ওষুধ শিল্প আমাদের অত্যন্ত সফল একটি খাত এবং এ খাতে রফতানির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এলডিসি থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটলে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউটিও) মেধাস্বত্ব আইনের অনেক নিয়মনীতির অধীনে আমাদের আসতে হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের ঠিক কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে, সেটার সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন এবং কোন কোন বিশেষ সুবিধার জন্য আমাদের বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলো ছাড়াও অন্যান্য দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি চালাতে হবে—এ আলোচনায় ওষুধ শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের সরাসরি মতামত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এ আলোচনার ভিত্তিতেই তৈরি করা হবে ‘রোডম্যাপ টু গ্র্যাজুয়েশন ফ্রম এলডিসি’।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনার ক্ষেত্রে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের থেকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক। তাহলে একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে কোথায় কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে কিংবা কোন উদ্যোগের ফলে সবচেয়ে ভালো ফলটি আসবে। সুতরাং এ ধরনের পারস্পরিক আলোচনা আমরা আশা করি।
এক্ষেত্রে আমরা সরকারিভাবে আলোচনা করছি বড় বড় কিছু অবকাঠামো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, কিংবা সক্ষমতা অনুযায়ী খুব বেশি ব্যবহার হচ্ছে না; সেগুলো মডেল হিসেবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেয়া যায় কিনা—এটা যেমন বড় হাসপাতালের ক্ষেত্রে হতে পারে, আবার স্থানীয় পর্যায়ের ছোট ছোট ক্লিনিকের বেলায়ও হতে পারে। এ রকম কিছু পরীক্ষামূলক কার্যক্রম আগেও হাতে নেয়া হয়েছিল কিন্তু খুব একটা সফল হয়নি। নতুন করে নতুন ব্যবস্থাপনায় এটা আবার শুরু করে দেখা যেতে পারে।
মানসম্মত মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা একটি নাগরিক অধিকার এবং সেটা নিশ্চিত করাটা মূলত সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে আমাদের ব্যয় মোট জিডিপির ১ শতাংশেরও কম, যা দুঃখজনকভাবে আমাদের অত্যন্ত বড় একটি জাতীয় সীমাবদ্ধতা। এ কারণেই সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় খুব দরকারি, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি মনোযোগের বিষয় হতে পারে—উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপজেলা হাসপাতালগুলোয় সরকারি ডাক্তাররা যেতে চান না। সেখানে এরই মধ্যে আমরা ‘কিছু বাধ্যবাধকতার’ প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যেমন আলোচনা করেছি, একই সঙ্গে ‘কিছু সুযোগ-সুবিধার’ ব্যবস্থাও দরকার সেটাও বলেছি। ডাক্তারদের জন্য উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত আবাসিক সুবিধা দেয়ার জন্য দুয়েকটা প্রকল্প আমরা শুরু করতে যাচ্ছি। এরই মধ্যে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিষয়ে আমরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে দুই-তিন হাজার নতুন চিকিৎসক নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেখানে একটু দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে, এক-দেড় বছর সময় লাগবে। এছাড়া আরো সমস্যা আছে। যেমন প্রকল্প তৈরির সময় আমি দেখেছি অবকাঠামো আছে কিন্তু ডাক্তার নেই, ডাক্তার আছে নার্স নেই; যন্ত্রপাতি আছে কিন্তু টেকনিশিয়ান নেই। এসব কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাটাও একটি পরিকল্পনার বিষয়।
বিশেষত স্বাস্থ্য খাতের প্রতি এখনো মানুষের আস্থাহীনতার উপস্থিতি দেখা যায়, সেক্ষেত্রে কীভাবে আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় বা তৈরি করা যায় সে বিষয়টি নিয়ে সম্পৃক্ত সবাইকে ভাবতে হবে। এ খাতে আমাদের অনিয়ম, ঘাটতির জায়গাগুলো কোথায় সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। এখনো প্রতি বছর আমাদের কেন স্বাস্থ্যসেবা নিতে বিদেশে গিয়ে একটা বিশাল অংকের অর্থব্যয় করতে হয় বা বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়? যেখানে আমাদের স্বপ্ন হলো— এমনকি যে কথাটি বিভিন্ন সময়ে বারবার বলা হয়েছে—স্বাস্থ্যসেবা নিতেই আমাদের দেশে বাইরে থেকে লোক আসবে। এটিই আসলে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের মাথাপিছু আয় এত বাড়ার পরও এখনো সমাজের অনেক মৌলিক বিভাজন দূর হয়নি। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম এবং তরুণ বয়সে শিক্ষক ছিলাম, তখন দেখেছি ঢাকা মেডিকেলে দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী, নেতা এমনকি মন্ত্রীরা পর্যন্ত সেখানে স্বাস্থ্যসেবা নিতে যেতেন। কিন্তু এখন সেখানে কারা যায়? কেন এই বিভাজন তৈরি হলো? বেসরকারি ও সরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় এবং অংশীদারত্ব দরকার, কিন্তু তার মানে বিভাজন তৈরি করা নয়।
চিকিৎসাকে একটি মহান পেশা হিসেবে দেখা হয়, যেখানে অর্থনীতিকে বলা হয় ‘ডিসম্যাল সায়েন্স’ অর্থাৎ যেটার নজর স্বার্থপরতার দিকেই থাকে। কাজেই আমার এ বিষয়ে আর বেশি কথা বলা উচিত নয়।
আমি স্মরণ করতে চাই বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের একজন দিকপাল উদ্যোক্তা প্রয়াত স্যামসন এইচ চৌধুরীকে। তিনি যখন স্কয়ার হাসপাতাল তৈরি করছিলেন তখন আমার সঙ্গে তার অনেক আলোচনা হয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন স্কয়ার একটি উচ্চমানের ব্যয়বহুল হাসপাতাল হোক। তাই সেই মানের একটি আধুনিক হাসপাতাল তৈরির পেছনে সেভাবেই তিনি বিশাল ইনভেস্টমেন্ট করেছিলেন। আবার এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ মূল্যে স্বাস্থ্যসেবার কথাও তিনি ভাবতেন। সেজন্য তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই বলছি, স্কয়ার হাসপাতাল বা এ রকম অন্য যারা স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগ উদ্যোক্তা আছেন তারা যদি ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য ঢাকার বাইরে ছোট ছোট শহরগুলোয় সাশ্রয়ী মূল্যের ক্লিনিক তৈরি করতে পারেন, যেটাকে অনেকটা আমাদের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সামাজিক ব্যবসায়ের আদলে করা যেতে পারে কিনা সেটা নিয়ে ভাবার জন্য তাদের কাছে আর্জি জানাই। এটা সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় করেও বানানো যেতে পারে; আবার স্বাস্থ্য খাতের উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে ‘করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি’র অংশ হিসেবেও তারা করতে পারেন।
ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: পরিকল্পনা উপদেষ্টা
[বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম ‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ ২০২৫’-এ প্রধান অতিথির বক্তৃতায়]