একজন প্রধানমন্ত্রী কি কখনো একটি টেলিভিশন নাটকের চরিত্র নিয়ে ভাবতে পারেন? কিংবা সাধারণ দর্শকের আবেগে কি তিনি সত্যিই বিচলিত হতে পারেন? রাজনীতির কঠোর বাস্তবতায় এমন প্রশ্ন অনেকের কাছেই অবান্তর মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি ঘটনা আছে, যেখানে একজন প্রধানমন্ত্রী একটি নাটকের চরিত্রের পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি ফোন করেছিলেন প্রযোজক ও নাট্যকারকে। তিনি প্রযোজক ও নাট্যকারকে ফোন করে বিনীত অনুরোধ করেছিলেন—নাটকের শেষটা কি মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশার অনুকূলে রাখা যায় না? এমনই একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া রাজনীতিবিদ হিসেবে কতটা সফল ছিলেন, তিনি কত বড় নেতা ছিলেন কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায় কী কী অবদান রেখেছেন—ইতিহাস তার নির্ধারিত নিয়মেই সেসবের বিচার করবে। কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, সেই পরিচয় অনেক সময় বড় কোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নয়, বরং ধরা পড়ে এমনই ছোট ছোট ঘটনায়।
১৯৮১ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অপ্রত্যাশিত হত্যাকাণ্ডের পর রাজনীতির হাল ধরেন গৃহবধূ খালেদা জিয়া। ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি ধীরে ধীরে নেতৃত্বের ভার নেন। দীর্ঘ সময় ধরে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী—শুধু দেশের ইতিহাসেই নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও নারীর ক্ষমতায়নের এক অনন্য প্রতীক।
খালেদা জিয়া যখন দারুণ প্রত্যয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ঠিক এই সময়েই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ঘটে যায় এক অভাবনীয় ঘটনা। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হতে থাকে একটি ধারাবাহিক নাটক—কোথাও কেউ নেই। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ নাটকটি অল্প সময়েই দেশের টেলিভিশন ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও দর্শকনন্দিত ধারাবাহিকে পরিণত হয়। এ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বাকের ভাই।
বাকের ভাই সমাজের চোখে একজন ভালো মানুষ নন। তাকে দেখা হয় উচ্ছৃঙ্খল, মস্তান প্রকৃতির এক অপরাধী হিসেবে। যদিও নাটকে তার কোনো প্রত্যক্ষ অপরাধের দৃশ্য দেখা যায় না, তবু সমাজ তাকে অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত করে। অথচ এ তথাকথিত অপরাধীর ভেতরেই দেখা যায় মানুষের জন্য গভীর ভালোবাসা। মানুষের কল্যাণে সে নিজের জীবন বিপন্ন করতে দ্বিধা করে না। আবার প্রেমিক হিসেবেও সে ব্যতিক্রমী—নমুনার প্রতি তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, যদিও সেই প্রেম শেষ পর্যন্ত ব্যর্থই থেকে যায়।
বাকের ভাই সমাজের চোখে একজন অপরাধী হয়েও মানুষের চোখে হয়ে ওঠেন দারুণ আকর্ষণীয় এক চরিত্র। নাটকের কাহিনীতে তাকে একটি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়। এমনভাবে মিথ্যা মামলা সাজানো হয় যেন বাকের ভাইয়ের ফাঁসির সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে। বাকের ভাইয়ের উকিল হিসেবে হুমায়ুন ফরীদির আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন বাকের ভাইকে বাঁচাতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থতার দিকে এগিয়ে যায়। সেই মুহূর্তে দর্শক যেন ক্রমেই উত্তেজিত হতে থাকে। তারা ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। শুরু হয় মিছিল, দেয়াল লিখন, সমাবেশ। ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে শোনা যায় নানা রকমের স্লোগান। ‘বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কেন, কুত্তাওয়ালী জবাব চাই’, ‘বাকের ভাইয়ের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’। বাকের ভাইকে বাঁচাতে ঢাকার রাজপথে কিশোর-যুবক মিছিল করতে থাকে। সে সময়কার পত্র-পত্রিকায় এ খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। সেই সংবাদ পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রীর কাছেও।
এক পর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নাটকের প্রযোজক বরকত উল্লাহ এবং নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদকে অনুরোধ করেন নাটকের শেষটা একটু ভিন্নভাবে করা যায় কিনা, বাকের ভাইকে বাঁচিয়ে রাখা যায় কিনা! কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ এক্ষেত্রে ছিলেন আপসহীন। তিনি যা ভেবেছিলেন, তাই করবেন; তাই করেছেন। বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয়েছিল।
একজন প্রধানমন্ত্রী হয়ে একজন নাট্যকার কিংবা প্রযোজককে ফোন করে নাটকের পরিণতি বদলে দেয়ার সুপারিশ সম্ভবত পৃথিবীতে বিরল। কিন্তু তিনি এ বিরল কাজটিই করেছিলেন। সাধারণের চোখে এ ঘটনা অনেক ছোট হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এ ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ। একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যাবে এ ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে আছে খালেদা জিয়ার চরিত্রের এক অনন্য মানবিক দিক।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তখন বিষয়টিকে কেবল একটি নাটক হিসেবে দেখেননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এটি মানুষের আবেগ, ন্যায়বোধ ও বঞ্চনার অনুভূতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবেই তিনি অনুভব করেছিলেন সাধারণ দর্শকের মনের প্রবল অনুভূতির বিষয়টি।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি কোনো নির্দেশ দেননি, কোনো চাপ সৃষ্টি করেননি। তিনি শুধু অনুরোধ করেছিলেন- ‘শেষটা কি একটু অন্যভাবে করা যায় না? বাকের ভাইকে কি বাঁচিয়ে রাখা যায় না?’ এখানে ক্ষমতার দম্ভ নেই, নেই শাসনের দৃঢ়তা, আছে কেবল মানুষের প্রতি প্রবল সহমর্মিতার মানবিক প্রকাশ। এই অনুরোধের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয় খালেদা জিয়ার সংবেদনশীল মন ও মানবিক মনস্তত্ত্বের পরিচয়।
খালেদা জিয়া জানতেন, তার এই অনুরোধ গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদ তার সৃজনশীল সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। নাটক তার পূর্বনির্ধারিত পরিণতিতেই পৌঁছায়। বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয়। কিন্তু এই প্রত্যাখ্যান খালেদা জিয়াকে খাটো করেনি। বরং এতে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার সেই বিরল মানসিকতা—যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মানুষের অনুভূতি বড় হয়ে ওঠে।
ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও সাধারণ মানুষের আবেগকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন! একজন রাজনীতিবিদ তো মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশাকে মূল্যায়ন করেই টিকে থাকেন। খালেদা জিয়াও তাই করেছেন। তিনি জানতেন, হয়তো এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুচিত, তবু একজন মানুষ হিসেবে তিনি মানুষের আবেগকে সম্মান জানিয়েছিলেন।
মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া সফল রাজনীতিবিদ হওয়া সম্ভব নয়। পৃথিবীর প্রায় সব রাজনীতিবিদই মুখে এ কথা বলেন। কিন্তু ক’জন তা অন্তরে ধারণ করেন? খালেদা জিয়া সম্ভবত তা বিশ্বাস করতেন। তিনি মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন, মানুষের অনুভূতিকে অবজ্ঞা করেননি। তার রাজনীতি আবেগহীন কূটকৌশলের সমাহার ছিল না; বরং তা ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন নিখুঁত ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে—এমন দাবি কেউ করবে না। তার রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক ছিল, এমন অনেক সিদ্ধান্ত ছিল, যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু তিনি যে এ দেশকে ও দেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন—তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমৃত্যু মানুষের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসার প্রমাণ তিনি রেখে গেছেন। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোয়ও মানুষের প্রতি সেই ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। তাই তো জীবনের কঠিনতম মুহূর্তেও তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করতে পেরেছিলেন—এ দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এ দেশ, এ দেশের মাটি-মানুষই আমার সবকিছু।’
এ কারণেই খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের মানুষ স্মরণ করবে অশেষ শ্রদ্ধা ও পরম মমতায়।
সফিক ইসলাম: শিক্ষক ও গবেষক