[গতকালের
পর]
সরকার কৃষিতে বড় অংকের
ভর্তুকি দিয়ে
থাকে। কৃষির
বাণিজ্যিকীকরণ করা
হলে ভর্তুকি কি কমে
আসবে?
ভর্তুকি
অনেকভাবে হয়।
একটা হলো
প্রত্যক্ষ নগদ
ভর্তুকি। এটি
কম-বেশি
হওয়াটা খুবই
স্বাভাবিক। এটি
হ্রাস পেতে
পারে। এর
ক্ষতিকর দিকও
আছে। প্রথমটা
হলো, যাদের
প্রাপ্য সবসময়
তারা ভর্তুকি
পায় না।
যোগাযোগ আছে
বা প্রভাব
আছে, তারা
হয়তো পেয়ে
যায়। দ্বিতীয়ত,
এভাবে রাষ্ট্রের
থেকে যখন
নগদ প্রণোদনা
পায় তখন
তা বাজার
ব্যবস্থার সঙ্গে
সাংঘর্ষিক হয়ে
যায়। যার
প্রতিযোগিতার ক্ষমতা
বা দক্ষতা
নেই, ভর্তুকি
সুবিধা দিয়ে
তাকে টিকিয়ে
রাখা হয়।
কিন্তু কৃষিতে
যে ভর্তুকি
দেয়া হয়,
তার ফিরতিটা
আমরা পাচ্ছি
অনেক বেশি।
কাজেই ভর্তুকিটা
আসলে কৃষিতে
বড় বিনিয়োগ
বলছি। ভর্তুকি
পুরোটা নগদে
হয় তাও
না। নীতি
সমর্থনের ভেতর
দিয়ে আমরা
বিভিন্নভাবে সহায়তা
করতে পারি।
যেমন সেচযন্ত্রের
সঙ্গে যদি
বিদ্যুৎ সংযোগ
থাকে, তার
ওপর সরকার
একটা ভর্তুকি
দিচ্ছে। এটাকে
দেখা হয়
বিনিয়োগ হিসেবে।
কারণ এটা
না দিলে
অনেকের পক্ষে
ডিজেল কিনে
সেচযন্ত্র ব্যবহার
করে সেচ
দেয়া সম্ভব
হবে না,
সেচের খরচ
বেড়ে যাবে।
উৎপাদন খরচও
বাড়বে। সে
হিসাবে আমরা
কৃষকের এ
ব্যয়ভার লাঘব
করছি। এ
বিনিয়োগের সুবিধা
কিন্তু বাংলাদেশ
নিয়েছে। আমাদের
দেশে যে
১৫ লাখ
শ্যালো টিউবওয়েল,
তার বেশির
ভাগই ডিজেলে
চলে। ডিজেলের
দাম বিশ্ববাজারে
যা-ই
থাকুক, সরকার
যতটুকু পারে
সুবিধাজনক দামে
সরবরাহ করছে।
অন্যান্য দেশের
তুলনায় আমরা
একটা ভালো
অবস্থানে আছি।
এটা কিন্তু
আমাদের একটা
বড় ধরনের
ডিভিডেন্ড দিয়েছে।
যদি বলেন,
আমাদের কৃষি
উৎপাদনের সবচেয়ে
বড় ড্রাইভার
কে? আমি
বলব, সবচেয়ে
বড় ড্রাইভার
হলো সেচ
ব্যবস্থা। নলকূপ
দিয়ে ভূগর্ভস্থ
পানি সেচ
দেয়া। এটি
আমাদের দেশে
যথেষ্ট সহায়তা
করেছে। কাজেই
ডিজেল ও
বিদ্যুৎ ভর্তুকির
ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের এমন
কোনো দেশ
নেই, যেখানে
কিছু না
কিছু ভর্তুকি
আছে। ভারতের
কৃষির কথা
যদি বলেন,
তাহলে সেটি
একটা উল্লেখযোগ্য
উদাহরণ। পাঞ্জাব
বা উত্তর
প্রদেশের কৃষকরা
গোড়া থেকে
যে পরিমাণ
ভর্তুকি পেয়ে
এসেছেন, সেই
পর্যায়ে বাংলাদেশ
এখনো যায়নি।
বাংলাদেশ তার
নিজস্ব মডেল
ব্যবহার করেছে।
বাংলাদেশ পাঞ্জাবি
মডেল ব্যবহার
করেনি। কীভাবে
নিজের মডেল?
সেটি হলো,
১৫ লাখ
শ্যালো টিউবওয়েলের
ক্রয়মূল্যের ওপর
কোনো ভর্তুকি
গোড়া থেকেই
ছিল না।
অন্যান্য বড়
কৃষি যন্ত্রপাতি
যেমন হার্ভেস্টর
মেশিনের ওপর
ভর্তুকি রয়েছে।
শ্রমিক সংকটের
মুখে ধান-গম
কাটার কাজে
এটা খুব
কাজে দিয়েছে।
ডিজেলের ওপর
কিছু ভর্তুকি
রয়েছে। বিদ্যুতের
ওপর সামান্য
ভর্তুকি দেয়া
আছে। সারের
ওপর বেশ
ভর্তুকি আছে।
সারের দামটা
ক্রয়ক্ষমতার ভেতর
থাকায় তারা
পর্যাপ্ত সার
ব্যবহারে বিনিয়োগ
করতে পারেন।
এজন্য আমি
বলছি, এটি
হলো বাংলাদেশের
মডেল।
একটা অভিযোগ এখন করা
হচ্ছে, ভর্তুকি মূল্যে সুবিধা পাওয়ায় কৃষকরা সার ও
পানির অপব্যবহার করছে। আপনার
দৃষ্টিতে বিষয়টি কী?
সার
ও পানি
আমরা কতটা
বেশি ব্যবহার
করছি, সেটি
অবশ্যই পর্যালোচনা
করে দেখার
আছে। মাত্রাতিরিক্ত
পানি, সার
ও কীটনাশক
ব্যবহারের কারণে
মাটির উর্বরা
শক্তিতে কী
প্রভাব পড়ছে
তাও দেখা
দরকার। অভিযোগ
আসছে, যেসব
নলকূপে বিদ্যুৎ
সংযোগ দেয়া
হচ্ছে, তাতে
পানি অনেক
বেশি তোলা
হচ্ছে। এতে
দুদিক থেকে
ক্ষতি হচ্ছে।
এক. অনেক
পানির অপচয়
হচ্ছে। দু্ই.
বিদ্যুতের খরচটাও
বাড়ছে। সেচে
ব্যবহূত বিদ্যুতের
ওপর ভর্তুকি
যুক্তিযুক্ত হারে
নির্ধারণ করা,
মিটার রিডিং
অনুযায়ী বিদ্যুৎ
বিল করা
এবং মাঠ
পর্যায়ে সেচ
পানির ব্যবস্থাপনা
উন্নয়ন হলে
এসব অপচয়
কমে আসবে।
আরেকটি কথা
খেয়াল রাখতে
হবে, সরকারের
ওই ভর্তুকিপ্রাপ্ত
যন্ত্র পাওয়ার
আশায় তীর্থের
কাকের মতো
অনেকেই বসে
থাকেন কখন
পাবেন। কিন্তু
প্রকৃত কৃষক
পাচ্ছেন কিনা
নিশ্চিত করতে
হবে। প্রকৃত
কৃষকের বাইরে
অন্য কেউ
যন্ত্র পাওয়ার
মতো ঘটনা
ঘটলে মুশকিল।
যেটা অনেকটা
পশ্চিমবঙ্গ ও
ওড়িশায় ঘটেছে।
কাজেই এক্ষেত্রে
আমাদের সাবধান
থাকা দরকার।
মনে রাখতে
হবে, এখানে
বেসরকারি খাত
বিনিয়োগ করতে
আসছে এবং
কিস্তিতে যন্ত্র
দেয়ার জন্য
প্রস্তুত আছে।
কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের একটা বড়
দিক কৃষি
প্রক্রিয়াজাত শিল্প
গড়ে তোলা।
সবাই বলছে
কিন্তু সম্ভাবনার তুলনায় অগ্রগতি অপেক্ষাকৃত ধীর
কেন?
এটা
আমরা বহুদিন
থেকে বলে
আসছি। এতে
সময় লাগে।
এ কারণে
যে কোনো
প্রতিষ্ঠান যদি
একটি প্রক্রিয়াকরণের
শিল্প প্রতিষ্ঠা
করে তাহলে
তাকে তো
সেটিকে লাভজনকভাবে
চালাতে হবে।
বিশাল যন্ত্রের
জন্য তাদের
হয়তো হাজার
হাজার টন
কাঁচামালের দরকার।
যেমন ধরুন
সয়াবিন। সয়াবিন
তৈরি করলাম।
সেখান থেকে
আমি তেল
উৎপাদন করব।
অথবা ভুট্টা
উৎপাদন হয়েছে।
সেখান থেকে
আমরা তেল
বা কর্নফ্লেক্স
বানাব। কাজেই
সারা বছর
শিল্প-কারখানার
যন্ত্রগুলো চালাতে
হলে পুরো
বছর পর্যাপ্ত
সয়াবিন ও
ভুট্টার সরবরাহ
থাকতে হবে।
এ জায়গাগুলোয়
সমস্যা আছে।
এর কারণ
আমরা এগুলো
এখনো খুব
ভালো করে
বুঝিনি। শুরু
যে অনেক
দিন হয়েছে
তাও নয়।
দোষও দেয়া
যায় না।
কারণ আমরা
এতদিন প্রধান
খাদ্যশস্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা
অর্জনের লড়াইয়ের
মধ্যে ছিলাম।
এখন কিছুটা
ফুরসত এসেছে।
কিছুটা নিঃশ্বাস
নিতে পারছি।
চালের আর
তেমন সমস্যা
নেই। এখন
শিল্পপতিরাও বুঝেছেন।
এক-দুজন
করে এগিয়ে
আসছেন। আরো
অনেকে আসার
চেষ্টা করছেন।
আশা করি,
আগামী পাঁচ-দশ
বছরের মধ্যে
অনেকটা এগিয়ে
যেতে পারবে।
ছোট ছোট
অ্যাগ্রো প্রসেসরও
এগিয়ে আসবে।
তাদের যন্ত্র
ও বিনিয়োগ
ছোট হবে।
একটা পর্যায়ে
তারা দেখবে
যে ছোটটা
লাভজনক। কিন্তু
বড়দের সঙ্গে
প্রতিযোগিতায় পারা
যাচ্ছে না।
যেটা মুরগির
খামারে হয়েছে।
বড় কোম্পানি
আসায় দুই-তিন
হাজারী মুরগির
খামারের মধ্যে
অনেকেই টিকতে
পারেনি। খরচে
পোষায় না।
এটা ভোক্তাদের
জন্য ভালো
হয়েছে। নইলে
এত কম
দামে মুরগি
খাওয়া যেত
না। তবে
মুরগির স্বাস্থ্য
মানের কথাটাও
মাথায় রাখতে
হবে। অ্যাগ্রো
প্রসেসিংয়েও তা-ই
হবে।
প্রধানমন্ত্রী কৃষিজমি রক্ষার কথা
বলছেন। কিন্তু তারপরও উল্লেখযোগ্য হারে কৃষি
জমি কমছে।
কীভাবে কৃষিজমি রক্ষা করা
যায়?
মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী একেবারে
সঠিক কথা
বলেছেন। তিনি
এটিও বলেছেন,
আমাদের শিল্পায়নও
করতে হবে।
শিল্পায়ন করতে
হলে সেখানে
জমির দরকার।
সঙ্গে সঙ্গে
এটিও বলা
হয় এবং
তিনিও বলেন,
একেবারে ন্যূনতম
পরিমাণ, যেটুকু
না হলেও
নয়, ততটুকু
জমি উন্নয়নকাজে
অধিগ্রহণ বা
ব্যবহার করা
যাবে। আমরা
যদি একেবারে
সিলিং দিয়ে
দিই, আগামীতে
এক ইঞ্চি
কৃষিজমি আর
শিল্পায়নে যাবে
না, তাহলে
শিল্পায়ন হবে
না। সরকার
সেটি করছেও
না। নইলে
১০০টা অর্থনৈতিক
অঞ্চল হতো
না। ওই
সুবিধাটাও রেখে
দেয়া হচ্ছে।
সবার প্রতি
আহ্বান জানানো
হচ্ছে, জমির
অপচয় যেন
না হয়।
অপচয় কোথায়
কোথায় হয়?
জেলা পর্যায়ে
আমরা যে
বড় বড়
স্টেডিয়াম বানিয়ে
রেখেছি, তার
পূর্ণ ব্যবহার
তো হয়
না। আমরা
কি এজন্য
নতুন নতুন
জমি নিচ্ছি
না? থানা
পর্যায়েও কৃষিজমিতেই
অবকাঠামো নির্মাণ
করা হচ্ছে।
এগুলোয় যেন
জমির অপচয়
না হয়।
সরকারি এজেন্সিগুলো
যার যার
মতো স্থাপনা
না বানিয়ে
যেখানেই সম্ভব,
কমন ভৌত
সুবিধা ব্যবহার
করতে পারে—এমন
সংস্কৃতি গড়ে
তোলা দরকার।
আগামী দিনের
কৃষি খাত
নিয়ে আপনার
পরামর্শ কী
হবে?
একটিই
কথা যে,
আমার নিজের
কর্মক্ষেত্র শিক্ষা
ও গবেষণায়
বর্ধিত বিনিয়োগ
অব্যাহত রাখতে
হবে। সেটি
সরকার করছেও।
কিন্তু আমাদের
খুব সযত্ন
প্রয়াস ও
নজর রাখতে
হবে শিক্ষার
মান বৃদ্ধির
জন্য। এটা
একটা বড়
ধরনের প্রশ্নসাপেক্ষ
বিষয়ে পরিণত
হয়েছে। আগামী
দিনে চতুর্থ
শিল্প বিপ্লবের
প্রয়োজন মেটাতে
আমাদের সর্বোচ্চ
অগ্রাধিকার দিতে
হবে শিক্ষার
মানোন্নয়নে। প্রাথমিক
থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
পর্যন্ত সব
পর্যায়ে আর্থিক
বিনিয়োগের চেয়ে
প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে
শিক্ষা কর্মসূচির
ব্যবস্থাপনার বিষয়ে
সবচেয়ে বেশি
নজর দেয়া
প্রয়োজন। কাজেই
সময় থাকতে
কাজটি করতে
হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে
তো স্বাধীনতা
দেয়া হয়েছে।
যুগোপযোগী সিলেবাস
এবং শিক্ষা
কার্যক্রম প্রণয়ন
ও বাস্তবায়ন
করার দায়িত্ব
আমাদের। ছাত্রদের
নিয়মিত ক্লাসে
ও ক্লাসের
বাইরে শিক্ষাদান
করতে হবে।
সময়মতো পরীক্ষা
নিয়ে সময়মতো
খাতা দেখে
ফল ঘোষণা
করতে হবে।
শিক্ষক কেবল
জ্ঞানদাতা নন,
তিনি একজন
ছাত্রের বিচারকও
বটে। অভিভাবকরা
বড় ভরসা
করেন শিক্ষকের
ওপর। শিক্ষক
যথাযথ তৈরি
হয়ে ছাত্রকে
শিক্ষা দেবেন
এবং পরীক্ষার
খাতায় যে
যা নম্বর
বা গ্রেড
পাবে তাকে
সেই গ্রেডটিই
দেবেন। এ
কাজ করতে
আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।
এ জায়গাটায়
সরকারের নজরদারির
পাশাপাশি আমাদের
অনেক কিছু
করার আছে।
[শেষ]
ড. এম. এ. সাত্তার মণ্ডল: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক