আলোকপাত

সংঘাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা

মানুষের স্থানান্তরের ঘটনাকে সাধারণত আন্তর্জাতিক অভিবাসন হিসেবে দেখা হয়—অর্থাৎ এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে যাওয়া। কিন্তু মানুষ তাদের নিজের দেশের ভেতরেও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে বাধ্য হয়।

এ প্রক্রিয়ায় তারা তাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যাকে বলা হয় অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষ হলো তারা যারা সংঘাত, সহিংসতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। প্রতি বছর আরো বেশিসংখ্যক মানুষ পালিয়ে যাওয়ায় পৃথিবীতে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। প্রতি বছরের এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরো মানুষ, যারা বহু বছর বা এমনকি দশক ধরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় বসবাস করছেন এবং এখনো তাদের অবস্থার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির পেছনে প্রধান দুটি কারণ হলো সংঘাত-সহিংসতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ২০২৪ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে ৮৩ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিজ দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত ছিল। এর মধ্যে ৭৪ মিলিয়ন মানুষ সংঘাত ও সহিংসতার কারণে এবং ৯ মিলিয়ন মানুষ দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গত এক দশকে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এ সংখ্যা ২০১৫ সালে ছিল ৪১ মিলিয়ন, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে নজিরবিহীন ৮৩ মিলিয়নে। শুধু ২০২৪ সালের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ওই বছর বিশ্বজুড়ে মোট ৬৬ মিলিয়ন অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০ মিলিয়ন সংঘাত ও সহিংসতার কারণে এবং ৪৬ মিলিয়ন দুর্যোগের কারণে ঘটেছে।

অঞ্চলের হিসেবে উপসাহারীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ রয়েছে—প্রায় ৩৯ মিলিয়ন। এর মধ্যে অধিকাংশ, অর্থাৎ ৩৩ মিলিয়ন মানুষ সংঘাত ও সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত। এরপর রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা, যেখানে মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১৭ মিলিয়ন, যার মধ্যে ১৬ মিলিয়নেরও বেশি সংঘাত ও সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত।

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বলতে বছরে ঘটে যাওয়া একটি জোরপূর্বক স্থানান্তরকে বোঝায়। একই ব্যক্তি একাধিকবার স্থানান্তরিত হতে পারেন এবং প্রতিটি ঘটনাই আলাদাভাবে গণনা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ কেউ সংঘাত থেকে পালিয়ে একটি আশ্রয় কেন্দ্রে গেলে পরে যদি সেই আশ্রয় কেন্দ্রে আক্রমণ হয় বা ভূমিকম্প, বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগ আঘাত হানে, তবে তাকে আবার পালাতে হতে পারে। গাজা উপত্যকাসহ বিশ্বের অনেক জায়গায় মানুষকে বছরে একাধিকবার পালাতে হয়েছে, কারণ সংঘাতের এলাকা পরিবর্তিত হয়েছে। এতে তাদের ঝুঁকি বেড়েছে এবং নতুন করে জীবন গড়ার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে সংঘাত, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তন একত্র হয়ে সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের ওপর সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, লেবানন, ফিলিস্তিন, সুদান ও ইউক্রেনে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আফগানিস্তান, কলম্বিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনের মতো দেশে দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকা কোটি কোটি মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও জীবিকার ক্ষতি হওয়ার ফলে অনেক মানুষ বছরের শেষেও স্থায়ী সমাধান খুঁজে পায়নি এবং বাস্তুচ্যুত অবস্থায়ই ছিল।

বাংলাদেশে মানুষের অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর দুটি কারণে ঘটে—আকর্ষণ শক্তি এবং বিকর্ষণ শক্তি। আকর্ষণ শক্তি মানুষকে শহরের দিকে আকৃষ্ট করে—যেমন ভালো অর্থনৈতিক সুযোগ বা শহুরে জীবনের আকর্ষণ। শিশুদের ভালো শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং শহরে তুলনামূলক নিরাপত্তার ধারণাও গ্রাম থেকে শহরে যাওয়ার বড় কারণ। এক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য হয়ে নয়, বরং নিজের ইচ্ছায় স্থানান্তরিত হয়।

কিন্তু সেই সঙ্গে কিছু বিকর্ষণ শক্তি আছে, যা মানুষকে দেশের ভেতরে অন্যত্র যেতে বাধ্য করে। এর মধ্যে রয়েছে মৌসুমি বেকারত্ব, জীবিকার অনিশ্চয়তা, উচ্চ দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বেড়ে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন ও আবাদি জমির ক্ষতি এবং বসতবাড়ির ধ্বংস। এসব কারণে মানুষ তাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যেমন বাংলাদেশের কিছু এলাকা বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে প্রতি বছর অনেক মানুষ কাজ ও জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় মৌসুমি খাদ্য সংকট দেখা দেয়, যা কখনো কখনো দুর্ভিক্ষের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

বাংলাদেশে দুর্যোগজনিত বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়ে ২০২৪ সালে ২ দশমিক ৪ মিলিয়নে পৌঁছেছে, যা ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে দেশের অর্ধেকের বেশি দুর্যোগজনিত বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে বর্ষাকালের বন্যার কারণে। ওই বছরের বর্ষার বন্যায় প্রায় ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষ স্থানান্তরিত হয়েছে, বিশেষ করে সিলেট বিভাগে, যেখানে গত জুনেই ৭ লাখ ২৩ হাজার মানুষের স্থানান্তর ঘটেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপরিবেশ্য ভূমি আচ্ছাদন এবং বন্ধ ড্রেনেজ খাল বন্যার তীব্রতা বাড়িয়েছে।

এ পরিস্থিতি আরো খারাপ করেছে ঘূর্ণিঝড় রেমাল। এটি প্রবল বৃষ্টি ও ঘণ্টায় প্রায় ১১১ কিলোমিটার বেগের বাতাস নিয়ে আসে, যার ফলে জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় এবং অভ্যন্তরীণ বন্যা সৃষ্টি হয়। ফলে প্রায় ১ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষ স্থানান্তরিত হয়, যার প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল আগাম সরিয়ে নেয়া। স্থানীয় ও জাতীয় কর্তৃপক্ষ আগাম সতর্কবার্তা প্রচার করে এবং ৯ হাজারের বেশি জরুরি আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপন করে। অন্য স্থানান্তরগুলো ঘূর্ণিঝড় চলাকালে ঘটেছে, বিশেষ করে বরিশাল, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা দেশে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং গত বছরের শেষে ১ লাখ ৭২ হাজার মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় ছিল।

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি শুধু মানবিক সংকট নয়; এটি একটি স্পষ্ট উন্নয়ন ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যা বর্তমানে যতটা মনোযোগ পাচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ প্রয়োজন। শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। মানবিক দিক থেকে অভ‍্যন্তরীণ অভিবাসন মানুষকে শেকড়চ‍্যুত করে। একজন বাস্তুহারা মানুষ শুধু তার ভিটেমাটিই হারায় না, সে হারায় তার ইতিহাস—তার নিজের এবং সেই সঙ্গে পরিবারের। সে হারায় তার সামাজিক ও মানবিক বন্ধন, তার পারিপার্শ্বিকতা; তার পরিবেশও অন্তর্হিত হয় বাস্তুচ‍্যুতির সঙ্গে সঙ্গে। শেকড় হারানোর মানবিক ও মানসিক যন্ত্রণা বড় তীব্র। মানুষ তখন শেওলার মতো ভেসে বেড়ায় এঘাটে-ওঘাটে। 

কিন্তু অভ‍্যন্তরীণ অভিবাসনের একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মাত্রিকতাও আছে। অভ‍্যন্তরীণ অভিবাসনের একটি বড় চালিকাশক্তি হচ্ছে সংঘাত ও সন্ত্রাস। একটি দেশে রাজনৈতিক কারণে গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে যুদ্ধ-সংঘাত বেধে যায়। তার হাত ধরেই আসে সন্ত্রাস। নির্যাতিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠী প্রাণের মায়ায় বাড়িঘর ছেড়ে পথে নামে। অভ‍্যন্তরীণ বাস্তুচ‍্যুতির অর্থনৈতিক কারণগুলোও অত‍্যন্ত জোরালো। দারিদ‍্র‍্য, বঞ্চনা ও বিত্তহীনতা সে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে। বঞ্চনার বিস্তার ও গভীরতা মানুষকে বাঁচার তাগিদে এক জায়গা থেকে অন‍্য জায়গায় নিয়ে যায়। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, কাজের সুযোগের অভাব মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে অভ‍্যন্তরীণ অভিবাসনের। জলবায়ুর পরিবর্তন যখন নানান জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতির কর্মকাণ্ডকে রুদ্ধ করে দেয়, তখন এসব মানুষ পরিবেশ-শরণার্থী হয়ে পড়ে এবং অভ‍্যন্তরীণ অভিবাসন ভিন্ন তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।

বাস্তুচ্যুত মানুষকে টেকসই সমাধান দিতে সরকারকে এমন নীতি ও পদক্ষেপ নিতে হবে যা সংঘাত নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে, দারিদ্র্য ও দুর্যোগের ঝুঁকি কমাবে এবং মানুষকে তাদের নিজ এলাকায় ফিরে যেতে, অন্যত্র পুনর্বাসিত হতে বা নতুন এলাকায় সমাজের সঙ্গে একীভূত হতে সহায়তা করবে।

ভবিষ্যতে নীতি ও কার্যক্রম নির্ধারণের জন্য বাস্তুচ্যুতি-সংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। সংক্ষেপে এ সমস্যা মোকাবেলায় তিনটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি—নীতির সমন্বয়, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার বজায় রাখা। আমাদের মনে রাখতে হবে, নিষ্ক্রিয় থাকার মূল্য ক্রমেই বাড়ছে এবং এর মাশুল দিচ্ছেন বাস্তুচ্যুত মানুষ। এ ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত স্পষ্ট—এখন সময় এসেছে এ তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে বাস্তুচ্যুতি প্রতিরোধ করা, পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা এবং মানুষের জীবনকে গড়ে তোলার।

সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

আরও