কৃষি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড

বারবার আগুন লাগলেও সমাধান কি চেয়েছি?

কেন বারবার সংঘটিত হচ্ছে অগ্নিকাণ্ড—প্রশ্নটি সবার মুখে এবং উত্তরটাও জানা। কিন্তু প্রতিকারের উদ্যোগ যেন নেই কোনো তরফ থেকে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ডিএনসিসির ভাষ্যমতে, এতে ৩১৭টি দোকানের মধ্যে ২১৭টি দোকান সম্পূর্ণ পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে। এতে ৩৫০-৪০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্নিদুর্ঘটনা নিয়ে কথা বলার আগে দেশে সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া বড় কয়েকটি অগ্নিদুর্ঘটনার কথা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ২০০০ সালের নভেম্বরে নরসিংদীর চৌধুরী নিটওয়্যার লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৫৩ জন, ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে নরসিংদীর শিবপুরে একটি গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৪৮ জন, ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের কেডিএস গার্মেন্টসে নিহত ৫৫ জন, একই বছর চট্টগ্রামেরই আরিনা টেক্সটাইলে নিহত ৬৪ জন, ২০০৭ সালে ও ২০১৪ সালে কারওয়ান বাজারের বিএসইসি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ২০১০ সালের ডিসেম্বরে আশুলিয়ার হা-মীম গ্রুপে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৩০ জন, ২০১০ সালের জুনে ঢাকার নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১১৯ জন, ২০১২ সালের নভেম্বরে আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১১৩ জন, ২০০৯ সালের মার্চ ও ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে অগ্নিকাণ্ড, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে গাজীপুরের ট্যাম্পাকো ফয়েলসে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৩৫ জন, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার ডিএনসিসি মার্কেটে আগুনে মার্কেট ভবন ধস, ২০১৯-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড, যেখানে হাসপাতালও রোগীদের জন্য নিরাপদ নয়, একই মাসের ২১ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৭৮ জন, ২৮ মার্চ ২০১৯ তারিখে বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিদুর্ঘটনায় নিহত ২৫ জন, ২০২২ সালের জুনে চট্টগ্রামের বিএম কনটেইনার ডিপোর ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিহত ৫১ জন আর এ বছরের ৪ এপ্রিল বঙ্গবাজারে আর ১৫ এপ্রিল নিউ মার্কেটের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৩০০ কোটি টাকার মতো ক্ষতি। উপরোক্ত তালিকা বিশ্লেষণ করে বলাই যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অগ্নিদুর্ঘটনার প্রভাব প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কোনো অংশেই কম নয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫ সালে দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ১৭ হাজার ৪৮৮টি, ২০১৬ সালে ১৬ হাজার ৮৫৮টি, ২০১৭ সালে ১৮ হাজার ১০৫টি, ২০১৮ সালে ১৯ হাজার ৬৪২টি, ২০১৯ সালে ২৪ হাজার ৭৪টি, ২০২০ সালে ২১ হাজার ৭৩টি, ২০২১ সালে ২১ হাজার ৬০১টি এবং ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ২৪ হাজার ১০২টি। অগ্নিকাণ্ডে এ আট বছরে অগ্নিযোদ্ধা ও জনসাধারণসহ মোট প্রাণহানির সংখ্যা ৯৫১ আর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকারও বেশি। ফলে বলাই বহুল্য যে অগ্নিকাণ্ড সরাসরি ব্যবসায়ীদের যে আর্থিক ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে তা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশও বটে।

কেন বারবার সংঘটিত হচ্ছে অগ্নিকাণ্ড—প্রশ্নটি সবার মুখে এবং উত্তরটাও জানা। কিন্তু প্রতিকারের উদ্যোগ যেন নেই কোনো তরফ থেকে। মূলত অগ্নিদুর্ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করা, বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ না করা ও ভবনের চারদিকে পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা না রাখা, সর্বোপরি জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করাই বারবার একই ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এছাড়া ফ্লোর ইনটেরিয়র ডিজাইনের সময় অগ্নিঝুঁকির বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয় না। ফুটপাত দখল করে চলাচলের পথকে সংকীর্ণ করে ফেলা হয়। অধিকাংশ সুউচ্চ ভবনে জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি না থাকা জানমালের ক্ষতি বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ। অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ব্যবহারকে অতিরিক্ত ব্যয় বলে মনে করা হয়। অধিকাংশ সুউচ্চ ভবনের ফায়ার অ্যালার্ম কাজ করে না, ফলে যতক্ষণে ভবনের লোকজন অগ্নিকাণ্ডের খবর পান ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। ২০১৯ সালে এফআর টাওয়ারের ঘটনায় এমনটিই দেখা গেছে। অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা বলা থাকলেও তা করা হয় না। সুউচ্চ ভবনগুলোতে অগ্নিনির্বাপণের জন্য বিশেষ জলাধার নির্মাণের আইন থাকলেও অধিকাংশ ভবনেই তা নেই। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় পানির সহজলভ্যতা। উপরোক্ত অবকাঠামোগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরই একটি ভবনে ইউটিলিটি সংযোগের অনুমতি দেয়ার বিধান থাকলেও কখনই তা মানা হয়নি। ফলে দেশের সুউচ্চ ভবনগুলো পরিণত হচ্ছে একেকটি মৃত্যুকূপে। উপরোক্ত বিষয়গুলোর পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলোও জড়িত। যেমন অগ্নিকাণ্ডের উৎস গ্যাসের চুলা, ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস ও বৈদ্যুতিক লাইন, ত্রুটিপূর্ণ ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ব্যবহার, দাহ্য বস্তুর যথেচ্ছ ব্যবহার, আবাসিক এলাকায় কেমিক্যালের দোকান ও গুদাম, নিয়মিত ফায়ার সেফটি চেকিং না করানো ইত্যাদি। পরিসংখ্যান বলছে, সিংহভাগ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট আর রান্নার চুলা থেকে।

অগ্নিকাণ্ড থেকে বাঁচতে প্রথমেই প্রয়োজন সচেতনতা। জানমালের ক্ষয়ক্ষতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিহ্নিত কারণগুলো সমাধানের চেষ্টা করা। সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনা ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় ভবনের ইউটিলিটি সার্ভিসের সংযোগ না দেয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পুরান ঢাকায় আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম উচ্ছেদের অনুরূপ উদ্যোগ সারা দেশেই নেয়া প্রয়োজন। আবাসিক, বাণিজ্যিক আর শিল্পাঞ্চলকে সম্পূর্ণ পৃথক করে ফেলতে হবে। কারণ বসতবাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন আর শিল্প-কারখানার অগ্নিঝুঁকি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা একরকম নয়। এতে অগ্নিনিরাপত্তা সমন্বয় করা সম্ভব হবে। ব্যাংক, বীমা, বড় বড় করপোরেট বিল্ডিংয়ে কাগজপত্র ও দাহ্য পদার্থের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। এসব কাগজপত্র-ফাইলের স্তূপ নির্দিষ্ট সময় পর পর পরিষ্কার বা রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে আমরা নিজেদের নিরাপদ রাখার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও অবদান রাখতে পারি। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রতিবছর সুউচ্চ ভবনগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে লাইসেন্সিংয়ের আওতায় আনতে হবে, যা আইনেই বলা আছে। অন্যথায় ভবনের ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও বড় অংকের জরিমানার বিধান থাকবে। যেসব ভবনে নোটিস জারি করার পরও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে না সেসব ভবনে ফায়ার সার্ভিস কোনো সেবা প্রদান করবে না মর্মে খোলা নোটিস জারি করতে হবে। এতে ভবন মালিক ও ভবন ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান উভয়েই অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে বাধ্য হবেন। পদক্ষেপটি কঠিন হলেও এখন তা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। রাজধানীর বস্তিগুলোর দিকেও নজর দিতে হবে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রতিরোধকল্পে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন-২০০৩ এবং অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ বিধিমালা ২০১৪ প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনে সাততলা বা তদূর্ধ্ব ভবনকেই বহুতল ভবন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ভবনে মালগুদাম ও কারখানা স্থাপন করতে হলে অবশ্যই ফায়ার সার্ভিস মহাপরিচালকের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে অগ্নি প্রতিরোধ, নির্বাপণ ও এতৎসম্পর্কিত নির্ধারিত বিষয়াদির ক্ষেত্রে মহাপরিচালকের ছাড়পত্র ছাড়া ভবনের নকশা অনুমোদন বা সংশোধন করা যাবে না। লাইসেন্স ছাড়া মালগুদাম বা কারখানা স্থাপনকারীকে অন্যূন তিন বছর ও লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গকারীকে অন্যূন ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধানও আইনে বলা রয়েছে। বিধিমালার ফায়ার ফাইটিং ফ্লোর প্ল্যান বহুতল ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাদি, জরুরি নির্গমন সিঁড়ি ও বিকল্প সিঁড়ি, লিফট ও ফায়ার লিফট, ডিটেকশন সিস্টেম, অ্যালার্মিং সিস্টেম, ইমার্জেন্সি লাইট, এক্সিট সাইন, ফায়ার ফাইটিং পাম্প হাউজ, হোজ কেবিনেট, স্প্রিংকলার হেড, ওয়াটার স্প্রে প্রজেক্টর হেড, সেফটিলবি, ফায়ার রেটেড ডোর, ভেন্ট, এভিয়েশন লাইট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা আছে, যা দেশের ৯৫ শতাংশ বাণিজ্যিক ও শিল্প ভবনে অনুপস্থিত। এর চেয়ে ভয়াবহ বিষয় আর কী হতে পারে?

প্রতিবার অগ্নিদুর্ঘটনার পর উপরোক্ত বিষয়গুলো আলোচনায় এলেও পরে সেগুলো আর আলোর মুখ দেখে না। অনেক ক্ষেত্রেই পুরনো ভবনগুলো এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যা আর সংস্কারের সুযোগই নেই। কিন্তু যেগুলো সংস্কারযোগ্য সেগুলোও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। আর নতুন ভবন নির্মাণেও যথাযথ বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষণীয় নয়।

সাজ্জাদ হোসেন রিজু

ব্যাংক কর্মকর্তা

আরও