বাজার অর্থনীতি : অ্যাডাম স্মিথ থেকে টিসিবির ট্রাক

প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামের একটা নির্দিষ্ট স্তরে এসেই মানুষ ক্রমে ধাতুর ব্যবহার শিখল। পশুপালন এবং জমি চাষে পশু ব্যবহারের ফলে কৃষিকাজে উন্নতি এল। ধাতুর তৈরি লাঙলের ফলক, কুঠার, বর্শা ও তীরে ধাতুর ব্যবহার শুরু হলো। সব মিলিয়ে উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন কৌশল এক নতুন পর্যায়ে উপনীত হলো। উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে প্রথমে বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে এবং পরে একই গোষ্ঠী সমাজের মধ্যে অর্থনৈতিক বিনিময়ের প্রয়োজন হলো। উৎপাদন ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের ফলে সবার সমবেত শ্রমের প্রয়োজন শেষ হলো, উপজাতি ও গোষ্ঠীগুলো ভেঙে পড়ল। ভিন্ন ভিন্ন পরিবারকে কেন্দ্র করে মানুষের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থ গড়ে উঠল। উৎপাদনের উপকরণ ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হলো। যার ফলে অন্যকে খাটিয়ে শ্রমলব্ধ ফল আত্মসাৎ করা সম্ভব হয়ে উঠল।

প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামের একটা নির্দিষ্ট স্তরে এসেই মানুষ ক্রমে ধাতুর ব্যবহার শিখল। পশুপালন এবং জমি চাষে পশু ব্যবহারের ফলে কৃষিকাজে উন্নতি এল। ধাতুর তৈরি লাঙলের ফলক, কুঠার, বর্শা ও তীরে ধাতুর ব্যবহার শুরু হলো। সব মিলিয়ে উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন কৌশল এক নতুন পর্যায়ে উপনীত হলো। উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে প্রথমে বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে এবং পরে একই গোষ্ঠী সমাজের মধ্যে অর্থনৈতিক বিনিময়ের প্রয়োজন হলো। উৎপাদন ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের ফলে সবার সমবেত শ্রমের প্রয়োজন শেষ হলো, উপজাতি ও গোষ্ঠীগুলো ভেঙে পড়ল। ভিন্ন ভিন্ন পরিবারকে কেন্দ্র করে মানুষের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থ গড়ে উঠল। উৎপাদনের উপকরণ ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হলো। যার ফলে অন্যকে খাটিয়ে শ্রমলব্ধ ফল আত্মসাৎ করা সম্ভব হয়ে উঠল।

ক্রমান্বয়ে উৎপাদিকা শক্তি বিকশিত হয়েছে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ধরনও পাল্টেছে। বিকশিত হয়েছে সমাজ, বিকশিত হয়েছে মানুষের চিন্তা, দর্শন, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান; অন্যদিকে বিকাশের মধ্যকার অসংগতির বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইও বিকশিত হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির সাম্প্রতিক গতি-প্রকৃতিতে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নের সংকট এবং তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে গিয়ে অতীতের এ ধারাবাহিকতায় বর্তমান পরিস্থিতি এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাওয়ার প্রক্রিয়াও একই সূত্রে প্রথিত রয়েছে।


বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিতে স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অগ্রগতির প্রশ্নে অর্থশাস্ত্রের যে শাখা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য বিস্তার করে আছে পুঁজিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে নব্য উদারপন্থী বাজার অর্থনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এ রকম একটি দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নিলে মানুষ, সমাজ, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ধারাবাহিক বিকাশ সম্পর্কেও একটি দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করতে হয়। তাই বাজার অর্থনীতির দর্শন অতীতের যেসব দার্শনিক ভিত্তি থেকে ক্রমাগত শক্তি জুগিয়েছে মুক্তবাজারকে বুঝতে গেলে তার চিত্রগুলো আমাদের বিবেচনায় আনা দরকার। সেই বিবেচনায় আমরা পুঁজিবাদের ধারাবাহিকতায় মুক্তবাজার দর্শনের প্রভাবকে তিনটি সময় পর্বে খুঁজে পাই—

১. ১৭৫০—১৮৩০

২. ১৮৭০—১৯২৯

৩. ১৯৭০ এবং পরবর্তী সময়


১৭৫৯ সালে অ্যাডাম স্মিথ১ (Adam Smith) তার প্রথম বই Theory of Moral Sentiments-এ মানুষের আচরণ নিয়ে একটি বিশ্লেষণ দাঁড় করান। পরবর্তী সময়ে অর্থশাস্ত্র-সম্পর্কিত তার ধারণার ভিত্তি হিসেবে যা বিবেচনা করা হয়। অ্যাডাম স্মিথের মতে, মানুষের আচরণ ছয়টি প্রবণতা দ্বারা পরিচালিত হয়—

১. নিজেকে ভালোবাসা

২. সহানুভূতি

৩. স্বাধীন হওয়ার ইচ্ছা

৪. শ্রমের অভ্যাস

৫. মালিকানা-সম্পর্কিত ধারণা

৬. এক দ্রব্যের সঙ্গে অন্য দ্রব্যের বিনিময়

এ ছয়টি অনুসিদ্ধান্তের ভিত্তিতে স্মিথ মনে করেন মানুষ নিজেই তার সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি সচেতন, সুতরাং সমাজে প্রতিটি মানুষকেই স্বাধীনভাবে চলতে দিলে Harmony (ঐকতান) অর্জিত হবে। অ্যাডাম স্মিথ মনে করতেন Invisible hand (অদৃশ্য হস্ত) সমাজের মধ্যে এই Harmony নিয়ে আসে, কেননা প্রত্যেক ব্যক্তিই তার ব্যক্তিগত লাভ দ্বারা পরিচালিত হলে সামাজিক ভারসাম্যের অবস্থা স্বাভাবিকভাবে অর্জিত হয়। স্মিথের কথা হচ্ছে, মুক্তবাজার (Laissez-faire) অর্থনৈতিক শ্রেণীগুলোর মধ্যে স্বার্থের সংগতি বিধান করেছে এবং সম্পদ সৃষ্টিতে পুঁজিপতিরা হচ্ছে মূল চালিকাশক্তি। এই সুসামঞ্জস্য অবস্থায় কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করলে সম্পদ বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি হয়। যদিও অ্যাডাম স্মিথের মতামত মুক্তবাজার দর্শনকে শক্তি জুগিয়েছে, কিন্তু আমাদের বিবেচনায় তার সময়কে যদি বিবেচনা করি তাহলে দেখব তিনি হচ্ছেন সেই সময়ের প্রতিনিধি যখন শিল্প-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে উৎপাদিকা শক্তি একটি নতুন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে এবং রাজা বা ভূস্বামীদের নিয়ন্ত্রিত অর্থ ব্যবস্থাকে বাতিল করে নতুন সামাজিক শক্তি হিসেবে পুঁজিপতি ও বণিক গোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। আর সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তার চিন্তার বৈপরীত্যও আমরা অ্যাডাম স্মিথ থেকেই পাই তার An Inquiry into the Nature and causes of the Wealth of Nations বই থেকে, যা পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার ব্যবস্থার বিপরীত ধারণাকে বিকশিত হতে সহযোগিতা করেছে। সম্পদের উত্স কী? সম্পদ বর্ধন হয় কীভাবে এবং উৎপাদিত দ্রব্য বণ্টিত হয় কীভাবে—এসব প্রশ্নের অনুসন্ধান করতে গিয়ে অ্যাডাম স্মিথের বক্তব্য ছিল শ্রমশক্তিই সম্পদের উত্স। উৎপাদিকা শক্তি শ্রমেরই ফসল। আর একটা দ্রব্যের কতটুকু শ্রম আছে তার ওপরই দ্রব্যের মূল্য নির্ধারিত হয়। যখন একটি দ্রব্যের সঙ্গে অন্য দ্রব্যের বিনিময় হয় তখন তা মূলত নির্ভর করে দুটো দ্রব্যের মধ্যে কতটুকু শ্রম নিয়োজিত আছে তার ওপর। আর দ্রব্য বিনিময় ব্যবস্থাকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি মানবসমাজের বিকাশকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখেছেন। তিনি বলেছেন মানবসমাজ চারটি ঐতিহাসিক পর্যায় অতিক্রম করে বর্তমান পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে—

১. শিকার (Hunting) —প্রাথমিক স্তর

২. পশুপালন—পরের স্তর

৩. কৃষি—মধ্যযুগ

৪. বাণিজ্য—ষোড়শ শতক

আর এর ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাদ হচ্ছে মানবসমাজ বিকাশের সর্বোচ্চ স্তর। তার মতে, এ ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন আসবে কিন্তু সামগ্রিক পরিবর্তন আসবে না। কিন্তু অ্যাডাম স্মিথের ধারণার মধ্যেই তার বিস্তর অসংগতির উত্তরগুলো খুঁজে পাওয়া যায়—

১. মূল্যের উত্স ও উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ যদি শ্রম হয়ে থাকে তাহলে উৎপাদিকা শক্তির ওপর পুঁজিপতির নিয়ন্ত্রণ কীভাবে মুক্তবাজার অর্থনৈতিক শ্রেণীগুলোর মধ্যে স্বার্থের সংগতি বর্ধন করে।

২. মূল্যের উত্স যদি শ্রম হয় তাহলে কীভাবে সম্পদ সৃষ্টিতে পুঁজিপতিরা মূল চালিকাশক্তি?

৩. মানবসমাজের পুঁজিবাদের পর্যায়ে পৌঁছানো যদি একটি ধারাবাহিক বিকাশের ফল হয় তাহলে পুঁজিবাদ (Capitalism) কেন মানবসমাজ বিকাশের সর্বশেষ স্তর হবে।

পরবর্তী সময়ে ডেভিড রিকার্ডো২ পুঁজিবাদের বিশ্লেষণকে আরো পরিণত জায়গায় নিয়ে আসেন কিন্তু তিনিও মোটামুটিভাবে অ্যাডাম স্মিথের মুক্তবাজার দর্শনকে সামাজিক সমন্বয়ে দক্ষ ব্যবস্থা মনে করেন। যদিও উভয়ের চিন্তার ছকে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল।


১৮৭০-এর দিকে বেনথাম তার উপযোগবাদের৩ তত্ত্ব নিয়ে আসেন। [বেনথামের মতে, মানুষ হচ্ছে Pleasure Machine (তৃপ্তি সৃষ্টিকারী যন্ত্র)। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে Pleasure (তৃপ্তি) কে সর্বোচ্চ করা। উপযোগ হচ্ছে এমন একটি বিষয় যা Pleasure-কে সৃষ্টি করে এবং Pain (অতৃপ্তি)কে প্রতিরোধ করে] এ দর্শনের সূত্র ধরে Utilitarian School (উপযোগবাদী স্কুল)-এর আগমন যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন William Stanley Jevens (জেভনস্), Carl Menger (মেনজার) এবং Leon Walras (ওয়ালরাস)। এরা তিনজন মুক্তবাজারের ধারণাকে পুনরায় অর্থশাস্ত্রের কেন্দ্রীয় ভাবনার মধ্যে নিয়ে আসেন। তাদের চিন্তার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, দুজন ব্যক্তি যদি স্বাধীনভাবে চিন্তা করে বিনিময় থেকে তারা লাভবান হবে, তাহলে তাদের মধ্যে বিনিময় সংঘটিত হবে। তাদের মতে বিনিময় সবার স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করে। তাদের চিন্তায় সমাজ যেভাবে ধরা পড়েছে—

১. মালিকানার পুঁজিবাদী ধরন ঠিক আছে

২. মানুষ যৌক্তিক আচরণ করে

৩. অর্থনীতিতে পূর্ণ প্রতিযোগিতা বিদ্যমান

৪. ভোগ বা Consumer Sovreignty (ভোক্তার স্বাধীনতা) হচ্ছে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

পরবর্তী সময়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আলফ্রেড মার্শালের৪ মধ্যে এ ধারণা আরো পরিণত রূপে পাওয়া যায়। মার্শাল মনে করতেন সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তিই তার তৃপ্তিকে সর্বোচ্চ করতে চায়। সুতরাং যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা, পুঁজি ও শ্রমিক সবাই তাদের মধ্যে যে সম্পদ আছে তা বিনিময় করতে চায়, সেখানে উভয়ের প্রান্তিক প্রাপ্তি সমান হয়ে (প্রান্তিক উপযোগ বা তৃপ্তি হচ্ছে অতিরিক্ত এক একক, বিনিময় থেকে যে বাড়তি তৃপ্তি যোগ হয়) ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা পায়। অর্থনীতি পরিচালিত হওয়ার এ ধরনের নীতিমালায় যৌক্তিক। মার্শাল মনে করেন, মুনাফা হচ্ছে ভোগ বিরতির পুরস্কার। পুঁজিপতি ভোগ না করে যে পুঁজি খাটায় সেটার পুরস্কার প্রাপ্তিই হচ্ছে মুনাফা। মার্শাল অর্থশাস্ত্রের ধারণাকে আরো সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসেন। মানুষের অতীত সামাজিক বিকাশ, তার লিঙ্গ ভেদাভেদ, তার অঞ্চল ভেদাভেদ এগুলোর বাইরে অর্থশাস্ত্রের কেন্দ্রীয় মনোযোগ পায় ব্যক্তি ও উৎপাদনী প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। মার্শালের মতে, বাজারে দামের ভিত্তিতে ভোক্তা ও উৎপাদক তার চাহিদা এবং উৎপাদন নির্ধারণ করবে। দামই হচ্ছে একমাত্র সংকেত; কীভাবে উৎপাদিত হয়, কীভাবে বণ্টিত হয় তার অনুসন্ধান করা অপচয় মাত্র। এভাবেই প্রত্যেক ব্যক্তি তার আচরণ নির্ধারণ করে। আমরা যদি ১৮৭০ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত পুঁজিবাদের চিত্র দেখি তাহলে দেখব Utilitarian School থেকে মার্শাল যুগ এমন এক সময়ের প্রতিনিধি যখন উপনিবেশ অঞ্চলগুলোয় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত, প্রযুক্তির অগ্রসর একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এসে পৌঁছেছে, যখন বৃহৎ মাত্রায় উৎপাদন সংঘটিত হচ্ছে, একচেটিয়া কারবারের উত্থান হয়েছে, অতিরিক্ত উৎপাদন থেকে নতুন বাজারের অনুসন্ধান নিয়ে লড়াইয়ের প্রস্তুতি চলছে, বিপরীতে শিল্পোন্নত দেশগুলোয় শ্রমিক আন্দোলন যথেষ্ট পরিমাণে দুর্বল হয়েছে যে বিবেচনায় এদের চিন্তার উপাদান তত্কালীন পুঁজিবাদের বিকাশের যে শর্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা ধারণ করতে পেরেছিল। কিন্তু অর্থনীতির কাঠামোয় যে অসংগতিগুলো এদের ধারণার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়—

১. পুঁজি বড় হয় কীভাবে?

২. লিঙ্গ, অঞ্চল ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের পার্থক্য কীভাবে মুক্তবাজারের কাঠামোয় সুষম বিনিময় ঘটায়?

৩. ভোগকে বিরত রেখে যদি উৎপাদনে না যাওয়া হয় তাহলে মুনাফা কীভাবে হয়?

৪. একচেটিয়া ব্যবস্থার অস্তিত্বে বাজারে পূর্ণ প্রতিযোগিতা কীভাবে কাজ করে?

৫. সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সঙ্গে উপনিবেশ অঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্ক মুক্তবাজারের ধারণায় কীভাবে কাজ করে?


দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পঞ্চাশের দশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে চেহারা সামনে আসে—

১. দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অগ্রবর্তী ধাপ হিসেবে চ্যালেঞ্জ উত্থাপন করে,

২. উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর একসময়ের উপনিবেশ অঞ্চলগুলো বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে,

৩. পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতিতে দুই শতক ধরে ব্রিটেন যে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল তা পরিবর্তিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র সামনে আসে,

৪. মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণা দুর্বল হয়ে কেইনসীয়৫ মতবাদ নিরঙ্কুশ প্রাধান্য বিস্তার করে। ফলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও নিয়ন্ত্রিত বাজারের ধারণা বিকশিত হয়।

কিন্তু সত্তরের দশকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা বিশেষ করে দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি (মুদ্রাস্ফীতি) ও বেকারত্ব এ দুই পরিস্থিতির একই সঙ্গে উপস্থিতি তিন দশকের কেইনসীয় অর্থশাস্ত্রের প্রভাবকে দুর্বল করে দেয়। কেননা, কেইনসীয় অর্থশাস্ত্রের ধারণা অনুযায়ী অর্থনীতিতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির অস্তিত্ব কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে দেয়। কেইনসীয় অর্থশাস্ত্র ও নিয়ন্ত্রিত বাজারের ধারণাকে তীব্রভাবে সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের মিলটন ফ্রিডম্যান৬ পুনরায় মুক্তবাজারের দর্শন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। মিল্টন ফ্রিডমানের ধারণাকে সারসংক্ষেপ করে এভাবে বলা যায়—

১. অর্থনীতিতে যে মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব বিরাজ করে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানো-কমানোর মধ্য দিয়েই তা সমাধান করা সম্ভব।

২. মুক্তবাজার অর্থনীতি অর্থনীতিতে দক্ষ বরাদ্দকে নিশ্চিত করে।

৩. সরকারি নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতিতে কাম্য নয়।

পরবর্তী সময়ে আশির দশকের শুরুর দিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ—এ দুটি প্রতিষ্ঠান উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর উন্নয়ন সংকট এবং সরকারি উদ্যোগের ব্যর্থতার প্রচারকে সামনে নিয়ে এসে কাঠামোগত সমন্বয় নামে নানা ব্যবস্থাপত্র হাজির করে, যার সংক্ষিপ্তরূপ এভাবে দাঁড় করানো যায়।

১. সরকারি ব্যয় হ্রাস

২. সরকারি খাতের বিরাষ্ট্রীয়করণ

৩. বাজার উদারীকরণ ও আমদানি শুল্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসা।

শিল্পী: রিচার্ড বোর্জ, নিউইয়র্ক টাইমস

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নানামুখী বাজার উদারীকরণে তত্পরতা আশি ও নব্বইয়ের দশকে আমাদের সামনে আসে। কিন্তু আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের শুরুতে বিশ্ব অর্থনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে—

১. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অগ্রবর্তী ধাপ হিসেবে যে চ্যালেঞ্জ উত্থাপন করেছিল, আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের শুরুতে তার কাঠামোগত বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিশ্বে একক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

২. তথ্যপ্রযুক্তি বিকশিত হওয়ার ফলে রাষ্ট্রীয় সীমানার ধারণা দুর্বল হয়।

বিশ্ব অর্থনীতিতে এ ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পুঁজির আরো কেন্দ্রীভবন ও পণ্যের বাজার প্রক্রিয়ায় আরো মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির যে উদ্যোগ উরুগুয়ে রাউন্ডের মধ্য দিয়ে GATT (গ্যাট)-এর আলোচনায় চাপ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে গৃহীত হয় তার পরিণত রূপ আমাদের সামনে আসে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন—ডব্লিউটিও) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা গ্যাটের গৃহীত নীতিমালা বাস্তবায়ন ও তদারকির কাজ করবে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এ দুটি সংস্থা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাকে সহায়তা দেবে।

সোভিয়েত-উত্তর জামানায় নব্য উদারবাদী অর্থনৈতিক দর্শনের জয়জয়কার ঘোষিত হলো। বাজার ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপমুক্ত করার নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এ ব্যবস্থা সফল হয়নি। বিশ্বব্যাংক, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা এবং আইএমএফের ভূমিকা, হস্তক্ষেপ মুক্তবাজারকে সফল করতে পারেনি। ধীরে ধীরে এ ব্যবস্থার নানা সংকট, সীমাবদ্ধতা সামনে আসতে থাকে। তখন অমর্ত্য সেন৭ বললেন, মুক্তবাজার সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। তাকে রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিতে হয়। তিনি দেখালেন, দারিদ্র্য বিমোচনে মুক্তবাজারের সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রয়োজন। দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দরকার নাগরিকের স্বাধীনতা। বিশেষত অর্থনৈতিক সংকটের সময় গণতন্ত্র বিশেষভাবে জরুরি হয়ে ওঠে। বাজার যেন দক্ষভাবে কাজ করতে পারে সেজন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের দৃঢ়তা প্রয়োজন। তাছাড়া, বাজার অর্থনীতিতে নাগরিকের অংশগ্রহণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ঋণ গ্রহণ, ভূমি সংস্কার—সব আরো অনেক পাবলিক পলিসির ওপর নির্ভর করে।

পাবলিক পলিসি বা সরকারি নীতি সংস্কারের ক্ষেত্রে ধনীদের ওপর উচ্চ হারে করারোপই কার্যকর বলে মনে করেন ফরাসি অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটি৮। ২০১৩ সালে ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্রন্থটির মাধ্যমে তিনি প্রচলিত অর্থনৈতিক চিন্তার সীমাবদ্ধতা ও বৈষম্য নিয়ে নতুন ডিসকোর্স হাজির করেন। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, বৈষম্য কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন নীতির ফসল। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৮০ থেকে বিশ্বজুড়ে বৈষম্য বেড়েছে। তার মতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, ন্যায্য কর ব্যবস্থা বৈষম্য কমিয়ে আনতে পারে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত তার ক্যাপিটাল অ্যান্ড আইডিয়োলজি বইটিকে বলা হয় বৈষম্যের ইতিহাস। বৈষম্য হ্রাসে সোভিয়েত জামানার সমাজতান্ত্রিক মডেলে তার ভরসা নেই, তিনি বরং বাজার ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার শক্তিকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর পক্ষে। পিকেটি বৈষম্য কমাতে যে সমাধান দিয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো ধনীদের ওপর করের হার বৃদ্ধি করা। এক্ষেত্রে তিনি ত্রিশের দশকের মহামন্দা ও বিশ্বযুদ্ধের ধকল কাটাতে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রে ধনীদের ওপর যে উচ্চ হারে করারোপ করা হয়েছিল সে ইতিহাস স্মরণ করেছেন। পিকেটির ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি (২০১৩) বইটি বিশ্বজুড়ে বিক্রি হয়েছে ২৫ লাখ কপি। এ বইয়ের কপিরাইটের বিপরীতে তিনি প্রায় ৬০ শতাংশ কর দিয়েছেন, তবে তিনি মনে করেন তার ৯০ শতাংশ দেয়া উচিত। তার যুক্তি এ বইয়ে তিনি যে ধারণা, ডেটা ব্যবহার করেছেন তা অনেক গবেষকের মিলিত কাজের ফসল। এছাড়া তিনি একটি পাবলিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সুবিধা নিয়েছেন। এ গবেষকদের অনেকেই তাদের ন্যায্য সম্মানী পাননি।

থমাস পিকেটি

পিকেটি অর্থনীতিতে যে সংস্কার আনতে চান সেখানে দেখা যায় দুটো ধারণা—সোশ্যাল ফেডারেলিজম ও পার্টিসিপেটরি সোশ্যালিজম। সোশ্যাল ফেডারেলিজমকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পিকেটি বলেছেন, বিভিন্ন দেশের মধ্যে যখন আন্তর্জাতিক চুক্তি হবে তখন যেন সেগুলো কেবল পুঁজির অবাধ যাতায়াত ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি না হয়ে থাকে; এক্ষেত্রে ন্যায্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে। পার্টিসিপেটরি সোশ্যালিজমের ধারণায় তিনি সবার শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ প্রাপ্তির বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। বৈষম্য কমিয়ে আনার পথ দেখাতে পিকেটি আমাদের নজর দিতে বলেছেন সুইডেনের দিকে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সুইডেন ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্যে জর্জরিত একটি দেশ, ১৯৫০ পর্যন্ত দেশটিকে ধনীদের স্বর্গ বলা হতো। আর আজ দেশটিতে নাগরিকদের অর্থনৈতিক সমতা ঈর্ষণীয়। পিকেটির মতে, যুদ্ধ কিংবা বিপ্লব না করেও যে বৈষম্য দূর করা যায় তার উদাহরণ সুইডেন।


মোটামুটিভাবে পুঁজিবাদী অর্থনীতির তিনটি শতকে বাজার অর্থনীতির দর্শনের প্রভাব ও তার সীমাবদ্ধতা ঘিরে এভাবে তিনটি সময়পর্বে আমাদের সামনে আসে। ভিন্ন ভিন্ন সময়ের মধ্য দিয়ে বাজার অর্থনীতির দর্শন আমাদের সামনে উপস্থাপিত হলেও তাদের সাদৃশ্য তাদের মধ্যে গভীর যোগাযোগ স্থাপন এবং তার একটি Uniform রূপ আমাদের সামনে আসে যাকে সংক্ষেপে এভাবে উপস্থাপন করা যায়—

১. বাজার দর্শনে ব্যক্তি বা ভোক্তাই প্রধান;

২. মানুষ যুক্তিশীল আচরণ করে। সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তি তার স্বার্থের ভিত্তিতে বিনিময় করলে স্বার্থের সমন্বয় হয়;

৩. বাজার ব্যবস্থা উৎপাদন ও বণ্টনের দক্ষ ব্যবস্থা;

৪. মুক্তবাজার সব ব্যক্তি ও দেশের মধ্যে সমান সুযোগ সৃষ্টি করে কেননা সেটা একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা।

মানুষ, সমাজ ও মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ধারাবাহিক বিকাশ তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এ রকম একটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে যে অসংগতিগুলো সামনে আসে—

১. সমাজ বা সামগ্রিক বিবেচনা অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে চলে যায়;

২. আজকের পরিস্থিতি যে মানবসমাজ বিকাশের ধারাবাহিক অগ্রগতির ফল তার অতীত শিক্ষা অনুপস্থিত হয়ে যায়;

৩. লিঙ্গ, অঞ্চল, ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির যে পার্থক্য তা কীভাবে বাজারের বিনিময়ের মধ্য দিয়ে স্বার্থের সংগতি তৈরি করে?

৪. পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার উৎপাদন এবং বণ্টনের দক্ষ ব্যবস্থা বলা হলেও সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার এক দশকের মধ্যেই বিশ্বে বৈষম্য কীভাবে আরো প্রকট হচ্ছে তা দৃশ্যমান হয়। ১৯৯৮ সালের মানব উন্নয়ন রিপোর্টের যে চিত্র (২০ শতাংশ মানুষ পৃথিবীর ৮৬ শতাংশ দ্রব্যসামগ্রী ভোগ করে, ৮০ শতাংশ মানুষ বাকি ১৪ শতাংশ ভোগ করে। এদের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ পায় মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ দ্রব্যসামগ্রী, যাদের অধিকাংশই স্বল্পোন্নত দেশে বসবাস করে) তা পরিবর্তনের কোনো পথ এ দর্শনের মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে আসে কিনা।

দেখা গেল এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বণ্টন, অসমতার সমস্যার সমাধান হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরো প্রকট হয়েছে। আর এ সংকটের ভয়ানক চেহারা দেখা গেল কভিড মহামারীর সময়। মুক্তবাজার একরকম ভেঙে পড়ল—উন্নত কি উন্নয়নশীল সব দেশেই। মহামারীর দুর্যোগ মোকাবেলায় মুক্তবাজার কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি, বরং এ সময় মানুষের জীবন-জীবিকার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হয়েছে।

টিসিবির পণ্য কিনতে ক্রেতার ভিড় ছবি: মো. মানিক

গত দুই বছরে কভিড মহামারীর প্রভাবে একদিকে বিভিন্ন দেশে মানুষ কাজ হারিয়েছে, তাদের আয় কমেছে। অন্যদিকে আমরা দেখেছি মহমারীকালে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনীর সম্পদ দ্বিগুণ হয়েছে। স্বভাবতই বেড়েছে দারিদ্র্য ও ধনবৈষম্য। অক্সফামের হিসাবে দেখা গেছে, মহামারীকালে এই শীর্ষ ১০ ধনীর সম্পদ ৭০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে দেড় ট্রিলিয়ন ডলার হয়েছে। অথচ এ সময়ে বিশ্বে ১৬ কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। এর বিপরীতে মিলিয়নেয়ারের সংখ্যা বেড়েছে ৫২ লাখ। মহামারীকালে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অতিধনীর সংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশের বেশি হয়েছে।

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিরুত্সাহিত করা হয়। কিন্তু কভিড দেখিয়ে দিল ভিন্ন বাস্তবতা। ভ্যাকসিন উৎপাদন, বণ্টনে রাষ্ট্রকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। অন্যদিকে লকডাউনের সময় বিপুল কর্মী ছাঁটাই করেছে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে সরকারের পক্ষ থেকে এমন কর্মহীন, যাদের বেতন কোম্পানি দিতে পারছে না এমন ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। ব্রিটেনে এমন ক্ষেত্রে মাসে আড়াই হাজার পাউন্ড পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে বিপুল মুনাফা করে যে খাতগুলো তারাও তাদের কর্মী কিংবা দেশের অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে এগিয়ে আসেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রণোদনা দিতে হয়েছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতেও আমরা দেখেছি সরকারকে প্রণোদনা দিতে হয়েছে।

মহামারীকালে দেখা গেল যেসব দেশে উৎপাদন, বণ্টন ও আর্থিক নীতিমালায় রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা আছে তারাই ভালোভাবে কভিড পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পেরেছে। মুক্তবাজার মানুষকে দুর্যোগে উদ্ধারের রাস্তা দেখায়নি, বরং নিজেই ভেঙে পড়েছে।

এ রকম বিভিন্ন বাস্তব সংকটের অভিজ্ঞতা থেকে বাজার বিষয়ে কিছু বিবেচনাকে আমলে নেয়া যায়। কভিড মহামারী দেখিয়ে দিয়েছে মুক্তবাজারে উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা সবসময় দক্ষভাবে কাজ করে না। সব ব্যক্তি কিংবা দেশের জন্য এ ব্যবস্থা সমান সুযোগ তৈরি করে না। এ ব্যবস্থা নিজে নিজের দেখভাল করতে পারে না; রাষ্ট্রকে জরুরি, সংকট মুহূর্তে দরকারি হস্তক্ষেপ করতে হয়। কয়েকশ বছরের মুক্তবাজারের দর্শনকে প্রশ্নের সামনে ফেলে দিয়েছে কভিড। মুক্তবাজারের দর্শনকে প্রচার করা পশ্চিমা অনেক উন্নত দেশেও রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে নাগরিকের জীবন ও জীবিকা রক্ষায়। উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল—সব দেশেই মুক্তবাজারের দর্শন এ সহস্রাব্দে বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

টীকা

১. অ্যাডাম স্মিথ

অ্যাডাম স্মিথ ১৭২৩ সালে স্কটল্যান্ডে কারক্যাল্ডি শহরে তার কাস্টমস অফিসার বাবার মৃত্যুর পরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৭৩৭ সালে তাকে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং পরে অক্সফোর্ডের ব্যালিওল কলেজে অধ্যয়নের জন্য পাঠানো হয়। ১৭৪৭ সালে তিনি বছর খানেক এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা করেন এবং এই সময়ে ডেভিড হিউমের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। ১৭৫১ সালে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে তর্কশাস্ত্রে তাকে একটি চেয়ার দেয়া হয় এবং ১৭৫৯ সালে তিনি তার নৈতিক ভাবপ্রবণতার তত্ত্ব (থিওরি অব মোরাল সেন্টিমেন্টস) বইখানি প্রকাশ করেন। গ্লাসগো ছেড়ে দিয়ে ১৭৬৩-৬৫ সময়কালে তিনি সারেলিউচের এক তরুণ ডিউকের ভ্রাম্যমাণ শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তার সঙ্গে ফ্রান্সে চলে যান। যেখানে কুইজনে, গার্টটসহ পঞ্চদশ লুইয়ের অন্য অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। ১৭৬৬ সাল থেকে তিনি কারক্যাল্ডিতে তার মায়ের সঙ্গে বসবাস করেন এবং তার জাতিসমূহের সম্পদ (ওয়েলথ অব নেশনস) বইটির ওপর কাজ করেন, যা ১৭৭৬ সালে প্রকাশিত হয়। এ বইটির সাফল্য তাকে লন্ডনে নিয়ে আসে। এরপর তিনি এডিনবরা ফিরে আসেন এবং সেখানে ১৭৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

২. ডেভিড রিকার্ডো

ডেভিড রিকার্ডো ১৭৭২ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন, তার বাবা ছিলেন একজন ইহুদি এবং কোম্পানির কাগজের দালাল। তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল খুবই কম এবং মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই তিনি তার বাবার ব্যবসায় যোগ দেন। ১৭৯৯ সালে অ্যাডাম স্মিথের লেখা পড়ার পরে রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ে তার আগ্রহ জাগে। জন স্টুয়ার্টের বাবা জেমস মিলের উত্সাহে তিনি এ বিষয়ে লেখা শুরু করেন। ১৮০৯ সালে তিনি তার প্রচারপত্র, ব্যাংক নোটের অবচয়নের প্রমাণস্বরূপ বুলিয়ানের চড়া দাম (দ্য হাই প্রাইস অব বুলিয়ান অ্যাজ প্রুফ অব দ্য ডিপ্রিসিয়েশন অব ব্যাংক নোটস) প্রকাশ করেন। ১৮১৭ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রধান বই, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও করারোপের মূলসূত্র (প্রিন্সিপলস অব পলিটিক্যাল ইকোনমি অ্যান্ড ট্যাক্সেশন), যা অর্থনীতির ক্ল্যাসিক্যাল ভিত্তি স্থাপন করে। ১৮২৩ সালে তিনি গ্যাটকম্ব পার্কে তার এস্টেটে মৃত্যুবরণ করেন।

৩. উপযোগবাদ (Utilitarianism)

ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতির ধারণাকে বিরোধিতা করে ১৮৭০ সালে উপযোগবাদীরা অর্থশাস্ত্রের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। জেবনস (Jevons), মেনজার (Menger), লিও ওয়ালরাস (Leon Walras) এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এদের তিনজনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনজন পৃথিবীর তিন জায়গায় থাকতেন এবং তাদের মধ্যে কোনো প্রকৃত যোগাযোগ না থাকা সত্ত্বেও তাদের তিনজনের চিন্তার সাদৃশ্য যথেষ্ট কাছাকাছি ছিল। ইংল্যান্ডের নাগরিক Jevons এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা Theory of Political Economy বইটি ১৮৭১ সালে প্রকাশিত হয়। অস্ট্রিয়ান Carl Menger এর Principle of Economics বইটি ১৮৭১ সালে প্রকাশিত হয়। সুইজারল্যান্ডের নাগরিক Leon Walras-এর গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা Element of Pure Economics ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত হয়।

৪. আলফ্রেড মার্শাল

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে একজন ক্যাশিয়ারের সন্তান আলফ্রেড মার্শাল ১৮৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ম্যালথাসের মতো তিনিও কেমব্রিজে গণিতশাস্ত্রে দ্বিতীয় র্যাংলার হয়েছিলেন এবং তার কলেজে একজন ফেলো নির্বাচিত হন। কেমব্রিজে যখন গণিত বিষয়ে অধ্যাপনা করছিলেন, তখন তিনি অধিবিদ্যা ও মনোবিদ্যায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি চর্চায় মনোনিবেশ করেন। ১৮৮২ সালে তিনি ব্রিস্টলে রাজনৈতিক অর্থনীতির আসনটি গ্রহণ করেন এবং অক্সফোর্ডেও এ বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৮৮৫ সালে তিনি অর্থনীতির প্রফেসর হিসেবে কেমব্রিজে ফিরে আসেন এবং ১৯০৮ সালে অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত ওই পদে আসীন ছিলেন। তার প্রধান প্রধান প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্যের শুদ্ধ তত্ত্ব (১৮৯৭) (দ্য পিওর থিওরি অব ফরেন ট্রেড) এবং অর্থনীতির মূলসূত্র (১৮৯০) (প্রিন্সিপলস অব ইকোনমিকস)। তিনি ১৯২৪ সালে মারা যান।

৫. কেইনস

জন মেইনার্ড কেইনস ১৮৮৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং লেখাপড়া করেন ইটন ও কেমব্রিজে, যেখান থেকে গণিতশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণী পেয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি মার্শালের তত্ত্বাবধানে অর্থনীতি অধ্যয়ন করেন এবং কিছু সময় সরকারি আমলা হিসেবে চাকরি করার পর কেমব্রিজের কিংস কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক নিযুক্ত হন। ১৯১১ সালে তিনি ইকোনমিক জার্নাল পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ট্রেজারিতে একটি পদ গ্রহণ করেন, কিন্তু যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের সব দায়দায়িত্ব জার্মানির ওপর চাপানো হলে তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৩০ সালে তার অর্থবিষয়ক নিবন্ধ (ট্রিটিজ অন মানি) প্রকাশিত হওয়ার আগে সমসাময়িক অর্থনৈতিক সমস্যাবলির ওপর তিনি বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রচারপত্রিকা প্রকাশ করেছেন। তার প্রধান অবদান, সাধারণ তত্ত্ব (দি জেনারেল থিওরি) প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে। তিনি ১৯৪৪ সালে ব্রিটন উডস আলোচনায় নেতৃত্ব দেন, যার ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড) গঠিত হয়। তিনি ১৯৪৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

৬. মিলটন ফ্রিডম্যান

মিলটন ফ্রিডম্যান ১৯১২ সালে নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন। ১৯৭৩-৮১ সাল পর্যন্ত National Bureau of Economic Research-এর Research Staff ছিলেন। একই সময়ে ১৯৪৮ থেকে ৭৭ পর্যন্ত তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। ১৯৭৬ সালে তিনি অর্থশাস্ত্রে নোবেল প্রাইজ পান। ফ্রিডম্যানের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা Methodology of Positive Economics ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয়। তিনি ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

৭. অমর্ত্য সেন

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের জন্ম ১৯৩৩ সালে, শান্তিনিকেতনে। স্কুলের পড়াশোনা শুরু করেন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরীজ স্কুলে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির পাঠ শেষ করে যান কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে। এখানেই তার পিএইচডি শেষ করেন। কর্মজীবন শুরু করেন কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে। এরপর দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি পড়িয়েছেন এমআইটি, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস, ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড, হার্ভার্ডসহ আরো অনেক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পান এই অর্থনীতিবিদ। উন্নয়ন, স্ব-ক্ষমতা, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ বিষয়ে তার গবেষণা বিশ্বজুড়ে আলোচিত। ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম, কালেকটিভ চয়েজ অ্যান্ড সোশাল ওয়েলফেয়ার, পোভার্টি অ্যান্ড ফেমিনস, দি আইডিয়া অব জাস্টিস তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

৮. থমাস পিকেটি

ফরাসি অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটির জন্ম ১৯৭১ সালে। ২২ বছর বয়সে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে সম্পদের পুনর্বণ্টন বিষয়ে পিএইচডি লাভ করেন। এরপর যোগ দেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে। ২০০২ সালে তাকে ফ্রান্সের সেরা তরুণ অর্থনীতিবিদের পুরস্কার দেয়া হয়। বর্তমানে অধ্যাপনা করছেন প্যারিসের স্কুল ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ ইন দ্য সোশ্যাল সায়েন্সেস, প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকস এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে। বিশ্বজুড়ে আলোচিত তার দুটো গ্রন্থ হচ্ছে—ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি (২০১৩), ক্যাপিটাল অ্যান্ড আইডিয়োলজি (২০১৯)

(লেখাটি সিল্করুট ঈদ সংখ্যা ২০২২-এ 'বাজার অর্থনীতির দর্শন ও প্রশ্ন' শিরোনামে প্রকাশিত)

আরও