গত মাসে লেখা আমার একটি ধারাভাষ্যের শিরোনাম ছিল ‘আ বেটার বাইডেন-শি সামিট?’ সে লেখায় আমি প্রশ্নচিহ্নের ওপর বেশ জোর দিয়েছিলাম। যুক্তিসংগত নানা কারণেই ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত গত বছরের সম্মেলনটি ব্যর্থ হয়েছিল। দুর্বল প্রস্তুতি ও স্লোগানের (সংকটময় যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে নতুন ‘দ্বার’ উন্মোচন করা) ওপর বেশি জোর দেয়া হয়েছিল এতে। ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন আকাশসীমায় চীনের একটি নজরদারি বেলুনের উপস্থিতি যেকোনো সমঝোতা প্রক্রিয়াকেই নস্যাৎ করে দিতে পারে। সেই ধারাবাহিকতায় সানফ্রান্সিসকোর সম্মেলনটি আরো ভালো ফল দেবে এমন আশা করা দুরাশারই শামিল।
সুখবর হলো, গত বছরের বৈঠকের পর সানফ্রান্সিসকোর সম্মেলনটি প্রকৃত অর্থে অগ্রগতি এনেছিল। সর্বোপরি, দুই পক্ষই এবারে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিল। গত গ্রীষ্ম থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উচ্চতর পর্যায়ে কূটনৈতিক আদান-প্রদান শুরু হয়েছিল। বেইজিং সফর করা উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন, অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন, বাণিজ্যমন্ত্রী জিনা রাইমন্ডো ও জলবায়ুবিষয়ক দূত জন ক্যারি। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব যাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যুতে একমত হতে পারেন তার পথ মসৃণ করার প্রয়াস ছিল তাদের।
এ বিষয়ে আমি সর্বশেষ লেখাটির কিছু কিছু অংশে এমন একটি কাঠামো হাজির করতে চেয়েছিলাম যা দিয়ে সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনটির মূল্যায়ন করা যাবে। দুই পক্ষের বৈঠকের কূটনৈতিক আলাপের সারাংশ নিয়ে এগিয়েছে আমার লেখাটি। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সম্মেলন-পরবর্তী প্রেস কনফারেন্স, সানফ্রান্সিসকোতে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে নৈশভোজে দেয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভাষণ।
বিস্ময়কর নয় যে অন্ততপক্ষে আমার প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী অধিকাংশ অগ্রগতি ঘটেছিল ন্যায্যতার ভিত্তিতে, যা স্পষ্টত প্রকাশযোগ্য ছিল। অথবা যাকে আমি ‘অনুল্লেখযোগ্য ফলাফল’ বলে চিহ্নিত করেছিলাম। এক্ষেত্রে দুটি দিক উল্লেখযোগ্য: দুদেশের সেনাবাহিনী পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপন, যৌথ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এ গুরুতর সমাধানযোগ্য সংকট নিরসন।
নজরদারিসংক্রান্ত ব্যর্থ বেলুনকাণ্ডের মতোই তাইওয়ান প্রণালি ও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে দুই পক্ষের বরফ না গলা, কোনো পক্ষ অন্য কোনো সামরিক যোগাযোগে ব্ল্যাকআউটের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে সহযোগিতা করতে না পারা। দায়িত্বশীল পরাশক্তি হিসেবে দুই দেশের প্রতিরক্ষা বিভাগের মধ্যে নিয়মিত আলোচনার ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া অন্য কোনো সুযোগ ছিল না। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুরুতর কিন্তু সমাধানযোগ্য ফ্যান্টানিল সংকট নিয়েই অনেক কথা বলছে। ১৮-৪৫ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিকদের মৃত্যুর প্রধান কারণ এই সিনথেটিক ওপিয়েডের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। চীনের ফ্যান্টানিল রাসায়নিক সরবরাহকে এ ভয়ংকর সংকট নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নহীন উৎস হিসেবে বিবেচনা করে।
অন্যদিকে সানফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনেও অনুল্লেখযোগ্য কিছু ফলাফল এসেছিল। তাছাড়া পরবর্তী বছর সরাসরি এয়ার ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য একটি যৌথ প্রতিশ্রুতির ব্যবস্থাকরণ এবং খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায় লেনদেন প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার জন্য যৌথ স্বীকৃতি বিষয়ে শিং বলেছিলেন যে পরবর্তী পাঁচ বছর আদান-প্রদান ও পড়াশোনা বিষয়ক কর্মসূচির ক্ষেত্রে চীন তাদের দেশে ৫০ হাজার মার্কিন যুবককে আমন্ত্রণ করতে প্রস্তুত। এছাড়া শি আরো ঘোষণা দেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন প্যান্ডার সংরক্ষণে সহযোগিতা চলমান রাখতে প্রস্তুত আছে। এটি ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর আনন্দের ব্যাপার। এছাড়া ওয়াশিংটন ডিসি থেকে তিনটি পান্ডা নিয়ে যাওয়া কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণীপ্রেমীদের অনুভূতিতে তীব্র আঘাত এসেছিল।
আমার সর্বশেষ বই অ্যাক্সিডেন্টাল কনফ্লিক্টে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে উভয় পক্ষের সর্বজনীন দাবির ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলাম। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান এ দ্বন্দ্বের যুগে অংশীদারত্বমূলক একটি এজেন্ডার তীব্র সংকট রয়েছে। বিশেষত গত সাড়ে পাঁচ বছরের শত্রুতার পর যেখানে পারস্পরিক সন্দেহ দূরীকরণে সহজ কোনো পথ নেই, সেখানে সানফ্রান্সিসকোর অনুল্লেখযোগ্য ফলাফল দ্বন্দ্ব নিরসনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্র প্রয়াস হিসেবে উদাহরণ রেখেছে।
হয়তো আমি এটাও বলতে পারতাম যে দ্বন্দ্ব নিরসনের অন্য দুটি ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, যা আমার পূর্ববর্তী ভাষ্যে চিহ্নিত করেছি: দুটি দেশই অস্তিত্ব সংকটের (জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য) মুখোমুখি হচ্ছে এবং চুক্তি প্রণয়নের অগ্রগতি। কেবল তথাকথিত সানিল্যান্ড চুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যতিক্রম ঘটেছে, যা সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনের আগমুহূর্তে নেয়া হয়েছিল, যে চুক্তি দুবাইয়ে আসন্ন জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ২৮) অনুষ্ঠিত হওয়ার আগমূহূর্তে জলবায়ুসম্পৃক্ত সহযোগিতা জোরদার করতে একটি নতুন কার্যকরী দল প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তুলনামূলকভাবে অগ্রগতিসম্পন্ন এআই পদ্ধতির ঝুঁকি কমাতে দ্বিপক্ষীয় আলাপের প্রয়োজনে একটি চুক্তি ছাড়া প্রশাসনসংশ্লিষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো অগ্রগতি ছিল না। সাইবারনিরাপত্তা, মানবাধিকার অথবা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়নি। যদিও বিভিন্ন বিষয়ে দুটি পরাশক্তির মধ্যে সংলাপের দীর্ঘদিনের ইতিহাস রয়েছে।
চুক্তি প্রণয়নে কূটনীতিই ছিল সর্বস্ব এবং সম্পর্ক গভীর ও স্থায়ীকরণের প্রাতিষ্ঠানিক মডেলের ওপরও খুবই সামান্য গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। উভয় পক্ষের কূটনীতিকদের নিয়ে বৈঠক গতিশীল করতে এটি মোটেও বিস্ময়কর ফলাফল ছিল না। কিন্তু গত বছরের বালিতে অনুষ্ঠিত ব্যর্থ সম্মেলনের বোঝাপড়ার কারণে বিষয়টি আমার কাছে এখনো অমীমাংসিত। যেখানে পুনঃচুক্তিতে যাওয়ার কার্যকর রূপান্তর ঘটানোর জন্য আমি সুদক্ষ কূটনীতিকে বাহবা দিই—পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা অর্জন, এসব দক্ষতা একটি শক্তিশালী সম্পর্কের নিশ্চয়তা দেয় না, যা থেকে অপ্রত্যাশিত সমস্যা প্রতিরোধ করা যাবে। এ বছর দুদেশের মধ্যে উত্তেজনার বিষয় ছিল চীনের নজরদারি বেলুন। কে জানে পরবর্তী সময়ে কী আসতে যাচ্ছে?
আমি মনে করি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বিরূপ পরিস্থিতির এ যুগে দুই পরাশক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসনে সংবেদনশীল নেতাদের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক লেনদেনের চেয়ে অতিরিক্ত আরো বেশি কিছু প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের চর্চা কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব নিরসনে এখনো আগ্রহোদ্দীপক মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখে। যদিও সানফ্রান্সিসকোতে প্রত্যাশিত ফলাফল এনে দেয়নি। সে যা-ই হোক, দ্বিপক্ষীয় দ্বন্দ্ব নিরসন ও সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে এখনো যুক্তরাষ্ট্র-চীনের পররাষ্ট্র দপ্তরকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
এটি ঠিক যে সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনের মাধ্যমে বালিতে গৃহীত নিম্নমানের পদক্ষেপগুলোর পরিমার্জন করা হয়েছিল। কিন্তু চীন-যুক্তরাষ্ট্র সংঘর্ষের প্রভাব এখনো গভীর প্রশ্ন হিসেবে বিদ্যমান আছে, বিশেষত বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দ্বন্দ্ব এটিকে আরো বেশি শোচনীয় করে তুলেছে। ৪ ঘণ্টার সম্মেলনের কূটনীতিকদের দাপ্তরিক প্রতিবেদনে এসব বিষয় বিস্ময়করভাবে কম মনোযোগ পেয়েছিল। পরিশেষে, বাইডেন ও শি জিনপিংয়ের জন্য এ ধরনের অনুল্লেখযোগ্য ফলাফল গ্রহণ করা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সহজ ছিল।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
স্টিফেন এস রোচ: ইয়েল ইউনিভার্সিটির অনুষদ সদস্য, মরগান স্ট্যানলি এশিয়ার সাবেক চেয়ারম্যান
ভাষান্তর: শামসুন নাহার সাকি