গত এক দশকে বাংলাদেশে উৎপাদন খাত স্থবির হয়ে পড়েছে, বিপরীতে সেবা খাতের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটেছে, যা উন্নত অর্থনীতির প্রচলিত প্রবণতা থেকে ভিন্নতা প্রকাশ করছে। সাধারণত উন্নত দেশগুলো, বিশেষ করে জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানির মতো প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলো প্রথমে শক্তিশালী শিল্প বিনিয়োগের মাধ্যমে উচ্চ কর্মসংস্থান ও মাথাপিছু আয় নিশ্চিত করে, এরপর সেবা খাতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান অর্জনের আগেই উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কমে আসছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পরিবর্তন কাঠামোগত দুর্বলতা ও নীতিগত অসংগতির প্রতিফলন। উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের অভাব ও আমদানির ওপর বাড়তি নির্ভরতা এর অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্প বা উৎপাদন খাতে এ ধরনের পতন দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। কারণ শিল্প বা উৎপাদন খাত ঐতিহ্যগতভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। সেবা খাত সম্প্রসারণ হলেও এটি শিল্প খাত পতনের ফলে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি।
২০১৩ সালে শিল্প বা উৎপাদন খাতের অবদান ছিল ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর প্রতিবেদনে এ চিত্র ফুটে উঠেছে। শিল্প বা উৎপাদন খাতের এ ধরনের পতন দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং সেবা খাতের অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত অসংগতি, উৎপাদন খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং আমদানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতার ইঙ্গিত দেয়। শিল্পায়নের ওপর কম গুরুত্ব দিলে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ উৎপাদন খাত সাধারণত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং রফতানি প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য উৎপাদন খাতের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেয়া উচিত। সুতরাং শক্তিশালী শিল্প খাত ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি টেকসই হবে না।
টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সাধারণত উন্নত দেশগুলো কৃষি থেকে শিল্পে, এরপর সেবা খাতে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ শিল্প খাতকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি কৃষি থেকে সেবা খাতে চলে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা স্থায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বদলে ক্ষুদ্র ইউনিটগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে অনানুষ্ঠানিক, নিম্ন আয় ও নিম্নমানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারছে না। শিল্প খাতের এ স্থবিরতা সরকারের নীতির ত্রুটিরই প্রতিফলন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শিল্প খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের শিল্প খাত পুরোপুরি ব্যক্তিনির্ভর একটি খাত। এ খাতের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে প্রয়োজন দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ও মূলধন। দেশী বিনিয়োগ ও মূলধনের অন্যতম উৎস ব্যাংক ঋণ। কয়েক বছর ধরেই দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। ফলে ব্যাংক সুদহারও বেড়েছে। নীতি সুদহার ও ব্যাংক সুদহার বাড়ানোর নীতি এখনো অব্যাহত থাকলেও মূল্যস্ফীতি কমেনি। এ নীতি দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকেও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শিল্প উৎপাদন খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদা কমেছে এবং নতুন শিল্প তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। বেসরকারি খাত বা শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে কর্মসংস্থানের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। এ খাত যত সম্প্রসারণ হবে ততই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিগত সরকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের নামে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি করেছে। এ কারণে সরকারের বিপুল অর্থের জোগান দিতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে বেশি সুদে ঋণ নিচ্ছে এবং সে সুদের জোগান দিতে নানামুখী কর আরোপ করছে। সুদহার বাড়ানোর কারণে বেসরকারি খাত ব্যাংক ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমেছে। শিল্প খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে সরকারকে মূলধনপ্রবাহ ও নীতি সুবিধা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিগত সরকার সাড়ে ১৫ বছরে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করা হয়েছে। কয়েক বছর ধরেই স্মরণকালের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা, ডলার সংকট, রিজার্ভের ক্ষয়, বিনিয়োগ খরা, রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও অনিয়ম-দুর্নীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের লুটপাট, অব্যবস্থাপনাসহ অর্থনীতি বিভিন্ন সংকটে নিমজ্জমান ছিল। গত বছরের আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন খাতে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে থাকে। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোও চলছে কোনো রকমভাবে। মানুষের করের টাকার যথেচ্ছ অপব্যয়ে এবং প্রকল্পের নামে পকেট ভারী করেছে সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও অলিগার্ক শ্রেণী। দেশের অর্থনীতি বড় হবে, আসবে বড় দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান হবে, কর্মসংস্থান হবে—এসব কথা বলে নেয়া হয়েছে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্প। কিন্তু এসবের নাম করে তথ্যের গোঁজামিলে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে বৃহত্তর কাগুজে অর্থনীতি। প্রকৃতপক্ষে এর বেশির ভাগই বানোয়াট। বাস্তবে হয়েছে লুটপাট; ধ্বংস করা হয়েছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট সুশাসন তথা দেশের অর্থনীতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নীতি সুদহার ও ব্যাংক সুদহার বাড়ানোয় ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। সরকারের ব্যাংক ঋণনির্ভরতা বাড়ায় বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমেছে। এ পরিস্থিতি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে তৈরি করেছে প্রতিবন্ধকতা। এ কারণে শিল্প উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে।
এছাড়া বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি। এরপর রয়েছে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে আইনের দ্রুত প্রয়োগের অভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মাত্রাতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ, দুর্বল অবকাঠামো ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, জমির অভাব ও ক্রয়ে জটিলতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংকের ঋণ জোগানে সক্ষমতার অভাব এবং স্থানীয়দের সঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের যোগসূত্র ও সমন্বয়ের অভাব। এগুলোর বাইরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সুশাসনের অভাবও দায়ী। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এখন দরকার সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। শিল্প উৎপাদন খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চলমান অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা দ্রুত কাটিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সেগুলো সমাধানের মাধ্যমেই দেশে শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
শিল্প উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি কমতে থাকা অর্থনীতির জন্য মোটেই ভালো দিক নয়। কেননা কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ জিডিপিতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ খাতের প্রবৃদ্ধি কমে গেলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গত বছরের মে মাসের হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখ ৯০ হাজার। ২০২৩ সাল শেষে গড় বেকারের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৭০ হাজার। এর অর্থ, গত বছরের তুলনায় এখন দেশে বেকারের সংখ্যা বেশি। শিল্প উৎপাদন খাত সম্প্রসারণ হলেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। বেকারত্ব কমানোর জন্য এ খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দেশে বেকারত্ব বাড়ার অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব। বিনিয়োগের প্রতিকূল পরিবেশ থাকায় শিল্প খাতের তেমন প্রসার ঘটেনি, কর্মসংস্থানও তৈরি হয়নি। ২০২১-২৩ পর্যন্ত তিন বছরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, যা সার্বিক শিল্প প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিবিএসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগ হার ছিল ৩২ শতাংশের কিছু বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও তা ৩০ দশমিক ৯৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল।
শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন ও রফতানি বাড়বে। পাশাপাশি অর্থনীতি গতিশীল ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দীর্ঘদিন ধরে নীতি সুদহার ও ব্যাংক সুদহার বাড়ানোর নীতি বজায় থাকলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। এ ধরনের নীতি থেকে সরকারের সরে আসা উচিত। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করাসহ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আমাদের দেশের সমস্যা হলো, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিরও বদল হয়ে যায়। বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে বিনিয়োগকারীরা সমস্যায় পড়েন। সরকার পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগে যাতে কোনো প্রভাব না পড়ে সেজন্য রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে অভিন্ন নীতি প্রণয়নও জরুরি। আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট এবং মুদ্রানীতি আরো শিল্পবান্ধব করতে জরুরি ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা দরকার।