আলোকপাত

বিসিএস, ভারতের চন্দ্রযান ও আমাদের স্পারসো

আজকাল ফেসবুকে কিছু উক্তি আর তথ্য ট্রল হচ্ছে। এর একটি হচ্ছে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উক্তি, ‘কোনো বিজ্ঞানী নেই, গবেষক নেই, দার্শনিক নেই। যেদিকে তাকাবেন শুধু প্রশাসক।’ আর সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের চন্দ্রযান-৩-এর চাঁদে অবতরণ উপলক্ষে আরেকটি ট্রলে দেখা যায়, ভারত ও বাংলাদেশের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান পদের একটি তুলনামূলক চিত্র। যেখানে

আজকাল ফেসবুকে কিছু উক্তি আর তথ্য ট্রল হচ্ছে। এর একটি হচ্ছে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উক্তি, ‘কোনো বিজ্ঞানী নেই, গবেষক নেই, দার্শনিক নেই। যেদিকে তাকাবেন শুধু প্রশাসক।’ আর সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের চন্দ্রযান-৩-এর চাঁদে অবতরণ উপলক্ষে আরেকটি ট্রলে দেখা যায়, ভারত ও বাংলাদেশের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান পদের একটি তুলনামূলক চিত্র। যেখানে ভারতের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, ‘ইসরো’-এর প্রধান হিসেবে কর্মরত একজন মেকানিক্যাল কাম অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার, যিনি কিনা মহাকাশ গবেষণা তথা রকেট আর স্যাটেলাইট নিয়ে সারা জীবন ব্যয় করেছেন। তার বিপরীতে বাংলাদেশের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, ‘স্পারসো’-এর প্রধান পদে আসীন ছিলেন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একজন প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তা। ট্রলে এ তুলনামূলক চিত্রটি উপস্থাপনের পর সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে এজন্যই বাংলাদেশের পক্ষে কখনো চাঁদে যাওয়া সম্ভব নয়! 

বাংলাদেশের পক্ষে কখনো চাঁদে যাওয়া সম্ভব কিনা জানি না, বরং এ ধরনের কোনো চেষ্টা করাও অহেতুক অর্থ ও শ্রমের অপচয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে দেশের এ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, স্পারসোর কোনোই কাজ নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনেকগুলো ক্ষেত্রেই স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি ও তথ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যা মূলত সরবরাহ করতে পারে এই স্পারসো। যেমন নগর পরিকল্পনা, ভূমিরূপ পরিবর্তন, নদ-নদী পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, বনায়ন ও কৃষি গবেষণা, পরিবেশ দূষণ পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা, সামরিক পরিকল্পনা, যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে। তাছাড়া বাংলাদেশ এরই মধ্যে একটি স্যাটেলাইটের মালিক, আর তার নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও এ সংস্থাটিকে দেয়া উচিত ছিল। বিভিন্ন স্যাটেলাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ, বিচার-বিশ্লেষণ এবং তা ব্যবহারোপযোগী করে সময়ানুক্রমে সংরক্ষণ—এ কাজটি দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারলে সংস্থাটি দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। মূলত হাজারো বৈজ্ঞানিক গবেষণার উপাদানের সরবরাহক হতে পারত এ সংস্থা। অথচ আজকাল একটি ছোটখাটো গবেষণার জন্য আমাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছবি সংগ্রহ করতে হয়। 

শুধু যে স্পারসো, তা-ই নয় বাংলাদেশের অনেকগুলো বিশেষায়িত বিভাগের প্রধান পদে আছেন প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তা। ধীরে ধীরে তা বাড়ছে। পরিকল্পনা কমিশনে অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন লোকেরা ছিল। এখন প্রশাসনের আওতায়। ভবিষ্যতে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, স্বাস্থ্যের ডিজি বা প্রধান প্রকৌশলী পদে যদি তারা আসীন হওয়ার চেষ্টা করেন, অসম্ভব কিছু নয়। এক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন সংস্থাপ্রধানের পদটিকে প্রশাসনিক পদ মনে করেন। মন্ত্রী-সচিবের যেমন কোনো সংশ্লিষ্ট ডিগ্রির প্রয়োজন নেই, তেমনি তারাও। কিন্তু বিশেষায়িত সংস্থাগুলো পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত জ্ঞান সবচেয়ে আগে প্রয়োজন। ভারতের ‘ইসরো’-এর প্রধানকে অবশ্যই অনেক প্রশাসনিক কাজ করতে হয়। তবে সর্বাগ্রে তাকে মহাকাশ গবেষণা তথা নভোযান বিষয়ে জানতে হবে, নতুবা ‘ভিশনারি’ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া তারা মাত্র কয়েক দিনের জন্য প্রধান হয়ে আসেন, অনেকটা সময় কাটিয়ে চলে যান। বরং এক্ষেত্রে সংস্থা প্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন সংস্থায় কাজ করা একজন দক্ষ লোককে নিয়োগ দিয়ে, তার অধীন দু-একজন প্রশাসন ও হিসাববিজ্ঞানে বিশেষায়িত কর্মকর্তা রাখা যেতে পারে, যারা তাকে প্রশাসন ও হিসাব বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। কিন্তু তা না করে গণহারে সংস্থা প্রধানের পদে বাইরে থেকে লোক নিয়োগ কোনোভাবেই কাম্য নয়। এরই মধ্যে সরকারের পরিবেশ, দুর্যোগ, বিমান, পেট্রোবাংলা, ব্রিজ অথরিটি, ডিএমটিসিএল জাতীয় অনেক বিশেষায়িত সংস্থার প্রধান পদগুলো তাদের দখলে। 

এতে করে কার লাভ হচ্ছে। অবশ্যই সরকার বিব্রত হচ্ছে এবং বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে। জনগণ প্রকৃত সেবা পাচ্ছে না। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, পেশাজীবী সম্প্রদায় হতাশায় আক্রান্ত হচ্ছে। কারিগরি পেশার লোকজন গণহারে বিদেশ গমনের মাধ্যমে দেশ ‘ব্রেইন ড্রেইন’-এর শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই সংস্থাগুলোয় পেশাজীবীরা পূর্ণ উদ্যমে কাজের স্পৃহা হারাচ্ছেন। আবার ‘যেই দেশের যেই ভাও’—এই মত অনুসরণ করে গণহারে পেশাজীবীরা আজকাল প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারে যোগ দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে একটি পত্রিকায় দেখলাম, ‘৪০তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে ২৪৫ জনের মধ্যে ৫৫ জন বুয়েটের’। নিজ পেশা ছেড়ে দিচ্ছে ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির আকর্ষণে। 

মূলত সরকারের প্রশাসন ও পুলিশ এ দুই ক্যাডারকে অশেষ ক্ষমতা প্রদানসহ নানা সুবিধা দিয়ে আকর্ষণীয় করে তোলার প্রক্রিয়াটির সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। ঔপনিবেশিক শাসকরা, হাজার মাইল পেরিয়ে এসে এ ভারতবর্ষ শাসন করতে গিয়ে বুঝেছিলেন যে তাদের সুবিধাভোগী একটি সম্প্রদায় এখানে তৈরি করা গেলে শাসন কার্যক্রম অনেকটা সহজ হবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটি বিলুপ্ত হয়ে শাসক নয় বরং সেবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা ছিল জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা এ সরকারি অফিসগুলোর। কিন্তু বাস্তবে তারা আরো বড় শাসক ও বেশি সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত না থাকলে তারা আরো বেশি পেয়ে বসেন। কেননা নিজ থেকে কেউ তাদের ক্ষমতা আর আরাম-আয়েসের জীবন ছেড়ে দিতে রাজি হবেন না। কোনো এক দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি বড় ধরনের সংস্কারের মাধ্যমে হয়তো একটি জনবান্ধব সরকারি প্রশাসন সৃষ্টি করা সম্ভব ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা কখনই হয়নি। 

তবে বিশেষায়িত সংস্থাগুলো নিজেদের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও যে সবসময় ভালো চলছে তাও কিন্তু নয়। স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, টেলিফোন, রেল, বিমান বা সরকারি ব্যাংক যার মাধ্যমেই চলুক, কোনো সংস্থাই জনমানুষকে ভালো সেবা দিতে পারছে বলে মনে হয় না। ভালো চলছে না অজস্র সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানও। ভাবুন একবার দেশে শুধু সরকারি টেলিফোন সংস্থা টিঅ্যান্ডটি আছে। একটি লাইন পেতে আপনার জুতার তলা ক্ষয়ে শেষ, তারপর সারা জীবনের ভোগান্তি বাকি। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এখন তা পাচ্ছেন মাত্র ১ ঘণ্টায়। একইভাবে সরকারি ব্যাংক বনাম বেসরকারি ব্যাংক, সেবার মানে বিস্তর পার্থক্য। এক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে জনগণকে ভালো সেবা দিতে চাইলে অনেকগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রেগুলেটরি সংস্থার আওতায় এনে বেসরকারীকরণ অথবা সরকারি-বেসরকারি বা পিপিপির মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। মোদ্দা কথা, এ নিয়ে গবেষণাও করা প্রয়োজন যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন ধরনের ব্যবস্থা সবচেয়ে ভালো। 

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি জ্ঞানভিক্তিক সমাজ গঠন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। সর্বোপরি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অন্যতম অনুষঙ্গ প্রযুক্তির বিস্তার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ একটি পেশাজীবী সম্প্রদায় এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইংরেজ আমলের প্রশাসনিক কাঠামোয় একটি আমলাভিত্তিক সরকার ব্যবস্থা এর কতটা অর্জনে সক্ষম তা প্রশ্নবিদ্ধ। পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য তাই একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন। 

ড. মো. সিরাজুল ইসলাম: অধ্যাপক, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও পরিচালক, সেন্টার ফর ইনফ্রাস্ট্রাকচার রিসার্চ অ্যান্ড সার্ভিসেস, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও