গত ১৭ এপ্রিলে মিশন শেষে আইএমএফের প্রতিনিধি দলের মন্তব্য ছিল—মোটা দাগে নমনীয় বিনিময় হার মূল্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করবে এবং বৈদেশিক প্রভাব মোকাবেলায় স্থানীয় অর্থনীতির প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। পরদিন একটি শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিকের শিরোনাম ছিল—আরো নমনীয় বিনিময় হারের সময় এসেছে: আইএমএফ।
এ মূল্যায়ন টাকার নমনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত প্রশ্নটিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। এ প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব, সত্যিই কি বাংলাদেশের জন্য একটি নমনীয় বিনিময় হার গ্রহণ করার সময় এসেছে?
বহু বছর ধরে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো ‘ডলারের মান বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ভীতি’র প্রবণতা দেখিয়ে এসেছে। তারা নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থার দাবি করলেও মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং অস্থিরতা এড়াতে ব্যাপকভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এ ভয় তৈরি হয়েছিল, কারণ যখন উন্নয়নশীল দেশগুলো মুদ্রার নমনীয়তা অনুমোদন করেছে, তখন তারা বারবার কঠোর পরিণতি ভোগ করেছে—আমদানি মূল্য ও বৈদেশিক ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের পলায়ন এবং জনরোষ প্রায়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করেছে, যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে তা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
একটি আদর্শ পরিস্থিতিতে, সরকারের তার সিদ্ধান্তগুলো পরিবর্তন বা বাতিল করার ক্ষমতা থাকা উচিত। উদাহরণস্বরূপ যদি একটি বাজারভিত্তিক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা দেশগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্য অসুবিধা সৃষ্টি করে, তবে সরকারের কোনো বাধা ছাড়াই পূর্ববর্তী মুদ্রা ব্যবস্থায় ফিরে আসার ক্ষমতা থাকা উচিত। এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে যুক্তরাষ্ট্র, যা একসময় মুক্ত বাণিজ্যের পক্ষে ছিল এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, এখন সংস্থাটির কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থেকে সরে আসা বা সেগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে সংশোধন করার দেশটির আইনি সক্ষমতা আছে কিনা।
তবুও বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণগুলোর এক অনন্য সংমিশ্রণ অবশেষে একটি ভাসমান টাকা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপযুক্ত মুহূর্ত তৈরি করেছে। দুর্বল মুদ্রাকে ভাসানোর বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারকদের প্রায়ই ঠেলে দেয়া একটি ভয়ের উপাদানও এখানে কাজ করে। আমরা এখানে যুক্তি দিচ্ছি যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বাংলাদেশকে ‘ভাসতে ভয় পাওয়ার’ প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে এবং আরো নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে সহায়তা করবে।
প্রথমত, চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে অব্যাহত উত্তেজনা সত্ত্বেও তেলের দাম আশ্চর্যজনকভাবে সহনীয় পর্যায়ে স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৬০-৭০ ডলারের কাছাকাছি থাকায় বাংলাদেশ একটি বিরল সুযোগের মুখোমুখি হয়েছে। আমদানীকৃত জ্বালানি দেশের মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ পূরণ করে, যার বার্ষিক আমদানি ব্যয় বর্তমানে ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জ্বালানি তেলের মূল্য পরিশোধ অন্য যেকোনো আমদানির চেয়ে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেশি হ্রাস করে। যখন বিশ্বব্যাপী তেলের দাম অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যায়, তখন আমাদের রিজার্ভ দ্রুত কমে যায়, যা টাকাকে অবমূল্যায়নে বাধ্য করে। তবে আজকের স্থিতিশীল তেলের দাম ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকির সংকট কমিয়ে দিয়েছে।
জ্বালানি তেলের বাজারে যে স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে তা সাময়িক কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমরা হয়তো জীবাশ্ম জ্বালানির সর্বোচ্চ চাহিদা প্রত্যক্ষ করে ফেলেছি। বিশ্বজুড়েই বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে এবং নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির প্রসার ঘটছে। এ বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর আগে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমাদের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য আগামী বছরগুলোয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আরো জ্বালানি প্রয়োজন হবে, কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০-৭০ ডলারের আশপাশে স্থিতিশীল থাকলে তা বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না বলে আশা রাখি। ফলে চাহিদা পূরণে রিজার্ভের ওপর হাত দিতে হবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্থানীয় মুদ্রা বাজারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে। আগে দেখা যেত, যখনই রিজার্ভ তলানিতে নেমে আসত তখন টাকার বড় অংকের অবমূল্যায়ন করা হতো। বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ায় এমন পরিণতি এড়ানো যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বিশ্বের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডলার ২০-৩০ শতাংশ অতিমূল্যায়িত বলে ব্যাপকভাবে বিবেচিত। বাইডেন প্রশাসনের কয়েক বছরের আর্থিক প্রণোদনা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময় নিরাপত্তার সন্ধানে বিনিয়োগকারীদের মার্কিনমুখিতা বছরখানেক ধরে ডলারকে কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী রেখেছে। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ ও বাণিজ্যযুদ্ধের সূত্রপাতের ফলে সামনের বছরগুলোয় প্রধান মুদ্রাগুলোর তুলনায় কিছুটা দুর্বল থাকতে পারে গ্রিনব্যাক।
এটি বাংলাদেশকে একটি নমনীয় মুদ্রা ব্যবস্থায় রূপান্তরের অনুকূল বাহ্যিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যখন ডলার এরই মধ্যে দুর্বল হচ্ছে, তখন টাকার যেকোনো স্বাভাবিক অবমূল্যায়ন ডলারের শক্তিশালী সময়ের তুলনায় কম আকস্মিক হবে। ১৯৯৭ সালে ডলার শক্তিশালী থাকাকালীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুদ্রার ভয়াবহ পতনের কথা স্মরণ করুন? সেই সংকটের সময় থাই বাথ ও ইন্দোনেশিয়ান রুপিয়াহর মতো মুদ্রাগুলো কয়েক মাসের মধ্যে তাদের মূল্যের অর্ধেকেরও বেশি হারায়। এর ফলে করপোরেট দেউলিয়াত্ব ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। কারণ বৈদেশিক মুদ্রায় নির্ধারিত ঋণ রাতারাতি পরিশোধযোগ্য হয়ে ওঠে। ডলারের এ দুর্বলতা চক্রের সময় বাংলাদেশ তার ফ্লোটিং শুরু করে এমন ট্রমা এড়াতে পারে।
তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ বাজার থেকেও এ সংকেতগুলো আসছিল যে মুদ্রা মান বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার এটিই সঠিক সময়। অফিশিয়াল বিনিময় হার এবং কালোবাজারের (হুন্ডি) হারের মধ্যে ব্যবধান মাত্র ৩-৪ টাকায় নেমে এসেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফররত আইএমএফ মিশনের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। এ তুলনামূলক ছোট ব্যবধান ইঙ্গিত করে যে টাকা তার বাজার নির্ধারিত মূল্য থেকে গুরুতরভাবে বিচ্যুত নয়, অন্যান্য অনেক উদীয়মান দেশের মতো নয় যেখানে সমান্তরাল হারগুলো সরকারি হার থেকে নাটকীয়ভাবে ভিন্ন ছিল। উপরন্তু পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ডলারের ব্যাপক বহির্গমনের পর ডলারের জন্য কালোবাজারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে মনে হচ্ছে, অন্তত আপাতত। এ শর্তগুলো ইঙ্গিত করে যে যেকোনো প্রাথমিক সমন্বয়জনিত ধাক্কা সামলানো সম্ভব হবে—এটি একটি নাটকীয় পতন না হয়ে বরং একটি মৃদু সমন্বয় হবে।
নমনীয় মুদ্রা বিনিময় হার আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনয়নে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। যখন কোনো সরকার কৃত্রিম বিনিময় হারের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারবে না, তখন খারাপ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো সরাসরি মুদ্রার গতিবিধিতে প্রতিফলিত হবে, যা নাগরিকরা সরাসরি অনুভব করবে। এটি তাৎক্ষণিক জবাবদিহিতা তৈরি করে। ২০১৮ সালে আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা বিবেচনা করুন, যখন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রির প্রশাসন বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে বড় আর্থিক ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করার পর তাৎক্ষণিক পেসো অবমূল্যায়নের মুখোমুখি হয়েছিল। মুদ্রাটি এক বছরে প্রায় ৫০ শতাংশ মূল্য হারায়, যা মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আড়াল করা আর্থিক সম্প্রসারণের প্রকৃত ব্যয় উন্মোচন করে।
নমনীয় মুদ্রা বিনিময় হারের কারণে সম্পদমূল্যের অসংগতি দূর করতে ভূমিকা রাখবে। অফিশিয়াল ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের ব্যবধানের কারণে আগে কোনো প্রপার্টির ভিন্ন ভিন্ন দাম পাওয়া যেত। বাণিজ্যিক আবাসন খাত, আমদানীকৃত শিল্পসরঞ্জাম, কৃষি উপকরণ এবং প্রযুক্তি আমদানির মূল্য আগের ব্যবস্থায় তাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য প্রতিফলিত করেনি। যখন মুদ্রার মান বাজারভিত্তিক করে দেয়া হবে তখন বিভিন্ন সম্পদমূল্য তাদের প্রকৃত বাজারমূল্যে সামঞ্জস্য হবে। এতে বিনিময় হার কারসাজির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে সুবিধা দেয়া খাতগুলোর পরিবর্তে প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতগুলোয় বিনিয়োগ পরিচালিত হতে সহায়তা করবে। এ নমনীয় মুদ্রা বিনিময় হার বাংলাদেশের অর্থনীতিজুড়ে সম্পদ বরাদ্দ উন্নত করবে এবং অফিশিয়াল ও কালোবাজারের হারের ব্যবধানের সুযোগ নেয়া ব্যবসাগুলো থেকে অতিরিক্ত মুনাফা দূর করবে।
সমালোচকরা যুক্তি দিতে পারেন যে ভাসমান বিনিময় হার অনিয়ন্ত্রিত পুঁজি পলায়নকে উৎসাহিত করতে পারে। এ উদ্বেগ আমাদের সামনে থাকা নীতিগত বিকল্পগুলোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ একটি মধ্যপন্থী পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারে—টাকাকে ভাসতে দিয়েও নির্দিষ্ট পুঁজি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে, যা দেশ থেকে অতিরিক্ত অর্থ বেরিয়ে যাওয়াকে প্রতিরোধ করবে, কিন্তু বিনিময় হারকে বাস্তব অর্থনৈতিক কারণগুলোর প্রতি সাড়া দেবে। ব্রাজিল ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো দেখিয়েছে যে এ পদ্ধতি কাজ করে, তারা ভাসমান বিনিময় হার ব্যবহার করে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রয়োজন বা শর্তের ভিত্তিতে বৈদেশিক মুদ্রার বহির্গমন সীমিত করে। এই হাইব্রিড পদ্ধতি বাংলাদেশকে বৃহত্তর বিনিময় হার নমনীয়তা দেবে। তবে এখনো বাজারের সম্ভাব্য অস্থিরতা পরিচালনার জন্য সরঞ্জাম সরবরাহ করবে।
একটি নমনীয় বিনিময় হার বাংলাদেশের রফতানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে, টাকাকে তার প্রকৃত বাজারমূল্য খুঁজে পেতে দেবে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পোশাক খাত বৈশ্বিক বাজারে উন্নত মূল্যের ক্ষমতার মাধ্যমে উপকৃত হবে। বাংলাদেশ কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা মুদ্রার মূল্যের ওপর নির্ভর করে রফতানি সুবিধা বজায় রাখতে পারে না—এমন ‘প্রতিবেশীকে ভিখারি বানাও’ নীতিগুলো শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি কৃত্রিম বিনিময় হার রক্ষা করার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন বৈদেশিক মুদ্রা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করবে, এ সম্পদগুলো স্কুল, হাসপাতাল ও রাস্তার মতো অপরিহার্য জাতীয় প্রয়োজনে অর্থ ছাড় করতে পারবে। যারা ঘন ঘন বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠান সেই নাগরিকদের এটি উপকৃত করবে এবং বিত্তশালীদের উন্নত দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য অবৈধভাবে বিদেশে সম্পদ স্থানান্তর করতে নিরুৎসাহিত করবে।
এখন পরবর্তী প্রশ্ন আসবে, মূল্যস্ফীতির ওপর নমনীয় মুদ্রা বিনিময় নীতির প্রভাব কেমন পড়বে? একই ধরনের নীতিগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়—কেবল বিনিময় হার নয়, সঠিক মুদ্রানীতি মূল্য স্থিতিশীলতার মূল নির্ধারক। বাজারের বিকৃতি দূর করে এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দ্রুত অভিযোজন সক্ষম করে, একটি ভাসমান টাকা বাংলাদেশের রফতানি আরো অনুকূল অবস্থানে নিয়ে যাবে এবং প্রকৃত জাতীয় অগ্রাধিকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ করবে।
আমদানীকৃত পণ্যের ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ নাগরিকদের জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু মূল্যবৃদ্ধি ঘটাতে পারে নমনীয় মুদ্রা বিনিময় হার। তবে এটি বিকল্পের চেয়ে অনেক ভালো একটি কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী মুদ্রা বজায় রাখা যা শেষ পর্যন্ত আকস্মিক, নাটকীয় অবমূল্যায়নের প্রয়োজন হয়। মুদ্রার মূল্যের আকস্মিক পতন তীব্র মূল্যবৃদ্ধি ঘটায়, ঠিক যেমনটি বাংলাদেশ ২০২৩-২৪ সালে দেখেছিল যখন টাকার অবমূল্যায়ন সবকিছুকে আরো ব্যয়বহুল করে তুলেছিল। তবে একটি নমনীয় বিনিময় হার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছোট এবং ধীরে ধীরে পরিবর্তনের সুযোগ দেয়, একটি বড় ধাক্কা নয় যা দরিদ্র পরিবারগুলোকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করে। নমনীয় বিনিময় হারের আকস্মিক ধাক্কা এড়াতে সরকার নির্দিষ্ট প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা ব্যবসাগুলোকে টাকায় অস্থায়ী আর্থিক সহায়তা দিতে পারে।
বলা বাহুল্য, প্রস্তুতি অপরিহার্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তৈরি অব্যাহত রাখা এবং একটি ভাসমান ব্যবস্থায় উন্নীত হওয়ার প্রস্তুতি নেয়া, প্রত্যাশা পরিচালনার জন্য নীতি পরিবর্তনের বিষয়ে স্পষ্টভাবে যোগাযোগ করা এবং বাজারের ওপর নজরদারি ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবেলায় নির্বাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করার জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করা। একটি কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী মুদ্রা আমাদের রিজার্ভ কমিয়ে দেয় এবং যারা বাংলাদেশ ত্যাগ্যের পরিকল্পনা করছে তাদের বিদেশে সম্পত্তি ক্রয়ে উৎসাহিত করে। যদিও বিদেশে পাড়ি জমানো বৈধ, তবে আমাদের জাতীয় রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়।
স্থিতিশীল তেলের দাম, ডলারের দুর্বল প্রবণতা এবং কালোবাজারের বিকৃতি হ্রাসের সমন্বয় এমন অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে যা কদাচিৎ একই সঙ্গে দেখা যায়। এমনকি যদি এ প্রবণতাগুলো বিপরীত দিকেও যায়, তবে বিনিময় হারের নমনীয়তার সুবিধা কৃত্রিম হার বজায় রাখার ঝুঁকিকে ছাড়িয়ে যাবে। এখন আরো নমনীয় বিনিময় হারে চলে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে, উন্নত সরকারি ব্যয়কে উৎসাহিত করবে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। ভাসমান মুদ্রাকে ভয় না পেয়ে বাংলাদেশের এটিকে অর্থনৈতিক শক্তি এবং তার অর্থের ওপর বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণের দিকে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত। আমাদের অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর আস্থা রাখার এবং টাকাকে তার প্রকৃত মূল্য খুঁজে পেতে দেয়ার সময় এসেছে। এ বিষয়ে এ রূপান্তরকে সমর্থন করার জন্য একটি ‘বৈদেশিক মুদ্রা হস্তক্ষেপ তহবিল’ গঠন প্রাসঙ্গিক।
এ কে এনামুল হক: অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের মহাপরিচালক
সৈয়দ আবুল বাশার: অর্থনীতিবিদ ও গবেষক