বারান্দার এক কোণে চুপচাপ বসে আছেন এক বৃদ্ধা। তার স্বামী মারা গেছেন বছরখানেক হলো। শরীরে নানা ধরনের রোগ বাসা বেঁধেছে। নিয়মিত ওষুধ লাগে, আবার হাঁটতেও খুব কষ্ট হয়। ছেলে জেলার বাইরে চাকরি করেন, মেয়ে থাকেন বিদেশে। মায়ের কাছে না থাকলেও তার প্রতি সন্তানদের ভালোবাসার কোনো কমতি নেই; তবে আছে সময়ের কমতি। ফোনে প্রতিদিন কথা হয়, প্রয়োজন হলে টাকা পাঠানো হয়। তবু সেই বৃদ্ধা অসুস্থ হয়ে রাতে ঘুম ভেঙে গেলে পাশে বসার মতো, কিংবা খুব প্রয়োজনে মনের কথা বলার মতো কাউকে খুঁজে পান না। তার খুব অসহায় বোধ হয়। শেষ বয়সে বৃদ্ধ জীবনে ‘ভালো থাকার’ সংজ্ঞা খুঁজতে থাকেন।
গল্পটি কাল্পনিক হলেও আগামী দিনের বাংলাদেশে এমন লাখো গল্প অনেক পরিবারের বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে। ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হলো। এ বছরে দিনটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘The Age of Longevity: Rethinking Systems for Longer Lives’। অর্থাৎ মানুষ যখন আগের চেয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকছে, তখন তার এ দীর্ঘ জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, সেবা খাত ও অন্যান্য ব্যবস্থা নিয়েও আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
বাংলাদেশ ক্রমে ‘এজিং সোসাইটি’ বা বার্ধক্যপ্রবণ সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯১ সাল থেকে হিসাব করলে দেখা যায় দেশে এ তিন দশকে ৬০ প্লাস প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধির হার ছিল প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, যা মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়েও দ্রুত। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ (প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখ)। বিভিন্ন জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছাতে পারে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ যে বাংলাদেশকে আমরা এতদিন তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে দেখে এসেছি, সেই বাংলাদেশ দ্রুত প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দেশে পরিণত হচ্ছে। এখন যেমন রাস্তায় বের হলে অসংখ্য তরুণদের দেখতে পাওয়া যায়; ২০৫০ সাল নাগাদ ঘর থেকে বের হলে আশপাশে তেমনি অসংখ্য প্রবীণ দেখতে পাওয়া যাবে। বর্তমানে আমরা যে বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত আলোচনার কেন্দ্রে রাখছি তরুণ জনগোষ্ঠী ও তাদের ঘিরে কাঙ্ক্ষিত জনমিতিক লভ্যাংশ ও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে; সেটির মুদ্রার ঠিক অপর পিঠেই আছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের বার্ধক্যের গল্প। কারণ একদিকে বর্তমানের প্রবীণ জনগোষ্ঠী দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ জনগোষ্ঠী হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মানুষের বর্তমান গড় আয়ু ৭২ দশমিক ৩ বছর যেখানে পুরুষদের তুলনায় নারীদের গড় আয়ু কিছুটা বেশি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি, শিশুমৃত্যু কমে আসা, পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যের অগ্রগতি সব মিলিয়েই দেশে মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দিন বাঁচার সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে একাধিক দীর্ঘমেয়াদি রোগের হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একেকজন প্রবীণ একাধিক রোগবালাই নিয়ে এ দীর্ঘ জীবন কাটাচ্ছেন, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়। সরকারি হিসাব মতে, দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, কিডনি সমস্যা, ক্যান্সার, বাত, চোখের সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টের মতো রোগে ভুগছে। এক্ষেত্রে প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের শেষলগ্নে কর্মজীবন শেষ হয়ে যাওয়া, স্বামী বা স্ত্রীকে হারানো, সন্তানদের দূরে থাকা, কিংবা দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য জটিলতায় অনেক প্রবীণই একাকিত্ব বা বিষণ্নতার মধ্যে থাকেন, যা তাদের মাঝে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অথচ অনেক পরিবারই প্রবীণের এ স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা আচরণের পরিবর্তনকে বয়সের স্বাভাবিক সমস্যা মনে করে উপেক্ষা করে থাকে।
সুতরাং হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রবীণদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা, চোখের দৃষ্টিশক্তি, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রাথমিক মূল্যায়ন যুক্ত করার পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রবীণবান্ধব সেবায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে পরিবারের কাঠামো বদলাচ্ছে। ছোট পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। দ্রুত নগরায়ণ, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সন্তানদের শহর বা বিদেশে চলে যাওয়ার কারণে আগের মতো পরিবারের ওপর নির্ভর করে প্রবীণদের যত্ন নেয়া দিন দিন কঠিন হচ্ছে। তাই পাড়া বা ওয়ার্ডভিত্তিক সরকারি বিনামূল্যের বা বেসরকারি স্বল্পমূল্যের হোম কেয়ার, প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারী এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থার মতো সামাজিক পরিচর্যার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলোকেও প্রবীণদের সামগ্রিক কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রবীণদের কর্মক্ষমতা। বাংলাদেশের অনেক মানুষ ৬০ বছর পার হওয়ার পরও কর্মক্ষম থাকার মতো অবস্থায় থাকেন যেমন কৃষিকাজ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প কিংবা অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকেন। তাই বার্ধক্য মানেই যে কর্মক্ষমতার সমাপ্তি এমন ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। যারা কাজ করতে সক্ষম ও আগ্রহী, তাদের জন্য বয়য়োপযোগী ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের জন্য আর্থিক নিরাপত্তাও জরুরি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দারিদ্র্যপ্রবণ এ দেশে প্রবীণের বিশাল একটা অংশ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে। আর যারা যৎসামান্য ভাতা পেয়ে থাকেন এ সহায়তাও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের বেসরকারি খাতের কর্মজীবী মানুষ, কৃষক, দিনমজুর, গৃহকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মতো অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষের জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরো সহজ ও বিস্তৃত করতে হবে।
প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গড়তে গণপরিবহন, আবাসন ও জনপরিসরকেও বয়সবান্ধব করতে হবে। ভাঙা ফুটপাত, গণপরিবহনে ওঠানামার অসুবিধা কিংবা বাসাবাড়িতে পর্যাপ্ত আলোর অভাব প্রবীণদের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ করে। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় নিরাপদ পার্ক ও হাঁটার পথ, বসার বেঞ্চ, ছায়া ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে প্রবীণরা নিরাপদে হাঁটাচলা ও সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখতে পারেন। আমাদের ভবিষ্যতে নিজেদের কথা ভেবে হলেও এখন থেকে এসব নিয়ে আরো যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখা দরকার, প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ শুধু প্রবীণদের জন্য নয়, এটি আমাদের সবার ভবিষ্যতের জন্য সেই পরিবেশের নিশ্চয়তা দেয় যেখানে আমরা সুস্থ, নিরাপদ, স্বাধীন ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারব।
মো. মাহির ফয়সাল: সহকারী অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়