সময়ে অসময়ে বন্যা, সাগর উপকূলে ঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি, বর্ষায় সূর্যের খরতাপ আর গোটা বছর ধরে আবহাওয়ার নানা পরিবর্তন এখন যত ভয়ের কারণ। লোভের কাছে ভয় অবশ্য নস্যি। বাতাসের প্রাকৃতিক ফিল্টার যে অরণ্য, তাকে ধ্বংস করে তৈরি করছি লাভের জমি। বিশ্বজুড়েই গাছ কাটার মচ্ছব। ছোট হচ্ছে অ্যামাজন। ধুঁকছে সুন্দরবন। একে একে মাথা জাগাচ্ছে শিল্প-কারখানা। কয়লা পুড়ে বাড়ছে গ্রিনহাউজ গ্যাস তথা কার্বন নিঃসরণ। হাওয়ায় বাড়ছে ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ, যা কিনা উষ্ণায়নের ইন্ধন।
পরিবেশ বদলের যে ক্ষতি তার শুরু উন্নত বিশ্বের বেপরোয়া প্রকৃতি শোষণ। আর্থিক সমৃদ্ধির লোভ। সেই বেপরোয়া মনোবৃত্তি কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। উন্নয়নশীল দেশগুলোও একই রাস্তায় হেঁটে ছুঁতে চেয়েছে একই আকাশ। তাই পৃথিবীর সবুজ ধ্বংসের দায় কার? মানবসভ্যতাকে বাঁচানোর খরচের ভাগ কার ঘাড়ে কত—এ নিয়েও কয়েক দশক ধরে উন্নয়নশীল বনাম উন্নতের বিরোধ চরমে।
কার্বন নিঃসরণে পৃথিবীকে দূষিত করার ‘অপরাধী’র তালিকার শীর্ষে অবশ্য চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ভারত। ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোও কার্বন ডাই-অক্সাইড মিশিয়ে বায়ুমণ্ডলকে ধারাবাহিকভাবে বিষাক্ত করছে। এ বিষয়ে গেল বছরের ২৭ অক্টোবর ‘এমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট ২০২২: দ্য ক্লোজিং উইন্ডো’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)। তাতে দেখা যায়, বিশ্বে ২০২০ সালে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের গড় যেখানে মাথাপিছু ৬ দশমিক ৩ টিসিওটুই (টন কার্বন ডাই-অক্সাইড ইকুইভ্যালেন্ট)। বাংলাদেশে যেটা শূন্য দশমিক ৮। অর্থাৎ খুবই কম কার্বন নিঃসরণ করেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে আমাদের। কোন গ্যাস বাতাসকে কতটা উত্তপ্ত করে, কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিরিখে তা হিসাব করার একক পদ্ধতি হচ্ছে টিসিওটুই। ইউএনইপি প্রতিবেদন বলছে, গড়ের অনেকটাই উপরে যুক্তরাষ্ট্র (১৪ টিসিওটুই), রাশিয়া (১৩ টিসিওটুই), চীন (৯ দশমিক ৭ টিসিওটুই)। এমনকি ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়াও ৭ দশমিক ৫ টিসিওটুই কার্বন নিঃসরণ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয় এ হার গড়ে ৭ দশমিক ২ টিসিওটুই। আর অনুন্নত দেশগুলো থেকে মাথাপিছু ২ দশমিক ৩ টিসিওটুই গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গত হয়।
এ শতাব্দীর শেষে গিয়ে যাতে পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের ওপর না বাড়ে তার অঙ্গীকার করা হয়েছিল প্যারিস চুক্তিতে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি যে লক্ষ্যের চেয়ে বহু দূর, তা ইউএনইপির প্রতিবেদনই বলে দিচ্ছে। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখতে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৪৫ শতাংশ আর ২ ডিগ্রিতে আটকে রাখতে হলে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে ৩০ শতাংশ।
থার্মোমিটারের পারদ চড়তে চড়তে যদি ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে, আবহাওয়াবিদরা তাকে বলেন মৃদু তাপপ্রবাহ। উষ্ণতা বেড়ে ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে বলা হয় মাঝারি তাপপ্রবাহ। আর ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেলে তাকে তীব্র তাপপ্রবাহ ধরা হয়। প্রতি বছরই দেশের ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। তবে আশঙ্কার কথা হচ্ছে এটা সাম্প্রতিককালে বেশি সময় স্থায়ী হচ্ছে, যা কিনা কার্বন নিঃসরণের ফল বলছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। ভয় জাগিয়েছে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনও, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে—অদূর ভবিষ্যতে এ অঞ্চল এমন তাপপ্রবাহে ভুগবে, যা মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে!
‘সময় এলে দেখা যাবে’—বলে উড়িয়ে দেয়ার ব্যাপার যে এটা নয়, এবারই তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। গেলবার আমরা যে গ্রীষ্ম কাটিয়ে এসেছি সেটি ছিল অস্বাভাবিক চড়া তাপমাত্রার। ঋতুটি এসেছিল আগে আগে, থেকেছেও তুলনামূলক দীর্ঘ সময়। এবার তো ৫২ বছরের রেকর্ড ভেঙে ঢাকার তাপমাত্রার পারদ (১৫ এপ্রিল) চড়েছিল সর্বোচ্চে, ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। তবে দেশে সর্বোচ্চ উঠেছিল চুয়াডাঙ্গায়—৪২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন পর্যন্ত এটিই এ মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। গেল বছর এপ্রিলেও দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রির ঘর পেরিয়েছিল। বসন্তেও রেকর্ড গরম পরখ করেছে দেশবাসী।
গত কয়েক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলেও দেখা যাচ্ছে, তাপপ্রবাহের ঘটনা এখন নিয়মিত। কভিডকালের আগে তো প্রায় বছরই ৪২ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায় তাপমাত্রা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি, ২০৫০ সালে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি এবং ২১০০ সালে ২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। তাপপ্রবাহের সঙ্গে সাম্প্রতিককালে বেড়েছে শৈত্যপ্রবাহের মাত্রাও। তবে ক্রমান্বয়ে কমে আসছে শীতকালের ব্যাপ্তি। এবারই হাতেনাতে মিলেছে তার প্রমাণ। ঢাকাবাসীর কাছে যেন শীত এলো এলো বলে চলেই গেল। অনেকের তো আলমারি খুলে গরম কাপড় নামানোরই প্রয়োজন পড়েনি।
আবহাওয়ার এ বৈরিতায় বেশির ভাগ রবি ফসলেরই স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে ফলনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তাপমাত্রা কম-বেশি হলে মাছের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটে। ইলিশের মাইগ্রেশনের সময় পরিবর্তন হতে পারে। গেল বছরও হালদা নদীতে যথাসময়ে মাছ ডিম ছাড়েনি। প্রজাতিতে এসেছে বৈচিত্র্য। নির্ধারিত সময়ে সমুদ্রে গিয়ে ইলিশ না পেয়ে ফিরে আসতে হয়েছে জেলেদের।
আপাতত মিসর চুক্তিকে উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে মানতেই হবে। কারণ উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথে প্রথম বিশ্বের দায় স্বীকার করাটাই যে একটা বড় প্রতিবন্ধক হয়েছিল। ২০৭০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিও
মিলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বের দেশগুলো একত্র হয়েছে, কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে নিয়েছে। তবে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা মানে এ নয় যে, পরিবেশে আর কার্বন নিঃসরণ হবে না। শূন্যে নামানোকে সহজ করে বললে, সেটি এমন জায়গায় থাকবে যাতে প্রকৃতি তা শুদ্ধীকরণে সক্ষম হয়। আর এখানেই গাছ ও বনের মাহাত্ম্য। আমরা এটাও জানি, কার্বন নিঃসরণের হার বাড়তে থাকলে এবং পাশাপাশি গাছের সংখ্যা কমলে প্রকৃতির পক্ষে সেটাকে আর পরিবেশবান্ধব করে রাখা সম্ভব নয়। তখনই পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ে এবং শুরু হয় প্রকৃতির প্রতিশোধ। ঝড়, বন্যা আর খরার মাধ্যমে প্রাণিজগৎকে ধ্বংস করার রাস্তায় হাঁটতে শুরু করে। করে বলা ভুল, এরই মধ্যে প্রকৃতি তা শুরু করে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ সম্প্রতি বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিসংক্রান্ত একটি তালিকা দিয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে আমাদের অবস্থান তৃতীয়। আর জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সপ্তম। এছাড়া জাতিসংঘের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকির তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী যে কার্বন নিঃসরণ, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারেই নিচের সারিতে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ঝড়, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস—এগুলোর সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হয় এ দেশের মানুষকে। প্রাকৃতিক এ বিপর্যয়ের কারণে বেড়ে যায় মৌসুমি দারিদ্র্য। প্রতি বছর সরকারকে তাই এসব দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাজেটের একটি অংশ ব্যয় করতে হয়। বিশ্বব্যাংককে উদ্ধৃত করে আইএমএফ বলেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে কেবল সাইক্লোনের কারণে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৬ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বার্ষিক ক্ষতি হবে জিডিপির ২ শতাংশ।
ওবায়দুল্লাহ সনি: সাংবাদিক