পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা শেষে অবসর নিয়েছেন। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের সুরক্ষায় গঠিত তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত, মূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্ব সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমিরুল আবেদিন
বাজেট প্রণয়নে সবসময় আগের বারের তুলনায় একটু বড় আকারে করার প্রবণতা বহু পুরনো। আবার বড় বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সরকারের অনেকগুলো অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
বাজেটের আকার দিয়ে জনকল্যাণ মাপা সম্ভব নয়। এমনিতে প্রতিবারই সরকার ও থিংক-ট্যাংকরা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট বলে সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করে। এভাবে মানুষের মনে এক ধরনের জাদুকরী ঘোর তৈরি হয়। বাজেট বড় হলেও দেশের উন্নয়ন হবে এমনটি নয়, বরং বিশাল আকারের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রশ্ন গড়তে হয়, এ বিশাল বাজেটের অর্থ আসলে কোথা থেকে আসবে। কীভাবে এ অর্থের জোগান মিলবে। বাজেটের আকারের বড় একটি অংশ অনুৎপাদনশীল খাত গ্রাস করে নিচ্ছে। যেমন সরকারের পরিচালন ব্যয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয় আছে। সরকার এরই মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ চালু করেছে। এর মধ্যে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এমনকি খেলোয়াড়দের জন্যও আলাদা কার্ড সুবিধা চালু রয়েছে। সম্প্রতি সরকার নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নিচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে মেগা প্রজেক্ট অথবা বিলাসী প্রকল্পের পেছনে অপচয়িত অর্থ আছে। বিশেষত মেগা প্রজেক্টের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতেই বাজেটের বিশাল একটি অংশ চলে যাবে। এদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক জনস্বার্থের খাতে জিডিপির অনুপাতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বরাদ্দ বাড়েনি। বরং বাস্তবিক দৃষ্টিকোণে তা সংকুচিত হয়েছে। এজন্যই বিশাল আকারের বাজেট দেখতে বড় কিন্তু ভেতরে শক্তি নেই।
এ মুহূর্তে সাধারণ মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি একটি বড় সমস্যা। বাজেটে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে। কিন্তু এখনো বাজারে এর প্রভাব সেভাবে দৃশ্যমান নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ চান?
মূল্যস্ফীতি এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তবে দেশে এ সমস্যাটিকে বাজার সিন্ডিকেট বলে এড়ানোর প্রবণতা রয়েছে। তবে বাস্তব হলো, নীতিগত পর্যায়ে ভুল ও নানা অনিয়মের ফলেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে চলেছে। যেমনটি বলেছি, বাজেটে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট বা পরোক্ষ কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনটি হলে সব পণ্যেরই দাম বাড়বে। এমনটিতে মূল্যস্ফীতি উসকে যাবেই। বাজারে মানুষের আয় কিন্তু বাড়ছে না। অথচ নিত্যপণ্যের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ বাধ্য হয়েই খাবার ও চিকিৎসার খরচ ছাঁটাই করছেন। এ শ্রেণীর সুবিধার কথা ভেবে বাজারে টিসিবির মতো রাষ্ট্রীয় বিপণন ব্যবস্থার আমূল সম্প্রসারণ দরকার। আবার মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটকে ভাঙার কাঠামোগত দিকনির্দেশনাও থাকা জরুরি। সেটি বাজেটে অনুপস্থিত। যদিও সরকার ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের কিছু দিকনির্দেশনা রেখেছে। কিন্তু সার্বিকভাবে দেশের সবাই সুবিধা ভোগ করতে পারে এমন কিছু পাওয়া যায়নি। অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারকে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়ানোর দিকটিকে বেশি মনোযোগ দেয়া দরকার ছিল। তেমনটি না করে অনুৎপাদনশীল খাতে ও আমলাতান্ত্রিক পরিচালন ব্যয়ে বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এমনকি কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের সুষম বণ্টনের দিকটিও ভাবতে হবে। এখনো যে পরিকল্পনা আছে সেগুলো ইতিবাচক ফল দেবে। কিন্তু এর ফল পেতে সময় লাগবে। তাই স্বল্পমেয়াদে সংকট সামাল দেয়া যায় এমন দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি ছিল।
সরকার অবশ্য রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। নতুন বাজেটেও সেগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখছেন?
রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য সরকারের কিছু পরিকল্পনা আছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তদের কর ফাঁকি ও খেলাপি ঋণ মওকুফ করার এক সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে যারা অর্থ পাচার কিংবা ঋণখেলাপি হয়েছেন তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। তারা দেশের বাইরে বেশ ভালো অবস্থানেই আছে। বরং যেভাবে কর আরোপ করা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে বিদেশী সংস্থাগুলোকেই খুশি করার জন্য এমনটি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের ওপর কর আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যদি তা বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর আরো বড় চাপ তৈরি হবে। দেশে বেকারত্ব এখন বড় সমস্যা। প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের উৎপাদনশীল খাতে অংশ নেয়ার সুযোগ কম। বেকারত্বের বোঝার কারণে অনেকেই ব্যাটারিচালিত যান কিংবা রাইডশেয়ারে যুক্ত হন। সারা দিন খেটে যে সামান্য অর্থ উপার্জিত হয় তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছে। এখন যদি তাদের আয়ের এ উৎসের ওপর কর বসানো হয় তাহলে তো আয় কমবে। উলটো ব্যয় আরো বাড়বে। এর আরেকটি প্রভাব হলো, তখন তারা বাধ্য হয়ে ভাড়াও বাড়াবেন। নীতিগত জায়গা যদি এমন ধারাবাহিকতা ধরে রাখে তাহলে কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব হবে না। এজন্য বাজেটে কর আদায়ের বিষয়গুলো শেষ পর্যন্ত এ রূপরেখাতে পাস হলে পুঁজির স্বার্থই রক্ষা হবে। সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করবে না।
বিগত কয়েক দশকে আমরা সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি অনুসরণ করেছি। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে শুল্ক কমানো হচ্ছে। এ বিষয়গুলোর প্রতিফলন বাজেটে কেমন হতে পারে বলে ভাবছেন?
বিগত কয়েক দশকে দেশের জ্বালানি নীতিকে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ও পরনির্ভরশীল রাখা হয়। যেকোনো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এটি আত্মঘাতী পথ। হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে বিদেশী এলএনজি এবং কয়লা আমদানির পেছনে। এর পেছনে আমদানিকারক ও বিশেষ গোষ্ঠীর বিপুল মুনাফার স্বার্থ জড়িত। নতুন সরকার এরই মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে জনপ্রিয় করার জন্য কিছু উদ্যোগের কাজ শুরু করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবহেলায় যে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের নষ্ট হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ আদায়ের রাজনৈতিক সাহসও আসলে দেখা যায়নি। নিজস্ব সম্পদের পরিপূর্ণ ব্যবহার ব্যতিরেকে আমদানিনির্ভর থাকলে ডলার সংকট আর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মতো বিষয় ঠেকানো যাবে না।
বিগত বছরগুলোতে ক্ষমতার স্বার্থে বিদেশী রাষ্ট্রগুলোকে ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ দেয়া হয়। এ সময় চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও জাপানের বহু প্রকল্পের অনুমোদনও দেয়া হয়। এক্ষেত্রে জাতীয় সক্ষমতার ব্যবহারটি হয়নি। এজন্য আমরা বিদেশী ঋণনির্ভর, বাণিজ্যনির্ভর ও আমদানিনির্ভর হয়েছি। এর আরেকটি নেতিবাচক প্রভাব প্রাণ-প্রকৃতি বিনাশী সিদ্ধান্ত নেয়া। আমাদের জ্বালানি খাতও এজন্য পরনির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করিনি। এজন্য দেশের জ্বালানি নীতি স্বনির্ভর হয়ে ওঠেনি। শুধু জ্বালানি কেন, প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতেই শতকাল দেশীয় মালিকানা থাকা জরুরি। দেশে তেল-গ্যাস বা কয়লার মতো দেশীয় অনবায়নযোগ্য জ্বালানি রফতানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এমনকি দেশীয় সক্ষমতা জরিপ এবং সেগুলো আহরণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও অনুসরণ করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর সময়সাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু সেদিকেই আমাদের যেতে হবে। আমাদের নিজস্ব সক্ষমতার অনুপাতে সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টি এবারো জোরেশোরে আলোচনায়। বলা হচ্ছে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। তার পরও এ দুই খাতে বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয় বলেই মনে হচ্ছে। এ দুটো খাতের প্রসঙ্গে আপনার মন্তব্য কী?
শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দিক দিয়ে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের মধ্যে তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ায়ও তলানির দিকে। এ দুটো খাতের ক্ষেত্রেই সরকার বরাদ্দ নিশ্চিত করতে পারে না। শিক্ষা খাত প্রকল্পওয়ারি অর্থায়ন ব্যবস্থায় চলছে। প্রকল্প অনুযায়ী অর্থায়নে এ খাত চলতে পারে না। দেশে এখনো কমপ্রিহেনসিভ শিক্ষা কমিশনের অভাব আছে। যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ, যোগ্যদের শিক্ষকতায় আনার মতো বেতন কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষা খাতের উন্নতি সম্ভব নয়। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ যা দেয়া হয় তার সুষম বণ্টন জরুরি। এ বরাদ্দের বড় অংশ ভৌত অবকাঠামো বা ভবন নির্মাণে ব্যয় না করে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি, মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং গবেষণাগার উন্নয়নে বরাদ্দ দিতে হবে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে সব শিক্ষার্থীর জন্য নিখরচায় শিক্ষা উপকরণ ও ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল সার্টিফিকেট বিতরণের কারখানা না বানিয়ে গবেষণাভিত্তিক অনুদান পাঁচ গুণ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের মতো ভঙ্গুর একটি খাতে বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ৩ শতাংশে নেয়া জরুরি। এখানেও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ সমাধান নয়। প্রতিটি উপজেলায় এবং গ্রামীণ প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা ডাক্তার ও বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষকে ঢাকা বা বড় শহরে ছুটতে না হয়। ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘এসেনশিয়াল ড্রাগস’-এর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে অতিপ্রয়োজনীয় সব ওষুধ রাষ্ট্র নিজেই উৎপাদন করতে পারে। বিশেষত আমাদের ওষুধ শিল্পের জেনেরিক লাইসেন্সিং সুবিধা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য আলাদাভাবে ভাবতে হবে।
বেকারত্ব এখন একটি বড় সমস্যা। সরকার অবশ্য জানিয়েছে তারা কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে কাজ করবে। এদিকে দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। তাই বেসরকারি খাতেও কর্মসংস্থান গড়ছে না। এমন সময়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও স্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়তে সরকারের এ ভাবনাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। শিক্ষার মান বাড়ানোর আগে সামাজিক সুরক্ষা বেশি জরুরি। সামাজিক সুরক্ষা ও নীতি সহায়তা পেলে শিক্ষা খাতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাড়বে। যেমন বলেছি, জাতীয় সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করতে হবে। এখন বেসরকারি খাতের ওপর ভর করে ফ্রিল্যান্স বা আত্মকর্মসংস্থানের মতো কথা বলে তো বেকারত্ব সমস্যার সমাধান হবে না। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বৃহৎ কর্মসংস্থান গড়তে হবে। দেশে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা জরুরি। আবার অনেক কারখানাকে আধুনিকায়ন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এটি করতে পারলে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। দেশের গ্যাস অনুসন্ধান, খনিজ উত্তোলন এবং বিদ্যুৎ ও বন্দর ব্যবস্থাপনার মতো বড় বড় কৌশলগত দায়িত্ব বিদেশী কোম্পানির হাতে না দিয়ে ‘বাপেক্স’ বা দেশীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করতে হবে। এতে প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও সাধারণ কর্মীদের জন্য হাজার হাজার উচ্চমানের কর্মসংস্থান দেশেই তৈরি হবে। এদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে সরকারের বিপুল লোকবল প্রয়োজন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত হাজার হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য। দেশের হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার-নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীর চরম সংকট। মেধা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে এমনকি চুক্তিভিত্তিক হলেও এসব পদ পূরণ করা জরুরি। এমনকি পদগুলোর বর্তমান প্রয়োজনীয়তাও যাচাই করে নিতে হবে। কোনো একটি পদ পূরণ করলেই হবে না। সেটির ব্যবহার সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা যাচাই করেই আসলে কর্মসংস্থান গড়তে হবে। না হলে তো বিনিয়োগই অপচয়। সেসব স্থানে শিল্পায়ন বা উৎপাদন বাড়াতে কর্মমুখী শিক্ষায় জোর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাভিত্তিক করে তুলতে হবে, যেন শিক্ষার্থীরা নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে নতুন নতুন দেশীয় শিল্প খাত ও চাকরির সুযোগ তৈরি করবে।
মেগা প্রজেক্টের পেছনে লাখ কোটি টাকা অপচয় না করে, সেই অর্থ দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে দেয়া যেতে পারে। তরুণরা যেন সহজে এবং বিনা সুদে ঋণ নিয়ে ছোট ও মাঝারি উৎপাদনশীল ব্যবসা শুরু করতে পারে, তার জন্য বাজেটে বিশেষ ‘তরুণ উদ্যোক্তা তহবিল’ রাখা যেতে পারে। কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন করে গ্রামে অনুসারী শিল্প (যেমন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, কোল্ড স্টোরেজ চেইন) তৈরি করলে গ্রামীণ যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য শহরমুখী হতে হবে না। এদিকে দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থানই অনানুষ্ঠানিক খাতে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে হয়রানি, স্থানীয় চাঁদাবাজি এবং করের অযৌক্তিক বোঝা থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। এদের যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিবন্ধন করে স্বল্প সুদে ঋণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা দেয়া যায়, তবে এ অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানগুলো টেকসই রূপ নেবে। এগুলো বড় উদ্যোগ। বাস্তবায়নে সময় দরকার। তবে অর্থনীতির স্বার্থেই করতে হবে।