সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা: বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে বাড়লেও সরকারি হিসাবে কমছে

নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেয়া কঠিন

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার অংশ। ফুটপাত দখল, সড়ক-মহাসড়কে বাস ও ট্রাক পার্কিংয়ের মাধ্যমে রাস্তাকে সংকুচিত করা, অদক্ষ চালক ও সহকারী দিয়ে গাড়ি চালানো, সড়ক ব্যবস্থাপনায় নানা অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার অংশ। ফুটপাত দখল, সড়ক-মহাসড়কে বাস ও ট্রাক পার্কিংয়ের মাধ্যমে রাস্তাকে সংকুচিত করা, অদক্ষ চালক ও সহকারী দিয়ে গাড়ি চালানো, সড়ক ব্যবস্থাপনায় নানা অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া মহাসড়কে থ্রি-হুইলার জাতীয় যানবাহনের চলাচল বৃদ্ধি, মাত্রাতিরিক্ত গতি, ত্রুটিপূর্ণ ও অবৈধ যানবাহন চলাচল বৃদ্ধি, ট্রাফিক আইন না মানা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার এবং সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতায় সড়কে প্রাণহানি বাড়াচ্ছে। দুর্ঘটনায় প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণ ঝরছে, শত শত মানুষ পঙ্গু হচ্ছে, পরিবার হারাচ্ছে উপার্জনক্ষম সদস্য। কিন্তু এর চেয়েও দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এ ভয়াবহ সমস্যার অর্থাৎ হতাহতের প্রকৃত চিত্রটাই আমরা জানি না। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যার তথ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র না জানার অর্থ হচ্ছে, আমরা এসব মৃত্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছি না—এ বার্তাই পৌঁছায় জনগণের কাছে। সরকার যদি সত্যিই ‘নিরাপদ সড়ক’ চায়, তবে প্রথম কাজ হবে সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা। প্রকৃত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সঠিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেয়া।

বিআরটিএ জানাচ্ছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত অর্থাৎ পাঁচ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৩৭৭ জন। অথচ বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অর্থাৎ চার মাসে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৩৭৮ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসেই নিহত হয়েছে ২ হাজার ৪৮৬ জন—যেখানে ফেব্রুয়ারির তথ্যই নেই।

এ সংখ্যাগুলো শুধু সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে পরিসংখ্যানগত পার্থক্য নয়, নীতিনির্ধারণেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। প্রশ্ন হলো, সরকার কোন সংখ্যাটিকে প্রকৃত সংখ্যা হিসেবে ধরে কাজ করছে? যদি প্রকৃত তথ্যই জানা না যায়, তাহলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গৃহীত পরিকল্পনাগুলো কতটা কার্যকর হবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব বিআরটিএর নয়, এটি পুলিশের কাজ। বিশ্বব্যাপী পুলিশের মাধ্যমেই এ তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। যদিও বিআরটিএ পুলিশের তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান প্রকাশ করছে। বাংলাদেশে পুলিশ যেমন অনেক তথ্য উপেক্ষা করে, তেমনি বিআরটিএও একটি দায়সারা মানসিকতা নিয়ে এ কাজে নিয়োজিত। বিআরটিএর নিজস্ব কাজ—ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস, গাড়ি নিবন্ধন—এ মৌলিক দায়িত্বগুলোই তারা ঠিকভাবে পালন করতে পারছে না বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অথচ তাদের ওপর সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান সংগ্রহের দায়িত্বও চাপানো হয়েছে। ফলে এ দায়িত্ব পালনে তাদের অনীহা, দায়সারাভাব ও তথ্যগত ত্রুটি—সবই অবশ্যম্ভাবী।

বেসরকারি সংস্থাগুলো সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য নিয়ে কাজ করে। যদিও এ পদ্ধতি বিজ্ঞানসম্মত নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যই ভুল বা অসম্পূর্ণ হয়, তাহলে বিকল্প কী? বরং রাষ্ট্রের উচিত ছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যকে সহায়ক হিসেবে নিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান উন্নত করা। বরং দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়াই ২০২৩ সাল থেকে বিআরটিএ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে নিজেরাই তথ্য প্রকাশ শুরু করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৮২ শতাংশই বসবাস করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় (নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ) এবং বিশ্বের মোট যানবাহনের ৫৪ শতাংশই চলাচল করে সেখানে। বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর ৯০ শতাংশ হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোয়। আর বাকি ১০ শতাংশ হয় উন্নত দেশগুলোয়। আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার সর্বোচ্চ। এরপর রয়েছে উগান্ডা। আর ঘানা ও দক্ষিণ আফ্রিকায় পথচারীরা সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মোটরযানের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত উন্নয়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিও দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং মৃত্যুহার বাড়াতে অবদান রাখছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় দুর্ঘটনার প্রকৃত পরিসংখ্যান প্রকাশ ও পরিসংখ্যানকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু এসব দেশে সড়ক নিরাপত্তাকে সরকার কম অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ায় তথ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত হচ্ছে। গত দুই দশকে অনেক উন্নয়নশীল দেশ ভবিষ্যৎ সড়ক নিরাপত্তা কৌশল বিকাশ এবং কার্যক্রমকে সহজতর করার জন্য গবেষণা শুরু করেছে।

বর্তমানে নিরাপদ সড়ক বিশ্বব্যাপী একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। তাছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর পরিণতি ও বিপুল ব্যয়ের বিষয়ে সমাজে জনসচেতনতা বাড়ছে। সড়ক নিরাপত্তার উন্নয়ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মোটরযানের ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উভয়ই উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে ভিন্ন। ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তার তথ্য বিশ্লেষণ করে এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোয় জনসংখ্যাপ্রতি মৃত্যুহার অনেক বেশি। ইইউভুক্ত দেশগুলো সঠিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে সড়কে শূন্য মৃত্যুহারের লক্ষ্য অর্জনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় মৃত্যুহার বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোয় সড়ক নিরাপত্তায় অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। ফলে উন্নত দেশগুলো সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। উন্নত দেশের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও একই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে অনেক বাধা রয়েছে। নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য কম অর্থ বরাদ্দ এর প্রধান বাধা। এরপর রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা লক্ষ্য, কর্মক্ষমতার পরিমাপ এবং নীতির অভাব। তবে ডব্লিউএইচও বলছে, উন্নত দেশগুলোর সফল নীতিমালা উন্নয়নশীল দেশগুলোয় চালু করা উচিত। উন্নয়নশীল দেশে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। সড়ক নিরাপত্তার প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা রয়েছে। উচ্চগতিতে গাড়ি চালানো দুর্ঘটনা ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। তাই পুলিশের মাধ্যমে যথাযথ ট্রাফিক আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ট্রাফিক পুলিশ উন্নত দেশগুলোর মতো প্রশিক্ষিত বা সজ্জিত নয়। দুর্ঘটনার সময় সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলো বাস বা গাড়ির যাত্রীদের জন্য সিটবেল্ট বাঁধা এবং মোটরসাইকেল চালকদের জন্য হেলমেট পরতে বাধ্য করা। উন্নত বিশ্বে সেগুলো বাধ্যতামূলক করায় দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তার উন্নতি সম্ভব। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারে।

দুর্ঘটনার সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশের মাধ্যমে জাতীয়ভাবে একটি কেন্দ্রীয় সড়ক দুর্ঘটনা ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে, যেখানে সব দুর্ঘটনার স্থান, সময়, হতাহতের সংখ্যা ও কারণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিআরটিএর মূল কাজ লাইসেন্স, ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন ও পরিবহন নীতিমালা বাস্তবায়ন—এ কাজে মনোযোগী হওয়া। দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান সংগ্রহের দায়িত্ব তাদের কাঁধে তুলে দিয়ে মূল দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করা হচ্ছে। তবে তথ্য যাচাই ও গুণমান নিশ্চিত করে বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নিতে পারে সরকার। এদের মাধ্যমেও স্থানীয় পর্যায়ের দুর্ঘটনা চিহ্নিত করা সহজ হবে। যেহেতু তথ্যই নীতিনির্ধারণের ভিত্তি, তাই সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত জাতীয় নীতিমালায় পরিসংখ্যানের প্রক্রিয়া, দায়িত্ব ও পদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। কেননা আমরা যদি প্রকৃত দুর্ঘটনার চিত্র জানতেই না পারি, তাহলে কীভাবে নীতিনির্ধারণ করব? কীভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেব? তাই সময় এসেছে বিভ্রান্তিকর ও অসম্পূর্ণ পরিসংখ্যান থেকে বের হয়ে একটি সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার গঠনের। সড়কে মৃত্যু ঠেকাতে হলে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।

আরও