শরৎ আসে কাশের বনে/পদ্মা নদীর কূলে, সাদা মেঘে আকাশ ঢাকা/ জ্যোৎস্না জুঁই ফুলে। গত ২১ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মাধ্যমে মা দুর্গার আগমন ঘটে স্বামীগৃহ পৃথিবীতে। দুর্গা পূজা বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসবের অপেক্ষায় সারা বছর প্রহর গনেন সনাতন ধর্মাবলম্বী পূজারীরা। এ বছর মা দুর্গা মাতৃগৃহ কৈলাস থেকে হাতিতে চড়ে স্বামীগৃহে আসেন। আবার দোলায় চড়ে মাতৃগৃহে গমন করবেন। হাতিকে দেবীর উৎকৃষ্ট বাহন বলা হয়। এ বাহন শুভ ফলদায়ক। কারণ এটি ভালো বৃষ্টিপাত, অধিক ফসল ও দেশের সুখ ও শান্তি নিশ্চিত করে। অন্যদিকে দেবীর দোলায় গমন অশুভ সংকেতের পরিচায়ক। এটি পৃথিবীতে মহামারী, মড়ক, ভূমিকম্প, খরা ও অতিমৃত্যুর মতো ভয়াবহ দুর্যোগের ইঙ্গিত বহন করে।
দুর্গা পূজা শুধু একটি উৎসব নয় বরং একটি ভালো ও মন্দের মধ্যকার যুদ্ধের প্রতীক, যেখানে দেবী দুর্গা অসুর রাজাকে পরাস্ত করেন। বাঙালি হিন্দুদের জন্য এটি সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব এবং বিশ্বাস ও ঐক্যের এবং বীরত্বের প্রতীক। দুর্গা পূজাকে বলা যায়, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির বিজয়কে উদযাপন। মহিষাসুরকে বধ করার মাধ্যমে দেবী দুর্গা বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করেন, যা এ পূজার মূলমন্ত্র। এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি অঙ্গিকার, ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার সম্মিলিত রূপ।
শারদীয় দুর্গা পূজা বর্তমানে বাঙালির সবুজ ভুবন পেরিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। লাভ করেছে সর্বজনীন রূপ। আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, মরিসাস, ফিজি, কুয়েত অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হচ্ছে দুর্গা পূজা। ওমানে বসবাসকারী হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নিজেদের দেশের মতোই দুর্গা পূজা পালন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে দুর্গা পূজার আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকে না হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। দুর্গা পূজা ভারত ও বাংলাদেশসহ অন্তত ৩০টির বেশি দেশে পালিত হয়। এসব পূজার মূল উদ্যোক্তা হলো ভারত ও বাংলাদেশের প্রবাসী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। চীনের হংকং, সাংহাই ও জাপানের টোকিওতেও বাঙালিরা দুর্গা পূজা উদযাপন করে। এছাড়া ইতালি, স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোয় প্রবাসীরা দুর্গা পূজার আয়োজন করে, যেখানে বিশ্বশান্তির জন্য প্রার্থনা করা হয়।
পুরাকালে দেবতারা মহিষাসুরের অত্যাচারে স্বর্গ থেকে বিতারিত হন। তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শরীর থেকে আগুনের মতো তেজরশ্মি একত্রিত হয়ে বিশাল আলোক পুঞ্জের সৃষ্টি করে। ওই আলোকপুঞ্জ থেকেই আবির্ভূত হন মা দুর্গা। দিব্য অস্ত্রে সজ্জিত দেবী দুর্গা অসুরকুলকে বধ করে স্বর্গ তথা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে শান্তি স্থাপন করেন। দেবী দুর্গা মহামায়া, মহাকালী, মহালক্ষ্মী, মহাস্বরসতী, শ্রীচণ্ডি প্রভৃতি নামেও পরিচিত। মা দুর্গা শত্রুর কাছে, পাপীদের কাছে, অত্যাচারীদের কাছে যেমন এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম তেমনি মর্ত্যের মানুষের কাছে স্নেহময়ী জননী। ত্রেতা যুগে রামচন্দ্র ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে দুর্গা পূজা করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতসহ সারা পৃথিবীতে রামচন্দ্র কর্তৃক উদযাপিত পূজা পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়। রামচন্দ্র শরৎকালে যে পূজা করেন সেটাকে বলা হয় অকাল বোধন। অকালবোধন হলো নিদ্রিত সময়ে দেবতাদের জাগ্রত করা। অসুর বধ করে মা দুর্গা হলেন মহিষাসুরমর্দিনী। তিনি আদ্যশক্তি মহামায়া। পশুরাজ সিংহ দেবীর বাহন। সঙ্গে দুই পুত্র সেনাপতি কার্তিক ও গণেশ অন্য দুই পাশে দুই দেবী লক্ষ্ণী আর স্বরসতী।
দেবী প্রতি বছর আশ্বিনের পঞ্চমী তিথিতে স্বামীগৃহ কৈলাস থেকে বেড়াতে আসেন বাবার বাড়িতে। দেবীর তিনটি চোখ আছে বলে তাকে বলা হয় ত্রিনয়নী। বাম চোখ চন্দ্র, ডান চোখে সূর্য এবং কপালের চোখ অগ্নিকে নির্দেশ করে। দেবীর ডানদিকের পাঁচ হাতের অস্ত্রগুলো হলো—যথাক্রমে ত্রিশূল, খড়্গ, চক্র, শঙ্খ ও পদ্ম ইত্যাদি এবং বাম দিকের পাঁচ হাতের অস্ত্রগুলো হলো ঢাক, ধনুক, পাশ, অঙ্গুশ ও দুধার। দেবীর অসীম শক্তির প্রতীক হচ্ছে এসব অস্ত্র। বিজয় দশমী হলো ঐক্যের প্রতীক ন্যায় প্রতিষ্ঠার দিন। বিজয়ার দিনে অনেকেই পূর্বশত্রুতা ভুলে আলিঙ্গন করেন এবং বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেন। তাই পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এমনকি বৈশ্বিক সংহতি রক্ষার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় দুর্গা পূজার গুরুত্ব অপরিসীম।
এ বছর সারা দেশে আনুমানিক ৩১ হাজার ৪৬১টি মণ্ডপ-মন্দিরে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বছর দেশে ৩২ হাজার ৪০৮টি দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সে হিসাবে এবার ৯৪৭টি দুর্গা পূজা কম হয়েছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর মাঠ জরিপ কমিটি এ তথ্য জানিয়েছে। শারদীয় দুর্গা পূজা উপলক্ষে সম্প্রতি (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠন দুটির বক্তব্যে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, প্রস্তুতি নিতে অপারগতা ও বন্যার কারণে দুর্গত এলাকার কোথাও কোথাও পূজারিরা দুর্গা পূজা আয়োজন করতে পারেননি। সংগঠন দুটির হিসাবে ঢাকা মহানগরে এবার ২৫২টি মন্দিরে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বছর ঢাকা মহানগরীতে অনুষ্ঠিত দুর্গা পূজার সংখ্যা ছিল ২৪৮টি। সে হিসাবে এবার রাজধানী ঢাকায় পূজার সংখ্যা বেড়েছে চারটি। অন্যদিকে ময়মনসিংহ মহানগরীতে এবার ১২৯টি এবং সমগ্র জেলায় প্রায় ৬৯০টি মন্দিরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গা পূজা।
দুর্গা পূজার গুরুত্ব: বাঙালি সংস্কৃতিতে দুর্গা পূজার তাৎপর্য অপরিসীম। এটি পরিবারগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা জোগায়। শারদীয় দুর্গোৎসব সমাজে সম্মিলিত চেতনাকে প্রতিফলিত করে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করে। মা দুর্গা কর্তৃক অসুর বধের কাহিনী মানুষকে সমাজের অসুররূপী নির্যাতনকারীদের, নারীশিশু নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং ২৪-এর জুলাই যুদ্ধের মতো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের অনুপ্রেরণা জোগায়।
এবার পূজা উপলক্ষে সরকারি কর্মচারীরা চারদিনের ছুটি উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের বহুদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবার ১ অক্টোবর নির্বাহী আদেশে বুধবার এবং ২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বিজয় দিবসে সরকারি ছুটি। আর পরের দুইদিন যথাক্রমে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় ছুটির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে চারদিন। চারদিন ছুটি হওয়ার কারণে সনাতন ধর্মাবলম্বী সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নিজ নিজ বাড়িতে গিয়ে মা, বাবা, ভাই-বোন ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দুর্গা পূজা উপভোগ করে নির্বিঘ্নে কর্মস্থলে ফিরে আসতে পারবেন। ফলে এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্গা পূজা উপলক্ষে ছুটি বাড়ানোর দাবির কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে।
আমাদের কথা হলো, কুমিল্লার কান্দিপাড়ায় ২০২১ সালে দুর্গা পূজাকে কেন্দ্র করে হনুমানের হাতে পরিত্র কোরআন শরিফ রেখে এবং রংপুরের পীরগঞ্জের চতরার মাঝিপাড়ায় একটি মিথ্যা ফেসবুক আইডিকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাংচুর, বাড়িঘর, দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ, মূল্যবান আসবাবপত্র এবং গবাদি পশু ছিনিয়ে নেয়ার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটুক—এটা কারো কাম্য হতে পারে না। আমরা চাই জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সমাজের সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে আনন্দঘন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রতিবছর শারদীয় দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হোক। অসুরদের রাজা মহিষাসুর বধ ও যুদ্ধজয়ের আনন্দে ভরে উঠুক আমাদের এ সবুজ সুন্দর পৃথিবী নামের গ্রহটি।
নিতাই চন্দ্র রায়: সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন