ক্যান্সারের মতো জীবনঘাতী রোগের চিকিৎসায় সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দেশের প্রধান সরকারি বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতাল জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইসিআরএইচ) রেডিওথেরাপির জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়েছে। কোনো কোনো রোগীর সিরিয়াল ২০২৮ সালের শেষভাগে পড়েছে। এমনকি নতুন রোগীদের রেজিস্ট্রেশনও এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে বলে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ক্যান্সার চিকিৎসায় এমন দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু একটি হাসপাতালের সক্ষমতার সংকট নয়, বরং দেশে সরকারি বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা ও অবকাঠামো এবং পরিকল্পনাগত ঘাটতিরও প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর ভঙ্গুরতারও একটি স্পষ্ট চিত্র।
বেসরকারি অনেক হাসপাতালে ক্যান্সারের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের পক্ষে এ রোগের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া বড় চাপের। কিন্তু বাস্তবতা হলো দেশে প্রতি বছরই ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে ভুগে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে ১ লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি। সংস্থাটির হিসাবে দেশে বর্তমানে ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৪৬ হাজারের মতো, যা ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ দেশব্যাপী বিপুলসংখ্যক ক্যান্সার রোগীর বিপরীতে চিকিৎসা ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল এবং ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে নানাভাবেই তাদের ভুগতে হচ্ছে। এখানে বড় বৈষম্যও স্পষ্ট—যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা বেসরকারি ব্যবস্থায় তুলনামূলক দ্রুত চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পেলেও দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত রোগীদের বড় অংশকে সরকারি হাসপাতালের সীমিত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবায় এমন আর্থিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য কোনো টেকসই ব্যবস্থার লক্ষণ নয়। কিন্তু চিকিৎসাসেবার এ সীমাবদ্ধতা শুধু ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রেই নয়, জটিল ও বিশেষায়িত প্রায় সব স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সামগ্রিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জানা গেছে, এনআইসিআরএইচে মোট ছয়টি রেডিওথেরাপি মেশিন পরিচালনার ব্যবস্থা থাকলেও চারটিই দুই বছরের বেশি সময় ধরে বিকল। সচল দুটি মেশিন দিয়ে প্রতিদিন তিন শিফটে গড়ে ২৫০ রোগীকে রেডিওথেরাপি দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ সীমিত সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা ও স্থাপন সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু একটি সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে জীবন রক্ষাকারী চারটি মেশিন বছরের পর বছর বিকল থাকা কেবল অর্থ সংকটের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে ক্রয় প্রক্রিয়া, যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি সক্ষমতা, জনবল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির মতো বিষয়ও জড়িত। এসব দুর্বলতা দূর না করলে নতুন যন্ত্র কিনেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। যদিও বিদ্যমান বাস্তবতায় হাসপাতালটির সক্ষমতা বাড়াতে সরকারকে দ্রুত অর্থায়নের বিষয়েও ভাবতে হবে। একই সঙ্গে যেসব মেশিন দীর্ঘদিন ধরে বিকল, সেগুলো দ্রুত মেরামত বা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র দীর্ঘ সময় অকেজো পড়ে না থাকে।
বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজনের বিপরীতে বিশেষায়িত সেবার সুযোগ সীমিত হওয়ায় রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রোগীরা এনআইসিআরএইচে চিকিৎসার জন্য আসেন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ আরো সংকুচিত হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল ও চিকিৎসা অবকাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ হওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে রাজধানীকেন্দ্রিকতা শুধু রোগীর ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, ঢাকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন চাপ তৈরি করছে, যা তাদের বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়ে সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এনআইসিআরএইচের বর্তমান পরিস্থিতি সেই কাঠামোগত সমস্যারই একটি উদাহরণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আটটি বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের বিশেষায়িত সেবা চালুর উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে অবকাঠামোও তৈরি হয়েছে এবং জনবল ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানানো হয়েছে। এসব কেন্দ্র দ্রুত চালু করা গেলে রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমানোর পাশাপাশি নিজ নিজ অঞ্চলের মানুষকে কাছাকাছি সময়ে চিকিৎসা দেয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ওষুধ, প্রশিক্ষিত জনবল এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে বিভিন্ন স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণের পর প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি বা পরিচালন সক্ষমতার অভাবে সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ার নজির রয়েছে। তাই কেবল অবকাঠামো নির্মাণের সংখ্যাকে অগ্রগতি হিসেবে দেখলে চলবে না; একটি হাসপাতাল বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে রোগীসেবা দিতে পারছে, সেটিই হতে হবে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।
এর বাইরেও কিছু বিষয় ভাবনায় আনা জরুরি। ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা কেন বাড়ছে? কোনো রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকাও জনস্বাস্থ্যকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেয়ার বিষয়টিকেই সামনে আনে। দেশের মানুষ প্রায় ৩৫ ধরনের ক্যান্সারে ভুগছে বা নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে বলে ডব্লিউএইচওর তথ্য জানাচ্ছে। এটি বড় উদ্বেগের বিষয়। যদিও এ-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো তথ্যভাণ্ডার নেই; তবে খাদ্যনালি, ফুসফুস, স্তন ও জরায়ু ক্যান্সারের আধিক্য থেকে ভেজাল খাদ্য, পরিবেশ দূষণ, অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তানগ্রহণ তথা অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনসহ নানা কারণে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা। সুতরাং সরকারের হাতে যেসব বিষয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আছে, সেগুলোর দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। যেমন ভেজাল খাদ্যের বিপণন বন্ধ, বায়ু মান উন্নত করা ইত্যাদি। নয়তো একদিকে ক্যান্সার চিকিৎসার অবকাঠামো বাড়ানো হবে, অন্যদিকে রোগীর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে যার চাপ সামাল দেয়া সম্ভব হবে না। সবচেয়ে জরুরি হলো, মনে রাখা যে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা কেবল চিকিৎসাসেবা দেয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত না; রোগ প্রতিরোধ এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।