ডিপ স্টেট বললেই মনে হতে পারে এর উৎপত্তি পশ্চিমা দেশগুলো—বিশেষত ইউরোপ ও আমেরিকায়। কিন্তু এ ধারণার উৎস মূলত তুরস্কে। পঞ্চাশের দশকে তুরস্কে যেটিকে বলা হতো ‘ডেরিন ডেভলেট’, সেটিই আধুনিক রাজনীতিতে বহুল প্রচলিত ‘ডিপ স্টেট’। তুর্কি ভাষায় ‘ডেরিন’কে ইংরেজিতে বলে ডিপ। মানে গভীর বা অভ্যন্তরীণ, আর ‘ডেভলেট’ বা দৌলাতকে ইংরেজিতে বলে স্টেট। মানে রাষ্ট্র।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ওসমানীয় খিলাফত ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকে এবং ১৯২২ সালে এর সমাপ্তি ঘটে। খিলাফতের সমাপ্তির পর কামাল পাশা, অর্থাৎ কামাল আতাতুর্ক—তুরস্কের জাতির পিতা (আতা অর্থ পিতা ও তুর্ক অর্থ তুরস্ক)-এর নেতৃত্বে একটি সেক্যুলার তুরস্ক গড়ে ওঠে। পঞ্চাশের দশকে সে সেক্যুলার তুরস্কেই সেনাবাহিনী-গোয়েন্দা বিভাগ-বিচার বিভাগের কিছু সদস্য এবং কিছু বেসামরিক ব্যক্তির (সিভিলিয়ান) সমন্বয়ে, কামাল আতাতুর্কের আদর্শে একটি মধ্যপন্থী সেক্যুলার জাতি-রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে, কমিউনিস্ট ও কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তুর্কি প্রজাতন্ত্র থেকে বের করে দেয়া, ক্ষমতাহীন করা বা দমন করার লক্ষ্য নিয়ে সরকারের মধ্যেই আরেকটি শক্তিশালী বলয় গড়ে ওঠে। এটিকে ‘প্যারালাল সরকার’ও বলা হয়। এভাবে সরকারের মধ্যে আরেকটি সরকার বা শক্তিশালী বলয় গড়ে ওঠার ধারণাকেই মূলত ইংরেজিতে ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়।
মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জেসন চ্যাফেটজ তার বিখ্যাত বই ‘দ্য ডিপ স্টেট’-এ বলেন, ‘ডিপ স্টেট’ বলতে সরকার ব্যবস্থার মধ্যে এমন এক ধরনের আধা-অদৃশ্য (কোয়াসি-ইনভিজিবল) ক্ষমতা কাঠামোকে বোঝায়, যা এমন ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত, যারা সব সরকারের আমলেই নিজেদের ক্ষমতা অটুট রাখে। এরা সরকারের নীতিনির্ধারণের বহু দিক নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু নির্বাচিত না হওয়ায় প্রচলিত জবাবদিহিতার বাইরে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘ডিপ স্টেট’ ধারণাটি মূলত জনপরিসরে আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে জন লে ক্যারের থ্রিলার উপন্যাস ডেলিকেট ট্রুথের মাধ্যমে। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিপ স্টেট বলতে মূলত সামরিক-শিল্প জটিলতা (মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স) এবং সরকারের ভেতরের অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোকে বোঝানো হয়, যাদের অনেক সময় ‘নন-গভর্নমেন্ট ইনসাইডার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের অংশ না হলেও নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে। তবে এখন অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বর্তমান আমেরিকার ডিপ স্টেটে সামরিক ও শিল্প খাতের সঙ্গে প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রও জড়িত হয়েছে।
আবার যেহেতু রাশিয়ার রাজনীতি পশ্চিমা রাজনীতি থেকে আলাদা, তাই এখানে ডিপ স্টেটের ধরনও ভিন্ন। রাশিয়ার ডিপ স্টেটকে বলা হয় ‘সিলোভিকি’ বা ইংরেজিতে ‘পিপল অব ফোর্স’—অর্থাৎ ক্ষমতাবান মানুষ। রাশিয়ার এ ক্ষমতা কেন্দ্র মূলত সাবেক সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ডিপ স্টেটের ধরনও আলাদা। বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন, সরকার গঠন ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কাঠামো পশ্চিমা দেশের মতো জটিল না। যেমন এখানে রাজনীতি মূলত একাত্তরকেন্দ্রিক, সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে গঠিত হয়, কোনো প্রদেশভিত্তিক কাঠামো নেই এবং শিয়া-সুন্নি কিংবা ধর্মীয়-জাতিগত- বর্ণবাদী সংঘাত নেই। এ কারণে এখানে ডিপ স্টেটও তুলনামূলকভাবে কম জটিল বা অন্যভাবে বললে খুব বেশি ‘গভীর’ (ডিপ) না। এ কারণে যারা বাংলাদেশে ডিপ স্টেটের হয়ে কাজ করে, তারাও হাইলি কম্পিটেন্ট অথবা স্কিল্ড না, এমনকি হতেও হয় না বা হওয়ার দরকারও হয় না।
আর একটি বিষয় হলো বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক বন্ধন তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এখানে ডিপ স্টেট তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ যদি ঢাকা থেকে বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট জেলার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করতে চায়, তার পক্ষে সেটা সম্ভব। সামাজিক গঠনের কারণে এটা আবার পশ্চিমা দেশে সম্ভব না। এজন্য পশ্চিমাদের তুলনায় বাংলাদেশের ডিপ স্টেট তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান।
ডিপ স্টেটের কোনো নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো নেই, যেমনটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, সরকার যদি ঘোষণা করে যে গাড়ি ভাড়া বাড়বে না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় ভাড়া বেড়েছে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—কে বা কারা সরকারের এ নীতিকে প্রভাবিত করল? যারা এ নীতিকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে, তারা সাধারণত দৃশ্যমান নয় এবং জবাবদিহির আওতায়ও থাকে না। এ ধরনের অদৃশ্য প্রভাবশালী শক্তি, যা সরকারের নীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, সেটাকেও এক ধরনের ডিপ স্টেট বলা যায়। আবার যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস শহর থেকে হিউস্টন শহরে ট্রেন চলাচলের জন্য জনগণ অনেক বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছে, কিন্তু সরকার এখনো সে রেললাইন বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এর একটি কারণ হিসেবে শোনা যায় গাড়ি ও তেল ব্যবসায়ীরা প্রভাব বিস্তার করে সরকারকে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দেইনি। কারণ এ রেললাইন চালু হলে মানুষ যাতায়াতের জন্য ট্রেন বেশি ব্যবহার করবে। ফলে গাড়ি ও তেল ব্যবসায় অনেক ক্ষতি হবে। এ দুই শহরে কয়েক মিলিয়ন মানুষ বাস করে। এই যে একটা গোষ্ঠী সরকারের নীতিকে প্রভাবিত করতে পারল কোনো ধরনের জবাবদিহি ছাড়া, এরাও এক ধরনের ডিপ স্টেট।
ডিপ স্টেটের ভালো ও খারাপ দিক নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। জেসন চ্যাফেটজ বলেন, ‘ডিপ স্টেট গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য একটি হুমকি। যখন অনির্বাচিত বা জনগণের সমর্থনহীন কোনো গোষ্ঠী ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তখন জনগণের জন্য এবং জনগণ দ্বারা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা খর্ব হয়।’ তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে জনগণের যে ক্ষমতা প্রয়োগ করার কথা, ডিপ স্টেট সে ক্ষমতাকেই সীমিত বা অকার্যকর করে দেয়। তবে এটি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের রাজনীতির ধরনের ওপর নির্ভর করে। রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা যদি স্বৈরতান্ত্রিক হয় এবং ডিপ স্টেট যদি সে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করে, তাহলে ডিপ স্টেটের ভূমিকা জনগণের পক্ষে যেতে পারে। আবার রাষ্ট্র যদি গণতান্ত্রিক হয় এবং ডিপ স্টেট যদি সে গণতান্ত্রিক সরকারের সব নীতিকে সমর্থন করে, তাহলে ডিপ স্টেটের ভূমিকা জনগণের বিপক্ষে যেতে পারে। এর উল্টোটাও ঘটতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আওয়ামী লীগ মনে করে ডিপ স্টেট শেখ হাসিনা শাসনের পতনে ভূমিকা রেখেছে। এ দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে এক্ষেত্রে ডিপ স্টেটের ভূমিকা জনগণের পক্ষে গেছে বলে বিবেচিত হতে পারে।
ডিপ স্টেটের মধ্য থেকে কেউ কেউ আবার ভেতরের তথ্য ফাঁস করে। তাদের ইংরেজিতে বলা হয় হুইসেলব্লোয়ার। বাংলায় যাদের বলা যায় ‘গোপন তথ্য ফাঁসকারী’। বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের তথ্য বইয়ের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়—অর্থাৎ স্বেচ্ছায় এ জগৎ ত্যাগ করার অথবা ক্ষমতা শেষ হওয়ার পর অনেকেই বই লেখেন এবং সেখানে অজানা অনেক তথ্য তুলে ধরেন। তবে সমস্যা হলো গোপন ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা যখন তথ্য ফাঁস করেন, তখন অনেকেই সে তথ্য সহজে বিশ্বাস করেন না। কিছুদিন সামাজিক পরিসরে আলোচনা হলেও তা থেকে আইনকানুন তৈরি করা বা শক্তিশালী কোনো নীতি প্রণয়ন করা যায়, এমন উদাহরণ খুবই কম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা একটি বই লেখেন ‘এ ব্রকেন ড্রিম’ নামে। তিনি একজন হুইসেলব্লোয়ার, কারণ তিনি দেশ ছাড়ার পর অথবা তার ভাষায় দেশ ত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর বিদেশে গিয়ে বইটি লেখেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের বিচার বিভাগ, সংসদ, সরকার, আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা ও ডিজিএফআই নিয়ে অনেক তথ্য তুলে ধরেছেন, যার অনেক কিছুই জনগণ জানত না। বইটি নিয়ে কিছুদিন আলোচনা হয়েছে বটে, কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সেগুলো নিয়ে কোনো তদন্ত এবং পদক্ষেপও নেয়া হয়নি।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র আকারে ছোট হওয়ায় এবং এর সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে কম জটিল হওয়ায় এখানে যারা ‘সরকারের মধ্যে সরকার’—অর্থাৎ ডিপ স্টেটের সঙ্গে জড়িত, তারা মূলত ব্যক্তিস্বার্থ বা সংকীর্ণ নিজস্ব স্বার্থ নিয়ে কাজ করে। তাদের আকাঙ্ক্ষাও তুলনামূলকভাবে সীমিত। তবে যারা ‘সরকারের মধ্যে সরকার’ এদের সঙ্গে যদি বিদেশী শক্তি যুক্ত হয়, যেমনটি ওয়ান-ইলেভেনের সময় ঘটেছিল (এ বিষয়ে ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ার: ১৯৯৬-২০১২’ বইতে প্রণব মুখার্জি বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন যে ভারত কীভাবে ওই সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছিল), তখন রাষ্ট্রের ক্ষতি হয় অনেক।
ড. মো. ফরিদ তালুকদার: সহকারী অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ম্যাকনিজ স্টেট ইউনিভার্সিটি, লুইজিয়ানা, ইউএসএ