অভিমত

আবাসন খাতের অগ্রগতি ও ড্যাপ

গত এক যুগে দেশের অভাবনীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। একই সঙ্গে এ সময়ে দেশের আবাসন খাতে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশের ৮৫ শতাংশ লোক গ্রামে বাস করত। বাসস্থানের জন্য তারা বাঁশ, কাঠ, খড়, ছন, গোলপাতা, পাটখড়ি প্রভৃতি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করত। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলসহ মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকায় মাটির দেয়ালের প্রচলন ছিল। ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে প্রায়ই মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করত। তাছাড়া নদীভাঙনের

গত এক যুগে দেশের অভাবনীয় উন্নয়ন অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। একই সঙ্গে সময়ে দেশের আবাসন খাতে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশের ৮৫ শতাংশ লোক গ্রামে বাস করত। বাসস্থানের জন্য তারা বাঁশ, কাঠ, খড়, ছন, গোলপাতা, পাটখড়ি প্রভৃতি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করত। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলসহ মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকায় মাটির দেয়ালের প্রচলন ছিল। ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে প্রায়ই মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করত। তাছাড়া নদীভাঙনের ফলে ঘরবাড়ি হারিয়ে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ত। আশ্রয়হীন, ভবঘুরে, ছিন্নমূল এসব মানুষের বসবাসের জন্য স্থায়ী আবাসনের জন্য প্রথম উদ্যোগ নেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি রাজধানীর মিরপুরে বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় তাদের পুনর্বাসনের জন্য উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময়ে তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোগকে আরো যুগোপযোগী বিস্তৃত পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ করেন। প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি জেলায় নির্দিষ্ট ব্যারাকে আশ্রয়হীন ছিন্নমূল মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়। জুন ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় যার জমি আছে ঘর নেই এমন লাখ ৫৩ হাজার ৭৭৭টি ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কক্সবাজার জেলার খুরুশকুলে বাস্তবায়ন করা হয়েছে জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে লক্ষ্যে বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় পাঁচতলাবিশিষ্ট ১৩৯টি ভবন নির্মাণ করে মোট হাজার ৪০৯টি জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। এর বেশির ভাগ ভবন এরই মধ্যে উদ্বোধন করা হয়েছে এবং বাকি কাজ শিগগিরই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সরকার ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ সময়কে মুজিব বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে। মুজিব বর্ষে সরকার এক লাখ ভূমিহীন গৃহহীন পরিবারকে ভূমি গৃহ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে এবং তার সিংহভাগ এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করেছে। সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের ফলে গ্রামাঞ্চলে ভূমিহীন, গৃহহীন ছিন্নমূল মানুষের বাসস্থানের সংস্থান হয়েছে। অন্যদিকে মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মিত ঘরবাড়ির ক্ষেত্রেও এসেছে পরিবর্তন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী লোকসংখ্যা ৯৩ থেকে ৭৭ শতাংশে নেমে এসেছে। গ্রামে বসবাসকারী বেশির ভাগ মানুষই এখন পাকা কিংবা সেমি-পাকা ঘরে বসবাস করে। বাঁশ, কাঠ ছনের ছাউনি দেয়া ঘর এখন গ্রামাঞ্চলেও বিরল। গ্রামাঞ্চলে এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় ইট-সিমেন্ট নির্মিত ফ্লোরে কাঠ ঢেউটিনের চালা দেয়া ঘর। গত অর্ধশতাব্দীতে দেশের আবাসন খাতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে তার সিংহভাগ হয়েছে নগরকেন্দ্রিক। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। বর্তমানে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সীমিত পরিসরে কিছু আবাসিক বাণিজ্যিক প্লট উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ইজারা দেয়। ফ্ল্যাট বাণিজ্যের ধরনা দেশে তখনো বিকাশ লাভ করেনি। ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মিত বহুতল ভবনের সংখ্যা তখন ছিল একেবারেই নগণ্য। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে এসে দেশের রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক প্লট ফ্ল্যাট নির্মিত হয়েছে। একই সাথে সরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বহুসংখ্যক আবাসিক বাণিজ্যিক ভবন। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার লোকসংখ্যা দুই কোটি অতিক্রম করেছে, যা ১৯৭৪ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ছিল মাত্র ১৬ লাখ। বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাসনের চাহিদা পূরণে সরকার সরাসরি বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে করছে। এছাড়া সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভূমি উন্নয়ন ফ্ল্যাট নির্মাণের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। একই সাথে রাজধানী ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামলাতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ঢাকা জেলার সংযোগস্থলে হাজার ২২৭ একর জায়গা নিয়ে গড়ে তুলেছে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট সিটি পূর্বাচল নতুন শহর।

এখানে ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের প্রায় ২৬ হাজার প্লট তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া এখানে পিপিপির মাধ্যমে নির্মাণ করা হবে বিপুলসংখ্যক ফ্ল্যাট। ফলে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায়। এছাড়া রাজধানীর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ উত্তরা মডেল টাউন প্রকল্পের মাধ্যমে দশমিক বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১০ হাজার আবাসিক প্লট লাখ ২৫ হাজার ৫১২টি অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করেছে।

রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ প্রত্যেকটি বিভাগীয় জেলা শহরে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব উন্নয়ন কার্যক্রম পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী করা হচ্ছে, যেন ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া রাজধানীর পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে উবঃধরষবফ অত্বধ চষধহ (উঅচ) প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী জানুয়ারিতে চূড়ান্ত গেজেট আকারে তা প্রকাশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে স্বাধীনতার প্রাক্কালে যে জরাজীর্ণ, ঘনবসতিপূর্ণ অস্বাস্থ্যকর রাজধানী আমরা দেখেছি, তার আমূল পরিবর্তন হবে এবং রাজধানী ঢাকা হবে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন একটি তিলোত্তমা নগরী।

আবাসন খাতে গত ৫০ বছরে অবস্থান পরিমাণগত পরিবর্তনের পাশাপাশি গুণগত পরিবর্তন উল্লেখ করার মতো। পোড়ামাটির ইটের সঙ্গে চুন-সুরকির ঢালাইয়ের স্থলে বর্তমানে স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহূত হচ্ছে অত্যাধুনিক নির্মাণসামগ্রী। উন্নত স্থাপত্য নকশার পাশাপাশি ভবন নির্মাণে মার্বেল পাথরের মোজাইক টাইলসকৃত ফ্লোর, দেয়ালে চুনের পরিবর্তে উন্নত মানের প্লাস্টিক ইমালশন, আরসিসি ঢালাই ইত্যাদি ব্যবহূত হচ্ছে। পোড়ামাটির ইটের পরিবর্তে ফেরোসিমেন্ট প্রযুক্তি বিভিন্ন ধরনের ব্লক বিশেষ করে অটোক্লেভ এরেটেড কংক্রিট ব্লক, ফেরোসিমেন্ট ব্লক ইত্যাদি দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে বহুতল আবাসিক বাণিজ্যিক ভবনে চলন্ত সিঁড়ি লিফটের ব্যবহার হচ্ছে উল্লেখযোগ্যভাবে, যা দেশের স্বাধীনতার প্রাক্কালে একেবারেই বিরল ছিল। অতিসম্প্রতি ভবনগুলোতে নিজস্ব সোলার সিস্টেম, সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সংযোজন করা হচ্ছে। জরাজীর্ণ সরকারি কোয়ার্টারগুলো ভেঙে অত্যাধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে স্বল্প স্থানে অধিকসংখ্যক মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা পুরান ঢাকার রিডেভেলপমেন্টের কথা ভাবছে সরকার।

একটি বিষয় লক্ষণীয় যে ঢাকা শুধু বাংলাদেশের বৃহত্তম নগরী নয়, স্বাধীনতার পর ৫০ বছরে ঢাকা পরিণত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় মুম্বাইয়ের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির শহর। ৫০ বছর আগে ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতা শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। বর্তমানে এর লোক সংখ্যা কলকাতার চেয়ে প্রায় ৩০ লাখ বেশি।

কথা অনস্বীকার্য যে যেকোনো শহর বা দেশের মোট আবাসন খাতের শতকরা শতাংশ বা তার কমসংখ্যক আবাসনের ব্যবস্থা সরকার প্রত্যক্ষভাবে করে। বাকি ৯৮ ভাগ বা তার বেশি মানুষের আবাসন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা সহযোগিতায় ব্যক্তি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। তাই সরকারের একার পক্ষে দেশের আবাসন সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়, যদি ব্যক্তি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে ভূমিকা পালন না করে।

তাই আগামী দিনের আবাসন ব্যবস্থায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা সহযোগিতার মাধ্যমে আবাসন খাতে ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

৫০ বছর একটি দেশের ইতিহাসে খুব একটা বেশি সময় নয়। স্বল্প সময়ে দারিদ্র্যপীড়িত, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ তার ভাগ্য পরিবর্তনে কতটা সফলতা অর্জন করতে পারে বাংলাদেশ তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অর্থনৈতিক সামাজিক উন্নয়নের সব সূচকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় সময়ে বাংলাদেশের অর্জন সত্যিই অকল্পনীয় ঈর্ষণীয়। একই সাথে দেশের আবাসন খাতে যে উন্নয়ন অগ্রগতি, গত ৫০ বছরে হয়েছে তা বিশ্বের অনেক দেশের কাছে অনুকরণীয় অনুসরণীয়। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি উন্নত সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

রেজাউল করিম সিদ্দিকী: উপপরিচালক

গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়

আরও