আলোকপাত

শুধু ইসলামী ব্যাংকেই নয় অন্যান্য ব্যাংকেও পারিবারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল

দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতে ইসলামী ব্যাংক আমানত ও গ্রাহকের আস্থায় একটি শক্তিশালী ও ভালো ব্যাংক ছিল। কিন্তু ব্যাংকটিকে ধ্বংস করেছে তার সম্পদ। তার সম্পদই এ ব্যাংকে শকুনদের ডেকে এনেছে।

দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতে ইসলামী ব্যাংক আমানত ও গ্রাহকের আস্থায় একটি শক্তিশালী ও ভালো ব্যাংক ছিল। কিন্তু ব্যাংকটিকে ধ্বংস করেছে তার সম্পদ। তার সম্পদই এ ব্যাংকে শকুনদের ডেকে এনেছে। ব্যাংকটির সম্পদ না থাকলে হয়তো তারা এখানে আসত না। এ ব্যাংকের পুরনো পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এস আলম গ্রুপকে বের করে দেয়া একটি সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

ইসলামী ব্যাংকের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা জ্যামিতিক হারে হয়েছে। এটা অবশ্যই বিস্ময়কর ব্যাপার। ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছিল। এ আস্থার কারণে তারা শহর, উপশহরে শাখা করার জন্য আমন্ত্রণ জানাত। গ্রাহকরা ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থাকে পছন্দ করতে শুরু করেছিল। দেশে ইসলামী ধারার ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় আইবিবিএল অগ্রদূত ছিল। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তাদের কার্যক্রম ও গ্রাহকের সেবা করাকে তারা ইবাদতের অংশ হিসেবে নিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে এ ব্যাংকের সফলতা দেখে দেশের অন্যান্য ব্যাংকও ইসলামিক ধারার ব্যাংকে রূপান্তর হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও ইসলামী ধারার নিয়মনীতিতে রূপান্তর হতে থাকে। এর সূত্রপাত করেছিল ইসলামী ব্যাংক।

১৯৭৫ সালে সৌদি আরবে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) যাত্রা করে এবং এই আইডিবির হাত ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা দ্রুত বিস্তার লাভ করতে থাকে। এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে কুয়েত, সেনেগাল, বাহরাইন, পাকিস্তান, ইরান, সুইজারল্যান্ড, আম্মান, জর্ডান, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশে ইসলামী ধারার ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রয়াস শুরু হয়। ১৯৮২ সালের নভেম্বরে আইডিবির একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে একটি ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করে। ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড নিবন্ধিত হয়। মূলত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে ‘ইসলামী’ ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। এ দ্রুত বর্ধনশীল খাতকে সংগঠিত করার জন্য ১৯৯০ সালে অ্যাকাউন্টিং ও অডিটিং সংস্থা (AAOIFI) খোলা হয়। ১৯৯৬ সালে সিটি ব্যাংকও ইসলামী ব্যাংক বিভাগ চালু করে এবং অন্য ব্যাংকগুলো শিগগিরই এ পথ অনুসরণ করে।

আইবিবিএলের যখন আনুমানিক ৬০-৭০ হাজার কোটি টাকা আমানত হলো, তখন জঙ্গিদের অর্থায়নের অভিযোগ তোলে একটি পক্ষ। সে পক্ষটি বিশেষ করে এস আলম গ্রুপ ও গংরা এ ব্যাংকের কিছু শেয়ার ক্রয় করে। এরপর তারা ব্যাংকের বোর্ডের চেয়ারম্যানকে পদত্যাগে বাধ্য করে। তারা কাউকে না জানিয়ে জোর করে বোর্ডের দখল নেয়। প্রকৃতপক্ষে এস আলম গ্রুপ ও তার গংরা ব্যাংকটি দখল করেছে। তাদের এ দখলে সহযোগিতা করেছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পদচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার।

এখনো ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। এজন্য যোগ্য, দক্ষ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের এ ব্যাংকের দায়িত্ব দিতে হবে। তারা যদি নিঃস্বার্থভাবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন, তাহলে ব্যাংকটি দ্রুত উন্নতি করবে। রাহুমুক্ত হলে ব্যাংকটির প্রতি মানুষের দ্রুত আস্থা ফিরে আসবে। তখন সবাই আবার এ ব্যাংকে ফিরে আসবে। নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে যারা এ ব্যাংকের টাকা লুণ্ঠন করেছে, তারা ঋণ নেয়ার সময় জামানত দেয়নি। ফলে লুণ্ঠন হওয়া টাকা উদ্ধার করা কঠিন। দেশের কোনো ব্যাংকে পরিবারের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কোনোভাবে কাম্য নয়। পারিবারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেলে তারা নামে-বেনামে ঋণের মাধ্যমে গ্রাহকের আমানত লুণ্ঠন করে। বিগত সরকারের আমলে শুধু ইসলামী ব্যাংকেই নয়, অন্যান্য ব্যাংকেও পারিবারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।

আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও আইবিবিএলের নতুন কর্তৃপক্ষে যারা আসবেন, তারা খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কাজ করবেন। যে খেলাপি ঋণ আদায় করা যাবে না তাদের শেয়ার বিক্রি করে সেখান থেকে আদায় করতে হবে। এর পরও যদি খেলাপিরা ঋণ পরিশোধ না করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে ফৌজদারি মামলা করতে হবে।

ইসলামী ব্যাংক বিপর্যয়ের জন্য তার পরিচালনা পর্ষদ দায়ী। কেননা পরিচালনা পর্ষদে যারা আছেন তারাই তো ব্যাংকের মালিক। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ামানুসারে, ব্যাংকের মালিক তার নিজের ব্যাংকের সঙ্গে কোনো ব্যবসা করতে পারবে না। অথচ সেই নিয়মটি লঙ্ঘন করেই তারা ব্যবসা করেছে। নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে তারা ব্যাংক লুটপাট করেছে।

শুরুতে ব্যাংকটি ভালো ছিল। মুনাফা লাভের জন্য ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ব্যাংকে যেসব বিদেশীর বিনিয়োগ ছিল তারাও কোনো লভ্যাংশ নেয়নি। তারা তাদের লভ্যাংশ ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনকে দিয়েছে। এছাড়া ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) অর্থায়ন করেছিল। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের না জানিয়ে বোর্ড সভা ভেঙে দিয়ে ক্যু করে ব্যাংকটি দখল করা হয়েছিল, সেজন্য তাদের মধ্যে ব্যাংকটির প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল। ক্রমান্বয়ে ব্যাংকটির প্রতি তাদের আস্থা কমতে থাকল। তারা ইসলামিক নিয়মনীতির অনুপস্থিতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব মারাত্মকভাবে প্রত্যক্ষ করল। এরপর তারা তাদের শেয়ার কম মূল্যে বিক্রি করে দিয়ে চলে যায়। এটি দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি করে।

এ ব্যাংকের নতুন পর্ষদের দায়িত্বে যারা থাকবেন তারা যদি ইসলামিক নিয়মনীতি অনুসরণ করেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে। তবে ইসলামিক নিয়মনীতি অনুসরণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অবশ্যই স্থায়ী হতে হবে। যদি প্রতি বছর সেগুলো পরিবর্তন ঘটে তাহলে তাদের রাজি করানো কঠিন হবে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যেহেতু তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে, তাই তাদের ফিরিয়ে আনাও সহজ হবে না।

একসময় রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আসত। কারণ এ ব্যাংকের প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব অমিরাতের আস্থা ছিল। তারা মনে করত, এ ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আছে। ব্যাংকটি গ্রাহকের সঙ্গে কোনো প্রতারণা করবে না। গ্রাহকের আস্থার কারণেই ইসলামী ব্যাংকের ১ লাখ কোটি টাকার আমানত হয়েছিল, যা দেশের বেসরকারি চার-পাঁচটি ব্যাংকের আমানতের সমান ছিল।

গত কয়েক বছর ইসলামী ব্যাংক সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভালো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। শুরুতে ব্যাংকের পরিচালকরা স্বাধীন ছিলেন, তারা তো ভালোভাবেই ব্যাংকটি চালিয়েছিলেন। যেসব শেয়ারদাতা ছিলেন তারাও এখন নেই। বিদেশী শেয়ারদাতারাও চলে গেছেন। আইবিবিএলের শেয়ারের ৮২ শতাংশই এস আলম গ্রুপের দখলে। নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে তারা ব্যাংকটিকে লুণ্ঠন করেছে। তারা ঋণখেলাপিও। ব্যাংকের মালিক হয়েও তারা নিজেরাই ব্যাংকে ব্যবসা শুরু করেছিল, যা নিয়মবহির্ভূত।

এ ব্যাংকে যারা ঋণখেলাপি এবং ব্যাংক লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা উচিত। আইবিবিএলের পর্ষদ পুনর্গঠিত হয়েছে। আশা করি, তাদের হাত ধরে ভবিষ্যতে ব্যাংকটি উন্নতি করবে। অন্য ইসলামী ব্যাংকগুলোও ভালো করবে, যা ক্ষতি হয়ে যাওয়ার তা হয়েছে। আইবিবিএলকে শক্তভাবে দাঁড়ানো উচিত। একটি লুণ্ঠিত ব্যাংক সরকারের সহায়তা নিয়ে কীভাবে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে, তার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা দরকার। ব্যাংকটির প্রতি মানুষের আস্থা আবারো ফিরে আসুক, সেই প্রত্যাশা।

আবু আহমেদ: অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

আরও