শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

অন্ধকারে আলো খোঁজা রাশীদুল হাসানের ডায়েরি

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যারা শুধু জ্ঞানের বাহক নন, সমাজকে আলোকিত করার নৈতিক শক্তিও ছিলেন। জাতির দুর্ভাগ্য, এ মানুষগুলোর জীবন, চিন্তা ও সংগ্রাম সম্পর্কে আজও আমরা খুব কমই জানি।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যারা শুধু জ্ঞানের বাহক নন, সমাজকে আলোকিত করার নৈতিক শক্তিও ছিলেন। জাতির দুর্ভাগ্য, এ মানুষগুলোর জীবন, চিন্তা ও সংগ্রাম সম্পর্কে আজও আমরা খুব কমই জানি। স্বাধীনতাকে সংকীর্ণভাবে রাজনীতিকরণ কিংবা ইতিহাসের দায় এড়িয়ে চলার অভ্যাস—কারণ যা-ই হোক, আমরা তাদের বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা করি না। এ প্রেক্ষাপটে, আমার জানা একজন শহীদ বুদ্ধিজীবী এসএমএ রাশীদুল হাসানের জীবন ও মৃত্যু আমাদের সামনে বহু অনালোচিত প্রশ্ন তুলে ধরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এ শিক্ষককে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনীর দোসর রাজাকার–আলবদর-আলশামসরা ঈশা খাঁ রোডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। ২২ দিন পর তার এবং আরো কয়েকজন শিক্ষকের গলিত দেহ পাওয়া যায় মিরপুর বধ্যভূমিতে। দেশপ্রেমিক, রাজনীতি–সচেতন এ শিক্ষক যুদ্ধ-পূর্ব সমাজ, রাজনীতি ও মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চারটি ডায়রি লিখে গেছেন, যা এক অমূল্য দলিল।

ডায়েরিগুলো পড়ে আমি এক গভীর সত্যে বিস্মিত হয়েছি। রাশীদুল হাসান ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন রাজনৈতিক টানাপড়েন, আন্দোলন, এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে; ব্যাখ্যা করেছেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে; এমনকি এক পর্যায়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নয়, ‘পূর্ব বাংলা’ শব্দ ব্যবহার শুরু করেছেন—চেতনার বিবর্তন সেখানে স্পষ্ট। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থনমূলক প্রচার বা বক্তব্য নিয়ে বিশ্লেষণ করেননি। একজন মুক্তচিন্তার শিক্ষক হিসেবে তিনি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের পক্ষপাতী ছিলেন।

বেদনাদায়কভাবে আজ আমরা দেখি ঠিক তার উল্টো চিত্র। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দলীয় সম্পৃক্ততায় বিভক্তি, পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান, আর শিক্ষার্থীদের আস্থাহীনতা। রাশীদুল হাসানের ডায়েরি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষকের প্রথম পরিচয় দলনির্ভর কর্মী নয়, বরং নৈতিক আলোকবাহক। এ অবস্থানের অবক্ষয় সমাজের জন্য গভীর অশনিসংকেত।

আমাদের সমাজে এখন সাহসী, সত্যবাদী, নীতিমান মানুষের কত অভাব! মিথ্যার মোড়কে নিজেকে আড়াল করা, ক্ষমতা–ধনলোভে বিবেক বিসর্জন দেয়া—এসব যেন নৈমিত্তিক। অবৈধ উপায়ে রাতারাতি ধনী হতে দ্বিধা নেই; বিদেশে অর্থ পাচার করতেও সংকোচ নেই। প্রশ্ন জাগে, এই পথেই কি লাখ লাখ শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করছি আমরা?

রাশীদুল হাসান ছিলেন আবেগ, নিষ্ঠা, সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, সত্যনিষ্ঠা ও রাজনৈতিক আহ্বানের এক মনোমুগ্ধকর সংমিশ্রণ। সত্যের প্রতি রাশীদুল হাসানের অবিচল আস্থা তার নিজের কবিতায় স্পষ্ট—

‘যা সত্য তা বেঁচে রবে, আমি বাঁচি বা না বাঁচি;

কি বা আসে যায়, আমি আছি বা না আছি।’

বাংলাদেশ নিয়ে তার ভাবনা যেন সবসময়ই গভীর মনন ও উদ্বেগে আবদ্ধ ছিল। ১৯৬৯ সালের মার্চে পশ্চিম পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে চলছিল রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার গোলটেবিল বৈঠক, কিন্তু দেশের মানুষ তখনো কোনো ফলপ্রসূ সংবাদ পাচ্ছিল না। দেশপ্রেমিক ও রাজনীতি সচেতন এ মানুষের মানসিক অবস্থার কিছুটা আভাস আমরা পাই তার ডায়েরির ১২ মার্চ ১৯৬৯-এর লেখায়। তিনি লিখেছেন: ‘সারা দেশে অশান্তি ও বেদনার্ত ভাব। দেশজননী যেন নতুন জন্মবেদনার প্রহর গুনছে। ড. শামসুজ্জোহার হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের ধর্মঘট অব্যাহত রয়েছে। ওদিকে পিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠক চলছে। কোনো অগ্রগতির খবর এ পর্যন্ত পাইনি। তবে শুভেচ্ছা ও প্রত্যাশার খবর পাচ্ছি। গভীরতর কোনো লেখাপড়ার কাজ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় কাজ করাও বুঝি সম্ভব নয়। অন্তরের প্রার্থনা দিয়ে দেশের মঙ্গল কামনা করছি।’

এ দেশ ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। অথচ ভাষাকে অবহেলা করার দায়ও আমাদের কম নয়। ব্রিটিশরা ইংরেজি শিক্ষায় একটি সুবিধাভোগী শ্রেণী তৈরি করেছিল; বাংলা তখন ‘নিম্ন’ শ্রেণীর ভাষা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। পাকিস্তানের উর্দু চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াসও সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতারই পুনরাবৃত্তি। রাশীদুল হাসান ডায়েরিতে লিখেছিলেন—

‘জীবিকার প্রয়োজনে ইংরেজি শিখেছি। কিন্তু বাংলা—আমি যাকে ধারণ করি হৃদয়ে, আমার মাতৃভাষা, আমার আত্মপরিচয়ের মূল উৎস।’ এ স্বীকারোক্তিতে তার শেকড়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর আত্মমর্যাদা দীপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাঙালি জাতিসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং বিশ্বের দরবারে বাঙালি হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে রবীন্দ্রনাথ একটি বড় মাধ্যম। পাকিস্তান আমলে রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। সে সময় রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীদের প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে থাকতে হতো। তথাপি এ শিক্ষক তার বড় মেয়েকে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হিসেবে গড়ে তুলছিলেন।

বাংলাদেশের জন্মের জন্য তার অন্তরের ব্যাকুলতা সর্বোচ্চে পৌঁছেছিল শেষ দিনগুলোতে। শহীদ হওয়ার মাত্র দুইদিন আগে ১২ ডিসেম্বর তিনি লিখেছিলেন—

‘আমাদের রাত্রিগুলো মাছের পেটের মতন, সারা রাত আমরা সব জান-নূন হয়ে আছি; আমাদের প্রার্থনার ধ্বনি, তোমার প্রাণে কী পৌঁছাবে?’

কবিতাটি পড়লে মনে হয়—একজন মানুষ তার অস্থির রাত, ভয়, আশা আর মুক্তির আর্তি একসঙ্গে আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তার আরেকটি কবিতা কানে বাজে—

‘এখন আমার দেশ আমার অশ্রুজলে, আমার দেশ আমার অন্তরে নিরন্তর বিব্রত বিষয়।’

তার ডায়েরি পড়তেই বারবার মনে হয়েছে—আমি তাকে কীভাবে সম্মান জানাব? নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শিল্পাঙ্গন’ আমার লেখা ‘এ গুণী নামি তোমারে’ অবলম্বনে একটি আলেখ্য নির্মাণ করে, যা পরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়—এ যেন ক্ষুদ্র হলেও তার স্মৃতির প্রতি এক নীরব শ্রদ্ধা।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের জীবন ছিল বর্ণাঢ্য; তাদের হৃদয়ে লালিত ছিল এক শোষণহীন, কল্যাণকর বাংলাদেশের স্বপ্ন। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে তারা নানা উপায়ে রেখেছেন অমর অবদান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক খবর পেলেন, ধানমন্ডির একটি বাড়িতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আত্মগোপনে আছেন এবং খাদ্যের অভাবে কষ্টে দিন কাটছে। রাত গভীর হলে তিনি লুঙ্গি পরে একাই বস্তায় চাল-ডাল-সবজি তুলে নিলেন এবং হেঁটে গিয়ে সেই মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পৌঁছে দিলেন। এমন গল্প শুনলে বুক ভরে ওঠে—কারণ এ গল্পগুলোতেই লুকিয়ে আছে আমাদের মুক্তির লড়াইয়ের প্রকৃত ইতিহাস, বুদ্ধিজীবীদের মানবিকতা ও সাহসের অপরূপ আলো।

কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন, সংকীর্ণতা, গৌরববিহীন ক্ষমতা-সংগ্রাম আর পরিকল্পিত ইতিহাস বিকৃতি—এসবের কারণে আমরা নতুন প্রজন্মকে এ বীরত্বগাথা শেখাতে ব্যর্থ হয়েছি। তাই হয়তো আজ মুক্তিযুদ্ধ অনেকের কাছে গর্ব নয়—এক অস্পষ্ট স্মৃতি, এক ছায়ার মতো ধারণা।

যে ইতিহাসে আমাদের জন্ম, যে আত্মদানে আমরা ঋণী—সেই ইতিহাসকেই যদি আমরা ভুলে যাই, তবে জাতি হিসেবে আমাদের শেকড়ই তো ক্ষয়ে যাবে।

এমএম শহিদুল হাসান: অধ্যাপক (অব.), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও