আর্থিক ক্ষতি লাঘব করতে বাস্তব জীবনে ইসলামী বীমার গুরুত্ব

উন্নত দেশগুলো অর্থনৈতিক আধিপত্যের মাধ্যমে নিজ প্রভাব-প্রতিপত্তি ধরে রাখতে চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে কোনো দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাংকিং ব্যবস্থার পাশাপাশি বীমা খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। প্রায় তিন হাজার বছর আগে দীর্ঘ স্থলপথ ভ্রমণ ও জলপথে নৌভ্রমণের মাধ্যমে ইউরোপীয়রা বীমা শিল্পের গড়াপত্তন করে। ইসলামের আবির্ভাবের দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রথমবারের মতো সাধারণভাবে ইসলামী বীমা ব্যবস্থার প্রচলন হয় এবং ক্রমান্বয়ে তা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটা এমনি একসময় ঘটে, যখন আরবের মুসলমান বণিকরা ভারত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নৌপথে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে থাকেন। তখন তারা দলবদ্ধভাবে যৌথ তহবিল গঠন করতেন এবং প্রয়োজনে এ তহবিল থেকে একে অন্যকে সহযোগিতা করা হতো। ফলে ব্যবসা পুনর্গঠন, পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নতি ও সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ও আর্থিক ক্ষতি লাঘব করতে বাস্তব জীবনে বীমার গুরুত্ব কম নয়। ইসলামী শরিয়াহ বিশারদ ও চিন্তাবিদরাও পারস্পরিক সহযোগিতা ও কল্যাণের জন্য ইসলামী বীমা ব্যবস্থা চালু করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশেও ইসলামী বীমার প্রসার ঘটতে শুরু করেছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ইসলামী বীমার জন্য নতুন আইন প্রয়োগ করতে চলেছে। প্রচলিত বীমার সঙ্গে ইসলামী বীমার কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। প্রচলিত বীমায় শরিয়াহর কোনো নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। পারস্পরিক কল্যাণ ও সহযোগিতাই এ বীমার প্রাথমিক উদ্দেশ্য। অন্যদিকে প্রচলিত বীমা মুনাফা অর্জনকে গুরুত্ব দেয়। ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় বীমাকারী ও বীমাগ্রহীতার মধ্যে প্রতিনিয়ত সুসম্পর্ক বজায় থাকে। প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় তা কম দেখা যায়। ইসলামী বীমা যেহেতু ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত সেহেতু এতে সব প্রকার লেনদেন ও বিনিয়োগে সুদ অবশ্যই পরিত্যাজ্য। প্রচলিত বীমায় সব প্রকার লেনদেন ও বিনিয়োগে সুদ বা রিবার সংস্পর্শ থাকে, এতে কোনো প্রকার বাধানিষেধ নেই। ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় ব্যক্তিগতভাবে মুনাফা লাভের প্রশ্ন ওঠে না। এটি সমবায়ভিত্তিক সংস্থা। প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় ব্যক্তিগতভাবে মুনাফা লাভের প্রশ্ন অপরিহার্য।

ইসলামী বীমা ব্যবস্থার সব কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা থাকে। বীমা নীতিমালায় অস্বচ্ছতা বা ঘারার উপাদান থাকে না। অন্যদিকে প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় অস্বচ্ছতা বা ঘারার উপাদান থাকে। ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় নীতিমালায় জুয়া কিংবা এ-সংক্রান্ত অন্য কোনো উপাদান থাকে না। প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় এ ধরনের উপাদান থাকতেও পারে বলে মনে করা হয়। ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় মানুষের কল্যাণের জন্য জাকাত বা সদকা তহবিল গঠন করা হয়। অন্যপক্ষে প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় ওই ধরনের কোনো তহবিল গঠনের বিধান নেই। ইসলামী বীমা শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালনার জন্য একটি শরিয়াহ কাউন্সিল গঠন করা হয়। প্রচলিত বীমা যেহেতু শরিয়াহভিত্তিক নয়, সেহেতু কোনো শরিয়াহ কাউন্সিল গঠন করার প্রশ্নই ওঠে না। ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় সহযোগী সব সদস্যরা লাভ-লোকসানের অংশীদার, যেহেতু এ বীমা ব্যবস্থা মুদারারা নীতিতে অংশীদারত্বের প্রথা ভিত্তিতে পরিচালিত। অন্যদিকে প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় এভাবে লাভ-লোকসানের অংশীদার এবং মুদারাবা নীতির কোনো ব্যবস্থা নেই।

ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় বিশেষ কয়েকটি সুবিধা বিদ্যমান যা এ-সংক্রান্ত ইসলামী শরিয়াহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রচলিত বীমা ব্যবস্থার সঙ্গে পার্থক্য সূচিত করে। ইসলামে সুদের লেনদেন ও কায়কারবার নিষিদ্ধ বিধায় ইসলামী বীমা ব্যবসার সুদ পরিহার করার ফলে ইসলামী বীমা গ্রহণকারী তথা পলিসি হোল্ডাররা উভয়েই হালাল মুনাফা তথা হালাল আয় অর্জনের পথ নিশ্চিত করে। এ বীমা ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী তথা পলিসি হোল্ডারদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা বিদ্যমান হেতু ইসলামী বীমা কোম্পানির উদ্যোক্তা ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে লাভ-লোকসানের হারাহারি বণ্টনের মাধ্যমে অংশীদারত্বের উপাদান বিদ্যমান, যা কিনা প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সঞ্চয়ই সমৃদ্ধি বহন করে। ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় অংশীদারত্বের উপাদান বিদ্যমান থাকায় সমাজের সর্বস্তরের জনগণ, কৃষিজীবী, পেশাজীবী, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী সবাই ইসলামী বীমা জীবন বীমা, সাধারণ বীমার পলিসি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হবেন। ফলে প্রিমিয়াম হিসাবে প্রদত্ত অর্থ বীমা তহবিলে সঞ্চিত হয়ে তহবিল গঠন ও তা বিনিয়োগে সহায়ক হবে। তার ফলে আর্থসামজিক উন্নয়নে যথাযথ অবদান রাখবে। এতদভিন্ন ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় শরিয়তসিদ্ধমতে বীমা ব্যবস্থা তথা বীমা ব্যবসা নিশ্চিতকরণ ছাড়াও ইসলামী ন্যায়নীতির ভিত্তিতে আহরিত সম্পদ মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের হাতে কুক্ষিগত না হয়ে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার ও পলিসিহোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ বণ্টনের ফলে সমাজে ন্যায়ানুগভাবে সম্পদের বণ্টন নিশ্চিত হবে।

তাই ইসলামী ইনসাফের ভিত্তিতে সমাজের সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রসার আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম।

মুহাম্মদ নুরুল আলম চৌধুরী: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

আরও