দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মূলত চারটি ধাপ রয়েছে—প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ দুটি হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা। অন্যদিকে রয়েছে সর্বোচ্চ ধাপ উচ্চশিক্ষা। সারা বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই হচ্ছে উচ্চশিক্ষার চারণ ভূমি। এখানকার শিক্ষকরা সেই শিক্ষা ব্যবস্থার কাণ্ডারি। বিশ্ববিদ্যালয় মূলত উচ্চতর শিক্ষা এবং গবেষণার একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় একাডেমিক ডিগ্রি প্রদান করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া অনেকটাই অনুশীলন, অধ্যবসায় ও উদ্ভাবননির্ভর। শিক্ষকদেরও পেশাগত কাজ প্রধানত দুটি—শিক্ষাদান ও গবেষণা। যদিও এর বাইরে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব শিক্ষকদের পালন করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের শিক্ষা ও পাঠ্যক্রম পরিচালনা স্কুল-কলেজের গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার মতো নয়। এখানে বিভাগীয় শিক্ষকরা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর পর কোর্স কারিকুলাম পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেকটাই যুগোপযোগী করে নেন, যা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে শিক্ষা ও গবেষণার কার্যক্রম পরিচালনার সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা পায়।
শ্রেণীকক্ষে উপযুক্ত পাঠদানের জন্য নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষকরা নিজেদের প্রস্তুত করেন। রাত-দিন গবেষণা করে নিত্যনতুন অনেক তথ্য ও উপাত্ত তাদের উদ্ভাবন করতে হয়। এ কাজে শিক্ষকদের ব্যয় করতে হয় প্রচুর সময় ও শ্রম। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির বাইরে অন্য কোনো পার্ট টাইম কাজ করার সময় ও শক্তি তাদের অবশিষ্ট থাকে না। এতে ব্যক্তিগত জীবনযাপনের জন্য এখানকার বেতন-ভাতা ব্যতীত অতিরিক্ত কোনো আয়ের উৎস তাদের থাকে না। যদিও কারো কারো ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেও থাকে, তবে সেটার দায় পুরো শিক্ষক সমাজ নেবে না। অতএব যিনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেবেন প্রথমেই তার জন্য সম্মানজনক বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা অপরিহার্য, যা তার সম্মানজনক জীবন মানের পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে।
পেটে ক্ষুধা নিয়ে কোনো কাজেই সঠিকভাবে মনোনিবেশ হয় না। সংসার জীবনে অভাব-অনটন লেগে থাকলে দৈন্যদশাসংবলিত মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সাবলীল পাঠদান কোনোভাবেই সম্ভব নয়, সেখানে গবেষণার মতো উদ্ভাবনী একটি কর্মকাণ্ড পরিচালনা তো বহু দূর। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সবচেয়ে কম, যা সত্যিকার অর্থেই হতাশাজনক। এ রকম দৈন্যদশাসংবলিত বেতন-ভাতা নিয়ে মেধাবীদের এখানকার চাকরিতে বেশি দিন ধরে রাখা সম্ভব নয়। দেখা যায় উন্নত দেশে যারা পিএইচডি করতে যান, তারা সাধারণত আর দেশে ফিরতে চান না। এর মূল কারণ সেখানকার উন্নত জীবন ব্যবস্থা, আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধাদি, যা অনেকটাই কোনো ব্যক্তির আয়-রোজগার ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বর্তমান দুর্বল বেতন কাঠামো দিয়ে মেধাবীদের শিক্ষকতা ও গবেষণা পেশায় আকৃষ্ট করা সম্ভব না। আর যদি সেটা করা না যায় তবে যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষাদানও দিবাস্বপ্ন মাত্র। কারণ বটগাছ চৈত্র্যের দুপুরে প্রখর রোদে ক্লান্ত পথিককে যেভাবে ছায়া দেয়, ক্ষুদ্র কলাগাছ দ্বারা সেটা আশা করা কেবলই দুরাশা। পাশাপাশি অনাগত ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে যাতে কোনো টেনশন করতে না হয় সেজন্য চাকরি শেষে থাকতে হবে পর্যাপ্ত ও যুগোপযোগী আনুতোষিক ও পেনশন সুবিধা। নয়তো বৃদ্ধ বয়সে সাহায্যের জন্য পরিবার পরিজন নিয়ে তাদের ঘুরতে হবে তাদেরই হাতে গড়া শিক্ষার্থীদের দ্বারে দ্বারে। এমন টেনশন ও বিড়ম্বনা নিয়ে সৃজনশীল শিক্ষাদান ও গবেষণার মতো উদ্ভাবনী একটি কাজ চালিয়ে যাওয়া একজন শিক্ষকের জন্য অলীক স্বপ্ন মাত্র।
একজন সরকারি চাকরিজীবী চাকরি শেষে যে মাসিক ভাতা পেয়ে থাকেন মূলত সেটাকেই আমরা পেনশন বলে থাকি। প্রকৃতপক্ষে মাসিক পেনশন ভাতা ও আনুতোষিক বা গ্র্যাচুইটির সমন্বয়কে পেনশন বলা হয়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় পেনশন পাওয়ার প্রথম শর্ত সরকারি নিয়ম-কানুন অনুসারে একজন চাকরিজীবীকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকাল পর্যন্ত চাকরি করতে হয়। শর্তপূরণ (২৫ বছর চাকরিকাল) ব্যতিরেকে ১০০ শতাংশ পেনশন পাওয়া যায় না। তবে চাকরির মেয়াদ ২৫ বছরের কম হলে শতাংশ হারেও পেনশন পাওয়া যায়। এ ব্যবস্থায় একজন সরকারি চাকরিজীবীকে তার সর্বশেষ মূল বেতনের ৯০ শতাংশের অর্ধাংশের ২৩০ গুণ পরিমাণ টাকা আনুতোষিক বা গ্র্যাচুইটি হিসেবে প্রদান করা হয়। পাশাপাশি মূল বেতনের ৯০ শতাংশের অর্ধাংশ মাসিক ভাতা হিসেবে তিনি পেয়ে থাকেন যেটাকে মূলত আমরা পেনশন বলে থাকি।
অধিকন্তু পিআরএলে থাকাকালীন ১২ মাসের ছুটিতে গিয়েও মূল বেতনের সমপরিমাণ টাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ অন্য সরকারি চাকরিজীবীরা পান। এর বাইরে পেয়ে থাকেন সামান্য পরিমাণ চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা। এভাবে পেনশন অবসর জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা কিছুটা দিলেও উন্নত বিশ্বসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় বলবৎ আর্থিক সুবিধাদির তুলনায় একেবারেই নগণ্য, যা অনেক সময় অবসর জীবনযাপনকালীন জীবন মান নিয়ে মেধাবীদের হতাশাগ্রস্ত করে থাকে। বস্তুত এটাই স্বাভাবিক—মেধাবীরা যথাস্থানে তাদের মেধার যথাযথ প্রয়োগে দেশ ও জাতিকে সেবাদানের পাশাপাশি নিজেদের সুন্দর জীবন মান নিশ্চিত করবে। সেটা সম্ভব না হলে ব্রেইন ড্রেইন চলতেই থাকবে। এর দায় মেধাবীদের নয় বরং রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। কারণ পেটে ভাত না থাকলে শুধু দেশপ্রেমের ফাঁকা বুলি ধোপে টিকে না।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ সব সরকারি চাকরিজীবী পেনশনের আনুতোষিক অর্থ দিয়ে শেষ জীবনে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করে থাকেন, অর্থাৎ একটি ফ্ল্যাট কেনেন অথবা পরিবার পরিজন নিয়ে আবাসনের বিকল্প কোনো বন্দোবস্ত করেন। আর মাসিক যে ভাতা পান তা নিয়ে দুবেলা দুমুঠো খেয়ে-পরে দিন অতিবাহিত করেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে যদি কোনো সঞ্চয় থেকে থাকে নিজ উদ্যোগে সেটা সঞ্চয়পত্র অথবা অন্য কোথাও লগ্নি করে কিছুটা সচ্ছল জীবনযাপনের ব্যবস্থা করেন। প্রভিডেন্ট ফান্ডে কিছু জমা থাকলে সেটা ছেলেমেয়েদের বিয়ে অথবা মধ্য বয়সে জন্ম নেয়া সন্তানাদির পড়াশোনায় ব্যয় করতে হয়। এর পরে স্বামী-স্ত্রীর হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি তো লেগেই থকে। সবকিছু মেটানোর জন্য এ পেনশনটুকুই সবেধন নীলমণি। অতএব যুগোপযোগী পেনশন কাঠামোর নিশ্চয়তা না থাকলে মেধাবীরা এখানে কেন আসবেন?
এটা মনে রাখা দরকার যে এ বাণিজ্যিক ও বৈষয়িক ধ্যানধারণার যুগেও আমাদের দেশে অন্যান্য চাকরির সব সুযোগকে উপেক্ষা করে এখনো যারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা পেশায় ফার্স্ট চয়েজে আসেন তারা সত্যিকার অর্থেই নির্মোহ জীবনযাপন মেনে নিয়ে এখানে আসেন। পড়াশোনা ও গবেষণার মতো সৃষ্টিশীল কোনো কিছু সাধনই তাদের মূল লক্ষ্য।
উপরন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সততা মানব জীবনের প্রকৃত শিক্ষা, বাকি সব দক্ষতা। এ দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা দুই প্রকার—১. চারিত্রিক শিক্ষা এবং ২. কারিগরি বা সৃজনশীল শিক্ষা। এ দুটো একে অন্যের পরিপূরক। যে ব্যক্তি চরিত্রবান হন তিনি কোনো একটি বিষয়ে অবশ্যই দক্ষ হন। আবার দক্ষতা অর্জন করলে তিনি চরিত্রবান নাও হতে পারেন।
তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সততা ও নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা, জীবনমান ও যুগোপযোগী পেনশন কাঠামোর নিশ্চয়তা না থাকলে তারা পরিণত হবেন সততা ও নৈতিকতাবিবর্জিত এক সম্প্রদায়ে। পড়াশোনা ও গবেষণায় ফাঁকি দিয়ে নিজেদের আরো বেশি নিয়োজিত করবেন বিভিন্ন নন-একাডেমিক কর্মকাণ্ডে। এতে একসময় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে উচ্চশিক্ষার মূল দর্শন। জাতি ও রাষ্ট্র হারিয়ে যাবে উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে। দেশমাতৃকা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাবে পশ্চাৎপদতার দিকে।
অতএব স্বতন্ত্র ও উন্নত বেতন কাঠামোসহ বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের উন্নত জীবনমানের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এখন সময়ের দাবি মাত্র। পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের আদলে রাষ্ট্রীয় ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে তাদের দিতে হবে যথাযথ মর্যাদা। এক্ষেত্রে জাপান, কোরিয়াসহ এশিয়ার অন্য উন্নত দেশগুলোর মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে।
মূলত শিক্ষা ও শিক্ষক সমাজের উন্নয়ন মানেই একটি জাতির ভিত্তির উন্নয়ন। অতএব সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়াটাই সমীচীন। তা না হলে শুধু দেশপ্রেমের ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে ব্রেইন ড্রেইন প্রতিরোধ করার বাসনা আশার সাগরে দুরাশার ভেলা নিয়ে খেলা বৈ আর কিছুই নয়।
ড. মো. এরশাদ হালিম: অধ্যাপক ও গবেষক, সিন্থেটিক অর্গ্যানিক কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালস, রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়