জ্বালানি খাতে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ বড় ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যতটা না বৈশ্বিক সংকটের কারণে আমরা এ বিপাকে পড়েছি তার চেয়ে বড় কারণ হচ্ছে আমাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জোর না দেয়া। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য চাল ও গমের সরকারি মজুদকে বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে এ মজুদ সরকারকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ দেয়। কিন্তু অর্থনীতির আরেকটি সমান গুরুত্বপূর্ণ খাত জ্বালানির ক্ষেত্রে এখনো এ ধরনের কার্যকর কৌশলগত মজুদ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বিশেষত আমদানিনির্ভর তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ক্ষেত্রে এ ঘাটতি ক্রমেই বড় ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে এ চিত্রই উঠে এসেছে।
বর্তমানে দেশে এলপিজির মাসিক ব্যবহার দেড় লাখ টনের বেশি। স্থানীয় গ্যাস সংকটে আবাসিক, পরিবহন ও শিল্প খাতের একটি বড় অংশ এ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। শিল্পে এলপিজির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতির উৎপাদন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা—দুই ক্ষেত্রেই এর গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। অথচ সংকটকালে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর মতো সরকারি মজুদ না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এলপিজি সংকট এ দুর্বলতারই প্রকাশ। সরকারি আমদানি তথ্যে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য দেশে এলেও বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। সরবরাহ চেইনের বিভিন্ন স্তরে এর নানা কারণ তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুদ সক্ষমতা থাকলে সংকটের সময় রাষ্ট্র বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ দিতে পারত। এতে বেসরকারি আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের ওপর বাজারের প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণও তৈরি হতো না। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে গেলে কিংবা সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলে মজুদ থেকে পণ্য সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার সুযোগ থাকত।
দুঃখজনক হলো, এলপিজি মজুদের প্রয়োজনীয়তা নতুন কোনো বিষয় নয়। বিগত সরকারের সময়ে দেশে এক লাখ টন এলপিজি স্টোরেজ সক্ষমতা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল। সরকারি এলপি গ্যাস কোম্পানি বিভিন্ন এলাকায় জমিও পেয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও এসব উদ্যোগ বাস্তব অবকাঠামোয় রূপ নেয়নি। বর্তমানে বাগেরহাটের মোংলায় বার্ষিক এক লাখ টন ধারণক্ষমতার অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাতারবাড়ীতেও বৃহৎ এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত ধীর। সংকট যখন বাজারে দৃশ্যমান, তখন পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পর্যায়ে আটকে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এলএনজির ক্ষেত্রেও একই দুর্বলতা রয়েছে। দেশে পর্যাপ্ত মজুদ সক্ষমতা না থাকায় সরাসরি স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কার্গোর ওপর নির্ভর করতে হয়। কোনো কার্গো সময়মতো না এলে কিংবা বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে গেলে দেশের গ্যাস সরবরাহে চাপ পড়ে। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে এলএনজি টার্মিনালে জাহাজ ভিড়তে না পারলেও সরবরাহ ব্যাহত হয়। অথচ পর্যাপ্ত স্থলভিত্তিক মজুদ থাকলে এসব সাময়িক বিঘ্ন অনেকটাই সামাল দেয়া সম্ভব ছিল।
জ্বালানি মজুদের প্রয়োজনীয়তা শুধু বর্তমান সংকটের কারণে নয়, ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন ক্রমে কমছে। ফলে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে। বিদ্যুৎ-জ্বালানির সমন্বিত মহাপরিকল্পনাতেও ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানির পরিমাণ ব্যাপকভাবে বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এমন বাস্তবতায় আমদানি বাড়িয়ে শুধু চাহিদা মেটানোর পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে মজুদ, পরিবহন, টার্মিনাল ও জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। জাপান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু আমদানি নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। তারা কৌশলগত মজুদ, একাধিক সরবরাহ উৎস, বন্দরভিত্তিক অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ বা স্থলভিত্তিক সংরক্ষণ এবং জরুরি সময়ে সরকারি মজুদ বাজারে ছাড়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এর উদ্দেশ্য একটাই—আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ ধাক্কা এলে দেশের অর্থনীতি যাতে পুরোপুরি অরক্ষিত না হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে অবশ্য কিছুটা প্রস্তুতি রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৬০ দিনের মজুদ সংরক্ষণ সক্ষমতা রয়েছে এবং তা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু এলপিজি ও এলএনজির মতো ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে একই ধরনের কৌশলগত প্রস্তুতি নেই। অথচ এলপিজি-এলএনজির বাজার এখন শুধু ভোক্তা পর্যায়ের বিষয় নয়; শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
জ্বালানি মজুদ গড়ে তুললে অবশ্যই ইনভেন্টরি কস্ট বাড়বে। কিন্তু মজুদ না থাকায় মূল্য যে আরো বেশি, বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রমাণ। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপ ভোক্তার ওপর স্থানান্তর করা কোনো টেকসই জ্বালানি নীতি হতে পারে না। একইভাবে প্রতিটি সংকটে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চমূল্যে কার্গো আমদানি করাও অর্থনীতির জন্য ব্যয়বহুল। একটি নির্দিষ্ট মাত্রার কৌশলগত মজুদ থাকলে মূল্য ও সরবরাহ—দুই ধরনের ঝুঁকিই কিছুটা প্রশমিত করা সম্ভব।
তাই এলপিজি ও এলএনজির জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত মজুদ নীতি এখনই প্রণয়ন করা প্রয়োজন। কত দিনের মজুদ থাকবে, কে তা সংরক্ষণ করবে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের দায়িত্ব কী হবে, জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে মজুদ বাজারে ছাড়া হবে এবং কীভাবে একাধিক বন্দর ও সরবরাহ উৎস গড়ে তোলা হবে—এসব বিষয়ে সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা থাকা দরকার। সরকারি অবকাঠামোর পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকেও এক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে। গভীর সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় বৃহৎ স্টোরেজ অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগও যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো স্বাভাবিক সময়ের সরবরাহ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অংশ। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, সমুদ্রপথে বাধা কিংবা বিশ্ববাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি—কোনো ঘটনাই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু এসব ধাক্কা সামাল দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া সম্পূর্ণভাবে দেশের নীতিনির্ধারকদের হাতে। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার পরও যদি প্রয়োজনীয় মজুদ অবকাঠামো গড়ে না ওঠে, তাহলে প্রতিটি বৈশ্বিক সংকটেই বাংলাদেশকে মূল্য দিতে হবে। তাই সংকট দেখা দেয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে এখনই জ্বালানি মজুদের সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।