২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এডিপিতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তবে এডিপি বাস্তবায়ন নিয়ে নানা মহলের সংশয় আছে। সরকারের পক্ষে কি এডিপি সময়মতো বাস্তবায়ন সম্ভব হবে?
গত কয়েক বছরের ইতিহাস বিবেচনায় এবারো এডিপি বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরও কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতা বেড়েছে, এমনটি দেখা যাচ্ছে না। আবার এডিপি কোথায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তার কোনো নিরীক্ষণ নেই। কোন প্রকল্প আমাদের প্রয়োজনীয়, কোনটিতে পরিমার্জন দরকার এবং সাশ্রয়ের মাধ্যমে কীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়—এসব নিয়ে আলোচনা হয় না। বাজেটে পরিসংখ্যানগত আলাপটাই আসে। অতীত প্রকল্পগুলোর গুণগত মান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রভাব কেমন এর বিশ্লেষণ এখন থেকে শুরু করা দরকার। না হলে এ সংখ্যানির্ভর আলোচনা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে না।
এডিপিতে বরাদ্দ যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে কিনা, বিশেষ তহবিল কেমন, বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য এড়ানোর বিষয়গুলোতে বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দ কেমন তা নিয়ে বহুদিন আলোচনা চলছে। বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়েছে তা কমানোর জন্য বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ জরুরি। এ বিশ্লেষণ সরকারের তরফে দেয়া হয় না। কোন জেলা কত বরাদ্দ পেল তা যদি আলোচনা করা হয় তাহলে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নে বৈষম্য অনেকাংশে কমানো যাবে। উন্নয়ন বাজেটের স্থানিক বণ্টন, ন্যায্যতা ও উন্নয়ন উপযোগিতা বিশ্লেষণ করলে এডিপি প্রস্তাবনা পূর্ণাঙ্গ হয়।
আমাদের অধিকাংশ উন্নয়নই নগরকেন্দ্রিক। কিন্তু বিগত সময়ে নানা ধরনের উন্নয়ন অবকাঠামো হলেও জনজীবনের মানোন্নয়ন ঘটেনি। বাসযোগ্য নগরী গড়ার ক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে আছি। আমরা কেন সমাধানের পথে হাঁটতে পারলাম না?
আসলে দেশে পরিকল্পনা ছাড়াই উন্নয়ন হয়। উন্নয়নের পর পরিকল্পনার ধারণাটি গুঁজে দেয়ার চেষ্টা চলে। যেমন কোনো একটা আবাসিক এলাকা গড়া হলো। এরপর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা বা অন্যান্য গৃহস্থালী সংযোগ আনার উদ্যোগ নেয়া হলো। এভাবে পৃথিবীর কোথাও উন্নয়ন হয় না। পরিকল্পনার মাধ্যমে শহর এলাকার বিস্তার ঘটাতে পারলে অর্থের সাশ্রয় হয়। একই সঙ্গে নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করা যায়। আমাদের উন্নয়ন মডেলে পরিকল্পনাকে অনেক পেছনে রাখা হয়। এজন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নির্দেশনা দরকার। সরকার যদি একটি মাস্টারপ্ল্যান করে নির্ধারণ করে দেয়, পরিকল্পনার আওতার বাইরে গিয়ে কেউ কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারবে না তাহলে এমন অবস্থা হতো না। তখন অল্প খরচে উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষকে সেবা দেয়াও সহজ হতো। বিচ্ছিন্ন নগরায়ণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর জনগণের স্বেচ্ছাচারী নগরায়ণভকে পরিবর্তনের চেষ্টা না করাটা ইতিবাচক নয়।
এখনো শিল্পায়ন ও নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ সীমিত। সরকারের আপসকামিতার কারণে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আবাদি জমি, জলাশয় ভরাট করে প্রকল্প করছে আর পরে সেগুলো পরিকল্পনায় আত্তীকরণ হচ্ছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদীর পাড় দখল, জলাধার ভরাট করে অনুমোদনহীনভাবে বালি-পাথর চুরি করছে। তারা কোনো বাধা পাচ্ছে না। এভাবে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি মানুষের স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান নষ্ট হচ্ছে। দুঃখজনক, দোষীদের এক্ষেত্রে কোনো জরিমানা গুনতে হয় না, বরং তাদেরই নীতিনির্ধারণে বেশি দেখা যায়। উন্নয়ন পরিকল্পনার অনুঘটকগুলোর ভেতরে রাজনীতি ঢুকে গেছে। তাই দেশে সুষ্ঠুভাবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে ড্যাপের কথা বলা যায়। ব্যবসায়ীদের চাপে এটির দুইবার পর্যালোচনা হয়েছে। নতুন করে ড্যাপ রিভিউ কমিটিও করা হলো। এ কমিটির উদ্দেশ্যই পেশাদার পরিকল্পনা এড়িয়ে ‘উন্নয়ন’ বৈধতা দেয়া। এ কমিটিতে বিশেষজ্ঞ বা পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পরিকল্পনাকে সংহত রাখা রাষ্ট্রের কাজ। কিন্তু রাষ্ট্র এটিকে বারবার বদলে ফেলতে চায়। এ বদলে ফেলার সংস্কৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন শহরের বাসযোগ্যতার সংকট দূর হবে না।
সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দিকে এগোচ্ছে। এগুলো আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার চরিত্র পাল্টাতে পারবে?
ঢাকা বা নগরীর যাত্রীরা সাধারণত স্বল্প দূরত্ব অতিক্রম করে। পথচারীবান্ধব ফুটপাত না থাকায় অনেকে এ স্বল্প দূরত্ব অতিক্রমের জন্য এখনো গণপরিবহনে যাতায়াত করেন। সেখানেও থাকে দুর্ভোগ। এখন সড়ক ব্যবস্থাপনায় সীমিত পরিসরে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। এআইয়ের ব্যবহারে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা ভালো। কারণ এটি এত ব্যয়বহুল না। যেমন গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বসানোর সিদ্ধান্ত, এগুলো প্রয়োজনীয়। এখানে মূল চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির বাস্তবায়ন নয়। সরকারকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাসমালিক ও সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অনুমোদনহীন ও ফিটনেস নেই এমন যানবাহন সড়ক থেকে সরানো কঠিন নয়।
প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে বিদ্যমান আইনের সমন্বয়টা জরুরি। রাষ্ট্র চাইলে স্বল্প ব্যয়ে এমন অনেক কাজ করতে পারে। অনেক বড় প্রকল্পই আমাদের কাজে আসে না। ঢাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এক্সপ্রেসওয়ে করা হলো। সেটির সুফল ওইভাবে মেলেনি। সে তুলনায় গাড়িতে জিপিএস ট্র্যাকার স্বল্প ব্যয়ের এবং এতে তদারকির কাজ সহজ হবে। এরই মধ্যে কয়েকটা জায়গায় এআই ক্যামেরা বসিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছে। গণপরিবহন ব্যবস্থার আমূল বদলের জন্য তাই বড় ব্যয়ের প্রয়োজন নেই। শৃঙ্খলা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণটাই বেশি জরুরি। গণপরিবহনের ক্ষেত্রে বাস বা প্যারাট্রানজিটের মিনিবাস জনপ্রিয় ও সহজলভ্য করা জরুরি। অতীতের সব সরকারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা সাশ্রয়ী সংস্কারের দিকে কম মনোযোগী। বড় বড় পরিকল্পনার দিকেই মনোযোগ থাকে বেশি। কিন্তু আমাদের সহজে বাস্তবায়ন করা যায় এমন বিকল্প সমাধান লাগবে। সরকার এখন মেট্রোরেল, মনোরেল এমনকি ইভির কথা বলছে। এগুলোর থেকে বেশি জরুরি রাজধানীতে মানসম্পন্ন পাবলিক বাস পাওয়া যাচ্ছে কিনা। বৈদ্যুতিক হোক বা না হোক, পাবলিক বাস লাগবে। সড়কে ইজিবাইক, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমানোর জন্য এসব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সহজলভ্য করতেই হবে।
দেশের জনসংখ্যা বিবেচনায় রেল সবচেয়ে সাশ্রয়ী পরিবহন সুবিধা। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই রেল লোকসান গুনে যাচ্ছে। রেল খাতে আমাদের প্রতি বছরই ভর্তুকি দেয়া লাগে। রেলকে লাভজনক করার কাজটি কি খুব কঠিন?
না, কঠিন নয়। আমরা মেট্রোরেল ও মনোরেল নিয়ে আলাপ করছি। এর বাইরে আছে লাইন রেল ট্রানজিট বা এলআরটি। এগুলোই সাধারণ যাত্রীবাহী রেল। এগুলোর জন্য আমাদের নতুন করে লাইন তৈরি করতে হচ্ছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবকাঠামো সম্প্রসারণ করতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অঞ্চল গাজীপুর, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী—সবদিকেই তো লাইন মিলবে। এগুলোকে যদি আমরা যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে অল্প সময়েই যাত্রীরা অনেক দূরের গন্তব্যে যাতায়াত করতে পারবেন। কমিউটার রেলগুলো চালু রাখার কথা বলে এক্সপ্রেস নাম দিয়ে বিদ্যমান লাইনকে কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছি। ঢাকা থেকে গাজীপুর, ময়মনসিংহের দিকে আরো বেশি লাইন করার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়নি। নারায়ণগঞ্জের ডেমো ট্রেনটিকে পাইলট প্রকল্প বানিয়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। নতুন কিছু রেললাইন হচ্ছে। এর মধ্যে খুলনার রেললাইনের পূর্ণ উপযোগিতা মিলছে না। এজন্যই নতুন রেললাইন নির্মাণের বদলে যেসব লাইন আছে সেগুলোর সর্বোচ্চ উপযোগিতা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। এজন্য কমিউটিং দূরত্বে দ্রুতগতির রেল আনার উদ্যোগে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এদিকে রেলের অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে। নতুন মিটার গেজ, ব্রড গেজ এমনকি সড়ক ও রেললাইনের মানোন্নয়ন করা হয়েছে। এখন কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের ট্রেনের ইঞ্জিন নেই। এ সংকট না মিটিয়ে তাহলে এত অর্থ ব্যয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হলো কেন? তার মানে রেলের উন্নয়নে পর্যাপ্ত পরিকল্পনার অভাব শুরু থেকেই ছিল।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, বাস মালিক ও সংশ্লিষ্টরা চান না দেশে রেললাইনের উন্নয়ন হোক। এখানে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও যে নেই তা বলা যাবে না। রেলের মাধ্যমে ৩০০-৩৫০ কিলোমিটার দূরত্বের অধিকাংশ রুটেই যাত্রীসেবা দেয়া সম্ভব। আর ১০০ কিলোমিটারের দূরত্ব হিসাব করলে বিশাল যাত্রী সংযোগের সুযোগ রয়েছে। এজন্য আমাদের যেসব অবকাঠামোগত সুবিধা আছে সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহার করতে হবে। মেট্রোর নতুন লাইন কিংবা মনোরেলের মতো প্রকল্প নেয়া যেতে পারে। কিন্তু দেশব্যাপী বড় যোগাযোগমাধ্যমকে আগে গুরুত্ব না দিয়ে এগুলো বাস্তবায়ন করা সুপরিকল্পনার পরিচায়ক নয়। বড় প্রকল্পকে রাজনৈতিক বিলাসের প্রতীক ভাবার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরুতে হবে। মেট্রোর দুই লাইন নির্মাণে যা ব্যয় হবে তা দিয়ে সাত-আটটা রেললাইন করতে পারি। অন্য কোনো অঞ্চলের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায় এ আলাপটা এখন বেশি জরুরি।
সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ অনেকের মত, এ লক্ষ্যমাত্রায় অল্প কয়েকটি খাতে সুবিধা ও রেয়াত সুবিধা দেয়া হয়েছে। তাই এর পূর্ণ সুবিধা সবাই পাবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে কী কী করা দরকার?
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আমাদের এক নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেটি হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে এমনকি অবকাঠামোগত উন্নয়নেও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নেই। অথচ ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের মতো দেশ এ জ্বালানির মাধ্যমেই অনেক ব্যয় সাশ্রয় করেছে। অতীতের সরকারও নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল তবে সে অনুযায়ী কাজ করেনি, বরং আমরা আমদানিনির্ভর অনবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপরই নির্ভর করেছি। নতুন সরকারের অগ্রাধিকারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থাকাটি ইতিবাচক। অগ্রাধিকার ও লক্ষ্য অনুযায়ী এ খাতে কর রেয়াত বা অন্যান্য বিনিয়োগ সুবিধা দিতে হবে। তবে এ বিষয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন আছে। সরকারকে এ দিকটাতে আরো মনোযোগ দিতে হবে। এখানে এ খাতের একটি ভালো বাণিজ্যিক কাঠামো দাঁড় করাতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে সংযুক্ত করে কাঠামো গড়তে হবে। সবচেয়ে বেশি জরুরি, এ কাঠামো আমাদের পরিকল্পনা উন্নয়নের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক করা হবে ওই আলোচনা। উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্য যেন আলাদা না হয়। কেউ অবকাঠামো নির্মাণে নীতিমালা অনুসরণ করছেন কিনা সেই আইনি বাধ্যবাধকতাও থাকতে হবে।
আরেকটা বিষয় হলো, জ্বালানি চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। নগর পরিকল্পনা এখনো ব্যক্তিগত গাড়ি, এসি ও বদ্ধ বাড়িনির্ভর। এগুলো জ্বালানি চাহিদা বাড়াচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ বাড়ছে। এ চাহিদা বাড়তেই থাকবে। এজন্য প্রচুর জ্বালানি চাহিদা তৈরি হয় এমন ভবন তৈরি না করে জ্বালানি সাশ্রয়ী অবকাঠামো দরকার। সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামোর জন্য গ্রিন বিল্ডিং কোড থাকবে। অবকাঠামোকে কীভাবে কার্বন সাশ্রয়ী করা যায় তা পরিকল্পনায় আনতে হবে। এটাই সরকারের এখনকার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ঢাকা ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। বলা হচ্ছে, যেকোনো বড় মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানীর বড় অবকাঠামো ধসে পড়ার ঝুঁকি অনেক। এ বাস্তবতায় আমাদের পক্ষে কি সংকটের সংস্কার করে রিডেভেলপমেন্ট করা সম্ভব?
না। বাস্তবতা বুঝেই আমাদের কথা বলতে হবে। আমরা যেটা করতে পারি, শহরের যে প্রতিনিয়ত প্রসার ঘটছে সেটাকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য করা। শহরে পরিধি যেদিকেই বাড়ানো হোক, একটা পরিকল্পনার আলোকে আনতে হবে। অপরিকল্পিত কিছুই সেখানে ঠাঁই পাবে না। কেউ আইনের ব্যত্যয় ঘটাতে পারবে না। আর এখন শহরে যে অবকাঠামোগুলো আছে সেগুলোকে দুর্যোগ মোকাবেলা ও ভূমিকম্প সহনশীল করার জন্য রেট্রোফিটিং ও মজবুতকরণের কৌশল নিতে হবে। ভবন মালিকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব সংস্কারের উদ্যোগ নেয়ার একটি পরিকল্পনা পথনকশা দিতে হবে। পাশাপাশি অবকাঠামোর ইউটিলিটি সংযোগগুলোকেও দুর্যোগ সহনশীল করতে হবে। ভয়াবহ কোনো দুর্যোগেও যেন এগুলো টিকে থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা, এখানে ফাঁকা স্থানের অভাব। তাই ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের সময় আমরা কোথাও আশ্রয় নিতে পারি কিনা এ বিষয়ে আলাদা করে ভাবতে হবে। ঢাকার অধিকাংশ ওয়ার্ডেই এখন খেলার মাঠ বা পার্ক নেই। এ বাস্তবতায় প্রতি ওয়ার্ডে ৫০০ মিটারের মধ্যে ফাঁকা স্থানে যেন থাকার সুযোগ হয় সে কৌশলটা নিয়ে ভাবতে হবে। নানাভাবে সবুজায়ন বাড়াতে হবে। এ সবুজায়নের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির সঞ্চয় বাড়ানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে বণ্টন ব্যবস্থাপনার দিকটিও অন্তর্ভুক্ত করতে পারি। এভাবে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে দূষণ ও ঝুঁকি দুটোই কমানো সম্ভব। বিশেষত যেসব অবকাঠামোকে আমরা লাইফলাইন বলে থাকি অর্থাৎ হাসপাতাল অবকাঠামোকেও দুর্যোগ সহনশীল করতে হবে। শহরে অননুমোদিত অনেক ভবনে হাসপাতাল হচ্ছে। অনেক আবাসিক ভবনেও হাসপাতাল হচ্ছে। এমনটি হতে দেয়া যাবে না।
রাজধানীতে প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বাড়ছে। বিপুল জনসংখ্যার চাপ আবাসন, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা খাতে পড়ছে। বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে আমাদের করার কী আছে?
এরই মধ্যে আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। সুপেয় পানির সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদাও বাড়ছে। যেকোনো অঞ্চলেই জনসংখ্যার হার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অধিকাংশ বড় শহরেই ধারণ ক্ষমতার বেশি মানুষ বসবাস করেন। এসব স্থানে নতুন করে বসতবাড়ি গড়ে জনসংখ্যার চাপ বাড়ানো ঠিক হবে না। আমাদের নতুন শহর অবকাঠামো করতে হবে। মফস্বল শহরকে আরেকটু আধুনিকায়নের কথা ভাবতে হবে। উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও অনেক বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব। তবে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ, সরকারকে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের কথা বললেই তারা ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বলে দায় এড়ান। এখনো অনেক ফাঁকা জায়গা আছে। আবাদি জমি ও গ্রামীণ এলাকা রয়েছে। নতুন শহর, নিদেনপক্ষে শহরতলী করার মতো জায়গাও আছে। এজন্য যে শহরগুলো আছে সেখানে আরো জনসংখ্যাকে ঠাঁই দেয়ার সুযোগ নেই। সরকারি সম্প্রতি স্পেশাল প্ল্যানিং অ্যাক্ট পাস করেছে। সারা দেশের জন্য যদি এমন বিশেষ পরিকল্পনা করা যায় তাহলে নগরায়ণের স্কেল ঠিক করা যাবে। তখন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও চাহিদা নির্ধারণ করা সহজ হবে। নগরায়ণও টেকসই হবে।
সরকারের পরিকল্পনায় খাল খনন কর্মসূচি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এটি আমাদের জন্য কতটা টেকসই প্রকল্প হতে পারে?
পদ্মায় পানির প্রাপ্যতার সংকট আছে। সেখানে একটি ব্যারাজ করে পানি ধারণ করা হবে, এটি একটা দুর্বল ধারণা। যেকোনো ব্যারাজই ডাউনস্ট্রিমে বিরাট সংকট তৈরি করে। পদ্মা ব্যারাজ দেশের ডাউনস্ট্রিমে থাকা অঞ্চলগুলোকে নানাভাবে পানির সংকট তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের মতো ডেল্টায়িক ভূখণ্ডে প্রবহমান পানি আটকে ব্যারাজ নির্মাণ প্রশ্নবিদ্ধ উদ্যোগ। ঠিক একই কারণে আমরা ফারাক্কা ব্যারাজেরও বিপক্ষে অবস্থান করেছি। একই কারণে পদ্মা ব্যারাজও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে বলে মনে হচ্ছে না।
পদ্মা ব্যারাজকে নিয়ে প্রশ্নটা আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পদ্মার এ পানির ওপরই ফারাক্কার ওপারে কতটুকু পানি আসবে তা নির্ভর করবে। এ ধরনের অনিশ্চিত অবস্থানে থেকে এমন প্রকল্প নেয়া কতটা ঠিক তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আমাদের বরং পানির হিস্যা পাওয়ার বিষয়ে সমতা গড়ার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। যেখানে এ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে অর্থাৎ ডাউনস্ট্রিম অঞ্চলের মানুষের মতামত কি নেয়া হয়েছে? কোনো জনমতামত ছাড়া শুধু আপস্ট্রিমকে সেচ প্রকল্পের আওতায় আনাটা বাস্তবিক নয়। পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে তাই আরো নির্মোহভাবে ভাবা জরুরি। প্রবহমান পানি না আটকে বিকল্প সমাধানগুলো খতিয়ে দেখা যেতে পারে। নদীশাসিত এমন ভূখণ্ডে ব্যারাজ না করাই ভালো। আবার আমাদের পরিবেশ সংবেদনশীল কোনো প্রকল্প কিংবা ভূরাজনৈতিক কারণেও যদি কোনো প্রকল্প নিতে হয় সেখানেও বিচক্ষণতা দেখাতে হবে। এভাবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে আমরা আমাদের বিভিন্ন ন্যায্য দাবির কথা জোর গলায় বলতে পারব। যেমনটা ভারতের সঙ্গে আমাদের পানি বণ্টনের বিষয়ে করা জরুরি।