জানা গেছে, প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকরা নিয়মিত রিচার্জ করেও হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, মিটার রিডিং কখনো দৈনিক আবার কখনো দুই সপ্তাহ পর পর একসঙ্গে আসে, রিচার্জের সময় শতাধিক ডিজিটের টোকেন নম্বর নিয়ে বিভ্রান্তি এবং মিটারে অবশিষ্ট ব্যালান্স জানার কোনো নির্ভরযোগ্য উপায় না থাকা—মোটাদাগে এগুলোই ভোক্তাদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠছে। কারো কারো বিল এক মাসের ব্যবধানে সাড়ে ৪ হাজার থেকে বেড়ে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ অবশ্য বলছে, অভিযোগের অধিকাংশই প্রকৃত ভূতুড়ে বিল নয়; বরং আগের মাসে ব্যবহার বাড়ায় ও উচ্চতর স্ল্যাবে চলে যাওয়ার স্বাভাবিক পরিণতি এটি। এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনায় জড়িতদের সীমিত কিছু ভুলের কারণেও এমনটি ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভুলের সংশোধনও হয়েছে। ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টদের ব্যখ্যা আংশিক সত্য হলেও গ্রাহকের আস্থার সংকট দূর হয়নি। এক্ষেত্রে গ্রাহকের তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাই প্রধান কারণ। আর বিল প্রস্তুত করার পর এমন অস্বচ্ছতা নানা প্রশ্ন তৈরি করে যা শেষ পর্যন্ত সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদনেই এক গ্রাহকের অভিজ্ঞতা দৃষ্টান্তমূলক। নিয়মিত রিচার্জ করলেও তার প্রিপেইড মিটার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিতরণ কোম্পানির দ্বারস্থ হলে তারা জানায়, মিটারের দৈনিক রিডিং ঠিকভাবে নথিভুক্ত হচ্ছিল না। এভাবে প্রকৃত ব্যবহার ও বিলের হিসাবে অসংগতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আরেক গ্রাহকের অভিযোগ, বিতরণ কোম্পানির মোবাইল অ্যাপের সঙ্গে মিটারের সরাসরি সংযোগ না থাকায় কত টাকা অবশিষ্ট আছে তা জানার উপায় নেই। এমন অভিজ্ঞতাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ভাবার সুযোগ নেই। দেশের ৫৫ লাখেরও বেশি প্রিপেইড গ্রাহকের বড় একটি অংশের তরফেই কমবেশি একই ভোগান্তির কথা শোনা যাচ্ছে। বিতরণ কোম্পানিগুলো ক্ষেত্রবিশেষে অভিযোগের সমাধান দিচ্ছে। তবে সেটি দিচ্ছে প্রশ্নোত্তরের ভিত্তিতে, নিয়মতান্ত্রিক স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নয়।
এবারের বিল বিভ্রাটের মূলে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। আবাসিক স্তরে তা গিয়ে পড়ে স্ল্যাবভিত্তিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে। প্রগতিশীল এ স্ল্যাব ব্যবস্থায় ব্যবহারের পরিমাণ সামান্য বাড়লেই একজন গ্রাহক পরবর্তী উচ্চতর স্তরে চলে যান। এভাবে দাম বাড়ার প্রকৃত হারের চেয়ে বিল বেশি গুণ বাড়ছে বলে মনে হয়। একই সময়ে স্বল্প বৃষ্টিপাত, তাপপ্রবাহ, ঈদ ও পরীক্ষার মৌসুম মিলিয়ে বিদ্যুতের ব্যবহার এমনিতেই বেড়ে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত। ট্যারিফ পরিবর্তনের সময় রিচার্জের টাকার টোকেনের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের টোকেন জোড়া লেগে একটি দীর্ঘ ও জটিল কোড তৈরি হয়ে যায়। এ কোড সাধারণ গ্রাহকের কাছে বিভ্রান্তিকর এবং এর ইনপুট ত্রুটিপ্রবণ। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিটার রিডিং নিয়মিতভাবে সংগ্রহ ও নথিভুক্ত না হওয়া এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর মোবাইল অ্যাপের সঙ্গে মিটারের সরাসরি সংযোগ না থাকা। এদিকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদনের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই স্বীকার করেছে যে এর অর্থনৈতিক প্রভাব খতিয়ে দেখা হয়নি। ফলে বাড়তি ব্যয়ের চাপ কোন স্তরের গ্রাহকের ওপর কতটা পড়বে, তা আগাম মূল্যায়ন ছাড়াই কার্যকর হয়েছে। খাগড়াছড়িসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে করণিক ভুলের কথাও বিদ্যুৎ বিভাগ নিজেই স্বীকার করেছে। এসবই প্রমাণ করে বিল প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় কারিগরি নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য হালনাগাদ ব্যবস্থা যথেষ্ট মজবুত নয়।
বিদ্যমান সংকট নিরসনে তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যার বদলে কাঠামোগত কিছু সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, প্রতিটি বিতরণ কোম্পানির প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থাকে মোবাইল অ্যাপ বা এসএমএস সেবার সঙ্গে বাস্তব সময়ে (রিয়েল-টাইম) সংযুক্ত করতে হবে। এভাবে গ্রাহক যেকোনো মুহূর্তে অবশিষ্ট ব্যালান্স ও দৈনিক ব্যবহারের হিসাব জানতে পারবেন। ট্যারিফ পরিবর্তনজনিত টোকেন জটিলতা দূর করতে প্রযুক্তিগত সংস্কার জরুরি। মূল্য সমন্বয়ের অংশটি একটি পৃথক, সহজবোধ্য বার্তার মাধ্যমে আগাম জানিয়ে দেয়া গেলে গ্রাহকের বিভ্রান্তি ও ইনপুট ত্রুটি দুই-ই কমবে। একজন গ্রাহক পরবর্তী উচ্চতর স্ল্যাবে প্রবেশের কাছাকাছি পৌঁছলে তাকে আগেভাগে সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা চালু করা উচিত। এভাবে বিল বাড়লে তা আকস্মিক ধাক্কা হিসেবে আসবে না। অভিযোগ থাকা মিটারগুলোর যাচাই একই বিতরণ কোম্পানির পরিবর্তে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে করা হলে তা গ্রাহকের আস্থা বাড়াবে, কারণ অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানই নিজের বিরুদ্ধে তদন্তের ফল ঘোষণা করলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি কেন্দ্রীয়, সময় নির্ধারিত (যেমন সাত কার্যদিবসের মধ্যে) ব্যবস্থা এবং মাসিক ভিত্তিতে অভিযোগ ও সমাধানের সংখ্যা প্রকাশের রেওয়াজ চালু করা দরকার। এতে জবাবদিহি কেবল সংবাদ সম্মেলনের বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে যেকোনো মূল্যবৃদ্ধির আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন প্রকাশ করতে বাধ্য করা এবং স্তরভিত্তিক গ্রাহকের ওপর প্রকৃত প্রভাব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়ার রীতিও প্রতিষ্ঠা জরুরি।
বিদ্যুৎ নিছক একটি পণ্য নয়, নাগরিকের নিত্যদিনের নির্ভরতার জায়গা। তাই বিল নিয়ে অসন্তোষকে বিচ্ছিন্ন ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রতিটি অভিযোগের পেছনে যে তথ্য ঘাটতি, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাব লুকিয়ে আছে, তা দূর করাই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। গ্রাহককে বারবার ব্যাখ্যা দেয়ার বদলে তাকে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য তথ্য দেয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি করণীয়।