বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অনেকাংশেই নির্ভর করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) বিনিয়োগ ও সরকারি ব্যয়ের ওপর। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী এক দশকে এআই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির বার্ষিক হারে সর্বোচ্চ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ করতে পারে। এতে প্রবৃদ্ধির গড় হার ৩ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হবে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ২০২৬ সালে বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই অবকাঠামো নির্মাণ, সরঞ্জাম কেনাসহ বিভিন্ন খাতে ৬৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেপি মরগ্যানের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এসেছে এআই-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ থেকে। এতে দেশটির প্রবৃদ্ধির হারে দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট যুক্ত হয়েছে।
কিন্তু এআই-নির্ভর অর্থনৈতিক শ্লথগতির লক্ষণও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুদহারের ঊর্ধ্বগতির কথাই ধরা যাক। পুঁজিপ্রবাহের পরিবর্তন এর অন্যতম কারণ। একসময় কোম্পানিগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ তহবিল থেকে এআই খাতে মূলধনি ব্যয় নির্বাহ করত। এখন ক্রমেই ঋণ গ্রহণ ও নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে এসব ব্যয় মেটানো হচ্ছে। বিপুল নগদ অর্থের মজুদ থাকা এবং নিয়মিত নিজেদের শেয়ার পুনঃক্রয়ের জন্য পরিচিত গুগলও এখন অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারের দ্বারস্থ হচ্ছে।
সরকারগুলো যখন ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা, দীর্ঘস্থায়ী রাজস্ব ঘাটতি এবং অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাহিদা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখনই এআই-সংশ্লিষ্ট ঋণের এ উল্লম্ফন ঘটছে। ফলে পুঁজি সংগ্রহের প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে, বাড়ছে বন্ডের ইল্ড বা প্রকৃত মুনাফার হার। এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ ও ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিশ্বজুড়ে স্থির আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ সিকিউরিটিজের ইল্ড এখন ৩ শতাংশের বেশি। অথচ ২০২২ সালের জানুয়ারিতে এ হার ছিল মাত্র ১২ শতাংশ।
চাপ শুধু বন্ড বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। চলতি বছর এআই-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) পরিকল্পনাও পিছিয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে এসবি এনার্জি, ওউরা ও ওপেনএআই। সম্প্রতি সফটব্যাংক ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে সাত বছর মেয়াদি বন্ড ইস্যু করেছে। অন্যদিকে মেটা ঋণপত্র ইস্যু করেছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে। এ পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে এআই খাতে বিনিয়োগের অর্থ জোগাতে বিনিয়োগকারীদের উচ্চ মুনাফা দিতে হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয়ের কাছাকাছি।
এআই-নির্ভর অর্থনৈতিক শ্লথগতি দেখা দিলে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। বাজারের প্রধান সূচকগুলোর শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির আড়ালে এরই মধ্যে বিভক্ত একটি চিত্র তৈরি হয়েছে। এআই খাতের বাইরের কোম্পানিগুলোর শেয়ার দুর্বল করলেও প্রায় সব মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে এআই কোম্পানিগুলোর হাত ধরে।
এআই কোম্পানির শেয়ারের দরপতন শুরু হলে তুলনামূলক সচ্ছল ভোক্তারা ব্যয় কমিয়ে দিতে পারেন। একই সঙ্গে শেয়ারের মূল্যায়ন কমে গেলে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগকারীরাও এআই স্টার্টআপগুলোয় অর্থায়নের বিষয়ে সতর্ক হয়ে উঠবেন। ফলে এসব নতুন কোম্পানিকে তাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা কাটছাঁট করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে এআই খাতে বিনিয়োগ ও শেয়ারমূল্য—উভয়ই কমতে থাকবে এবং একটি দুষ্টচক্র তৈরি হতে পারে।
বিভিন্ন কারণে এ ধরনের শ্লথগতি দেখা দিতে পারে। প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদনশীলতা না বাড়া কিংবা বিনিয়োগ থেকে দুর্বল মুনাফা আসায় কোম্পানিগুলো তাদের ব্যয় পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে পারে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও সাইবার হামলা এআই খাতের সম্প্রসারণ ব্যাহত করতে পারে। এছাড়া ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান বিরোধিতা—যা ‘নিমবি’ (নট ইন মাই ব্যাকইয়ার্ড) নামে পরিচিত—রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে। এসবের যেকোনো একটি ঘটনা এআইয়ের বর্তমান উত্থানকে থামিয়ে দিতে সক্ষম।
চলতি বছর বিশ্বজুড়ে এআই খাতে ব্যয় ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগের গতি কমলে অর্থায়নের ব্যয় কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু তাতে সুদহার যতই কমুক, বৃহত্তর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য তা যথেষ্ট হবে না। যুক্তরাষ্ট্রে গৃহ ঋণের সুদহার প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ। আবাসন খাতে স্থায়ী বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের জন্য এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে হবে।
এআই-নির্ভর মন্দা দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোরও সুদহার কমানোর সুযোগ সীমিত থাকবে। কারণ ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে আংশিকভাবে মূল্যস্ফীতি এখনো তাদের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। এ অবস্থায় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সুদহার কমালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এমন পদক্ষেপ নিতে দ্বিধায় পড়বে।
অন্যদিকে বড় অংকের রাজস্ব ঘাটতিতে আগে থেকেই চাপে থাকা সরকারগুলোর পক্ষে অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবেলায় অতিরিক্ত প্রণোদনা দেয়া কঠিন হবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রবাহের বড় একটি অংশই এআই-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ থেকে উচ্চ মুনাফা পাওয়ার প্রত্যাশায় চালিত হচ্ছে। সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে এ অর্থের একটি অংশ নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে। এতে ডলারের বিনিময় মূল্য দুর্বল হবে এবং মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বাড়বে। পরিণামে সরকারের পক্ষে রাজস্ব ঘাটতি অর্থায়নের জন্য ঋণ সংগ্রহ আরো কঠিন হয়ে উঠবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এরই মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার সরকারি রিজার্ভে ডলারের ব্যবহার কমে আসার প্রমাণ শনাক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চালান ও আন্তঃসীমান্ত অর্থায়নে ডলারের ভূমিকা হ্রাস পাওয়ার বিষয়টিও এ প্রবণতায় প্রতিফলিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ ছিল ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০০১ সালে এ অংশ সর্বোচ্চ প্রায় ৭২ শতাংশে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের প্রাধান্য ক্রমেই কমছে।
এআই-নির্ভর অর্থনৈতিক শ্লথগতির সম্ভাবনা সামনে রেখে ব্যবসায়ী নেতাদের এখনই প্রস্তুতি নেয়া উচিত। অন্তত কোম্পানিগুলোর উচিত সতর্কতার সঙ্গে নিজেদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা এবং পর্যাপ্ত নগদ অর্থের সংস্থান রাখা। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো সাম্প্রতিক আর্থিক সাফল্যের কতটা এআই-সংশ্লিষ্ট ব্যয় এবং ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা বাড়ার প্রত্যাশার ওপর নির্ভরশীল, তা পর্যালোচনা করা। এআই খাতে বিনিয়োগের প্রবাহ শুকিয়ে গেলে ব্যবসার অবস্থা কী দাঁড়াবে, সেটিও হিসাব করে দেখতে হবে। যারা মনে করছে এআইয়ের উত্থান চিরস্থায়ী, তাদের জন্য অচিরেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
দাম্বিসা মোয়ো: অর্থনীতিবিদ। তার রচিত সর্বশেষ বই ‘এজ অব ক্যাওস: হোয়াই ডেমোক্রেসি ইজ ফেইলিং টু ডেলিভার ইকোনমিক গ্রোথ—অ্যান্ড হাউ টু ফিক্স ইট’ (বেসিক বুকস, ২০১৮)