দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পকারখানাগুলো চালুর প্রক্রিয়া চলতি বছরের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে বন্ধ সরকারি শিল্পকারখানাগুলো দ্রুত চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়াসহ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে কার্যক্রমে গতি আনার নির্দেশনা দেয়া হয়। এমনকি এসব শিল্পকারখানায় বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে সময় নির্ধারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, জটিলতা দূরীকরণ এবং পরিবেশবান্ধব ও আধুনিকায়ন অন্যতম। যেমন ২০২৬ সালের মধ্যে বন্ধ থাকা কারখানাগুলো চালুর পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। দুই. এসব কারখানায় দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে। এরই মধ্যে প্রাণ-আরএফএল, আকিজ, টিকে গ্রুপসহ বিভিন্ন বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী বন্ধ কারখানা চালুর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। তিন. আমলাতান্ত্রিক সব জটিলতা দূর করে প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনতে হবে। চার. চিনিকলসহ অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত রুগ্ণ কারখানাগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে লাভজনক এবং পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. শামছুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় চিনি শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে দেশের সব কারখানার চাকা সচল রাখা, সেই আলোকে বন্ধ থাকা সরকারি সব চিনিকল পর্যায়ক্রমে চালুর মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও স্বনির্ভর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশের ১৫টি সরকারি চিনিকলের মধ্যে ৬টির মাড়াই কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। তবে এসব কারখানার আওতাধীন এলাকায় আখ চাষ অব্যাহত আছে। পর্যায়ক্রমে এসব মিল পূর্ণ উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) কাজ করছে। বন্ধ কারখানা চালু হলে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, উৎপাদন বাড়বে এবং সেই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।
চিনিকল শুধু চিনি উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, বরং লাখো আখচাষীর জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং স্থানীয় সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এসব মিল হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, আশপাশের রাস্তাঘাট উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া চিনিকলগুলো জ্বালানি সাশ্রয়েও ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা পরিচালনা করলে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ লাখ টাকা জ্বালানি ব্যয় হতো। কিন্তু নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে এ ব্যয় কমানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে আখের ছোবড়া বা ব্যাগাস ব্যবহার করে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
চিনিকলের লোকসানের প্রধান কারণ হলো ঋণের সুদ ও বাণিজ্য ঘাটতি। বেসরকারি খাত অনেক ক্ষেত্রে সুদ মওকুফের সুবিধা পেলেও সরকারি চিনিকলগুলো সে সুবিধা যথাযথভাবে পায় না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সরকারের কাছে আবেদন করা হবে। ঋণের সুদ ও শুল্ক বাদ দিলে বিএসএফআইসির প্রকৃত লোকসান তেমন নেই। গত অর্থবছরেই করপোরেশন সরকারকে ২১৩ কোটি টাকা আবগারি শুল্ক, কর ও ভ্যাট দিয়েছে। নতুন উপজাত পণ্য তৈরি করে লোকসান কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আখচাষীদের উৎসাহিত করতে আখের দাম ও প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে।
গত অর্থবছরে প্রতি কুইন্টাল আখের দাম ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২৫ টাকা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে চাষীদের প্রণোদনার পরিমাণ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ কোটি টাকা করা হয়েছে। চাষীদের আখের মূল্য দ্রুত পরিশোধের ব্যাপারে মোবারকগঞ্জ সুগারমিলে একটি পাইলট প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে আখের ওজন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে চাষীর মোবাইল ফোনে খুদেবার্তার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। আগে কয়েকটি টেবিল ঘুরে অর্থ পেতে যে সময় লাগত, এখন ডিজিটাল ব্যবস্থায় তা তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। পাশাপাশি সফটওয়্যারের মাধ্যমে চাষীদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও চাষাবাদসংক্রান্ত পরামর্শও দেয়া হচ্ছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারি চিনিকলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এজন্য এ চিনি শিল্পকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও স্বনির্ভর শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পরিবেশ সুরক্ষায় অন্য ফসলের তুলনায় আখের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিএসএফআইসি বছরে ৬৬ হাজার ৪৫ টন কার্বন শোষণে অবদান রাখে। এছাড়া ১০টি আখের ঝাড় একটি বড় বটগাছের সমপরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। কাজেই চিনি শিল্পকে আধুনিক ও স্বনির্ভর শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে বিএসএফআইসির পক্ষ থেকে কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও স্বনির্ভর চিনি শিল্প গড়ে তুলতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ খাতকে দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করে তুলতে চিনি শিল্প করপোরেশন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের চিনি শিল্পের প্রধান কিছু সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি, মাড়াই লক্ষ্যমাত্রা অনুপাতে কাঁচামাল তথা গুণগত মানের উচ্চ চিনি আহরণযুক্ত পর্যাপ্ত আখের অভাব। এ সমস্যা সমাধানে একরপ্রতি আখের ফলন বাড়াতে হবে। এজন্য আখ চাষের আধুনিক প্রযুক্তিগুলো চাষীর জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। আর্দ্র-গরম বাতাস শোষিত উন্নত জাতের পরিচ্ছন্ন বীজের ব্যবহার বাড়াতে হবে। সময়মতো মাত্রা মোতাবেক জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। আগাম আখের জমির পরিমাণ বাড়াতে হবে। রোপা আখের আবাদ বাড়াতে হবে। সময়মতো পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন করতে হবে। অন্য ফসলের মতো আখ চাষকে যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে।
আখ একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল। রোপণ থেকে মাড়াই পর্যন্ত ১৪ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়; এ সময়ে কৃষক একই জমিতে ২-৩ জাতের ফসলের চাষ করতে পারেন। এজন্য প্রত্যেক আখচাষীকে আখের সাথে কমপক্ষে ২টি সাথী ফসলের চাষ করতে হবে। প্রথম সাথী ফসল হিসেবে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মসুর, সরিষা এবং দ্বিতীয় সাথী ফসল হিসেবে গ্রীষ্মকালীন মুগ ও চারা পেঁয়াজের চাষ করতে হবে। এজন্য প্রত্যেক চিনিকলে একটি করে হিমাগার স্থাপন করে আখের সাথে উৎপাদিত আলু স্বল্পমূল্যে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া যেসকল আখচাষী ডাল, তেলবীজ ও ভুট্টা প্রভৃতি আমদানি নির্ভর শস্যের চাষ করবেন, তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক ৪ শতাংশ সরল সুদে কৃষিঋণ দিতে হবে।
মিলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও টাটকা আখ সরবরাহ না করা চিনিকলের আর একটি বড় সমস্যা। অনেক আখচাষী আছেন, যারা পরিপক্ক, টাটকা ও সতেজ আখ দিয়ে আগাম গুড় তৈরি করেন এবং অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন, রোগাক্রান্ত বা বাসি-পচা আখ মিলে সরবরাহ করেন। এ সমস্যা সমাধানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, আগাম পরিপক্ক ও মুড়ি আখ মিল চালুর শুরুতে সরবরাহ করতে চাষীদের উৎসাহিত করতে হবে এবং পুঁজি ব্যবস্থাপনা সেভাবেই করতে হবে।
বাইরের কেন্দ্রে আখচাষীদের আখের ওজনে কারচুপি ও পুঁজি বিতরণে অনিয়মের যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে প্রতিটি বাইরের কেন্দ্রে ডিজিটাল ওজনযন্ত্র স্থাপন এবং ওজনযন্ত্রের সঠিকতা যাচাই কাজ আন্তরিকতার সাথে সম্পন্ন করতে হবে। গ্রীষ্মকালে দুই থেকে তিনটি সেচ প্রয়োগের মাধ্যমে আখের ফলন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো যায়। তাই আখের জমিতে সেচ প্রদানের জন্য আখচাষীদের স্বল্পসুদে ঋণ প্রদান করতে হবে। আখ কাটা, আঁটি বাঁধা, মিলে পরিবহন প্রভৃতি কাজে কৃষকের নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। এজন্য আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে মিল চালুর ২-৩ মাস পূর্বে চাষীদের 'ক্রপ অ্যাডভান্স' হিসেবে নামমাত্র সুদে ঋণ দেয়া হতো। এখন সে ব্যবস্থাটি কোনো মিলে চালু থাকলেও তার কার্যকারিতা দৃশ্যমান নয়।
আজ থেকে ১০ বছরের ব্যবধানে মণপ্রতি আখ পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে আখ পরিবহনে কৃষকের আয় থেকে একটি বিরাট অংশ ব্যয় করতে হয়। অনেক সময় পরিবহনের অভাবে কৃষকের জমিতে আখ শুকিয়ে যায়। এজন্য ২০-২৫ একরের ব্লকভিত্তিতে আখের আবাদ করে সেখান থেকে স্বল্পমূল্যে মিলের নিজস্ব পরিবহনে আখ মিলে সরবরাহের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। অনেক আখচাষী কোদালের পরিবর্তে দা বা হাসুয়া দিয়ে আখ কর্তন করেন। এতে ৪-৬ ইঞ্চি উচ্চ চিনিসমৃদ্ধ আখ জমিতে থেকে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এতে একরপ্রতি ৪-৬ টন আখের ফলন কম হয় এবং চিনি আহরণের হারও কমে যায়। এ কারণে মাটির সমান করে ধারালো কোদাল দিয়ে আখ কাটার ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাইরের কেন্দ্র থেকে সময়মতো মিলে আখ পরিবহন না হওয়া এবং ক্রয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আখ মিলসগেটে সরবরাহ করাও চিনিকলের জন্য একটি বড় সমস্যা। এ ব্যাপারে মিল গ্যারেজ ও আখ সংগ্রহ বিভাগকে আরও তৎপর ও কঠোর হতে হবে। পুরনো যন্ত্রপাতি ও সময়মতো মেরামতি কাজ সম্পন্ন না হওয়ার কারণে ঘন ঘন যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়া মিলের জন্য কম সমস্যা নয়। এ ব্যাপারে মিলের কারখানা বিভাগকে সময়ানুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে।
নিম্ন চিনি আহরণ হার বাংলাদেশের চিনি শিল্পের একটি বড় সমস্যা। দেশে বর্তমানে সরকারি চিনিকলগুলোয় চিনি আহরণ হার শতকরা মাত্র ৫-৬ ভাগ। অথচ আমাদের পাশের দেশ ভারত ও পাকিস্তানে চিনি আহরণ হার প্রায় ৮-১০ ভাগ। ভারতের কোনো মিলে শতকরা ৮ ভাগ চিনি আহরণ হারের নিচে আখ ক্রয় করা হয় না।
যেহেতু একটি কথা আছে, ‘সুগার ইজ প্রডিউসড ইন দ্য ফিল্ড, নট ইন দ্য ফ্যাক্টরি’। মূলত চিনি আখের পাতায় উৎপাদিত হয় এবং তা পরিবাহিত হয়ে কাণ্ডের প্যারেনকাইমা কোষে জমা থাকে। সেই চিনি কারখানায় শুধু প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।
পাতায় চিনি উৎপাদনের জন্য দৈনিক সূর্যালোক ঘণ্টা একটি বড় নিয়ামক। আমাদের দেশে দৈনিক সূর্যালোক ঘণ্টা ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় অনেক কম। এটিও চিনি আহরণ হার কম হওয়ার অন্যতম কারণ। তাই পরিশেষে বলতে চাই, আখের মূল্য চিনি আহরণ হারের ওপর নির্ধারণ করা উচিত। এতে চাষীরা চিনি আহরণ হার বাড়ানোর জন্য উচ্চ চিনি আহরণযুক্ত আখ চাষ, আগাম আখ চাষ, মুড়ি আখ চাষ এবং রোপা আখ চাষের দিকে ঝুঁকবেন। সেই সঙ্গে আখ কাটার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মিলে আখ সরবরাহে সচেষ্ট হবেন। কারণ কাটার পর বিলম্বে আখ সরবরাহ করলে চিনি আহরণ হার কম হবে এবং কৃষক আখের মূল্যও কম পাবেন।
নিতাই চন্দ্র রায়: সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন