জুলাই গণ-অভ্যুত্থান

তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ আর সংযোগের দরজাটা খুলে রাখুন

গত বছরের আগস্টের প্রথম দিক। সারা দেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান তখন তুঙ্গে। সন্ধ্যা নেমেছে। আমাদের সন্তানরা তখনো পথে-ঘাটে, সড়ক ও রাস্তায়, মাঠে-প্রান্তরে সংগ্রামরত। একটি জেলা শহরে নয় দফা দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীদের একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল চলছে।

গত বছরের আগস্টের প্রথম দিক। সারা দেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান তখন তুঙ্গে। সন্ধ্যা নেমেছে। আমাদের সন্তানরা তখনো পথে-ঘাটে, সড়ক ও রাস্তায়, মাঠে-প্রান্তরে সংগ্রামরত। একটি জেলা শহরে নয় দফা দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীদের একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল চলছে। হঠাৎ একটি দল প্রথমে পেছন থেকে ইট-পাটকেল ছুড়ে মিছিলটিকে ধাওয়া করে। শিক্ষার্থীরা এমন অতর্কিত আক্রমণে দিশাহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে। এর মধ্যেই পিস্তল, রড ও চাপাতি নিয়ে দলটি পেছন থেকে হামলা চালায়। একটু পরই শুরু হয় মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ।

আঙ্কেল, প্লিজ দরজাটা খোলেন!"চোখেমুখে আতঙ্ক, দৌড়ে পালানো কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী আকুল কণ্ঠে একটি বাড়ির ফটকের ওপর ঘা দিচ্ছিল। না, শিক্ষার্থীদের শত কাকুতি-মিনতি এবং আশ্রয়ের জন্য গলা ফাটিয়ে সাহায্য চাইলেও সেদিন ওই বাড়ির দরজা খোলা হয়নি। পরদিন দেশের সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়েছিল যে সেদিনের ঘটনায় ছয় শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন এবং অন্তত ৩০ জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

আসলে সেদিন ওই বাড়ির সদর দরজাই যে বন্ধ ছিল তা নয়, বন্ধ ছিল হৃদয়ের দরজা, মানবতার দরজা, সংবেদনশীলতার দরজা এবং সবচেয়ে মর্মান্তিক সত্য হচ্ছে যে আমাদের সন্তানদের চরম বিপদেও ওদের জন্য আমরা দরজা খুলিনি। কেন খুলিনি—ভয়ে, বিপদের আশঙ্কায়, নিজেকে নিরাপদ রাখতে? দুটো প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যায়। এক, দরজায় যদি বিপদাপন্ন আমার নিজের সন্তান ঘা দিত, আমি কি তা খুলে দিতাম না? অনতিবিলম্বে, জড়িয়ে ধরতাম না তাকে আশ্বস্ত করতে, নিয়ে যেতাম না তাকে ঘরের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়? আমি তার কোনোটিই করিনি, কারণ আমি তফাৎ করি নিজের সন্তান আর অন্যের সন্তানের মধ্যে। দুই, দরজা না খুলে আমি কি আমাকে নিরাপদ করতে চেয়েছি? বোকা আমি! নিজেকে বর্মের আবরণে ঢেকে রাখলেই আমি কি নিরাপদ? না, আমি নিরাপদ নই। ‘‌কেন মুখ গুঁজে আছো তবে মিছে ছলে? কোথায় লুকোবে?’ আমি তখনই নিরাপদ, যখন যে কাঠামোর মধ্যে আমি আছি, সেই কাঠামো নিরাপদ। যৌথ ব্যবস্থা নিরাপদ না হলে, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। ‘‌মন্দিরে আগুন লাগলে দেবালয় কি রক্ষা পায়?’

আসলে, প্রত্যেকের সন্তান আমাদের সবারই সন্তান। তাদের সবার জন্য আমাদের সব দরজা খোলা রাখতে হবে—শুধু বিপদে নয়, স্বাভাবিক অবস্থায়ও; শুধু তারা চাইলে নয়, আমরা নিজেরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে; কোনো শর্তসাপেক্ষে নয়, শর্তহীনভাবে। আমাদের সন্তানদের জন্য কোন কোন দরজা খুলে রাখব আমরা?

দরজা খুলে রাখব সন্তানের জন্য অবিমিশ্র ভালোবাসার—খাদহীন, শর্তহীন, অন্তহীন ভালোবাসার। আমাদের সবার সন্তান যেন সে ভালোবাসা তাদের প্রতি রোমকূপে অনুভব করতে পারে। বিবাদ-বিসংবাদে, মতানৈক্য-মনোমালিন্যে, বিপদে-আপদেও তাদের মনে যেন আমাদের অবিমিশ্র ভালোবাসা নিয়ে প্রশ্ন না জাগে। ওরা যেন কখনো মনে না করে যে, আমরা ওদের বিচারে বসেছি। মানুষের বিচারে বসলে সেখানে স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা জন্মায় না।

দরজা খুলে রাখব তাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তার জন্য। আমাদের তরুণ সন্তানরা তাদের তারুণ্যের কারণেই মাঝেমধ্যেই বিপদে পড়বে এবং কখনো-সখনো বিপদ ডেকেও আনবে তাদের জন্য তো অবিশ্যিই, আমাদের জন্যও। তাই বলে কখনো যেন আমাদের ঘরে তাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তার দরজা বন্ধ না থাকে। ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, ‘‌সব পাখি ঘরে ফেরে’র মতো তারা যেন নির্ভয়ে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরতে পারে। আমরা যেন ওদের বিপদ আমাদের ঘাড়ে নিয়েও ওদের নিরাপত্তা দিতে পারি।

দরজা খুলে রাখব সন্তানদের বুঝতে পারার ও বিশ্বাসের। আমাদের সন্তানদের চিন্তা-চেতনা এবং কার্য কলাপ বুঝতে হবে এবং বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে হবে তাদের প্রতি। তরুণরা ‘‌হঠকারী, অস্থিরমতি, প্রগলভ’—এমনটা বলে আমরা যেন তাদের উড়িয়ে না দিই। আমরা যেন ভুলে না যাই যে আমাদের সন্তানরা একটি আলাদা প্রজন্ম এবং দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা-ধারা, কর্মকাণ্ড আলাদা হবেই। কিন্তু সেসবের প্রতি আমাদের যেন শ্রদ্ধাবোধ থাকে। তারা ভুল করবেই, যেমন আমাদের তারুণ্যে আমরা করেছি। কিন্তু সে ভুল যেন দায়-দায়িত্ব নিয়ে তাদেরই হয়।

দরজাটা খুলে রাখব তাদের সঙ্গে যোগাযোগ আর সংযোগের। সন্তানদের ভাষাটা বোঝা জরুরি। আক্ষরিক অর্থে আমাদের সন্তানরা এবং আমরা একই ভাষায় কথা বলি, কিন্তু শব্দচয়ন ও প্রয়োগে, বলা এবং বাচনভঙ্গিতে, বোঝা এবং জানায় আমাদের সন্তানদের সঙ্গে আমাদের অনেক সময়েই যোজন পার্থক্য থাকে। ‘‌তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি’ না বলে সে ভাষা অনুধাবনের চেষ্টা করব। আমাদের সন্তানদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়তো অনেক সময়েই থাকে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে। কিন্তু সংযোগ? সংযোগের জন্য দরকার ‘‌মুখোমুখি বসিবার’ সুযোগের। সে সুযোগ যেন আমরা তৈরি করে নিই। সামনাসামনি বসে কথা বললেই সন্তানদের সঙ্গে আমাদের একটা সংযোগ তৈরি হয়ে যায়। তখন সন্তানদের সঙ্গে অবিমিশ্র ভালোবাসার, বোঝার এবং বিশ্বাসের দরজাগুলোও আরো খুলে যায়। সংযোগের মাধ্যমে বোঝানোরও একটি নতুন দরজা খুলে যায়। আমরা যেন ওদের বোঝাতে পারি যে সহিংসতা আর সন্ত্রাস কারো ভাষা আর সংস্কৃতি হতে পারে না।

দরজা খুলে রাখব আমাদের সন্তানদের সঙ্গে শর্তহীন সময়ের। আমার সব সময়েই মনে হয়েছে, সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো হচ্ছে সাহচর্যের, আনন্দের ও সান্নিধ্যের। চূড়ান্ত বিচারে আমরা সে সাহচর্যের, আনন্দের আর সান্নিধ্যের হিরন্ময় স্মৃতিটুকুই হৃদয়ে ধারণ করি—আর সব তুচ্ছ হয়ে যায়। ভালোবাসার সময়, মমতার সময়, গল্পের সময়, কাছে বসে থাকার সময়, নির্ভরতার সময়, আড্ডার সময় এটাই আমাদের সন্তানদের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বের মূলভিত্তি। আমরা অনেকেই সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য বড় বেশি ‘‌গুণগত সময়’ খুঁজি। আমি মনে করি আমাদের সন্তানদের সঙ্গে কাটানো সব সময়ই গুণগতভাবে উচ্চতম মানের, কারণ সে সময়ের কোনো বিকল্প ব্যবহার হয় না, হতে পারে না।

দরজা খুলে রাখব সন্তানের কাছে চিরায়ত মূল্যবোধের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়। সব দেশে, সব প্রজন্মেই বয়স্করা বলেছেন যে তরুণরা অস্থিরমতি, হঠকারী ও প্রগলভ। তারা শুধু সবকিছু ভাঙতে চায়, বদলাতে চায়—সামাজিক বিধিবিধান, রীতিনীতি, ফ্যাশন, দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস ও স্থিতিশীলতা। তারা দমকা হাওয়ার মতো সবকিছু উড়িয়ে নিতে চায়। অন্যদিকে তরুণরা বলেন, বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে সমাজ কাঠামো, সামাজিক রীতিনীতি, বদলাচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ। ভাষা এবং আচার-ব্যবহারও বদলে যাচ্ছে। এ বদলে যাওয়া পৃথিবীর জন্য পুরনো ঘুণে ধরা ব্যবস্থা আর কাজ করছে না। তাই প্রথাগত কাঠামোর খোলনলচে বদলাতে হবে। তরুণদের কথায়, বিবর্তনের মাধ্যমে এ পরিবর্তন আসবে না, এ বদলের জন্য লাগবে বিপ্লব। প্রথাগত ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা দেখতে পারে বলেই কাঠামো বদলের জন্য তরুণদের এমন আকুলতা ও ব্যাকুলতা।

এ মতানৈক্যের মধ্যে কোনো দোষ নেই—একে সাংঘর্ষিক করারও কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু মনে রাখা দরকার যে কিছু মূল্যবোধ চিরায়ত ও সনাতন। যেমন মানবিকতা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মানুষকে মর্যাদা দেয়া, অন্য মানুষের প্রতি বিবেচনা। আমাদের সন্তানরা যেন এ চিরায়ত মূল্যবোধগুলোকে ধারণ করে এবং তাদেরকে উড়িয়ে না দেয়। শিক্ষককে সম্মান, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা, বয়োকনিষ্ঠদের প্রতি স্নেহ—এসব মূল্যবোধের অন্তর্গত। সমতার প্রতি আনুগত্য, বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থানও সনাতন মূল্যবোধের অংশ। এখান থেকেই আমরা পাই নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা, নারীর প্রতি সমমর্যাদার শিক্ষাও।

শেষের কথা বলি। উপর্যুক্ত দরজাগুলো খোলা রাখার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ‘‌সব ক’টা জানালাও খুলে দেবো’। সেসব দরজা-জানালা খোলা রেখেই দৃঢ়ভূমির ওপরে স্থিত থাকবে আমাদের সন্তানরা। সেখানে ঝড় উঠতে পারে, জোর বাতাস বইতে পারে, কিন্তু ভূমি শক্ত হলে আমাদের সন্তানরা ছিটকে পড়ে যাবে না। সে মাটিকে শক্ত করার দায়িত্ব কিন্তু আমাদের।

সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

আরও