নোবেল পুরস্কার ২০২৫

জ্ঞান ও উদ্ভাবনে যে ভূমিকা রাখায় বিজ্ঞানে এবারের নোবেল

১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত নোবেল পুরস্কার বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার। অসাধারণ মৌলিক গবেষণা আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের জন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রতি বছর এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।

১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত নোবেল পুরস্কার বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার। অসাধারণ মৌলিক গবেষণা আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের জন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রতি বছর এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। পাঁচটি ক্ষেত্রে যথা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র বা ফিজিওলজি, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। সুইডেনের রসায়নবিদ আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুযায়ী এ পুরস্কার দেয়া হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তদের একটি স্বর্ণপদক, সনদ ও উল্লেখযোগ্য অর্থ (১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়। বাংলাদেশী মুদ্রায় এ পুরস্কারের অর্থ ১২ কোটি ৬১ লাখ টাকার কাছাকাছি। মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও শান্তিপ্রয়াসীদের এ স্বীকৃতি বিশ্বকে নতুন পথের দিশা দেখায়। বিশেষ করে বিজ্ঞানজগতে, চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় নোবেল বিজয়ীরা প্রতি বছরই আমাদের দেখিয়ে দেন যে মানব বুদ্ধি ও অনুসন্ধিৎসা কতদূর পৌঁছতে পারে। এ প্রবন্ধে আমি ২০২৫ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় নোবেল বিজয়ীদের অসাধারণ অবদান এবং তাদের আবিষ্কারের বৈপ্লবিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করব।

২০২৫ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞান বা ফিজিওলজিতে নোবেল পুরস্কার যৌথভাবে মেরি এলিজাবেথ ব্রানকো, ফ্রেড রামসডেল ও শিমন সাকাগুচি অর্জন করেন। এদের মধ্যে মেরি ব্রুনকো ও ফ্রেড রামসডেল যুক্তরাষ্ট্রের এবং শিমন সাকাগুচি জাপানের নাগরিক। মানবদেহের জটিলতম প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রোগ প্রতিরোধ বা ইমিউন সিস্টেম। এ তিনজন বিজ্ঞানী আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কীভাবে নিজেদের কোষ এবং বহিরাগত আক্রমণকারী রোগজীবাণুদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে, সেই সংক্রান্ত এক যুগান্তকারী মৌলিক জ্ঞান বা নীতি আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাদের আবিষ্কারের মূল বিষয় ‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ যা অটোইমিউন রোগ বোঝার এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সাধারণত অত্যন্ত সতর্ক থাকে। এটি বাইরের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা অন্যান্য রোগজীবাণুকে আক্রমণ করে এবং শরীরের নিজস্ব সুস্থ কোষ ও টিস্যুকে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকে। এ ক্ষমতাকে বলা হয় টলারেন্স বা সহনশীলতা। তবে যখন এ টলারেন্স ভেঙে যায়, তখন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত শরীরের নিজস্ব কোষ ও টিস্যুকে আক্রমণ করতে শুরু করে, যা অটোইমিউন রোগ সৃষ্টি করে। অটোইমিউন রোগ হলো এমন এক ধরনের অবস্থা যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে নিজস্ব সুস্থ কোষ বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আক্রমণ করে, ফলে প্রদাহ ও ক্ষতি সৃষ্টি হয়। বর্তমানে ৮০টির বেশি অটোইমিউন রোগ সম্পর্কে জানা গেছে, যেমন টাইপ-১ ডায়াবেটিস, মাল্টিপল স্কলেরোসিস এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস।

ব্রানকো, রামসডেল ও সাকাগুচির গবেষণা প্রমাণ করে যে শরীরের প্রধান রোগ প্রতিরোধ অঙ্গ থাইমাস গ্রন্থির বাইরেও পেরিফেরাল টিস্যু বা অঙ্গগুলোয় একটি শক্তিশালী দ্বিতীয় স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করে। এ প্রক্রিয়াটিই পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স নামে পরিচিত। মেরি ই. ব্রানকো এবং ফ্রেড রামসডেল দেখিয়েছেন যে কিছু নির্দিষ্ট জিন (যেমন AIRE জিন) রোগ প্রতিরোধ কোষগুলোকে শরীরের নিজস্ব সুস্থ কোষ বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আক্রমণ না করার জন্য "প্রশিক্ষণ" দেয়। তাদের গবেষণা স্পষ্ট করে যে এ জিনগুলোর ত্রুটিই কীভাবে মারাত্মক অটোইমিউন রোগ সৃষ্টি করতে পারে। শিমন সাকাগুচি নিয়ন্ত্রক টি-কোষ (Regulatory T-cells বা Tregs) নামে এক বিশেষ ধরনের শ্বেত রক্তকণিকার গুরুত্ব আবিষ্কার করেন। এ কোষগুলোই হলো পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্সের মূল নিয়ন্ত্রক। নিয়ন্ত্রক টি-কোষগুলো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত সক্রিয়তাকে দমন করে, যেন তারা সুস্থ কোষ বা টিস্যুকে আক্রমণ না করে। সাকাগুচির এ আবিষ্কার অটোইমিউন রোগ, অঙ্গ প্রতিস্থাপন এবং ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপির ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের এসব মৌলিক গবেষণা আবিষ্কার কেবল অটোইমিউন রোগের চিকিৎসাই নয়, বরং ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারির পর অঙ্গ প্রত্যাখ্যান রোধ করা এবং ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ইমিউন সিস্টেমকে আরো কার্যকরভাবে পরিচালনা করার নতুন উপায় দেখিয়েছে।

২০২৫ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার যৌথভাবে দেয়া হয়েছে জাপানের সুসুমু কিতাগাওয়া, অস্ট্রেলিয়ার রিচার্ড রবসন এবং ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন-জর্ডানীয় বিজ্ঞানী ওমর এম ইয়াঘিকে। তাদের এ সম্মাননা দেয়া হয় ধাতব-জৈব কাঠামোর (Metal-Organic Frameworks–MOFs) উদ্ভাবন ও সংশ্লেষণের জন্য। রসায়নে এ নতুন শ্রেণীর জৈব অণুর নকশা তৈরির ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক স্থাপত্যের জন্ম দিয়েছে, যা মানবজাতির জন্য জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশুদ্ধ জলের ঘাটতির মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ধাতব-জৈব কাঠামো হলো এমন এক ধরনের ছিদ্রযুক্ত, স্ফটিকাকার পদার্থ, যা ধাতব আয়ন বা ক্লাস্টারকে জৈব লিগ্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করে তৈরি করা হয়। এদের কাঠামোতে অবিশ্বাস্যভাবে বড় এবং সুনির্দিষ্ট আকারের ফাঁপা স্থান (pores) থাকে, যা তাদের কার্যকারিতার মূল চাবিকাঠি।

কিতাগাওয়া এবং রবসন এ কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে প্রথম দিককার অগ্রদূত ছিলেন। রবসন এমন জটিল ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরির পথ দেখিয়েছিলেন, যেখানে জৈব অণু ও ধাতব আয়নগুলো পুনরাবৃত্তিক নকশায় বিন্যস্ত হয়। কিতাগাওয়া এ ধারণাকে কাজে লাগিয়ে ধাতব-জৈব কাঠামো সংশ্লেষণ এবং এদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা শুরু করেন। তারা দেখিয়েছিলেন যে কীভাবে এ ছিদ্রযুক্ত কাঠামো বিভিন্ন গ্যাস বা রাসায়নিক অণুকে শোষণ ও ধারণ করতে পারে। প্রফেসর ইয়াঘি এ ক্ষেত্রটিকে শিল্প পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য পরিচিত। তিনি কেবল ধাতব-জৈব কাঠামোর সংশ্লেষণের পদ্ধতিকে উন্নতই করেননি, বরং তিনি জিওলাইটিক ইমিডাজোলেট ফ্রেমওয়ার্কসসহ বিভিন্ন ধরনের ধাতব-জৈব কাঠামো তৈরি করেছেন, যা তাদের স্থায়িত্ব ও ব্যবহারের পরিসর বাড়িয়েছে। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে একটি হলো ধাতব-জৈব কাঠামো ব্যবহার করে মরুভূমির বাতাস থেকে জল আহরণ করার পদ্ধতি আবিষ্কার। তার তৈরি কাঠামোগুলো অত্যন্ত কম আর্দ্রতাযুক্ত পরিবেশেও জলীয় বাষ্প শুষে নিয়ে পানীয় জলের সংস্থানে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে।

রসায়নে ধাতব-জৈব কাঠামোর বৈপ্লবিক প্রয়োগে প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর অবিশ্বাস্য উচ্চ পৃষ্ঠতল এলাকা এবং কাঠামোয় গ্যাস বা অণু আটকে রাখার ক্ষমতা। অনিন্দ্য সুন্দর এ ধাতব-জৈব কাঠামোবিশিষ্ট যৌগগুলোর কিছু ব্যবহারিক প্রয়োগ কিছুটা আলোকপাত করা যাক। ১. কার্বন ক্যাপচার: ধাতব-জৈব কাঠামো বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে শুষে নিতে পারে। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এটি একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। ২. হাইড্রোজেন সংরক্ষণ: এ কাঠামো হাইড্রোজেন গ্যাসকে উচ্চ ঘনত্বে সংরক্ষণ করতে পারে, যা হাইড্রোজেনচালিত গাড়ির জন্য নিরাপদ ও কার্যকর জ্বালানি সঞ্চয় স্থান তৈরি করতে সাহায্য করে। ৩. বিশুদ্ধ জল: ধাতব-জৈব কাঠামো জল থেকে দূষণকারী ভারী ধাতু বা অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ অপসারণের জন্য ফিল্টার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নিরাপদ পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়ক। ৪. ওষুধ সরবরাহ: সুনির্দিষ্ট আকারের ছিদ্র থাকার কারণে, ধাতব-জৈব কাঠামো ওষুধের অণুগুলোকে শরীরে নির্দিষ্ট স্থানে ধীরগতিতে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহের জন্য আদর্শ বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে। এ তিন বিজ্ঞানীর কাজ রসায়নে একটি নতুন শাখার জন্ম দিয়েছে, যা অণু-পরমাণুর স্থপতি হিসেবে রসায়নবিদদের ক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাদের এ কাজ মানবজাতির পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং উন্নত জীবনযাত্রার জন্য নতুন উপাদান তৈরির ভিত্তি স্থাপন করেছে।

২০২৫ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার যৌথভাবে দেয়া হয়েছে ব্রিটিশ জন ক্লার্ক, ফরাসি মিশেল এইচ ডেভোরেট এবং মার্কিন জন এম মার্টিনিসকে। বৈদ্যুতিক সার্কিটে ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং ও শক্তি পরিমাপ আবিষ্কারের জন্য এবারের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তারা। এ যুগান্তকারী কাজটি দেখিয়েছে যে কোয়ান্টাম মেকানিকসের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যগুলো যা সাধারণত কেবল অতি ক্ষুদ্র কণার মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হতো তা মানব হাতের আকারের একটি বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাতেও প্রদর্শন করা যেতে পারে।

কোয়ান্টাম মেকানিকস হলো প্রকৃতির সেই মৌলিক নিয়ম, যা পারমাণবিক এবং উপপারমাণবিক কণাগুলোর আচরণ ব্যাখ্যা করে। এ জগতের সবচেয়ে উদ্ভট বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দুটি হলো—১. কোয়ান্টাম টানেলিং: কোয়ান্টাম জগতে, একটি কণা যথেষ্ট শক্তি না থাকা সত্ত্বেও একটি বাধা বা দেয়াল ভেদ করে অন্যদিকে চলে যেতে পারে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একটি বলকে দেয়ালে ছুড়ে মারলে তা যেমন নিশ্চিতভাবে ফিরে আসে, ক্ষুদ্র কণার ক্ষেত্রে তা সব সময় ঘটে না। ২. শক্তি কোয়ান্টাইজেশন: কণাগুলো কেবল নির্দিষ্ট পরিমাণের শক্তি শোষণ বা নির্গমন করতে পারে।

নোবেল বিজয়ীরা একটি সুপার কন্ডাক্টিং বৈদ্যুতিক সার্কিট ব্যবহার করে দেখিয়েছেন যে এ আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব ঘটনাগুলো একটি বৃহৎ, মানবসৃষ্ট সিস্টেমেও ঘটতে পারে। বিজ্ঞানীরা দুটি সুপারকন্ডাক্টরকে একটি পাতলা অন্তরক স্তর দিয়ে সংযুক্ত করে জোসেফসন জাংশন নামে একটি উপাদান তৈরি করেন। সুপারকন্ডাক্টরগুলোতে ইলেকট্রনগুলো জোড়ায় জোড়ায় (কুপার পেয়ার) আচরণ করে এবং সম্মিলিতভাবে একটি একক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল সিস্টেম তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা আরো দেখিয়েছেন যে এই বৃহৎ কোয়ান্টাম সিস্টেমটি শূন্য ভোল্টেজ অবস্থা থেকে টানেলিংয়ের মাধ্যমে বেরিয়ে আসতে পারে এবং একটি ভোল্টেজ তৈরি করতে পারে। এটি যেন হাতে ধরা যায় এমন একটি সিস্টেম অপ্রত্যাশিতভাবে একটি শক্ত প্রাচীর ভেদ করে গেল। তাদের এ পর্যবেক্ষণই ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম টানেলিং নামে পরিচিত। তারা আরো প্রমাণ করেন যে এ বৃহৎ সিস্টেমটি কেবল নির্দিষ্ট বা কোয়ান্টাইজড পরিমাণের শক্তিই শোষণ বা নির্গত করে। এ ফলাফল কোয়ান্টাম মেকানিকসের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।

তাদের যুগান্তকারী আবিষ্কার ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ভিত্তি স্থাপন করে। কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এ আবিষ্কারের গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী। সুতরাং পদার্থবিজ্ঞানে বিজ্ঞানীত্রয়ের আবিষ্কারের প্রধান প্রধান প্রায়োগিক দিকগুলো হচ্ছে—১. মৌলিক জ্ঞান: এ গবেষণা প্রমাণ করে যে কোয়ান্টাম মেকানিকস কেবল ক্ষুদ্র কণার জন্য নয়, বরং বৃহৎ মাপের বস্তুগুলোর সামগ্রিক আচরণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে ২. কৃত্রিম পরমাণু: বিজয়ীদের তৈরি এই সুপারকন্ডাক্টিং সার্কিটগুলোকে এক ধরনের ‘‌কৃত্রিম পরমাণু’ হিসেবে দেখা যেতে পারে যা তারবিহীন অবস্থায় কোয়ান্টাম আচরণ প্রদর্শন করে ৩. কোয়ান্টাম কম্পিউটিং: জন এম মার্টিনিস পরবর্তী সময়ে এই কোয়ান্টাইজড অবস্থাগুলোকে কাজে লাগিয়ে কোয়ান্টাম বিট (কিউবিট) তৈরি করার পথ দেখান। কিউবিট হলো কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মৌলিক তথ্য বহনকারী একক। সুপারকন্ডাক্টিং সার্কিট ব্যবহার করে তৈরি কোয়ান্টাম কম্পিউটারগুলো বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং মার্টিনিস ও তার সহকর্মীদের কাজটি এ প্রযুক্তির জন্য মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করেছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রচলিত কম্পিউটারের চেয়ে অনেক দ্রুত ও শক্তিশালী হিসেবে কাজ করে। এ প্রযুক্তি গবেষণা, ক্রিপ্টোগ্রাফি, মেশিন লার্নিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এ তিন বিজ্ঞানীর কাজ কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যাকে পরীক্ষাগার থেকে ব্যবহারিক জগতে নিয়ে এসেছে, যা ভবিষ্যতে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে চলেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, জাতিসংঘ ২০২৫ সালকে আন্তর্জাতিক কোয়ান্টাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে। আবিষ্কারের পর থেকে পদার্থবিজ্ঞানের এ শাখাটিতে গত শতবর্ষে বিস্ময়কর অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।

পরিসমাপ্তিতে ২০২৫ সালের চিকিৎসা, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো মানবজীবনের গুণগত পরিবর্তনের বিষয়ে নতুন আশা ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। আমরা আশা করি, বিশ্বজুড়ে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এ নতুন আবিষ্কারগুলোর মাধ্যমে মানবসভ্যতাকে অনেক উন্নত ও টেকসই পরিবেশে নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন।

ড. তোফাজ্জল ইসলাম: অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফেলো, ফুলব্রাইট, বাংলাদেশ ও বিশ্ব বিজ্ঞান একাডেমি

আরও