রফতানি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক বিষয়টি জড়িত তা সবার কাছে এখন দৃশ্যমান হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনফোবিয়া ক্রমান্বয়ে সমগ্র বিশ্বে এমনভাবে পরিবর্তন এনেছে যে এ বিরোধ নিরসনের খেসারত এখন অতি ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ দেশকেও পোহাতে হচ্ছে। এতে বৃহৎ সম্পদশালী বা বিশ্ব বাণিজ্যে অংশগ্রহণকারী বড় দেশগুলো কোনোভাবে এ বোঝা কাটিয়ে উঠতে পারলেও ক্ষুদ্র দেশগুলো সমস্যায় পড়েছে।
বাণিজ্য আলোচনার সঙ্গে যুক্ত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টাশুল্ক, যা সমগ্র বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ২০ শতাংশ পাল্টাশুল্কে রফা করতে পেরেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য মোট শুল্ক দাঁড়াল ৩৫ শতাংশ, সেটাও একেবারে কম নয়। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোরও প্রায় সমানভাবে শুল্ক বেড়েছে। তাই বাংলাদেশের জন্য যেটা সমস্যা সেটা অন্য অনেক দেশের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য হয়েছে।
গত ৩১ জুলাই হোয়াইট হাউজ থেকে প্রকাশিত নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ৭০টি দেশের ওপর ১০-৪১ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ধার্য হয়েছে সিরিয়া (৪১ শতাংশ), মিয়ানমার (৪১ শতাংশ) এবং লাওস (৪১ শতাংশ) ইত্যাদি দেশের জন্য। কিসের ভিত্তিতে এ অধিক হার তার বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন থাকলেও তা ধর্তব্যে আনার সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনামের পাল্টা শুল্কহার ২০ শতাংশ, যা বাংলাদেশের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। পাকিস্তানের শুল্কহার ১৯ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার শুল্কহার ১৯ শতাংশ। তুরস্কের শুল্কহার ১০ শতাংশ। প্রথম যখন এ পাল্টাশুল্ক ধার্য করা হয় তখন একটি ফর্মুলা ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন, এখন যে দেশ যত বেশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াতে পারবে তার ওপর নির্ভর করবে শুল্ক হ্রাসের বিষয়টি।
এখন দেখা দরকার এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জায়গাগুলো কী কী। যেমন এ দেশগুলোয় আগে শুল্ক কত ছিল, এখন মোট শুল্কের পরিমাণ দাঁড়াল কত, তা জানা দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপের বিষয়টি একটু ভিন্ন, এটা কলাম ১ ডিউটি রেটের ওপর নির্ভর করবে অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের হারমোনাইজড ট্যারিফ শিডিউলের ওপর নির্ভর করে ১৫ শতাংশের বেশি বা কম শুল্ক ধার্য হয়েছে। এক্ষেত্রে হোয়াইট হাউজ থেকে প্রকাশিত নির্বাহী আদেশের একটি পরিশিষ্টের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে যে প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল তারা বলেছে যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ সংরক্ষণ করেই তারা দরকষাকষি করেছে। তবে বাংলাদেশ থেকে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা সবই প্রায় শূন্য শুল্ক হারে আমদানির জন্য। অথবা অন্য দেশের তুলনায় কিছুটা বেশি দামে ক্রয় করার অভিপ্রায় প্রকাশ করা হয়েছে যাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা যায়। এতে বাণিজ্য ঘাটতি হয়তো কিছুটা কমবে। অর্থাৎ আমাদের একমাত্র পণ্য তৈরি পোশাক রফতানি ধরে রাখা যাবে। কিন্তু মোট কস্ট-বেনিফিট বিশ্লেষণ করে তা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা এখন দেখা দরকার হবে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির পুরো বিষয় আমরা এখনো জানতে পারিনি। কারণ অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে শুল্ক বাধার চেয়ে অশুল্ক বাধা অনেক বড়। বাংলাদেশকে অবিলম্বে সেগুলো মানতে হলে অনেক বড় আর্থিক বিনিয়োগ ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে, অনেক নীতিমালার সংস্কার করতে হবে, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন, কাস্টমস ব্যবস্থাপনা, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট, আইপি রেগুলেশন, আমদানি রেগুলেশন, আইসিটি নীতি, বিনিয়োগ নীতি, হিউম্যান রাইটস ইত্যাদির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ। এগুলোর রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিশেষভাবে দরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো তথ্যসমৃদ্ধ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দর কষাকষি বাস্তবিক পক্ষেই একটি কঠিন বিষয়। বাংলাদেশের প্রস্তুতিও খুব ভালো ছিল তাও নয়, সেদিক থেকে বাংলাদেশ ভালো করেছে।
তবে পুরো বিষয়টির রাজনৈতিক দিকটি সবার কাছে এখন পরিষ্কার হয়েছে, ভূরাজনৈতিক বিরোধ ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার একটি অস্ত্র হিসেবে বাণিজ্যকে ব্যবহার করা হয়েছে। এর স্থায়িত্ব কতটুকু সময়, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র তার ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে পেরেছে বলা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র সেবার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্বৃত্ত বাণিজ্যের অংশীদার। কিন্তু সেদিকটি প্রথম থেকেই আলাদা রাখা হয়েছে। কেউ এটা তুলেও ধরেনি বা বাংলাদেশের জন্য এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ১ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার রফতানি হয়েছে, আমদানি হয়েছে দশমিক ৭৭ বিলিয়ন, বাংলাদেশের পক্ষে ভারসাম্য প্রায় ৩৫৪ মিলিয়ন ডলার। আমরা এ দিকটার কথা ভবিষ্যতের জন্য চিন্তা করতে পারি কিনা ভেবে দেখা যায়।
উল্লেখ্য, ক্ষুদ্র ও স্বল্প বাণিজ্য পরিচালনাকারী দেশগুলোও এ শুল্কযুদ্ধ থেকে পরিত্রাণ পায়নি। যেমন নাউরু একটি ওশেনীয় দেশ। এর রফতানি মাত্র ২০৫ মিলিয়ন ডলার (২০২৩)। এ দেশের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশ। আবার ফকল্যান্ডস আইল্যান্ডসের রফতানি ৩৬৩ মিলিয়ন ডলার (২০২৩), তার ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ।
অন্যদিকে জাপানের ওপর শুল্কহার ১৫ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের ওপর শুল্কহার ১০ শতাংশ। অর্থাৎ যার যেখানে দর কষাকষির হাতিয়ার বেশি, তারা প্রতিপক্ষকে বোঝাতে পেরেছে, একটি নির্দিষ্ট শর্ত শুল্ক আরোপকারী দেশটির জন্যও বিপদ হয়ে আসতে পারে। কারণ কোনো না কোনো কারণে সে দেশটি অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি ধরে রাখার জন্য এ ধরনের পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। কিছু দেশ কোনো বাধাকে মোকাবেলার ক্ষেত্রে নিজেরাই শক্ত ভিত তৈরি করে নিয়েছে। যেমন বাইডেন প্রশাসন যখন চীনের ওপর সেমিকন্ডাক্টর রফতানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয় তখন দেশটি নিজেই বিষয়টির ওপর নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে থাকে। চীন অনেকটা সংগঠিতভাবে তাদের প্রযুক্তি দক্ষতা বাড়িয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের বার্ষিক এআই অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে, তখন চীনও এআই বানানোর সক্ষমতা সেভাবেই বাড়ানোর জন্য এগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীন তাদের গবেষণা এবং উন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে। চীনের রাষ্ট্র চালিত শিল্পায়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি খাত চালিত শিল্পায়ন পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছে, সঠিক নীতি এবং অধ্যাবসায় কীভাবে কাজে লাগিয়ে উন্নত হওয়া যায় ও পরনির্ভরতা ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে কমিয়ে এনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়।
এ রকম আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে, ২০১০ সালে একটি কূটনৈতিক বিরোধের কারণে চীন জাপানে দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানি স্থগিত করে। এরপর জাপান বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করে। তারা জাপান অর্গানাইজেশন ফর মেটালস অ্যান্ড এনার্জি সিকিউরিটি নামক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যৌথ কার্বন নিরপেক্ষ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর গবেষণার উদ্যোগ নেয়। দেশটি অস্ট্রেলিয়ার ফ্লোরাইট অনুসন্ধান প্রকল্পেও ইকুইটি বিনিয়োগ করে। অর্থাৎ জাপান নিজেরাই এখন অটো খাতের জন্য ব্যবহৃত দুষ্প্রাপ্য খনিজ তৈরি করছে।
সুতরাং বাংলাদেশকে এ রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন থেকে শিক্ষা নিতে হবে। অর্থনীতি এখন বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে ও অন্যকে ডিঙিয়ে যেতে সবচেয়ে বড় দক্ষতা। বর্তমান শুল্কযুদ্ধ নিজেদের অবস্থান তৈরিতে একটি কৌশল মাত্র। এখন দরিদ্র দেশ বা এলডিসি দেশ হিসেবে ছাড় দেয়ার বিষয়টি গৌণ হয়ে গেল। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ডব্লিউটিও) না মেনে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু করা যায়, বিশ্ব তার প্রমাণ দেখল।
এখন নিজেদের ভাবনা অন্যভাবে ভাবতে হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্ভাবনীগুলোকে এখন পুঁজি করতে হবে, মৌলিক গবেষণায় সরকারি সহায়তা বাড়াতে হবে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য এখন নিজস্ব উদ্ভাবনীকে এবং স্বতন্ত্র শক্তিগুলোকে খুঁজে বের করতে হবে।
আমাদের খনিজ সম্পদ তেমন নেই। তবে সমুদ্র সম্পদ আছে, সেগুলোর ব্যবহারের প্রচেষ্টা নিতে হবে। আমাদের প্রচুর মানব সম্পদ আরো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে, সঠিক উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থার পশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন করতে হবে, আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা বিদেশে ভালো কাজ করে সুনাম অর্জন করেছে। তারা যাতে আমাদের দেশেও ভালো কাজ করে সুনাম অর্জন করতে পারে তার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় সুশাসনের অবনমন ঘটেছে। বর্তমানের বিশ্বায়নের পরিবর্তিত পরিস্থিতি থেকে আমাদের অগ্রাধিকার এখন বেছে নিতে হবে। রাজনীতির পট পরিবর্তন করে এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে অন্য অগ্রাধিকার বেছে নিতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন, বিজ্ঞান ও গবেষণায় এখন সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ দরকার হবে। ছোট হোক বা বড় এখন কেউ কাউকে ছাড় দেবে না।
ফেরদাউস আরা বেগম: সিইও, বিল্ড—একটি পাবলিক প্রাইভেট ডায়ালগ প্লাটফর্ম