প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন—উভয় ক্ষেত্রেই বন ও বনাঞ্চলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, প্রতিটি রাষ্ট্রে মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকতে হবে। উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশে বনভূমি উজাড় হতে হতে এখন ১৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অবশ্য এ হিসাব সরকারের বন অধিদপ্তরের। বেসরকারিভাবে ধারণা করা হয়, প্রকৃত বনভূমির পরিমাণ এর চেয়ে কম। অভিযোগ রয়েছে, এমন অবস্থায়ও দেশে বনভূমি জবরদখল ও গাছপালা কেটে উজাড় করার প্রক্রিয়া চলছে নিরন্তর, বছরের পর বছর ধরে। এক্ষেত্রে বনের জমি দখলে নিয়ে নিজেদের নামে দলিল করে সেখানকার গাছ কেটে শ্রেণী পরিবর্তন এবং মাটি কেটে ভরাট করে ভূমির অবস্থান পাল্টে ফেলছে দখলদাররা। সেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের খবরও মিলছে। বন অধিদপ্তর সম্প্রতি বন দখলদারদের একটি তালিকাও প্রণয়ন করেছে। বনের জমি দখল করে ২৯৯ ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এসব দখলদার ১ হাজার ৭২১ দশমিক ৮৯ একর জমি দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা নির্মাণ করেছে। এসব বিষয় নিয়ে এখন থেকেই ভাবতে হবে। অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে বনের জমি উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, গত প্রায় এক দশকে বন উজাড় ও দখল হতে হতে দেশের বনভূমি তলানিতে ঠেকেছে। এশিয়ার দেশগুলোয় বনের পরিমাণ সবচেয়ে কমের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে। এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থা আর মাত্র দুটি দেশের—পাকিস্তান ও মঙ্গোলিয়া। দেশের বনভূমি আজ যে অব্যাহতভাবে ক্রমহ্রাসমান, তার কারণ প্রাকৃতিক নয়, বরং মানবসৃষ্ট। দিনে দিনে আমরাই বনজঙ্গল উজাড় করে চলেছি। কিছু স্বার্থান্ধ মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড, দায়িত্বহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনাহীনতা, দূরদৃষ্টির অভাব এবং বাছবিচারহীন অবকাঠামো নির্মাণই সাধারণভাবে এজন্য দায়ী। বন ধ্বংসের ফলে এরই মধ্যে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। পর্যাপ্ত বনভূমি থাকার পরও ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম নিজ নিজ দেশের বনাঞ্চল সম্প্রসারণ করার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। এসব দেশে সামাজিক বন বিভাগ অ্যাগ্রো ফরেস্ট্রি, কমিউনিটি ফরেস্ট্রি, কমার্শিয়াল ফরেস্ট্রি, আরবান ফরেস্ট্রিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আমাদেরও সেদিকেই এগোতে হবে।
আশার কথা, সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বনের জমি দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা ও কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বনভূমি উদ্ধারের জন্য এরই মধ্যে দখলকারীদের নামের তালিকা প্রস্তুত করেছে সরকার। বনভূমি উদ্ধার ও স্থাপনা অপসারণে উচ্ছেদ অভিযানও চালানো হবে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের সমন্বয়ে। তালিকা অনুযায়ী দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে দখলকৃত বনভূমি পুনরুদ্ধারে সরকারের সব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। সরকারি বনের সীমানা চিহ্নিত করতে হবে। এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ বনভূমি জবরদখল হয়েছে, তার ওপর বস্তুনিষ্ঠ তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং তা উদ্ধারে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। বন অধিদপ্তরের বনায়ন ও বন সংরক্ষণ কার্যক্রম নিরীক্ষায় পারফরম্যান্স অডিট ব্যবস্থা প্রবর্তন ও এর কার্যকর চর্চা নিশ্চিত করা জরুরি।
শুধু দখলদারদের তালিকা প্রকাশ করে বনভূমি উজাড়ের প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আসবে না, যদি তাদের হাত থেকে বনভূমিগুলো পুনরুদ্ধার না করা হয়। আসল কাজটিই হচ্ছে বেদখল হয়ে যাওয়া বনভূমি পুনরুদ্ধার করে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং সেগুলো যেন আবারো বেদখল হয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা। সেটা করতে হলে বনভূমি তদারকির ব্যবস্থা আরো কার্যকর করতে হবে। বন বিভাগের অসাধু অংশের সঙ্গে অবৈধ দখলদারদের যোগসাজশও ছিন্ন করতে হবে। আর অবিলম্বে বেদখলে থাকা বনভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাপক অভিযান চালানো প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক অভিঘাত সামনে আরো বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে যতটুকুই অবশিষ্ট রয়েছে, সেই বনাঞ্চল সুরক্ষায় অবিলম্বে মনোযোগী হতে হবে বন বিভাগের নীতিনির্ধারকদের। বন সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের ঘাটতি নেই। বিভিন্ন সময়েই আমাদের কর্তাব্যক্তিরা বন সুরক্ষার কথা বলেন; বলেন নতুন বন সৃজনে নানা আয়োজনের কথা। কিন্তু তার বাস্তব প্রতিফলন খুব একটা দৃশ্যমান নয়। এখন সত্যিকার পদক্ষেপ দেখতে চায় সবাই।