প্রতি বছরের মতো এবারো ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন হচ্ছে। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘প্লাস্টিক দূষণের অবসান’। দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু প্রদেশে এ বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবস আন্তর্জাতিকভাবে পালন করা হবে। প্লাস্টিক দূষণ আজ বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের পানীয় জল, খাদ্যশৃঙ্খল এবং স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে এমন দেশে প্লাস্টিক দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। বাংলাদেশ সরকার এবার পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কোনো বিকল্প উদ্ভাবন ও গবেষণা ব্যতিরেকে শুধু আইনি ঘোষণায় ক্ষতিকর কিন্তু বহুল ব্যবহৃত পলিথিনের ব্যবহার কতটা বন্ধ বা হ্রাস পেয়েছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। গত অর্ধশতকে প্লাস্টিকের ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে বর্তমান সময়কে ‘প্লাস্টিকের যুগ’ বলা যায়। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে প্লাস্টিক দূষণমুক্ত পরিবেশ এবং টেকসই ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা এবং আমার মতামত শেয়ার করাই এ প্রবন্ধের প্রধান উদ্দেশ্য।
প্রথমেই জেনে নিই কেন দক্ষিণ কোরিয়া আন্তর্জাতিক বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এবারের আয়োজক? গত ২৮ বছরে জল ও বায়ুর মান উন্নয়ন, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্য, বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্বের জন্য এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক। প্রস্তুতকারকদের দায়িত্ব সম্প্রসারণ করে দেশটি প্লাস্টিক দূষণ রোধে বিশ্বে অগ্রণী। তাদের ‘পূর্ণাঙ্গ জীবনচক্র প্লাস্টিক কৌশল’ উৎপাদন থেকে নিষ্পত্তি (disposal) পর্যন্ত প্রতিটি স্তর মোকাবেলা করে। উৎসে বর্জ্য কমানো, পুনর্ব্যবহার বাড়ানো ও বৃত্তাকার অর্থনীতির (Circular economy) দিকে যাত্রার মাধ্যমে তারা টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ছে।
প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১ কোটি ১০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য জলজ বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশ করে। অন্যদিকে কৃষিপণ্যে প্লাস্টিক ব্যবহারের কারণে মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিক কণাগুলো এবং প্লাস্টিক থেকে নিঃসৃত বিষাক্ত যৌগ পয়োনিষ্কাশন এবং ল্যান্ডফিল থেকে মাটি ও পরিবেশে ক্রমাগত জমা হচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণ ত্রিবিধ সংকটের মারাত্মক প্রভাবকে আরো বৃদ্ধি করছে: ১. জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট, ২. প্রকৃতি, ভূমি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির সংকট এবং ৩. দূষণ ও বর্জ্যের সংকট। প্লাস্টিক দূষণের বার্ষিক সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ৩০০-৬০০ বিলিয়ন ডলার। প্লাস্টিকের এত গভীর সংকট সত্ত্বেও সারা বিশ্বে এর অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তার কারণ কী? এর উত্তরের সন্ধানে প্লাস্টিকের আবিষ্কার ও বিবর্তনের ইতিহাস, এর বহুমুখী ব্যবহারের সুবিধা এবং পাশাপাশি মাইক্রো/ন্যানোপ্লাস্টিক ও বিষাক্ত রাসায়নিক নিঃসরণের মতো মারাত্মক প্রভাবগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যাক।
প্লাস্টিক হলো একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি দ্রব্যাদি যা প্রধানত জীবাশ্ম জ্বালানি অথবা প্রাকৃতিক জৈব যৌগ থেকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত হয়। এটি প্রধানত প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, পেট্রোলিয়াম এবং বায়োমাস থেকে সংগ্রহ করা কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। প্রথম আধুনিক প্লাস্টিক আবিষ্কৃত হয় ১৮৫৫ সালে, যখন আলেকজান্ডার পার্কেস ‘পার্কেসিন’ নামে একটি প্লাস্টিক তৈরি করেন। যদিও এটি বাণিজ্যিকভাবে সফল ছিল না, তবে এটি ছিল প্রাকৃতিক প্লাস্টিক উৎপাদনের এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। পরে ১৯০৭ সালে লিও বেকেল্যান্ড প্রথম পূর্ণতর সিনথেটিক প্লাস্টিক ‘বেকেলাইট’ উদ্ভাবন করেন যা ছিল প্লাস্টিক শিল্পে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। বেকেলাইট ছিল প্রথম সম্পূর্ণ কৃত্রিম পলিমার, যা ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক ব্যবহারে আসে। এরপর থেকে নানা ধরনের প্লাস্টিক আবিষ্কৃত হতে থাকে। এর মধ্যে কিছু প্লাস্টিক প্রাকৃতিকভাবে তৈরি (বায়োপলিমার), যেমন সেলুলোজ এবং কিছু সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে তৈরি, যেমন পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) ও পলিইথিলিন (পিই)। প্লাস্টিকের বহুমুখী ব্যবহার এর কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সম্ভব হয়েছে, যেমন হালকা ওজন, স্থায়িত্ব, নমনীয়তা, রাসায়নিক প্রতিরোধক্ষমতা, কম বিষাক্ততা এবং উৎপাদন খরচ। প্লাস্টিক উদ্ভাবনের ফলে কাঠ ও আঁশের জন্য গাছ কাটার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
প্লাস্টিকজাত দ্রব্য, এর টুকরো, কণা বা নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ যখন পরিবেশে (মাটি, পানি, বায়ু) ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, তখন সেই অবস্থাকেই সাধারণভাবে প্লাস্টিক দূষণ বলা হয়। গত ৫০ বছরে পৃথিবীতে মাথাপিছু এক টনের বেশি প্লাস্টিক দ্রব্য উৎপাদন করা হয়েছে। এসব পচনরোধী প্লাস্টিক বর্জ্যের শতকরা ১০ ভাগ পুড়িয়ে ধ্বংস করা হলেও বাকি ৯০ শতাংশের বেশি বিশ্ব পরিবেশকে নানাভাবে বিপন্ন করে তুলেছে। এসব ক্ষতিকর পচনরোধী বর্জ্য পরিবেশে ৪০০ থেকে এক হাজার বছর পর্যন্ত থাকতে পারে এবং নানা মাইক্রো বা ন্যানোকণা বা ক্ষতিকর পদার্থ নিঃসরণ করে প্রতিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যে ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পৃথিবীতে প্রতি বছর ৪৫ কোটি টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশে যোগ হচ্ছে। এ বর্জ্যের ৫১ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে এশিয়া মহাদেশে। প্লাস্টিক দূষণ বিশ্বের সব দেশে এবং সব পরিবেশে এমনকি মাউন্ট এভারেস্টের চূড়া, গভীর সমুদ্রের তলদেশ এবং মেরু অঞ্চলেও বিস্তৃত।
পরিবেশে অপচনশীল নানা প্লাস্টিক বর্জ্যের সঙ্গে অতিবেগুনি রশ্মি এবং পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের মিথস্ক্রিয়ার ফলে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক কণা এবং নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ, যেমন বিসফেনল-এ, বিসফেনল-এস, থ্যালেটস ইত্যাদি পরিবেশে নির্গত হয়। এসব মাইক্রো ও ন্যানোকণা এবং নিঃসৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মানুষ এবং অন্যান্য জীবের হরমোনাল সিস্টেমকে নষ্ট করতে পারে। ফলে প্লাস্টিক দূষণ মানুষ ও অন্যান্য জীবের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে নানা দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টি করে থাকে। এছাড়া এসব প্লাস্টিক ন্যানোকণা এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মানুষ ও অন্যান্য জীবের কোষাভ্যন্তরে অবস্থিত ডিএনএ এবং আরএনএ অণুর মধ্যে পরিবর্তন করে ক্যান্সার বা স্নায়ুতন্ত্র বিকল করতে পারে। তবে একক ব্যবহার পলিথিন ব্যাগ প্লাস্টিক বর্জ্যের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক। কারণ এদের যত্রতত্র ব্যবহার এবং ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার ফলে নিষ্কাশন নালা, খাল এবং নদীর প্রবাহ বিনষ্ট হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। আক্রান্ত হচ্ছে জলজপ্রাণী ও উদ্ভিদের শিকড়ের বিস্তার।
প্লাস্টিক বর্জ্য নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থ মাটি, পানি ও বায়ুমণ্ডলকে বিষাক্ত করে চলছে। প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ানোর ফলে ২০১৯ সালে বায়ুমণ্ডলে ৮ দশমিক ৫ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড যোগ হয়েছে। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে বিশ্বের উষ্ণায়নের ১০-১৩ শতাংশ অবদান হচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ানোর মাধ্যমে। প্রতি বছর ৪৩০ মিলিয়ন টনের বেশি প্লাস্টিক উৎপাদন হয়, যার দুই-তৃতীয়াংশ শুধু একবার ব্যবহারের পর বর্জ্য হিসেবে ত্যাগ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ হচ্ছে একবার ব্যবহারযোগ্য (সিংগেল ইউজ)। যদি এ প্রবণতা চলতে থাকে, তবে ২০৬০ সালের মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্য তিন গুণ বাড়বে, যা ইকোসিস্টেম এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক পরিণতির সৃষ্টি করবে।
প্লাস্টিক বর্জ্য কর্তৃক সামুদ্রিক প্রতিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। ফলে মাৎস্য, তিমি এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু সামগ্রিকভাবে সামুদ্রিক প্রতিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্লাস্টিক দূষণের ফলে প্রতি বছর ১০ লাখ সামুদ্রিক পাখি এবং এক লাখ সামুদ্রিক প্রাণী মৃত্যুবরণ করে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন যে বর্তমানে সমুদ্রে ৫ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন মাইক্রো ও ম্যাক্রোপ্লাস্টিক কণা জমা হয়েছে। প্রতি বর্গমাইল সমুদ্রে ৪৬ হাজার টুকরা/কণা প্লাস্টিক জমা হয়েছে। সমুদ্রে জমাকৃত প্লাস্টিকের মোট ওজন ২ লাখ ৬৯ হাজার টন। প্রতিদিন ৮০ লাখ টুকরা প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে পতিত হচ্ছে। এভাবে জমতে জমতে বড় বড় মহাসাগরে প্লাস্টিক বর্জ্য জমাকৃত এলাকা (প্যাচ) তৈরি হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রশান্ত মহাসাগরে বর্তমানে প্লাস্টিক বর্জ্যের প্যাচের আয়তন প্রায় ১৬ লাখ বর্গকিলোমিটার। অনুরূপ প্লাস্টিক বর্জ্য জমাকৃত এলাকা অন্যান্য মহাসাগর এবং সাগরেও সৃষ্টি হয়েছে। শুধু সমুদ্রের তলদেশ নয়, সমুদ্র পানির উপরিস্তরের প্রায় ৮৮ শতাংশ কমবেশি প্লাস্টিক দূষণে দূষিত। প্লাস্টিক বর্জ্যের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক দূষণ সৃষ্টি করছে প্লাস্টিক ব্যাগ বা পলিথিন ব্যাগ। প্রতি বছর ৮৩০ কোটি প্লাস্টিক ব্যাগ এবং প্লাস্টিকের টুকরা আমরা অসচেতনভাবে সমুদ্রসৈকতে ফেলে আসছি। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন যে ২০২৫ সালে সমুদ্রে মাছের সংখ্যার চেয়ে প্লাস্টিকের দ্রব্য এবং প্লাস্টিক কণার সংখ্যা বেশি হবে। বর্তমানে সমুদ্র থেকে আহরিত প্রতি তিনটি মাছের মধ্যে একটি মাছের পেটে প্লাস্টিক দ্রব্য পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, এর মধ্যে ৩৬ শতাংশ পুনঃচক্রায়ণ, ৩৯ শতাংশ ভূমি ভরাট এবং বাকি ২৫ শতাংশ সরাসরি পরিবেশে দূষক হিসেব যোগ হচ্ছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন মাছ, লবণ এমনকি শাকসবজিতেও পাওয়া যাচ্ছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে রয়েছে অবিশ্বাস্য ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ। এ যথেচ্ছ ব্যবহার শহরের জলাবদ্ধতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। পলিথিন নিষিদ্ধের আইন থাকলেও বাস্তবায়নের অভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। অর্থনৈতিক উন্নতি সত্ত্বেও আমরা প্রতিদিনই এ দূষণে অবদান রাখছি। প্লাস্টিক দূষণ রোধে প্রাকৃতিক পলিমারের মাধ্যমে বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক তৈরির প্রযুক্তির আবিষ্কার হয়েছে। এক্ষেত্রে এ দেশে বাঁশসহ নানা প্রকৃতিক ফাইবার ব্যবহারের সম্ভাবনা উজ্জ্বল, তবে এক্ষেত্রে পরিকল্পিত গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব নিতেই হবে—১. ব্যক্তিগত স্তরে: বাজারে পাট, বাঁশ বা কাপড়ের তৈরি পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করুন। পাতলা পলিথিন বর্জন করুন ২. ব্যবসায়িক স্তরে: লন্ড্রিতে কাপড়ের ব্যাগ চালু করুন। দুধ-পানীয় কাচের বোতলে বাজারজাত করুন ৩. প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে: সিটি করপোরেশনকে প্রতিটি বাড়ি থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদা সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সংকট মোকাবেলায় নাগরিক সমাজ, সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং উৎপাদনকারীদের সম্মিলিত উদ্যোগই একমাত্র পথ।
জীবপ্রযুক্তির মাধ্যমে প্লাস্টিককে কার্বন-নিউট্রাল কাঁচামালে রূপান্তর করে বায়োপ্লাস্টিক, জৈব জ্বালানি ও ফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন করা যায়। এছাড়া বিশেষ মৃত্তিকা অণুজীব বা কীট-পতঙ্গ যারা প্লাস্টিক খেয়ে শক্তি অর্জন করতে পারে, এদেরকে প্লাস্টিক দূষণ পরিশোধনে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার জীবপ্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা করা প্রয়োজন। যদিও বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে ব্যাপক গবেষণায় এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অনেক জ্ঞান অর্জিত হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে প্লাস্টিক দূষণ সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য মৌলিক গবেষণা নেই বললেই চলে। প্রকৃতপক্ষে, আমরা এক গবেষণাবিমুখ জাতি। আমরা জিডিপির কেবল দশমিক শূন্য ২৬ শতাংশ গবেষণায় খরচ করি, যা কেবল উগান্ডার চেয়ে সামান্য বেশি এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। ফলে বিশ্ব উদ্ভাবন সূচকে ১৩৩টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১০৬তম!
আমাদের নদীমাতৃক এবং কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিবেশ অঞ্চলে (ইকোসিস্টেমে) মাইক্রোপ্লাস্টিক, ন্যানোপ্লাস্টিক এবং প্লাস্টিক বর্জ্য নিঃসৃত জীবের হরমোন এবং স্নায়ুতন্ত্র নষ্টকারী মারাত্মক ক্ষতিকর জৈব যৌগের পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য গবেষণা আশু প্রয়োজন। মাইক্রো, ন্যানো এবং প্লাস্টিক বর্জ্য নিঃসৃত মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ফসল উৎপাদন, হাঁস-মুরগি, ডিম এবং মাৎস্য উৎপাদনে কতটা প্রভাব ফেলছে সে বিষয়ে আমাদের ধারণা অস্পষ্ট। এমনকি আমরা যেসব কৃষিজাত খাবার খাচ্ছি, তার মধ্যে প্লাস্টিক ন্যানোকণা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য নিঃসৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের কোনো উপস্থিতি আছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। প্লাস্টিক দূষণ আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান এবং সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ মৃত্তিকার স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মৃত্তিকার প্রাণ হচ্ছে মৃত্তিকার অণুজীবসমগ্র (মাইক্রোবায়োম) যা প্লাস্টিক দূষণে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যা টেকসই ফসল উৎপাদনের অন্তরায়। নিরাপদ ও টেকসই খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ বিষয়ে সমন্বিত গবেষণা আশু প্রয়োজন।
দেশের সুনীল অর্থনীতির প্রাকৃতিক সম্পদ বঙ্গোপসাগর আজ প্লাস্টিক দূষণে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। ভারত ও নেপাল থেকে উৎসারিত হওয়া অর্ধশতাধিক নদী এ দেশের বুক চিরে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। এসব নদী উজানের দেশগুলো এবং বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য বহন করে নিয়ত বঙ্গোপসাগরকে বিপন্ন করে তুলছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আঞ্চলিক উদ্যোগ জরুরি। দেশে প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা এবং প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানলাভ এবং দূষিত প্রতিবেশকে পুনরুদ্ধারের জন্য জাতীয়ভাবে আন্তঃবিভাগীয় সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন।
এশিয়া বিশ্বের ৫১ শতাংশ পরিবেশবিধ্বংসী প্লাস্টিক বর্জ্যের উৎস, আর বাংলাদেশেই প্রতিদিন যোগ হচ্ছে প্রায় তিন হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য (মোট বর্জ্যের ৮ শতাংশ)। প্লাস্টিক দূষণ মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ওয়েবিনারে গৃহীত সুপারিশগুলো হলো—১. কঠোর আইন প্রয়োগ: বিদ্যমান পলিথিন ব্যাগ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে পরিবেশ সুরক্ষা পুলিশ ফোর্স গঠন করে উৎপাদন, বিতরণ ও ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। ২. শিক্ষার মাধ্যমে পরিবর্তন: পাঠ্যপুস্তকে প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব ও পাটজাত পণ্যের (সোনালি ব্যাগ) সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা। ৩. পাটভিত্তিক বিকল্পের প্রসার: ঢাকার জলাবদ্ধতার মূল কারণ দৈনিক ১৪-১৫ মিলিয়ন পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার। পাটের সেলুলোজ থেকে তৈরি সহজে পচনশীল ও মাটি সমৃদ্ধকারী সোনালি ব্যাগের উৎপাদন বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও ভর্তুকি জরুরি। ৪. পাট উৎপাদন বৃদ্ধি: চাহিদা মেটাতে লবণাক্ততাসহিষ্ণু, বারোমাসী পাটের জাত উদ্ভাবন ও চাষাবাদ বৃদ্ধি করতে হবে। ৫. গণসচেতনতা: টেলিভিশন, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা চালানো। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্লাস্টিক দূষণের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি বছরে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আসুন, পুনর্ব্যবহার, পুনর্বিন্যাস, প্রত্যাখ্যান এ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে একটি প্লাস্টিক দূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
ড. তোফাজ্জল ইসলাম: ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি, অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই), গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়