নাগরিক থেকে আবাসন প্রতিষ্ঠান, নগর পরিবহন কেউই নিয়মকানুন মানতে চায় না

সমন্বিত উদ্যোগ ও নিয়মনীতির কঠোর পরিপালন ছাড়া টেকসই শহর হবে না

নগর পরিকল্পনার সঙ্গে আবাসন ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকেও সমন্বিত করতে হবে। বর্তমানে জমির মূল্য ও নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি শহর হলো ঢাকা ও চট্টগ্রাম। একটি দেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। অন্যটি বাণিজ্যনগরী। আবার এ দুই শহরের ভৌগোলিক ও জনমিতিক পার্থক্যও ব্যাপক। তবে এ দুই শহরের নানা সমস্যার মধ্যে বর্তমানে একটি বড় সমস্যা হলো জলাবদ্ধতা। যদিও এ দুই অঞ্চলে অসংখ্য জলাধার রয়েছে। একসময় যেসব জলাধার প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখত। কিন্তু ক্রমেই জলাবদ্ধতা একটি নিত্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে; একটানা কয়েক ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিপাত থেকে জমা পানি নিষ্কাশনের পথ পায় না। প্রশ্ন হলো, কেন? উত্তর হলো সমন্বিত উদ্যোগের অভাব। একটি শহরে যখন জনসংখ্যা ও অবকাঠামো বাড়তে থাকে, তখন পানি নিষ্কাশনের জন্য সুষ্ঠু পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামোও থাকা প্রয়োজন। যেমন পয়োনিষ্কাশন নালা বা বক্স কালভার্ট ইত্যাদি। তবে এগুলো যেন বর্জ্য জমে বন্ধ না থাকে, অকার্যকর না হয় সেটি নিশ্চিত করাটাও জরুরি। অর্থাৎ এখানে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও জরুরি। কাজের ধরন দেখেই বলা যায় যে এগুলো কোনো একক সংস্থার কাজ নয়। যে সংস্থা অবকাঠামো নির্মাণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে তার দায়িত্ব ড্রেনেজ অবকাঠামো নিশ্চিত করা। আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টদের কাজ নিয়মিতভাবে নালা বা বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করা। এক্ষেত্রে আরেকটি উদাহরণ হলো, একটি শহরের সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ ও সড়কে পরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়। এমন অসংখ্য বিষয় রয়েছে যেগুলোর বাস্তবায়নে নিয়োজিত রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। সুতরাং একটি শহরকে বাসযোগ্য ও টেকসই করতে হলে নিশ্চিতভাবেই সব দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের সমন্বিতভাবে কিছু উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

কিন্তু দেশের সব শহরের দিকে তাকালে অসমন্বয়ের চিত্রই বেশি দৃষ্টিগোচর হয়। এটা কেবল সমন্বিত উদ্যোগের অভাব নয়, পরিকল্পনারও অভাব। তবে এখানেও একটি প্রশ্ন চলে আসে। সেটি হলো দেশে অবকাঠামো নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা—সবকিছুর জন্যই সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি রয়েছে। তার পরও কেন প্রতিটি শহর অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে? কারণ কাগুজে নিয়মনীতির পরিপালন নেই। প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—সবার মধ্যে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানোর প্রবণতা রয়েছে। এক্ষেত্রে জবাবদিহির সংস্কৃতিও গড়ে ওঠেনি। সম্প্রতি বণিক বার্তা আয়োজিত ‘স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬’-এ গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীও বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। অথচ দেশে নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান নিয়মনীতির পরিপালন করছে কিনা সেটা তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার ভাগও রয়েছে। সুতরাং সরকার যে নিজস্ব বিধিমালার বাস্তবায়ন করতে পারছে না এটাও এক্ষেত্রে বিবেচ্য। অনিয়ম, দুর্নীতি এগুলো বন্ধ না করতে পারলে একটি শহর কখনই টেকসই হতে পারে তা কেবল ঢাকার দিকে তাকালেই অনুধাবন করা যায়।

ওই কনক্লেভে সরকার মেট্রোপলিটন সিটি থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে জোনিং ব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়েছে। উদ্যোগ হিসেবে এটি ইতিবাচক। এককভাবে কোনো শহরের ওপর চাপ কমাতে গেলে উপজেলাগুলোর জন্যও আলাদাভাবে ভাবার প্রয়োজন আছে। তবে পরিকল্পনা বা মহাপরিকল্পনা সফল করতে হলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা, ভূমি ব্যবহার, আবাসন, পরিবহন, পানি, বর্জ্য ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।

নগর পরিকল্পনার সঙ্গে আবাসন ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকেও সমন্বিত করতে হবে। বর্তমানে জমির মূল্য ও নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ একটি শহরকে টেকসই ও বাসযোগ্য করতে হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে আবাসন পরিকল্পনা করতে হবে। সরকারি জমি ব্যবহার করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ, স্বল্পসুদের ঋণ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

একইভাবে নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার আগে জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা করতে হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে এলপিজি সংরক্ষণ ও নিরাপদ সরবরাহের ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং জ্বালানিসাশ্রয়ী ভবন নির্মাণের বিষয়গুলো আবাসন পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত। ভবনে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করা, এলইডি বাতি ও বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার, পানিসাশ্রয়ী সরঞ্জাম এবং তাপ নিয়ন্ত্রণে উপযোগী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় ও জ্বালানি ব্যবহার কমানো সম্ভব। তবে সবুজ আবাসনের নামে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়িয়ে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া যাবে না।

নগরায়ণের চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণও জরুরি। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসন ও ব্যবসার সুযোগ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় রাজধানীর ওপর ক্রমাগত জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে। ফলে শুধু ঢাকায় নতুন আবাসন বা অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে দেশের অন্যান্য আঞ্চলিক ও বিভাগীয় শহরকে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক সেবার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে আবাসন, কর্মস্থল ও গণপরিবহনকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। কর্মস্থল ও প্রয়োজনীয় সেবা থেকে দূরে আবাসন তৈরি হলে দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে পরিবহন ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ দুটোই বাড়বে।

সবশেষে, স্মার্ট ও টেকসই নগরায়ণ কোনো একক মন্ত্রণালয়, সংস্থা বা খাতের কাজ নয়। পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে অনুমোদন, নির্মাণ, তদারকি, পরিবহন, বর্জ্য ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা—প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে। একই সঙ্গে আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ পরিকল্পনা যত উন্নতই হোক, তার বাস্তবায়ন ও নিয়মনীতির কঠোর পরিপালন নিশ্চিত করা না গেলে তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

আরও