শুধু একটি প্রতিরোধ সংগঠন নয়, বরং একটি কার্যকর রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রাথমিক রূপ।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান যেখানে যুদ্ধকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছিল, সেখানে অস্থায়ী সরকার এটিকে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কাজ করে। ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা সামরিক ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করে এবং বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক মিশন পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়। ওই সময়ের শীতল যুদ্ধকালীন বৈশ্বিক রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যের কারণে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বিলম্বিত হলেও এ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং পরবর্তী সময়ে ভারতের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করে। মুজিবনগর সরকারের চ্যালেঞ্জগুলো কেবল প্রশাসনিক বা সামরিক ছিল না। প্রথমত, আর্থিক সম্পদের তীব্র অভাব ছিল। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের আগের প্রশাসনিক কাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। তৃতীয়ত, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি নেতৃত্বে একটি মানসিক ও প্রতীকী শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিসভার ভেতরে যুদ্ধ কৌশল, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে মতপার্থক্যও ছিল। তবে তাজউদ্দীন আহমদের দৃঢ় ও বাস্তবধর্মী নেতৃত্বে এসব মতভেদ বড় ধরনের বিভাজনে রূপ নেয়নি।
এটি সত্য যে মুজিবনগর সরকার নিখুঁত ছিল না। তবে নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটি কার্যকর রাজনৈতিক-সামরিক কাঠামো অবশ্যই। এর সাফল্য যেমন স্পষ্ট, তেমনি এর সীমাবদ্ধতাও ইতিহাসের অংশ। এ চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এ সরকার মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত, লক্ষ্যনির্ভর এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংগ্রামে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিল। এজন্য মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কেবল প্রাসঙ্গিক নয়, বরং কাঠামোগত ও কৌশলগতভাবে অপরিহার্য ছিল। এটি প্রতিরোধকে ঐক্যবদ্ধ করে, যুদ্ধকে দিকনির্দেশনা দেয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে। এমন একটি সরকারের অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ হয়তো আরো দীর্ঘ, বিচ্ছিন্ন এবং কম কার্যকর হয়ে উঠত। ইতিহাসের দৃষ্টিতে এটি শুধু একটি অস্থায়ী প্রশাসন নয়; বরং এটি ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, বৈধতা এবং সংগঠিত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রথম বাস্তব প্রতিফলন।
ড. আমানুর আমান: লেখক ও গবেষক