নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পর তা আহরণ এবং শেষে বিতরণ—যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এগুলোই প্রধান তিনটি কাজ। এজন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন, কৃতিত্ব ও খ্যাতি নির্ভর করে নতুন জ্ঞান সৃজনে গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাংকিং নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গবেষণা ও উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বলে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংগুলোয় অবশ্য বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান ভালো নয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল। দেশে গবেষণা সংস্কৃতি এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে দক্ষ গবেষক ধরে রাখার মতো প্রণোদনা এখানে মেলে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও গবেষণায় যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে আমরা পিছিয়ে পড়ি।
গবেষণা পরিচালনা থেকে শুরু করে প্রকাশ পর্যন্ত বিনিয়োগ জরুরি। এতদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকরা নিজ অর্থায়নে কিংবা বৈদেশিক অনুদানের মাধ্যমে গবেষণা করেছেন। সেখানেও পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। এদিকে কয়েক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় স্বল্প পরিসরে হলেও গবেষণার জন্য তহবিল বরাদ্দ দিতে শুরু করেছে। এজন্য কয়েকটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে অবস্থান নিতে পেরেছে। তবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনের এ অগ্রযাত্রা কতদিন ধরে রাখা যাবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে ইউজিসিরই এক সিদ্ধান্তে। এতদিন ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালগুলোকে প্রথাগতভাবে তার অন্য সব খাতের বার্ষিক বাজেটের সঙ্গে গবেষণা প্রকল্পের বাজেট অনুমোদন করত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তখন নিজস্ব গবেষণা নীতিমালা, গবেষণা প্রকল্পের মেরিট, গবেষকের সক্ষমতা এবং গবেষণা প্রকল্পের গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার বিবেচনা করে গবেষণা প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দিত। ফলে গবেষণা প্রস্তাবের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে গবেষকদের যোগ্যতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী তহবিল বণ্টন করা যেত।
গবেষণার ফল তাৎক্ষণিক পাওয়া যায় না। দেশে অনেকের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে, গবেষণায় অনিয়মের মাধ্যমে অনেক অর্থের অপব্যয় করা হয়। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা বাজেট একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার বরাদ্দ ও ব্যয় করা হয়। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কাছে প্রথমে লিখিত গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। এরপর গবেষণা প্রস্তাবকারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ ডিন ও জ্যেষ্ঠ গবেষকদের সামনে গবেষণা প্রকল্পের বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করে প্রকল্পের মেরিট এবং গবেষকের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হয়। তারপর গবেষণা প্রকল্পের মেরিট, গবেষকের গবেষণা পরিচালনার অভিজ্ঞতা, অভ্যন্তরীণ ও বহিঃরিভিউয়ার কর্তৃক প্রদত্ত প্রকল্প প্রস্তাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন, ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গবেষণা তহবিল বরাদ্দ করা হয়। গবেষণা সমাপনান্তে আর্থিক সমন্বয় ও বিস্তারিত গবেষণা প্রতিবেদন পেশ করতে হয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ না দিয়ে, ইউজিসি সরাসরি গবেষণা খাতের বরাদ্দ পরিচালনা করবে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। যদি এ সিদ্ধান্ত বহাল হয় তাহলে গবেষকরা সঠিক সময়ে গবেষণা বরাদ্দ পাবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেকের মতে, দেশে অপ্রতুল গবেষণা হলেও এ সিদ্ধান্তের কারণে গবেষণার গতি ব্যাহত হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে অসন্তোষ জানিয়েছে। অনেকে প্রশ্ন করতেই পারেন, ইউজিসি একাই দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তহবিল পরিচালনা করলে সংকট আসলে কোথায়? এমনটাই কি যথেষ্ট গবেষণাবান্ধব ও বাস্তবসম্মত হয় না?
ইউজিসি প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে সরাসরি যে গবেষণা বাজেট পাঠায় তাতে অনেক দেরি হয়। ইউজিসির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বরাদ্দ আসতে আসতে অর্থবছরের অর্ধেক সময় পেরিয়ে যায়। অথচ ৩০ জুনের মধ্যে ব্যয়ের সমন্বয় দাখিল করার নিয়ম রয়েছে। এজন্য এক বছর মেয়াদের গবেষণা ছয় মাসে শেষ করতে গিয়ে গবেষকদের তাড়াহুড়ো করতে হয়। এভাবে গবেষণার মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। গবেষণায় তাড়াহুড়ো করা ঠিক নয়। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শুধু গবেষণাই করার সুযোগ পান না। তাদের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনায়ও অংশ নিতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্ভাবনাময় ও উপযুক্ত গবেষণা প্রকল্প প্রস্তাব নির্বাচন এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, সক্ষম ও দক্ষ গবেষক বাছাই করতে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এটা একটা দীর্ঘ ও জটিল কর্মযজ্ঞ। কিন্তু ইউজিসি সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষকের গবেষণা প্রকল্প প্রস্তাব কীভাবে আরো দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করবে তা স্পষ্ট নয়। গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়ন আর পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন এক কথা নয়। নতুন নতুন ধারণা নিয়ে গবেষণা প্রস্তাব তৈরি করলে তা বিশেষজ্ঞ ছাড়া সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই সম্ভব নয়।
এটা সত্য যে ১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নের এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে যথেষ্ট দক্ষ লোকবল ইউজিসির নেই। ইউজিসি হয়তো সারা দেশের দক্ষ গবেষকদের এ কাজে নিযুক্ত করতে পারে। কিন্তু ১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকেন্দ্রীভূত হয়ে কাজটি যত দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করা যেত, সেটা কি শুধু এক কেন্দ্রে করা যাবে?
গবেষণা প্রকল্প প্রস্তাব বাছাই ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইউজিসির অতীত অভিজ্ঞতা কী বলে? গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, বিশ্ব ব্যাংক ও ইউজিসির সহায়তায় উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে ২০২৩ সালে হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্প শুরু করে ইউজিসি। ৪ হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে চলমান এ প্রকল্পের প্রায় তিন বছর পার হলেও অগ্রগতি নামমাত্র। প্রকল্পের বাকি কাজ (প্রায় ৯৫ শতাংশ) শেষ করতে হবে ২০২৮ সালের মধ্যে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেই জানা যায়, অর্ধেকের বেশি সময় পার হলেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ। হিট প্রকল্পের কার্যপদ্ধতি, প্রকল্প যাচাই-বাছাই, প্রকল্প মঞ্জুর, অগ্রগতি, ইত্যাদি বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, শিক্ষামন্ত্রী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসংখ্যক শিক্ষক অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ইউজিসি কর্তৃক প্রকল্প পরিচালক বা পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে তৎকালীন সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে। ইউজিসির বর্তমান সিদ্ধান্তেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও হস্তক্ষেপ বাড়বে বলেও অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
একজন গবেষকের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, সততা, ইত্যাদি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ও জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকরা যত ভালো জানবেন, অন্য কারো পক্ষে কি তা সম্ভব? যদি সম্ভব হয়, তাহলে সেই বিদ্যাটা কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে লেনদেন করা যেত না? তাহলে কি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পে অনিয়ম ঘটে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কি সঠিক প্রকল্প নির্বাচন, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও সম্পাদন নিশ্চয়নে দক্ষতার ঘাটতি আছে? থাকতেই পারে। তাহলে এ সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান আগে সন্ধান করা দরকার ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি নিয়মতান্ত্রিকতা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে না পারে, তাহলে ইউজিসি সেটা করবে কীভাবে? তারা যদি সেটা করতে পারে, তাহলে সেই মন্ত্রটা তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিখিয়ে দেয়া যেত।
ইউজিসি আসলে কোন লক্ষ্যে, কী প্রক্রিয়ায় গবেষণা খাতের তহবিল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গবেষণা পরিচালনায় ভূমিকা রাখবে বিষয়টা ইউজিসি এখনো স্পষ্ট করেনি। যদি ইউজিসির হাতে উৎকৃষ্ট গবেষণা পরিচালনা কৌশল থাকে, তাহলে সেটা দেশের শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সঙ্গে আগেই আলোচনা করা যেত। তাহলে এ বিষয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হতো না।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে স্থান করে নেয়ার যে যাত্রা শুরু করেছে সেটা যেন থেমে না যায়। ইউজিসি যদি একটি উৎকৃষ্টতর, পরিচ্ছন্ন, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও উপযুক্ত পন্থায় গবেষণা প্রকল্প নির্বাচন এবং বাস্তবায়ন করার কৌশল অবলম্বন করতে চায়, তাহলে তার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মপন্থা সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আগেই খোলাসা করা উচিত।
ড. মো. মুনিবুর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়