মুদ্রানীতি

শুধু উচ্চ সুদহার নয়, দরকার সমন্বিত অর্থনৈতিক সংস্কার

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। আলোচনানুসারেই নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি, মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না নামায় কঠোর অবস্থান বজায় রাখা প্রয়োজন। কিন্তু এ সিদ্ধান্তের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো টানা চার বছর সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করেও যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে একই নীতি অব্যাহত রাখলে ভিন্ন ফলের প্রত্যাশা কতটা যৌক্তিক?

মুদ্রানীতি যে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে শুধু সুদহারের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে বাস্তব সমস্যাকে পুরোপুরি ধরা যায় না। গত কয়েক বছরে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে, ঋণপ্রবাহ সীমিত করা হয়েছে এবং চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হয়েছে। তবু মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। এর অর্থ হলো বর্তমান মূল্যস্ফীতির উৎস মূলত চাহিদা নয়; বরং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারের অদক্ষতা।

ডলার সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের উচ্চ মূল্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারে প্রতিযোগিতার ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে অসাধু সিন্ডিকেটের প্রভাব। ফলে সুদহার অপরিবর্তিত রাখা বা বাড়ানোর মাধ্যমে ঋণের চাহিদা কমানো গেলেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রত্যাশিতভাবে কমেনি, বরং বেড়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি অনেকটাই কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন; এর সমাধান তাই শুধু মুদ্রানীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাজার ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি নীতি, রাজস্বনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা—সবকিছুর সমন্বিত উন্নতি ছাড়া মূল্যস্ফীতিকে টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

অন্যদিকে দীর্ঘদিনের কঠোর মুদ্রানীতির আরেকটি দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে। অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগই প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ খাতে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। এর পেছনে শুধু উচ্চ সুদহার দায়ী নয়। একজন উদ্যোক্তা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন তখনই, যখন তিনি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থাশীল হন। বর্তমানে সে আস্থার ঘাটতিই সবচেয়ে বড় সমস্যা।

ব্যবসায়ীরা এখনো জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, বিদ্যুতের ঘাটতি, ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামা, করনীতির ঘন ঘন পরিবর্তন এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিবর্তে বিদ্যমান সক্ষমতা ধরে রাখতেই ব্যস্ত। ফলে শুধু সুদহার কমিয়ে দিলেই বিনিয়োগ হঠাৎ বেড়ে যাবে, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। বিনিয়োগকারীরা কম সুদের পাশাপাশি স্থিতিশীল নীতি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পূর্বানুমানযোগ্যতা চান। অর্থাৎ বিনিয়োগ বাড়ানোর পূর্বশর্ত হলো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে এবং উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে পারবেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গভীর উদ্বেগের নাম ব্যাংক খাত। নতুন মুদ্রানীতিতে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার কথা বলা হলেও খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এখনো সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের ব্যালান্স শিট দুর্বল করে না, এটি নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণপ্রবাহকেও সীমিত করে দেয়। ভালো উদ্যোক্তারা তখন অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন, আর অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

খেলাপি ঋণের সমস্যা নতুন নয়। বছরের পর বছর দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, রাজনৈতিক প্রভাব, একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত ঋণ প্রদান, পুনঃতফসিলের অপব্যবহার এবং ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা এ সংকটকে জটিল করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ঋণ পরিশোধ না করেও নতুন ঋণ পাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা আর্থিক শৃঙ্খলাকে দুর্বল করেছে। ফলে ব্যাংক খাতে এখন তারল্যের চেয়ে আস্থার সংকটই বেশি প্রকট।

এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু নতুন নীতিমালা ঘোষণা যথেষ্ট হবে না। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে জবাবদিহিতা, ঝুঁকিভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন, দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় নতুন ঋণ বিতরণ বাড়লেও তার একটি অংশ আবারো অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

মুদ্রানীতিতে উৎপাদনমুখী খাতে প্রণোদনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্যোগটি ইতিবাচক হতে পারে, তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রণোদনার প্রকৃত সুবিধাভোগী সবসময় উৎপাদনশীল উদ্যোক্তারা হননি। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করা না গেলে এ উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেবে না।

এবারের বাজেটে কিছু করছাড়ের মাধ্যমে জনগণকে স্বস্তি দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা না থাকলে সে সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। করনীতি, মুদ্রানীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনা—তিনটি ক্ষেত্রের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে কোনো একক নীতিই কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু নীতি সুদহার পরিবর্তন বা অপরিবর্তিত রাখাই সবচেয়ে বড় বিষয় নয়। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। মূল্যস্ফীতি কমাতে বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার, বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং ব্যাংক খাতকে সুস্থ করতে খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান—তিনটি ক্ষেত্রেই একযোগে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ মুদ্রানীতি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলেও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য এটি একা কখনই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সাহসী কাঠামোগত সংস্কার ও তার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন। সেটিই অর্থনীতির প্রতি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম শর্ত।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান

আরও