আলোকপাত

আরেকটি বিশ্বমন্দার সম্ভাবনা কেন অতিক্ষীণ

চলতি বছরের শুরুতে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল যে বিশ্ব অর্থনীতিতে আরেকটি মহামন্দা হানা দিচ্ছে। সব প্রান্তেই পড়বে এর প্রভাব। কিন্তু ২০২৩ সালের প্রথমার্ধ পেরিয়ে মনে হচ্ছে, প্রধান অর্থনীতির মধ্যে একমাত্র চীনই প্রলম্বিত মন্দার ঝুঁকিতে। নিউইয়র্ক, লন্ডনসহ ইউরোপের শেয়ারবাজারগুলোয় তেজি ভাব দেখা যাচ্ছে। টোকিওর শেয়ারবাজারে গত জুনে নিক্কেই সূচক ছিল ৩৩ বছরের সর্বোচ্চ। যদিও কয়েকটি

চলতি বছরের শুরুতে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল যে বিশ্ব অর্থনীতিতে আরেকটি মহামন্দা হানা দিচ্ছে। সব প্রান্তেই পড়বে এর প্রভাব। কিন্তু ২০২৩ সালের প্রথমার্ধ পেরিয়ে মনে হচ্ছে, প্রধান অর্থনীতির মধ্যে একমাত্র চীনই প্রলম্বিত মন্দার ঝুঁকিতে। নিউইয়র্ক, লন্ডনসহ ইউরোপের শেয়ারবাজারগুলোয় তেজি ভাব দেখা যাচ্ছে। টোকিওর শেয়ারবাজারে গত জুনে নিক্কেই সূচক ছিল ৩৩ বছরের সর্বোচ্চ। যদিও কয়েকটি অর্থনীতি ধুঁকছে তবে আরেকটি বিশ্বমন্দার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। 

কভিড ১৯ মহামারীর ধকল, বিশ্বের পরাশক্তির মধ্যকার শীতল যুদ্ধের জের ধরে ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত ও রাজনৈতিক বাঁকবদল সব মিলিয়ে বিশ্ব একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল।

চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসকে কমিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বিশ্বব্যাংক। ২০২৩ এর শুরুতে সংস্থাটির প্রাককলন ছিল, বিশ্ব অর্থনীতি চলতি বছর মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ সম্প্রসারণ হবে। তবে ২০২৪ সাল নাগাদ প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হবে বলে পূর্বাভাস দেয় সংস্থাটি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আক্রমণাত্মক নীতি, অবনতিশীল আর্থিক অবস্থা এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রভাব পড়ছে প্রবৃদ্ধির ওপর। ফলে আরো নেতিবাচক ধাক্কা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, এমনকি কঠোর আর্থিক নীতি থেকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ঘটনাগুলো বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এগুলো মন্দা পরিস্থিতির তীব্রতা বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারতো।

২০২১ সালে খানিকটা পুনরুদ্ধারের পর ২০২০ সালের মহামারীজনিত মন্দার সময় বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হয়। তবে ইতিহাস অনুসারে, বিশ্ব সর্বশেষ ১৯৩০-এর দশকে ১০ বছরের ব্যবধানে এ ধরনের দুটি মন্দার সম্মুখীন হয়েছিল।

বিশ্বব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, বিশ্বের তিনটি প্রধান প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরো অঞ্চল ও চীন—কিছুটা শ্লথগতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অভিঘাত আক্রান্ত হবে দরিদ্র দেশগুলোও, যারা কিনা এরই মধ্যেই একটি অনিশ্চিত জলবায়ু অর্থনীতি, নিম্ন ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং ক্রমবর্ধমান সুদহার ঘিরে টালমাটাল পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে। তাছাড়া ঋণের ক্রমবর্ধমান খরচ বড় অংকের ঋণ গ্রহণের বিষয়গুলোকে আরো চ্যালেঞ্জিং করে তুলতে পারে।

কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের কঠোর ব্যবস্থার কারণে ২০২২ সালে চীনের অর্থনীতি মাত্র ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি। যদিও চলতি বছরের শুরুতে বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার পর অর্থনৈতিক অবস্থা কিছুটা উন্নতি হচ্ছিল, তবে তা দ্রুত সময়েই মন্থর হয়েছে। নীতিগত অনিশ্চয়তার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে উত্তেজনা উদ্বেগটিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। চীনে বিনিয়োগের সীমিত সুযোগ এবং বেসরকারি উদ্যোগের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে বেশকিছু বেসরকারি ইকুইটি ফার্ম ও বিনিয়োগকারীরা চীন সম্পর্কিত বাণিজ্যিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করছেন।

অর্থনৈতিক মন্দার নানা কারণ থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মাত্রাতিরিক্ত ভোক্তা ও বিনিয়োগ আস্থা বা অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ে সমন্বিত চাহিদা বাড়ে। এতে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী থাকে। এতে নীতিনির্ধারকরা, মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাধ্য হয়ে হস্তক্ষেপ করে। মূল্যস্ফীতির তেজি ঘোড়াকে বাগে আনার চেষ্টা চালায়। আবার তারা যদি অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে; যেমন ধরেন সুদহার বাড়িয়ে দেয় তাহলে কিন্তু ঋণব্যয় বেড়ে যায়। এতে অর্থনীতি মন্দার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। 

সরবরাহের দিক থেকেও মন্দার সূত্রপাত হতে পারে। কোনো দেশের অর্থনীতি কিংবা তার বিশেষ কোনো খাত যখন চাঙ্গা থাকে তখন সরবরাহকারীরা উৎপাদন বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু চাহিদা যদি পড়তে থাকে তাহলে মজুদ কিন্তু বাড়তে থাকে। এতে প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এমনকি থমকে দাঁড়াতেও পারে। 

উপরে বর্ণিত কোনো ফ্যাক্টরই এখন ক্রিয়াশীল নয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে, চাহিদায় কিন্তু তার প্রভাব পড়েনি। এছাড়া মজুদও ফুলেফেঁপে উঠেনি। বলা যায়, সাম্প্রতিক মন্দার পূর্বাভাসের পেছনে অতীতের পরিসংখ্যানগত তথ্য ভূমিকা রেখেছে। সেসব উপাত্তে কভিড-১৯ মহামারীর অভিঘাত ও প্রভাব ঠিকভাবে আমলে নেয়া হয়নি। 

প্রায় আড়াই বছরের মহামারীর অভিঘাত শেষে মানুষ এখন ঘর থেকে বের হচ্ছে, ঘুরাঘুরি করছে, রেস্টুরেন্টে খাচ্ছে। পর্যটন ও আতিথেয়তা খাত বেশ ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রেস্তোরাঁগুলো গ্রাহকদের স্বাগত জানাতে পেরে আনন্দিত। পর্যটন কেন্দ্রগুলোও পর্যটকে ঠাসা। মহামারীর কঠোর বিধিনিষেধের কথা মানুষ অনেকটা ভুলে যেতে বসেছে। পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের পাশাপাশি একই ধরনের ক্রিয়াশীলতা দেখা গেছে শিল্প খাতে। বেশির ভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠানই মহামারী-পূর্ব মাত্রায় উৎপাদনে ফিরেছে। 

করোনা মহামারীর সময় কী হয়েছিল, মনে আছে? বিচ্ছিন্নতার কারণে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছিল। মানুষের মুখে মাস্ক ও লকডাউনে বিচ্ছিন্নতা বেড়েছিল। রেস্তোরাঁয় টেবিলের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছিল। শিল্প খাতেও জোগান ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য ছিল না। অনেক কারখানাই শিল্পোৎপাদন কমিয়ে দিয়েছিল, এতে অর্থনীতির চাকা ছিল মন্থর।

অর্থনীতিতে মন্থরতা ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন সরকার বেশ বড় অংকের প্রণোদনা প্যাকেজ হাতে নিয়েছিল। উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও এ পথ অনুসরণ করেন। বরং কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনার আকার আরো ব্যাপৃত করেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসে। চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য আসে ও চাঙ্গা হয় কর্মসংস্থান। অর্থনীতিতে সংকট আছে, কিন্তু এমন নয় যা স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধিকে আটকে দেবে। বাইডেনোমিকসের চমকে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন দেশটির মূল ভারসাম্য পয়েন্টে পৌঁছেছে। 

করোনা মহামারীকালীন যে বিধিনিষেধ আরোপিত হয়েছিল তা বাতিলের পর থেকে বাণিজ্য বাধা অপসারিত হয়। এতে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য ফিরে আসে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দামও চাঙ্গা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে যাচ্ছে তা আসলে মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরার জন্য।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ক্রমাগত সুদহার বাড়িয়ে গিয়েছে। এমন অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে জেপি মরগান চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার আশঙ্কা দেখছে না। গত মাসে এক পূর্বাভাসে শীর্ষস্থানীয় এ মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি ভালো গতিতে বাড়বে। তারা তৃতীয় প্রান্তিকে জিডিপি বা মোট দেশীয় পণ্যের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। 

যদিও আগামী বছরের জন্য মন্দার ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে, তবে ব্যাংকটি পরিমিত প্রবৃদ্ধি আশা করছে। ব্যাংক অব আমেরিকারও তাদের ২০২৩ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি ২০২৪ সালের মন্দার পূর্বাভাস করছে না।

জেপি মরগান আঞ্চলিক ব্যাংকিং সংকটের সময় ঋণসীমার দ্রুত সমাধান এবং ব্যাংক আমানতকারীদের জন্য নিয়ন্ত্রকদের সমর্থনকে চলমান সংকটের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থনীতিবিদরা দেখিয়েছেন উন্নত শ্রম সরবরাহ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকের উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি ভালো সময় আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইকুইটি বাজারগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বৃদ্ধি থেকে উৎপাদনশীলতা লাভের প্রত্যাশা করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেড যদি সুদহার বাড়ানো অব্যাহত রাখে, তবে মন্দা ঘটতে পারে।

ফেডের কঠোর মুদ্রানীতিতে প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি দেখা দিতে পারে কিংবা মন্দাও দেখা দিতে পারে—এ শঙ্কার পেছনে যুক্তি আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির সফট ল্যান্ডিং (ধীরগতির অবতরণ) পুরোপুরিই সম্ভবপর। বলা যায়, বাইডেন প্রশাসন চাহিদা চাঙ্গা রাখতে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা আখেরে ভালো ফল দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি প্রশমনে ফেডের নেয়া পদক্ষেপও প্রায় কার্যকর ছিল। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো ডলার শক্তিশালীকরণ। ফেডের সুদহার বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে গ্রিনব্যাকের মান বেড়েছে। এতে অন্যান্য দেশের রফতানি আয়ও চাঙ্গা করেছে। এতে কেউ কেউ যে বিশ্বমন্দার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তা হালে পানি পাচ্ছে না। 

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

কোইচি হামাদা: ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। জাপানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী আবে শিনজোর সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা

ভাষান্তর: সাবিদিন ইব্রাহিম

আরও