মাহমুদ এম আয়ুব তার ‘রেডেম্পটিভ সাফারিং ইন ইসলাম: এ স্টাডি অব দ্য ডেভশনাল অ্যাসপেক্টস অব আশুরা ইন টুয়েলভার শিয়াইজম’ বইতে দেখিয়েছেন, আশুরা এবং ইমাম হোসেনের (আ.) শাহাদতকে টুয়েলভার শিয়াইজম কেবল শোকের বয়ান হিসেবে ধরে না; এটাকে ধরে ‘অর্থবহ কষ্ট’ হিসেবে, যেখানে কষ্ট মানে পরাজয় নয়, বরং সত্যের সাক্ষ্য। এ সাক্ষ্য দেয়ার কাজটা নিছক আবেগ নয়, থিওলজিক্যাল। শিয়া চিন্তায় ইমামত মানে এমন এক নৈতিক কর্তৃত্বের ধারাবাহিকতা, যা ক্ষমতার সিংহাসনকে ছাড়িয়ে যায়। ফলে ইমাম হোসেনের (আ.) শাহাদত কেবল একজন মহৎ মানুষ নিহত হওয়ার ট্র্যাজেডি নয়; এটা এমন এক মুহূর্ত, যেখানে নৈতিক কর্তৃত্ব রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে এবং সেই প্রত্যাখ্যানকে শিয়া সংস্কৃতি ‘সাক্ষ্য’ হিসেবে ধরে রাখে। এখানে ‘শহীদ’ শব্দটা তাই শুধু মৃত্যু-সংক্রান্ত নয়, এটা এক ধরনের সচেতন অবস্থান নেয়ার নাম। আমি যতবার আশুরার মজলিসের ভাষা শুনেছি, ততবারই মনে হয়েছে, মানুষ কাঁদে ঠিকই, কিন্তু কাঁদতে কাঁদতেই নিজের নৈতিক কম্পাসটা ঠিক করে। এ কম্পাসটিই শিয়া শহীদ ট্র্যাডিশনের মূল শক্তি।
এ শক্তি ইতিহাসের ভেতর দিয়ে কীভাবে সামাজিক শক্তি হয়ে উঠল, সেটা বুঝতে গেলে কারবালার বয়ান কীভাবে নির্মিত হয়েছে সেটার দিকে তাকাতে হয়। তোরস্টেন হাইলেন আল-তাবারির কারবালা বর্ণনা নিয়ে লিখতে গিয়ে দেখান, ঘটনাটা কেবল সংঘর্ষের ‘খবর’ হিসেবে দাঁড়ায় না; এখানে অঙ্গীকার, আনুগত্য, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার একটা বড় কাঠামো তৈরি হয়। অর্থাৎ কারবালা ‘কী ঘটল’ তার সঙ্গে সঙ্গে ‘কার কী করা উচিত ছিল’ এ প্রশ্নটাকে সামনে আনে। এ কাঠামো পরে শিয়া স্মৃতিচর্চায় আরো তীক্ষ্ণ হয়। আর স্মৃতিচর্চার সবচেয়ে বাস্তব দিক হলো এটা ব্যক্তিগত থাকে না; এটা রাস্তায় নামে, জনতার মধ্যে ছড়ায়, আচার-অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক ভাষা হয়ে ওঠে। কামরান স্কট আঘাই আধুনিক ইরানে শিয়া প্রতীক ও আচার নিয়ে যে কাজ করেছেন, সেখানে বারবার একটা কথা ফিরে আসে: কারবালা-প্রতীক একদিকে রাষ্ট্রকে নৈতিক বৈধতার ভাষা দেয়, আবার অন্যদিকে জনগণকেও রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার ভাষা দেয়। এ কারণেই শিয়া প্রতীক-রাজনীতি কেবল ‘রেজিমের প্রোপাগান্ডা’ বা কেবল ‘জনতার আবেগ’ নয়; এটা রাষ্ট্র-সমাজের টানাপড়েনের এক ধরনের শেয়ার্ড ব্যাকরণ।
এ থিওলজিক্যাল এবং ঐতিহাসিক ব্যাকরণ মাথায় রেখে এখন আমি সাম্প্রতিক ঘটনায় আসি। সাম্প্রতিক যে ঘটনাটা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে, সেটা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর, যেটিকে একাধিক রিপোর্টে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আঘাতে নিহত হওয়া হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ ঘটনাটাকে শিয়া শহীদ ট্র্যাডিশনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘কীভাবে পড়া’ যেতে পারে আমি তাই ভাবছিলাম। খামেনি যুদ্ধ-সংকট ঘনীভূত হওয়ার মধ্যেও জনসম্মুখে থাকেন।
তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে যাননি, তিনি জেনে-বুঝেই ‘সেখানে ছিলেন’ এবং তিনি নিজেই শহীদ হতে চেয়েছিলেন। যদিও এ দাবিটা আমি প্রমাণিত তথ্য হিসেবে লিখতে পারি না, কারণ ‘ইচ্ছা’ একটি ভেতরের ব্যাপার, আর সেটা নিয়ে নির্ভরযোগ্য ডকুমেন্টেড প্রমাণ না থাকলে নির্মোহ লেখার ন্যূনতম সতর্কতা ভাঙা হয়। কিন্তু আমি এটা বলতে পারি, শিয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৃত্যু কখনো কখনো ‘অবশ্যম্ভাবী পরিণতি’ হিসেবে নয়, ‘নৈতিক দৃঢ়তা’র প্রতীক হিসেবে পড়া হয়, বিশেষত যখন নেতা বিপদের মুখেও জনসমক্ষে থাকার ইঙ্গিত দেন এবং পালিয়ে থাকার বদলে স্থির থাকার ভঙ্গি নেন। এ পাঠের কেন্দ্রে থাকে কারবালার সেই পুরনো ফ্রেম: সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য আছে এবং সেই মূল্যকে পালিয়ে এড়িয়ে যাওয়া নৈতিকভাবে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতে পারে। এখানে শহীদ হওয়া মানে মৃত্যু কামনা করা নয়; শহীদ হওয়া মানে মৃত্যু সম্ভাব্য জেনে সত্যের অবস্থান থেকে না সরে যাওয়া। এ সূক্ষ্ম ফারাকটা বোঝা জরুরি, কারণ এ ফারাক না বুঝলে আমরা খুব সহজে ধর্মীয় ট্র্যাডিশনকে ‘মৃত্যু-ফেটিশ’ বলে ভুল পড়ে ফেলি বা উল্টো দিকে গিয়ে সবকিছুকে রোমান্টিসাইজ করে ফেলি।
এ ঘটনাটা শিয়া ট্র্যাডিশনকে ভবিষ্যতে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, আমার কাছে তার দুইটা সম্ভাব্য দিক আছে। একদিকে এমন মৃত্যু শিয়া জনপরিসরে নতুন করে ‘জুলুম বনাম প্রতিরোধ’ বয়ানকে তীব্র করতে পারে, বিশেষ করে যারা ইরানকে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখে তাদের মধ্যে। শোক এখানে শুধু কান্না নয়; শোক হলো রাজনৈতিক নৈতিকতার পুনর্নবীকরণ, ‘আমাদের পাশ কার, আমাদের শত্রু কে’ এ রেখা টানার কাজ। অন্যদিকে একই ঘটনা শিয়া সমাজের ভেতরেও ভাঙনকে প্রকাশ্য করতে পারে, কারণ শিয়া বিশ্ব একরকম নয়। অনেকেই ইরানি রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি বিরক্ত, অনেকেই আবার এটাকে রক্ষাকবচ ভাবে। ফলে ‘শহীদ’ বয়ান একদিকে সংহতি তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে ভিন্নমতকে আরো ধারালো করে তুলতে পারে, কারণ প্রতীকটা যত বড় হয়, তার মালিকানা নিয়ে তত বেশি প্রতিযোগিতা হয়। এ দ্বৈধতাই আঘাইয়ের কাজ থেকে আমার মনে সবচেয়ে বেশি বসেছে: একই প্রতীক একই সঙ্গে ঢাল ও তলোয়ার।
এখানে যুক্তরাষ্ট্র কোথায় ভুল করল। আমি বলব ভুলটা ছিল ‘শুধু’ সামরিক বা কৌশলগত নয়; ভুলটা ছিল সাংস্কৃতিক-থিওলজিক্যাল। যদি আপনি শিয়া শহীদ ট্র্যাডিশনের এ দীর্ঘ ইতিহাস এবং এর সামাজিক কার্যকারিতা মাথায় না রাখেন, আপনি ধরে নেবেন একটি ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ প্রতিপক্ষকে ভেঙে দেবে, রেজিমকে নৈতিকভাবে নিঃস্ব করবে, ভয় তৈরি করবে। কিন্তু শিয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা বড় অংশ এ ধরনের আঘাতকে উল্টোভাবে পাঠ করতে পারে: এটাকে তারা নতুন কারবালা হিসেবে দেখতে পারে, নতুন করে ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের সাক্ষ্য’ হিসেবে প্যাকেজ করতে পারে এবং নিজেদের জনসমর্থনকে নৈতিক ভাষায় পুনর্গঠন করতে পারে। সহজভাবে বললে, আপনি যদি এমন এক প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়েন যে ক্ষতিকে কেবল ক্ষতি হিসেবে দেখে না, ক্ষতিকে নৈতিক পুঁজি হিসেবেও কাজে লাগাতে পারে, তাহলে আপনার ‘কস্ট ইম্পোজ’ করা সব সময় প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফল দেবে না। আর এ ভুল-অনুমান নীতিনির্ধারণে বড় ঝুঁকি তৈরি করে, কারণ তখন আপনি প্রতিপক্ষের রেজিলিয়েন্সের উৎসকে ভুল জায়গায় খুঁজবেন। আমি মনে করি, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এ ধরনের সাংস্কৃতিক পাঠের ঘাটতি বহুদিনের, কিন্তু শিয়া শহীদ ট্র্যাডিশনের ক্ষেত্রে সেটা আরো বেশি ব্যয়বহুল। কারণ এখানে স্মৃতি কেবল স্মৃতি নয়, স্মৃতি হলো সংগঠনের শক্তি।
শিয়া শহীদ ট্র্যাডিশনের ভেতর আল্লাহর কাছে বিচার, ন্যায় এবং শেষ হিসাবের একটা স্থায়ী অনুভব কাজ করে। মানুষ যখন বলে ‘আমরা ন্যায়ের পক্ষে,’ সেটা কেবল এ দুনিয়ার কোর্ট-কাছারির ভাষা না; এটা পরকালীন নৈতিক হিসাবের ভাষাও। ফলে শোক, প্রতিশোধ, ধৈর্য, প্রতিরোধ, সবই ধর্মীয় নৈতিক শব্দভাণ্ডার থেকে শক্তি পায়। এ শক্তিকে না বুঝে যদি আপনি কেবল ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা ‘ডিটারেন্স’ ভাষায় যান, আপনি হয়তো সাময়িক কৌশলগত সুবিধা পাবেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আপনি প্রতিপক্ষকে এমন বয়ান-বস্তু দিয়ে দেবেন যা তাদের অভ্যন্তরীণ বৈধতা বাড়াতে পারে। বিশেষত যখন নেতা হত্যাকে শহীদ হওয়ার ধারাবাহিক ইতিহাসের মধ্যে বসিয়ে দেয়া যায়, তখন ‘নেতা হারানো’ কেবল দুর্বলতা থাকে না; সেটা রূপান্তরিত হয় উত্তরাধিকারের দাবি এবং নৈতিক উচ্চতার প্রতীকে।
আবার কারবালায় ফিরে যাই, কারণ শিয়া শহীদ ট্র্যাডিশন শেষ পর্যন্ত এ ফেরা থেকেই বাঁচে। ইমাম হাসান (আ.) এবং ইমাম হোসেনের (আ.) নাম যখন উচ্চারিত হয়, তখন সেটার পাশে যে সম্মানসূচক বাক্য লেখা হয়, সেটাও আসলে মনে করিয়ে দেয় এ গল্পগুলো কারো ব্যক্তিগত জীবনী নয়; এগুলো নৈতিক মাপকাঠি। এ মাপকাঠির সামনে দাঁড়িয়ে যে কোনো আধুনিক রাজনৈতিক মৃত্যু, বিশেষত রাষ্ট্র-সহিংসতার মাধ্যমে মৃত্যু, সহজেই ‘শহীদ’ ফ্রেমে টেনে নেয়া যায়, যদি জনসমাজ এবং রাষ্ট্র সেই ভাষাটা সক্রিয় করতে চায়। আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু নিয়ে শিয়া বিশ্বে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, সেটা এই ফ্রেমিংয়ের শক্তিই দেখায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত ভুলটা হলো এ ফ্রেমিংয়ের সম্ভাবনাকে নীতির হিসাবের ভেতর না রাখা, বা রাখলেও তাকে গৌণ ধরে নেয়া।
আসিফ বিন আলী: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ডক্টরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র