ইন্টারনেটের অপব্যবহারে বাড়ছে কিশোর অপরাধ

কিশোরদের নিরাপদ সাইবার অভিজ্ঞতায় প্রশিক্ষণ হোক কার্যকর ও সর্বজনীন

শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল নিরাপত্তায় পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিভাবকরা নিজেরাই সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না রাখলে সন্তানদের যথাযথ দিকনির্দেশনা দেয়া কঠিন।

স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তার শিশু-কিশোরদের জ্ঞান অর্জন, যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, প্রতারণা, সাইবার বুলিং ও অপরাধ চক্রের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে বাস্তব জীবনে সংঘাত ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতিতে মাধ্যমিক পর্যায়ের ৩৮ হাজার ১৮০ শিক্ষার্থীকে সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেয়ার সরকারি উদ্যোগ সময়োপযোগী। তবে প্রশিক্ষণের সংখ্যা নির্ধারণ কিংবা কর্মশালা আয়োজনই এ সমস্যার সমাধান নয়। প্রয়োজন এমন একটি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে শিশু-কিশোররা ডিজিটাল জগতে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি দায়িত্বশীল আচরণও শিখবে।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর আওতায় ৩৮ হাজার ১৮০ শিক্ষার্থী ও ২ হাজার ৪৭৫ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবক ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে ৫০৫টি কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৯ সালের মার্চে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা। উদ্যোগটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু দেশের বিপুলসংখ্যক মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর তুলনায় এ প্রশিক্ষণের আওতা সীমিত। ফলে প্রকল্পটিকে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে না দেখে জাতীয় পর্যায়ে সাইবার সচেতনতা গড়ে তোলার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড এবং কিশোরী জান্নাতুল তাজমিনের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব অপরাধের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের ভূমিকা ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছার সুযোগ নেই। তবে শিশু-কিশোরদের সামাজিক সম্পর্ক, অনলাইন পরিচয় ও বাস্তব জীবনের ঝুঁকির মধ্যে যে সংযোগ তৈরি হচ্ছে, তা উপেক্ষা করারও অবকাশ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক, ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য প্রকাশ, অনলাইন গেমিংয়ের সূত্রে যোগাযোগ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে বিরোধের পরিণতি সম্পর্কে অসচেতনতা তাদের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। আবার অনলাইন প্লাটফর্মে সংঘবদ্ধ হওয়া কিংবা উসকানিমূলক কনটেন্টের প্রভাবে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না, এর সঙ্গে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ; সামাজিক পরিবেশ ও অপরাধ প্রতিরোধের প্রশ্নও জড়িত।

প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনবল ও উপযোগী পাঠ্যক্রমের ঘাটতি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও প্রশিক্ষিত শিক্ষক, হালনাগাদ পাঠ্যক্রম এবং গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। কেবল পাসওয়ার্ড সুরক্ষিত রাখা কিংবা সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করার পরামর্শ দিয়ে সাইবার সচেতনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিজিটাল পরিচয় সুরক্ষার কৌশল, অনলাইন প্রতারণা ও বুলিং শনাক্ত করার উপায়, ছবি বা ভিডিওর অপব্যবহার প্রতিরোধ, ভুয়া তথ্য যাচাই এবং সন্দেহজনক যোগাযোগের ক্ষেত্রে করণীয়।

এক্ষেত্রে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। প্রকল্পে ২ হাজার ৪৭৫ শিক্ষককে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা থাকলেও তাদের মাধ্যমে কতসংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে জ্ঞান ও দক্ষতা পৌঁছানো যাবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। শিক্ষকদের জন্য সহজবোধ্য ও নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রশিক্ষণ উপকরণ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক নিয়মিত পাঠ, আলোচনা ও অনুশীলনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শহরের তুলনায় গ্রাম ও মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা এবং প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি বেশি থাকলে সেখানে বিকল্প প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। প্রকল্পের সুফল যেন শুধু নির্বাচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল নিরাপত্তায় পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিভাবকরা নিজেরাই সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না রাখলে সন্তানদের যথাযথ দিকনির্দেশনা দেয়া কঠিন। তাই অভিভাবকদের জন্য আয়োজিত কর্মশালাগুলোকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব সমস্যাভিত্তিক করতে হবে। সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ে আলোচনা, বয়সোপযোগী সীমা নির্ধারণ, অনলাইন বন্ধু ও যোগাযোগ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে সহায়তা করার কৌশল শেখানো প্রয়োজন। তবে তদারকির নামে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কিংবা শাস্তির ভয় তৈরি করা যাবে না। এতে শিশু-কিশোররা সমস্যায় পড়লেও তা গোপন করতে পারে, বরং এমন পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে তারা নির্ভয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা জানাতে পারবে।

একইভাবে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সাইবার অপরাধের শিকার হলে অভিযোগ জানানোর সহজ পদ্ধতি, দ্রুত সহায়তা এবং শিশু-কিশোরবান্ধব প্রতিকার ব্যবস্থা থাকা দরকার। অভিযোগকারীর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। পুলিশি সহায়তা যেন ভীতিকর অভিজ্ঞতা না হয়ে ওঠে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। অনলাইন অপরাধের শিকার শিশু-কিশোরকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা কিংবা তার ব্যক্তিগত ছবি ও পরিচয় প্রচার করা হলে ক্ষতি আরো বাড়তে পারে। একই সঙ্গে যারা অনলাইনে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তাদের ক্ষেত্রে বয়স, অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিরোধ, সংশোধন ও আইনি জবাবদিহির মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য রাখতে হবে।

দেশে সক্রিয় ৩৮৬টি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা অন্তত ৪ হাজার ২৫০ বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিসংখ্যান কিশোর অপরাধের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের কারণ হলেও সমস্যাটির সমাধান কেবল নজরদারি ও দমনমূলক ব্যবস্থায় সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠাভ্যাস ও সৃজনশীল প্রযুক্তিচর্চার সুযোগ বাড়িয়ে কিশোরদের ইতিবাচক কাজে যুক্ত করা প্রয়োজন। অনলাইন জগতে তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অফলাইন জীবনে নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকল্পটির কার্যকারিতা যাচাইয়ে শুধু কতজনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হলো বা কতটি কর্মশালা আয়োজন করা হলো, তা দিয়ে সাফল্য নির্ধারণ করা উচিত নয়। প্রশিক্ষণের আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও আচরণে কী পরিবর্তন এসেছে, তারা ঝুঁকি শনাক্ত করতে ও প্রয়োজনের সময় সহায়তা নিতে পারছে কিনা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে কিনা—এসব সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। প্রকল্পের অগ্রগতি ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল্যায়নের ফল অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পদ্ধতি সংশোধন করতে হবে। সফল কর্মসূচিগুলো পর্যায়ক্রমে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও থাকা প্রয়োজন।

আরও