বর্তমানে শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এখন প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা, উদ্ভাবন, গবেষণা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রধান ভিত্তিও শিক্ষা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং অটোমেশন প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে শিক্ষা ব্যবস্থাও যুগোপযোগী রূপ নিচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ এখনো জিডিপির ২ শতাংশেরও নিচে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাখাতে ব্যয় ধরা হয়েছে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা একটি জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য অপ্রতুল। উন্নত বিশ্ব তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশও শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। কারণ তারা উপলব্ধি করেছে যে, ভবিষ্যৎ অর্থনীতি হবে জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর। অথচ বাংলাদেশে এখনো বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক ল্যাব, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, দক্ষ প্রযুক্তি শিক্ষক কিংবা গবেষণার পরিবেশ নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও বাস্তবভিত্তিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশমুখী হচ্ছে। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তারা আধুনিক গবেষণাগার, উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ গবেষক, আন্তর্জাতিক মানের পাঠদান এবং গবেষণার স্বাধীন পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু উদ্ভাবনে উৎসাহ দেয়া হয়, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন থাকে এবং তাদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, দেশে ফিরে এলে তারা সেই সুযোগ-সুবিধা পাবে না। এ কারণেই তারা বিদেশেই থেকে যেতে আগ্রহী হয়। এর ফলে দেশে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধাপাচারের মতো গুরুতর সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
একজন দক্ষ বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী বা প্রযুক্তিবিদ তৈরি করতে রাষ্ট্রের দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু উচ্চশিক্ষা শেষে তারা বিদেশে স্থায়ী হলে দেশের উন্নয়ন সেই মেধার সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। এতে প্রযুক্তি খাতে দেশ পিছিয়ে পড়ে এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনের গতি কমে যায়। এজন্য শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। গবেষণায় অর্থায়ন বাড়ানো এবং উদ্ভাবনী কাজের জন্য শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে হবে। তরুণদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যাতে তারা মনে করে নিজের দেশেই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। তাহলেই মেধাবীরা দেশে থেকে উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী হবে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো ডিজিটাল ডিভাইড বা প্রযুক্তিগত বৈষম্য। শহরের কিছু প্রতিষ্ঠান আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পেলেও গ্রামের অধিকাংশ বিদ্যালয় এখনো ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব থাকলেও তা অকার্যকর, কোথাও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ নেই, আবার কোথাও দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব রয়েছে। আবার অনেক স্থানে ল্যাব আছে কিন্তু দক্ষ পরিচালকের অভাবে ব্যবহার হয় না। অথচ বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি ছাড়া শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল ল্যাব, স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি এখন উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। করোনা মহামারীর সময় আমরা দেখেছি প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের লাখো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে ছিল। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর সম্ভব নয়। তাই শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয় ও কলেজে উচ্চগতির ইন্টারনেট, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং প্রযুক্তি প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করা জরুরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান বরাদ্দ কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।
শিক্ষাখাতে উচ্চ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের উদাহরণ টানা যেতে পারে। ভুটান, ভারত, নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কা শিক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের দিকে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে ভুটান তার সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা সত্ত্বেও শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ করছে (জিডিপির ৫ দশমিক ৮ শতাংশ)। দেশটি ডিজিটাল শিক্ষা, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ভারতও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে গবেষণার জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে এখনো গবেষণাখাতে ব্যয় অত্যন্ত কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষা কিংবা উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাব রয়েছে। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের অনেকেই বিদেশমুখী হচ্ছে। একটি দেশ যখন শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ায়, তখন তা শুধু মানবসম্পদ উন্নয়নই নয়, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করে। সুতরাং শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নতি করতে হলে এই খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি ছাড়া কোন বিকল্প নেই। উল্লেখ্য, শিক্ষা খাতে ভুটান ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, নেপাল ৪ শতাংশ, ভারত প্রায় ৩-৩ দশমিক ৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ২ শতাংশ, বাংলাদেশ ১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পাকিস্তান ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ বরাদ্দ রেখেছে এমন নজির আছে। উন্নত দেশ যেমন সিঙ্গাপুরে এই খাতে বরাদ্দ ৩ শতাংশ, জার্মানিতে প্রায় ৯ দশমিক ২ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৫ দশমিক ১ থেকে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, কিরিবাস প্রায় ১৪ দশমিক ২ শতাংশ, নামিবিয়ায় প্রায় ১০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং মালয়েশিয়া সর্বোচ্চ অর্থাৎ মোট বাজেটের প্রায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ যা ইউনেস্কোর সুপারিশকৃত ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি শুধু প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য নয়, সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বহু দরিদ্র পরিবার এখনো সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা দিতে হিমশিম খায়। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে কিংবা নিম্নমানের শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষার ব্যয় দিন দিন বাড়ছে। পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা, শিক্ষাসামগ্রী উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়ছে। আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে হলে শিক্ষক প্রশিক্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ প্রযুক্তি শুধু যন্ত্র নয়, তা সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন। এছাড়া কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে আরও সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা চাকরিনির্ভর না হয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। বর্তমান বিশ্বে দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা ছাড়া টিকে থাকা কঠিন। তাই শিক্ষা খাতে বাড়তি বিনিয়োগ দেশের বেকারত্ব কমাতে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে বাম রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি জিডিপির ৮ শতাংশ শিক্ষা বাজেট, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে, তবুও অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ একটি বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে, শিক্ষা ব্যয় একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ। বাংলাদেশ এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করছে। এই যুগে শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়, প্রয়োজন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক জ্ঞানসম্পন্ন ও উদ্যোক্তামুখী মানবসম্পদ। কিন্তু এর জন্য মাত্র ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ বরাদ্দ বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সেজন্যে আসন্ন বাজেটে শিক্ষাখাতে অন্তত জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। এতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তার লাভ করবে, গবেষণার সুযোগ বাড়বে, দক্ষ শিক্ষক তৈরি হবে এবং শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বৈষম্য কমবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার: অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়