অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা অনুযায়ী অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হবে রাজস্ব ব্যয়। যে কারণে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও অপেক্ষাকৃত সমতাভিত্তিক একটি কাঠামো গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এসব নীতি বাস্তবায়নে বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এক্ষেত্রে বাজেটে বরাদ্দের দিকটি বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে, তার প্রায় ৫০ শতাংশের ওপরই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য। কিন্তু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এর মধ্যে থোক বরাদ্দের প্রাধান্য আছে এবং সেইটা চিন্তার উদ্রেক করে।
একই প্রশ্ন রাজস্ব ব্যয়ের ক্ষেত্রেও চলে আসে। অবশ্যই সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানো উচিত। সরকার তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে এ ব্যয় সংযুক্ত না করে নির্দিষ্ট খাতে থোক বরাদ্দ হিসেবে দেয়া হচ্ছে। যখন একাধিক জায়গায় থোক বরাদ্দ দেয়া হয়, তখন দুটো বিষয় মনে আসে। একটা মনে হতে পারে, হয়তো এ অর্থ আদতে নেই; যেহেতু নেই, ওনারা নির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ দেননি। অথবা মনে আসতে পারে, এ বরাদ্দগুলোকে কীভাবে খরচ করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠতে পারেনি; সেজন্য এখন সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে—আজকে এটা না বলে কোনো একদিন কোনো একসময় এটা বলা হবে।
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও কিছু প্রত্যাশা অপূর্ণ রয়ে গেছে। অনেকেই আশা করেছিলেন যে সরকার আয়করের পাশাপাশি সম্পদ কর, উত্তরাধিকার কর কিংবা উচ্চ সম্পদশালীদের ওপর অতিরিক্ত করারোপের মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করবে। কিন্তু সে পথে যাওয়া হয়নি, বরং সীমিত পরিসরে অঘোষিত আয়কে নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, বিশেষ করে জমি বা আবাসন লেনদেনের ক্ষেত্রে দলিলে উল্লেখিত ও প্রকৃত লেনদেন মূল্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে পার্থক্য রয়েছে, সেটি সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এ বাস্তব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা হিসেবে বিষয়টিকে দেখা যেতে পারে।
ইতিবাচক বিষয় হলো, অতীতে যেভাবে প্রকাশ্যে কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ দেয়া হতো, এবারের বাজেটে সেই ধরনের কোনো বড় উদ্যোগ দেখা যায়নি। এটি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।
তবু সামগ্রিক রাজস্ব কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগামী বছরের অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের প্রধান ভরসা হিসেবে এখনো পরোক্ষ করকেই বেছে নেয়া হয়েছে। ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর অর্থ হলো, একজন ধনী ব্যক্তি ও একজন নিম্ন আয়ের মানুষ একই হারে করের বোঝা বহন করবেন। ফলে কর ব্যবস্থার প্রগতিশীলতা সীমিত থেকে যাচ্ছে।
আমার প্রত্যাশা ছিল সরকার রাজস্বের নতুন উৎস খুঁজবে। বিশেষ করে গত এক যুগে দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাচার হয়েছে, দেশে ও বিদেশে যে সম্পদ লুটপাটের মাধ্যমে হাতছাড়া হয়েছে, সেগুলো পুনরুদ্ধারকে রাজস্ব নীতির অংশ করা হবে। বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া সম্পদ উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারত। এমনকি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ ফেরত আনার সম্ভাবনাকেও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা যেত। কিন্তু সে ধরনের কোনো উদ্যোগ বা প্রাক্কলন দেখা যায়নি। এটি আমার কাছে কিছুটা বিস্ময়কর মনে হয়েছে।
অবশ্য এটাও সত্য যে বাজেটে জনবান্ধব কিছু উদ্যোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভ্যাট ছাড় দেয়া হয়েছে। নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্যোগগুলোর জন্যও কিছু কর সুবিধা রাখা হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সামগ্রিক বাজেট কাঠামোর ভেতরে এ সুবিধাগুলোর প্রভাব কতটা বড় ও কতটা বিস্তৃত হবে।
অর্থায়নের দিকে তাকালে উদ্বেগ আরো স্পষ্ট হয়। রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি বাস্তবতার তুলনায় অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। আমাদের বাজেট প্রক্রিয়ায় প্রায়ই এমন রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়, যা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে মনে হয় এ লক্ষ্যমাত্রাগুলো রাজস্ব সংগ্রহের বাস্তব সক্ষমতার ভিত্তিতে নয়, বরং বাজেটের হিসাব মেলানোর প্রয়োজনেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে সাধারণত প্রথমে রাজনৈতিকভাবে ব্যয়ের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়, এরপর প্রশাসনিকভাবে সেই ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়ের হিসাব দাঁড় করানো হয়। ফলে বাজেট প্রণয়নে অর্থনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিবেচনাই অনেক সময় বেশি প্রাধান্য পায়।
এ ঘাটতি পূরণের জন্য এবার বৈদেশিক ঋণের ওপরও বড় ধরনের নির্ভরতার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে মধ্যম মাত্রার ঋণগ্রস্ত দেশের কাতারে রয়েছে। আমার আশঙ্কা, আমরা ধীরে ধীরে আরো গভীর ঋণনির্ভরতার দিকে এগোচ্ছি। প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশ প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য নয়; বরং বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহৃত হবে। অর্থাৎ এ অর্থ চলতি ব্যয় ও রাজস্ব ঘাটতি মেটানোর কাজে ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
এখানেও একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। বাজেটের শুরুতে যে মানবিক সমাজ ও গণতান্ত্রিক অর্থনীতির দর্শনের কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, সেটি ভেবে দেখার বিষয়।
সরকারের কিছু নীতিগত পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবেও দেখা যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমানো এবং উদারীকরণের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতি হ্রাসের একটি প্রচেষ্টাও দৃশ্যমান। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো কর ও শুল্ক কাঠামোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা। এক বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরের কর কাঠামো সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যবসা পরিচালনায় নীতিগত স্থিতিশীলতা একটি বড় বিবেচ্য বিষয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজেটের মূল্যায়ন কেবল এর ঘোষণাপত্র দেখে করা যায় না। মিষ্টির স্বাদ যেমন খাওয়ার পর বোঝা যায়, তেমনি বাজেটের গুণাগুণও বোঝা যাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে। টাকা ব্যয় করা এবং মানুষের উপকার হওয়া—এ দুই বিষয় এক নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, সরকারের আয়-ব্যয়ের এ কাঠামো মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটাতে পারবে কিনা, বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে কিনা।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়নের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এটি প্রয়োজনীয়। এর পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। উদাহরণ হিসেবে স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি, তরুণদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান উদ্যোগ কিংবা নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা—এসব ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ, স্থানীয় সংগঠন ও উপকারভোগী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা আরো বাড়তে পারত।
বর্তমান বাজেটে রাজনীতি আছে, প্রশাসনিক কাঠামো আছে, উন্নয়নের ভাষ্যও আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ভবিষ্যতে সামাজিক সংগঠন, স্থানীয় সম্প্রদায় ও নাগরিকদের সক্রিয় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়ন ও তদারকির সুযোগ বাড়ানো গেলে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে।
বাজেটের দর্শন আশাব্যঞ্জক। কিন্তু তার সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। সেই বাস্তবায়ন কতটা মানুষের জীবনকে স্পর্শ করতে পারে, সেটিই হবে এ বাজেটের চূড়ান্ত মানদণ্ড। আর বাস্তবায়নের জন্য চলতি তথ্য-উপাত্তের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সংসদে বিবৃতি দিতে হবে। তা না হলে পতিত সরকারের ভ্রান্ত পদক্ষেপগুলোর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকে যাবে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো