দুই কোটি শিশুর ভঙ্গুর ও দুর্বল প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশে

উপযুক্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মনিটরিং ও যথাযথ নিয়োগ ছাড়া মানোন্নয়ন অসম্ভব

দেশে প্রাথমিক স্তরে দুই কোটিরও বেশি শিশু পড়ালেখা করে। প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতে দেশে ১ লাখ ১৮ হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সংখ্যার হিসাবে বিশ্বের অন্যতম বড় প্রাথমিক শিক্ষা বাংলাদেশে। নব্বই দশকে সর্বস্তরে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পর প্রাথমিকের পরিধি বিস্তৃত হলেও শ্রেণী উপযোগী দক্ষতা নিশ্চিতে তীব্র ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্সিলারেশন ইন প্রাইমারি এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক নথিতে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের শিখন দক্ষতায় ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। মূল্যায়নে দেখা গেছে, ১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর ৫১ শতাংশই তাদের বয়স উপযোগী সাধারণ বাংলা-ইংরেজি লেখা পড়তে ও বুঝতে পারে না। এরই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতভীতিও তীব্র।

প্রাথমিক স্তরে শিখন ঘাটতির পেছনে একাধিক কারণও চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। দুর্বল পাঠদান পদ্ধতি, স্কুল নেতৃত্বের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, জলবায়ুজনিত বিঘ্ন ও শিক্ষায় কম অর্থায়নকে এ স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা। এসব সীমাবদ্ধতা জীবনমুখী মৌলিক দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বিকাশে বাধা দেয়। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগ্রাহ্যতা ও কর্মসংস্থানের জন্য আবশ্যিক এ দক্ষতা তারা উপযুক্ত সময়ে অর্জন করতে পারছে না। এ স্তরের দুই কোটিরও বেশি শিশুর শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ আজ সংকটে। এ ঘাটতি তাদের জীবনব্যাপী প্রভাবিত করবে। দেশে ভবিষ্যতে অদক্ষ কর্মী ও দুর্বল নাগরিক তৈরির ঝুঁকিও অনেক বাড়ে। এটি এক ধরনের সামাজিক অদক্ষতা। এজন্য প্রাথমিক স্তরে দ্রুত সমতাভিত্তিক ও গুণগত শিখন নিশ্চিতে গভীর মনোযোগ দেয়া আবশ্যক।

প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি কতটা হয়েছে তা ২০১১ সালের জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সঙ্গে সর্বশেষ ২০২২ সালের প্রতিবেদনের তুলনা করলেই বোঝা যায়। ২০১১ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ বাংলায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছিল। সেই সংখ্যা এক দশকে কমে ৫১ শতাংশে নেমেছে। গণিতে এ হার ৫০ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে ৩৯ শতাংশ। পঞ্চম শ্রেণীতে তা আরো শোচনীয়, মাত্র ৩০ শতাংশ। প্রাথমিক স্তরে যখন শিখন মানের এমন ঘাটতি রয়েছে তখন সরকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পে (পিইডিপি-৩) ১৮ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা এবং চতুর্থ প্রকল্পে (পিইডিপি-৪) ১৫ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। মোট ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচের পরও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটেনি। অবকাঠামো অনেক হয়েছে কিন্তু তা শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দদায়ক ও কৌতূহলোদ্দীপক পাঠদান নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে মূল সমস্যা শিক্ষা অবকাঠামো নয়, বরং পাঠদান পরিকল্পনা, মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ করতে না পারার মধ্যেই নিহিত।

বিশেষজ্ঞদের মত, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উপযুক্ত শিখন দক্ষতা নিশ্চিতে আবশ্যিক কিছু নয়। উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ, পাঠদানকে হৃদয়গ্রাহী করার জন্য শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া এবং পাঠদানকে আনন্দদায়ক ও বাস্তবজীবনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করার মাধ্যমেই প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক কিছু শেখানো সম্ভব। যদিও প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কম বলে মেধাবীরা এখানে চাকরি করতে আগ্রহী নন। তবে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদধারীদের নিয়োগ দেয়া গেলে সমস্যার নিবারণ হবে এমনটি ভাবাও ঠিক হবে না। এটি নিয়ে ভাবা দরকার, তবে এটিই একমাত্র সমস্যা ভাবা যাবে না। সরকার এখন পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের উন্নয়নে যে বিনিয়োগ করেছে তার মধ্যে ডিজিটাল শিক্ষা ও একুশ শতকের দক্ষতা বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির ২০২৬ সালের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, এসব দক্ষতা বাস্তবায়নে শিক্ষকরা অনেক পিছিয়ে আছেন। প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষক নিজেদের প্রযুক্তিতে দক্ষ দাবি করলেও বাস্তবে শ্রেণীকক্ষে তা প্রয়োগ করতে পারেন মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষক। শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় থাকা বড় অসামঞ্জস্য এটি। এছাড়া প্রাথমিক স্তরে এখনো ২৭ হাজার ৭৩৪টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। প্রশাসনিক শূন্যতার কারণেও বিদ্যালয়ে উপযুক্ত রুটিন ও নিয়মিত ক্লাসের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। এদিকে সারা দেশে জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি উঠছে। প্রাথমিক স্তরকে শক্তিশালী না করে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ালে ভবিষ্যতে সামাজিক অদক্ষতাই বাড়বে।

এ প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক স্তরে মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের একাডেমিক যোগ্যতার বদলে শিক্ষার্থী মূল্যায়নে দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোর মান বাড়াতে হবে। শিখন পদ্ধতি, প্যাডাগোজি, বিকাশ মনোবিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিশেষত গণিতের মতো বিষয়ের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা রাখা জরুরি। প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সময়ে সঠিক মূল্যায়নের জন্য স্কুল পর্যায়ে মনিটরিং ও জবাবদিহি ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত করা জরুরি। মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করে এ পেশার সামাজিক গুরুত্ব বাড়াতে হবে। তখন মেধাবীরাও এখানে যুক্ত হওয়ার কথা বিবেচনা করবে।

শিক্ষার্থী বৃত্তি বৃদ্ধি এবং সেই অর্থ সঠিক খাতে ব্যয় নিশ্চিত করা। অনেক শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কিনতে পারে না। এটি শিখন ঘাটতির একটি প্রধান কারণ। বহু মিডিয়া ক্লাসরুম, ট্যাব বা আধুনিক অবকাঠামো মানসম্মত শিক্ষায় সহায়ক হতে পারে, কিন্তু দক্ষ শিক্ষক ছাড়া সেগুলো অর্থহীন। বর্তমান সমস্যা শুধু প্রকল্প দিয়ে সমাধান হবে না। তাই একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করে শ্রেণীভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানে এগোতে হবে।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি ভালো কারিকুলাম গড়তে হবে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো পরীক্ষায় কমন প্রশ্ন বাছাই করে তা মুখস্থ করার দিকেই ঝুঁকে আছে। একজন শিক্ষার্থী পুরো পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে পরিচিত না হয়েও অনেক ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশের বেশি নম্বর তুলতে পারে। এ ধরনের চর্চা শিক্ষার নৈতিকতার বিপরীত। এজন্য কারিকুলামে বড় সংশোধন জরুরি। ঘন ঘন কারিকুলাম ও পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন শিক্ষকদের বিভ্রান্ত করে ও পাঠদান বাস্তবায়নও দুর্বল করে।

সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও প্রাথমিক শিক্ষায় জোর দেয়ার কথা বলছে। এজন্য দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, নেতৃত্বশূন্য স্কুল পূরণ, মনিটরিং এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার। বিলম্ব মানে আরো হাজার হাজার শিশু ঝরে পড়া বা অশিক্ষিত থাকা। প্রাথমিক শিক্ষার এ সংকটের সমাধান না করে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।

আরও