বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কের শুরু আজ থেকে প্রায় সোয়া দুশো বছর আগে, ১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর থেকেই। ফলে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ককে গভীরভাবে বুঝতে ও মূল্যায়ন করতে হলে সে ইতিহাস সম্পর্কেও বিশদ ধারণা থাকা প্রয়োজন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
অর্থনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশ এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি পিছিয়ে পড়া দেশ হলেও ইতিহাসের তথ্য জানাচ্ছে যে, এ দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক শুরু হয়েছিল তাদেরই একক আগ্রহে, আজ থেকে সোয়া দুই শতাব্দীরও বেশি সময় আগে।
সিরাজুল ইসলাম দেখিয়েছেন যে, ‘১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর পরই অর্থাৎ ১৭৮৪-৮৫ সাল থেকেই আমেরিকার ইয়াংকিরা বঙ্গোপসাগরীয় বাণিজ্যে যোগদান করে এবং বাংলায় বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে তথ্যানুসন্ধান চালায়। অচিরেই কলকাতার আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে তারা প্রসার লাভ করে।’
১৭৮৪-৮৭ সালের মধ্যে এমপ্রেস অব চায়না, দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা, হাইড্রা ও জেনারেল ওয়াশিংটন নামের চারটি পণ্যবাহী মার্কিন বাণিজ্য জাহাজ বঙ্গোপসাগরীয় এলাকার মাদ্রাজ ও কলকাতায় নোঙ্গর করে। এর মধ্যে এমপ্রেস অব চায়নার মালিক ছিলেন মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারী ধনকুবের রবার্ট মরিস। উল্লিখিত জাহাজগুলো পণ্য বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে নিয়ে এ অঞ্চলে আসলেও সেসব তাদের নিয়মিত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের অংশ ছিল না; ছিল বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় পণ্য বিক্রির সম্ভাবনা যাচাই করে দেখার পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। তবে জাহাজগুলো থেকে পণ্য বিক্রি করে সংশ্লিষ্ট বণিকেরা ব্যাপকভাবে লাভবান হওয়ার অভিজ্ঞতা দেখে তিন বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে মার্কিন বন্দরনগরী সেলেমের সেই সময়কার প্রখ্যাত ব্যবসায়ী ইলিয়াস হাস্কেট ডার্বি ১৭৯০ সাল থেকে এ অঞ্চলে নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেন এবং তৎপরবর্তী বছরগুলোতে কলকাতা বন্দরে মার্কিন বাণিজ্য জাহাজের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং এসব ব্যবসায় তাদের প্রচুর মুনাফাও অর্জিত হয়।
এ সূত্রে স্মরণ করা প্রয়োজন যে, ভারতবর্ষ তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসনাধীন উপনিবেশ। শাসন, বাণিজ্য ও শোষণের সম্মিলিত ফায়দা গলিয়ে কোম্পানির সিভিলিয়ানদের হাতে তখন অনৈতিক পন্থায় উপার্জিত অঢেল সম্পদ। কিন্তু সে সম্পদ ও অর্থকড়ি কোম্পানির জাহাজে করে বৈধ উপায়ে নিজ দেশে অর্থাৎ ব্রিটেনে পাঠানোর কোনো সুযোগ ছিল না। এমনি পরিস্থিতিতে মার্কিনীরা এ দেশে বাণিজ্য করতে আসলে ইংরেজ সিভিলিয়ানরা তাদের সম্পদ আমেরিকান জাহাজের মাধ্যমে ব্রিটেনে পাঠানোর একটি সুযোগ পেয়ে যান। এই সুযোগকে আরো বেগবান করে তোলার লক্ষ্যে কোম্পানি কর্তারা ১৭৯৪ সালে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বাণিজ্য সংক্রান্ত সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করে। এর আওতায় মার্কিনীরা বাংলায় স্বাধীন ব্যবসায়ীর মতো ব্যবসা করার সুযোগ পায় এবং এ দেশে তাদের মুনাফা আরো বাড়তে থাকে। ব্রিটেনের ধারণা ছিল যে, এ চুক্তির ফলে তারাই লাভবান হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটে এর বিপরীতটি। মার্কিন বণিকদের এরূপ উচ্চ মুনাফা ও এ দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া সম্পদের উপর ভিত্তি করেই ১৮১২-২০ সময়ের মধ্যে ইউরোপের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও একটি শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়। অতএব দেখা যাচ্ছে যে, ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লবের মতো মার্কিন শিল্প বিপ্লবের পেছনেও বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের শোষিত শ্রম ও সম্পদের একটি বিরাট অবদান রয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য থেকে প্রমাণ মিলছে যে, একটি পুরোপুরি রক্ষণশীল কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে ধারণ করে ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরে মার্কিন বণিকদের হাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত হওয়ার মতো যথেষ্ট পুঁজি ছিল না বললেই চলে। তাহলে কিভাবে ও কিসের উপর ভিত্তি করে তারা বাণিজ্য করতে সুদূর বাংলা তথা বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত ছুটে এসেছিল? নৌপথ বিষয়ক গবেষক ও ঐতিহাসিক পার্কিনসন দেখিয়েছেন যে, মূলত চারটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই তারা উক্ত বাণিজ্য যাত্রায় যুক্ত হয়েছিল এবং সেগুলো হচ্ছে:
ক) সাগরবক্ষে জলদস্যুদের লুট করা সম্পদ সস্তায় কিনে নেয়া
খ) ভারতবর্ষের কর্মরত ব্রিটিশ সিভিলিয়ানরা অবৈধ পথে যে সম্পদ উপার্জন করেছিল, সেখান থেকে স্বল্পসুদে ঋণ নেয়া
গ) সুযোগ পেলে সাগরবুকে নিজেরাও দস্যুবৃত্তিতে লিপ্ত হওয়া
ঘ) আটলান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে চলাচলকারী আইজল ডি ফ্রান্স নামক ফরাসি জাহাজে অবস্থিত চোরাই বাজার থেকে সস্তায় পণ্য কেনা। অর্থাৎ লুণ্ঠন, দস্যুবৃত্তি ও সস্তায় দস্যুবৃত্তিক পণ্য কিনে লাভবান হওয়াই ছিল আঠারো ও উনিশ শতকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাণিজ্যের মূল কৌশল। এরই মধ্যে প্রায় দুই শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বহির্বাণিজ্য নীতি এখনো বহুলাংশে পুরনো অন্যায় ও অনৈতিক জবরদস্তি কৌশলের আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এর সর্বশেষ সংযোজন ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সাথে স্বাক্ষরিত এআরটি।
পাকিস্তানের নয়া ঔপনিবেশিক কাল
উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৬ সালে তার স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর থেকেই বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি অন্যতম লাভজনক বাণিজ্যক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করে আসছে। কিন্তু ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লব সংঘটনে বাংলার অবদানের বিষয়টি এ দেশের মানুষ যেরূপ ব্যাপকভাবে জানে, মার্কিন শিল্প বিপ্লবের পেছনেও-যে বাংলার সম্পদের প্রায় অনুরূপ ভূমিকা ছিল, সে বিষয়টি এ দেশের খুব কম মানুষই জানে এবং শিক্ষিত মানুষদের মধ্যেও এ বিষয়ক জানার পরিধি অত্যন্ত সীমিত। সে যাইহোক, যুক্তরাষ্ট্র তার বহির্বাণিজ্য নীতিতে নিজেদের স্বার্থেই বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ ভাববার যে কৌশল সেই গোড়া থেকে গ্রহণ করে এসেছে, তার ধারাবাহিকতাতেই ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভেঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি নতুন দেশ হওয়ার পরও সে গুরুত্ব অব্যাহত থাকে। আর তাই ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার অব্যবহিত পরে সম্ভব দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কনস্যুলেট অফিস স্থাপন করে এবং বাংলাদেশ থেকে পাট, চা, চামড়া ইত্যাদি পণ্য আমদানি করতে শুরু করে।
পাট, চা ও চামড়া—এ তিনটি পণ্যই ছিল তখনকার সমগ্র পাকিস্তানেরও প্রধান রফতানি পণ্য। ১৯৪৯ সালে ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেট অফিস স্থাপিত হবার পর থেকে বাংলাদেশের পাকিস্তানী আমলের প্রায় সবটা জুড়েই উক্ত কনস্যুলেটের বাণিজ্য শাখাকে ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, পাকিস্তানের রফতানি বাণিজ্যে পূর্ব পাকিস্তানের এ অবদানের কথা যুক্তরাষ্ট্রের জানা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানকে দেয়া অর্থনৈতিক সাহায্যের সিংহভাগই তারা প্রদান করে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সামরিক সহায়তাসহ অন্যান্য কাজে। তদুপরি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের বৈষম্যপূর্ণ ও শোষণমূলক নীতির বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত থেকেও পাকিস্তানের ঐ নীতিকে তারা নীরবে এবং কখনো কখনো যোগসাজশে গোপনে সমর্থন করে গেছে। সর্বশেষ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তারা জাতিসংঘসহ সর্বত্র পশ্চিম পাকিস্তানেরই পক্ষ অবলম্বন করেছে। তবে এতকিছু সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় শেষ দিন পর্যন্ত তারা এ দেশ থেকে পাট, চা, চামড়া ও অন্যান্য বেশকিছু পণ্যের আমদানি অব্যাহত রাখে, যা ছিল তাদের স্বার্থান্বেষী বাণিজ্য কৌশলেরই অংশ।
বাংলাদেশ আমল
১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করলেও ভূরাজনীতির কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অচিরেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তানকে অসন্তুষ্ট করে হলেও প্রদত্ত এ স্বীকৃতি ছিল বস্তুত বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক তাদের অতীতের লাভজনক বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভূরাজনীতির কৌশলগত স্বার্থেরই অংশ। আর এ সংক্রান্ত কারণগুলোকে অন্তত তিনটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে:
এক. নিকট অতীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মাকে (বর্তমান মিয়ানমার) ব্যবহার করে বাণিজ্য ও যুদ্ধজয় উভয় ক্ষেত্রে তৎকালীন মিত্রজোট যে কৌশলগত সুবিধা পেয়েছিল, সেটি তাদের কেউই ভুলে যাননি।
দুই. ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বাংলাদেশের জলসংযোগ এতোটাই সুবিধাজনক অবস্থানে যে, সে সহজ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে লাভবান হওয়ার একটি আকাঙ্ক্ষা নিকট-দূর নির্বিশেষে সকলেরই কমবেশি থাকার কথা এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্রেরও একেবারে প্রথম থেকেই ছিল। তিন. ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছিল অতি নিম্ন আয়ের ও প্রায় সবদিক থেকেই পশ্চাৎপদ একটি দরিদ্র দেশ। ফলে সেই সময়ের বৈশ্বিক জনসংখ্যার বিবেচনায় এটি একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর (প্রায় ৭ কোটি) দেশ হওয়া সত্ত্বেও নিকট ভবিষ্যতে এ দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বাণিজ্যের অংশীদার করে তোলার বিষয়টি তখন মার্কিন বিবেচনায় ছিল কিনা, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে পালাবদল ঘটলে সে সম্ভাবনা-যে ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, সেরকম ধারণা তাদের মধ্যে অবশ্যই ছিল। তা ছিল বলেই ১৯৭২ সাল থেকেই তারা এ দেশকে ঋণ, অনুদান ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে টিকিয়ে রাখার কৌশল নেয় এবং আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় মাত্রায় অংশ নিতে শুরু করে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরেই বাংলাদেশ ৬০ দশমিক ০৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করে, যা ছিল দেশওয়ারী রফতানির শীর্ষে এবং বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের ১৬ দশমিক ১৫ শতাংশ।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, আজ এত বছর পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির সামগ্রিক পরিমাণে ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটলেও শতাংশের হিসাবে সেখানে মোটেও বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। শতাংশের হিসাবে শেষোক্ত অর্থবছরে এ হার দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ, যা ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেশি। আর বস্তুত এখানটাতেই নিহিত রয়েছে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের অতীতের সাফল্য, ব্যর্থতা, ত্রুটি ও দুর্বলতাসমূহকে চিহ্নিত করে আগামীদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও সম্ভাবনা বাস্তবায়নে কিভাবে প্রস্তুতি নেয়া হবে, সে বিষয়টি।
১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ দশমিক ০৪ মিলিয়ন ডলারের যেসব পণ্য রফতানি করে, তার মধ্যে তৈরি পোশাকের (আরএমজি) কোনো ক্ষুদ্রতম অংশও ছিল না। সে তালিকার সিংহভাগ জুড়ে ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য (মোট রফতানির ৮৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ) এবং চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যাদি (মোট রফতানির ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ)। অবশিষ্ট ৫ দশমিক ৭২ শতাংশের আওতায় যেসব পণ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেগুলো পরিমাণে অত্যন্ত নগণ্য হলেও বুঝতে হবে যে, সেগুলোর পর্যাপ্ত রফতানি-সম্ভাবনা ছিল বলেই সেই পশ্চাৎপদ অবস্থাতেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উচ্চ আয়শ্রেণীর ভোক্তাবাজারে সেসব পণ্য রফতানি হতে পেরেছিল। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সেসব পণ্যের সমান বা তার চেয়েও বেশি বাজার-চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, ওই পণ্যগুলোর এরূপ উজ্জ্বল বাজার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত সেগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি, মানোন্নয়ন ও রফতানির ব্যাপারে যথোপযুক্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যাদি এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তী বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া অন্যান্য পণ্যের ব্যাপারে সরকারের দিক থেকে নীতি পর্যায়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেয়া ও উপযুক্ত সহায়তাকাঠামো গড়ে তুলতে না পারার ব্যাপারে সরকারের দায় যেমনি রয়েছে, তেমনি উদ্যোক্তাদের দিক থেকেও রয়েছে উদ্যম ও দক্ষতার ব্যাপক ঘাটতি। সে ক্ষেত্রে কার দায় কতটুকু, তার চেয়েও বড় কথা গত ৫৫ বছরেও কাজটি হয়নি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রফতানির পরিমাণ ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের তুলনায় ১৪৪ গুণ বাড়লেও সে তুলনায় পণ্যের সংখ্যা বেড়েছে খুবই সামান্য। হতাশার বিষয় হচ্ছে, কোনো কোনো অর্থবছরে এ সংখ্যা আরো কমে গিয়েছে; তবে সেটি চাহিদার ঘাটতির কারণে নয়, সরবরাহ সামর্থ্যের অভাবে।
এ অবস্থায় স্বভাবতই প্রশ্ন দাঁড়ায়, সামগ্রিক রফতানির পরিমাণ তাহলে ১৪৪ গুণ বাড়ল কেমন করে? মূলত তৈরি পোশাকই এ পরিমাণ বাড়িয়েছে। এটি একদিকে তৈরি পোশাক খাতের দক্ষতা ও সামর্থ্যের প্রমাণ বহন করলেও একই সঙ্গে তা দেশের সামগ্রিক রফতানি কৌশলের ত্রুটি, অদক্ষতা ও ব্যর্থতাকেও তুলে ধরছে।
শুধু তৈরি পোশাকের মতো একক পণ্যকে রফতানি-প্রতিষ্ঠা দিতে যেয়ে এ সময়ে অন্য এমন বহুসংখ্যক সম্ভাবনাময় পণ্য এ তালিকা থেকে হারিয়ে গেছে অথবা সংকুচিত হয়ে পড়েছে, যেগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে খুব সহজেই যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আরো বেশি পরিমাণে রফতানি করা সম্ভব হতো। এটি এখনো করা সম্ভব।
কিন্তু তৈরি পোশাকখাতের উদ্যোক্তা বা তাদের সহযোগীরা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত প্রণয়ন পর্যায়কে এমনভাবে ঘিরে রেখেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানির আলোচনা আসতেই মনে হয় যেন আরএমজি ছাড়া বহির্বিশ্বে রফতানি করার মতো বাংলাদেশের আর কোনো পণ্যই নেই। অথচ বাকি পণ্যগুলোর কোনো কোনোটির রফতানি সম্ভাবনা আরএমজির চেয়েও বেশি। চামড়াজাত পণ্যের কথাই ধরা যাক। এটির রফতানি যুক্তরাষ্ট্রের সদ্যআরোপিত বর্ধিত শুল্ককাঠামোর আওতাতেও কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু হতাশার বিষয় হচ্ছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের পর থেকে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি ক্রমাগত কমেই চলেছে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক এআরটি ছাড়াও বাংলাদেশের আরো বেশকিছু চুক্তি রয়েছে। কিন্তু এআরটির ভয়াবহতার কারণে অন্যান্য চুক্তিগুলোর আলোচনা প্রায় আড়ালেই পড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত এ ধরনের চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৮৬ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি (বিআইটি), ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তি (টিআইসিএফএ) ইত্যাদি। উল্লিখিত চুক্তি দুটি বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পণ্যের বর্ধিত বাজার সুবিধা সম্প্রসারণে ব্যাপকভাবে সহায়ক হয়েছিল।
বিআইটি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়েই বস্তুত বাংলাদেশে শেভরন, কনোকো-ফিলিপস, এক্সন-মোবিল প্রভৃতি মার্কিন তেল-গ্যাস কোম্পানির বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয় ও পরে তা ব্যাপকতা লাভ করে। তবে এদের কারো কারো সাথে স্বাক্ষরিত গ্যাস অনুসন্ধান ও আহরণ সংক্রান্ত উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) নিয়ে সমালোচনা থাকলেও মানতেই হবে যে, এ বিনিয়োগগুলো বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়নে ব্যাপকভাবে সহায়ক হয়েছিল। অন্যদিকে টিআইসিএফএ মার্কিন বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশকে অনেকাংশে সহজতর করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক শিল্পের জন্য জিএসপি সুবিধা অকার্যকর হয়ে যাওয়ার পরও এই টিআইসিএফএ-ই সেখানে বাংলাদেশী পণ্যের বাজার সুবিধাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে বলে অনেকে মনে করেন। উল্লিখিত দুটি চুক্তি বহাল থাকা অবস্থায় ২০২৬ সালে এসে এআরটি স্বাক্ষরের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। আসলে নতুন এ চুক্তি যতটা না বাণিজ্য সংক্রান্ত, তার চেয়ে অনেক বেশি ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার। এতে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়ে যা যা আছে, তা মূলত বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ সংক্রান্ত। অন্যদিকে এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের সম্প্রসারণ তো ঘটবেই না, উল্টো বেশকিছু বাংলাদেশী পণ্যের বাজার সুবিধা আরো সংকুচিত হয়ে পড়বে।
ফলে এআরটিকে যত দ্রুত সম্ভব পর্যালোচনার মাধ্যমে সংশোধন করা জরুরি এবং সে সুযোগ উক্ত চুক্তিতেই রয়েছে। আর জনমতের বিষয়টি বিবেচনা নিলে এটি বাতিল করাই উচিত এবং তজ্জন্য চুক্তির ৬ দশমিক ৫ নং অনুচ্ছেদে সে সুযোগও হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘যেকোনো পক্ষ অপর পক্ষকে চুক্তি বাতিলের লিখিত নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে’।
আর সেটি বাতিল করার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এটি যে, এ রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী এ অযৌক্তিক চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিল পূর্ববর্তী অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ফলে একটি অনির্বাচিত অরাজনৈতিক সরকারের অন্যায্য চুক্তির দায় একটি নির্বাচিত সরকার কেনই-বা গ্রহণ করবে? ফলে দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে উল্লিখিত চুক্তিটি অবিলম্বে বাতিল করা উচিত বলে মনে করি।
সুপারিশ:
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রায় আড়াইশ বছরের যে ইতিহাস, সেটি বিশ্ব-ইতিহাসের প্রবণতার বাইরের স্বতন্ত্র কোনো ধারা নয়। বরং শাসকের দণ্ডের ভার ও সমর্থনে পুঁজির একচেটিয়াত্বকে আশ্রয় করে সৃষ্ট মুনাফা যেভাবে পৃথিবীকে গ্রাস করে চলেছে, তাতে উল্লিখিত চুক্তি এর বাইরে যেয়ে অন্যপথে এগোবে সেটি এই মুহূর্তে চিন্তা করা অনেকটাই অসম্ভব। তবে এরপরও আশাবাদী মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যাশাকে বিবেচনায় নিয়ে এখানে এমন কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হলো, যা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের স্বার্থ ও আকাঙ্ক্ষার পরিপূরণে কিছুটা হলেও সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। সুপারিশগুলো হচ্ছে:
ক) স্বাক্ষরিত ভারসাম্যহীন বাণিজ্য চুক্তিটিকে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে সংশোধন অথবা বাতিল করে বিআইটি ও টিআইসিএফএ'র বাস্তবায়নকে জোরদার করা হোক।
খ) আরএমজির বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আর যেসব বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা রয়েছে, সরকারের উচিত হবে সেসব পণ্যের উৎপাদন ও রফতানির বিষয়ে উদ্যোক্তাদেরকে উৎসাহিত করা। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদেরকে কারিগরি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা দিয়ে তাদের দক্ষতা ও সামর্থ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এর মধ্যে চামড়াজাত পণ্য ও পাটপণ্য উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে যেসব ঘাটতি রয়েছে, সেসব পূরণের ব্যাপারেও জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
গ) ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ লাভকারী পণ্যসমূহের রফতানি বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে এ ক্ষেত্রটি ভীষণভাবে অবহেলিত। অথচ বিশ্বের বহু দেশই জিআই ট্যাগ দিয়ে পণ্য রফতানি বাড়িয়ে চলেছে এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও সেটি ঘটছে।
ঘ) ভারত, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন প্রভৃতি এশীয় দেশ বর্তমানে যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করছে, সেগুলো চিহ্নিত করে বাংলাদেশ কর্তৃকও সেগুলো রফতানির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য যে, আরএমজির কথা আসতেই চট করে আমরা ভিয়েতনামের তুলনা টানি। কিন্তু আমরা সবাই কি জানি যে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভিয়েতনামের প্রধান রফতানি পণ্য আরএমজি নয়—সেটি চতুর্থস্থানীয় পণ্য। সেখানে শীর্ষে রয়েছে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, জুতা ও যন্ত্রপাতি। বাংলাদেশও কি এটি করতে পারে না?
ঙ) নানা শ্রেণী ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও আহরণের বিষয়টি বহুদিন ধরেই থমকে আছে। এ ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা রক্ষা করে মার্কিন বিনিয়োগকে আরো উৎসাহিত করা যেতে পারে। স্বচ্ছতার প্রসঙ্গ তোলা এ কারণে যে, সম্প্রতি পেট্রোবাংলা এ বিষয়ে যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে, এখানকার উৎপাদন বণ্টন চুক্তিতে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে বিশেষ বিশেষ তেল-গ্যাস কোম্পানির মতামতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে শোনা যায়। ফলে এ ধরনের কোনো ঘটনা থাকলে তা যেন পরিহার করা হয়।
চ) বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের একটি বড় অংশ জুড়েই রয়েছে সেবাখাত। ভবিষ্যতে এ জাতীয় বিনিয়োগ কিভাবে উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) খাতে নিয়ে আসা যায়, সে ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে।
ছ) যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে বাংলাদেশ বর্তমানে আরএমজিসহ অন্যান্য যেসব পণ্য রফতানি করে থাকে, তার একটি বড় অংশই প্রণোদনা-নির্ভর। দেশের রফতানিখাতকে যত দ্রুত সম্ভব এ প্রণোদনা-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিযোগিতামূলক সামর্থ্যের ভিত্তিতে টিকে থাকবার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। রফতানিতে নগদ আর্থিক প্রণোদনার বিধান চালু হয়েছিল ১৯৮০ এর শেষার্ধে পোশাকখাতের সূচনা পর্যায়ে। বর্তমানে এ খাত অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক শক্তিশালী। ফলে আশির দশকে চালু হওয়া সে প্রণোদনা এখন আর টিকিয়ে রাখার কোনো যুক্তি নেই। জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকায় এ ধরনের নগদ প্রণোদনা দেয়া অনৈতিকও।
সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ গতিবিধি
লুণ্ঠন, লুণ্ঠিত সম্পদ সস্তায় ক্রয় করা এবং অনৈতিক পন্থায় আহরিত সম্পদকে পুঁজিতে রূপান্তর করে অধিক পরিমাণে লাভবান হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আঠারো শতকের শেষার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়াংকি বণিকেরা বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য করতে এসেছিল, তাতে তারা শুধু সফলই হননি; তাদের সে লুণ্ঠিত সম্পদ ও মুনাফা মার্কিন শিল্প বিপ্লবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানও রেখেছিল। আর সেই সাফল্য ও অবদানের পরিসর ও মাত্রা দেখে তারা তখনই বুঝে গিয়েছিল যে, বঙ্গোপসাগরীয় ঐ অঞ্চল লুণ্ঠন, জবরদস্তি ও মুনাফা অর্জনের এক নিরাপদ উর্বর ক্ষেত্র। তারা মোটামুটি নিশ্চিত হয় যে, বিশ্ববাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল তথা বাংলাদেশকে তাদের লাগবেই।
আর এমনি অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতেই যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে নৈতিকভাবে পরাজিত হওয়ার পরও ১৯৭২ সাল থেকেই আবার এ দেশের সাথে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রয়াসী হয় এবং পরবর্তী সাড়ে পাঁচ দশকের ব্যবধানে বহুসংখ্যক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে সে সম্পর্ককে আরো জোরদার করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। ধারণা করা যায় যে, আগামীদিনেও বাংলাদেশে যত বিভিন্ন মাত্রা ও আঙ্গিকের রাজনৈতিক উত্থান-পতন ঘটুক না কেন, এরপরও যুক্তরাষ্ট্র এ দেশে তার বাণিজ্যিক নীতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবে এবং সেটিকে সমর্থন করে যাওয়ার মতো লোকেরও এ দেশে কোনো অভাব হবে না।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও যেকোনো শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী এ কারণে যে, আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সরকার যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাদেরকে ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখবে, সেটি তারা ভালো করেই জানে, তাতে দরিদ্র সাধারণ জনগণের উপর করের বোঝা যতই বাড়ুক না কেন।
মোটকথা, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দিনে দিনে আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠার সম্ভাবনাই সর্বাধিক এবং তাতে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের লাভবান হওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত, বিশেষত গত ৯ ফেব্রুয়ারি এআরটি স্বাক্ষরিত হওয়ার প্রেক্ষিতে। তবে বাংলাদেশেরও কি এ সম্পর্ক থেকে লাভবান হওয়ার কিছু নেই? অবশ্যই আছে। তবে সেটি নির্ভর করছে এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা মানুষেরা কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টিকে দেখবেন, তার উপর।
আবু তাহের খান: লেখক ও বিশ্লেষক