চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার ভার গ্রহণ করে। এটা কোনো নির্বাচিত সরকার নয়। তবে দেড় সহস্রাধিক মানুষের আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে (এদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী কিশোর-কিশোরী, তরুণ ও শ্রমজীবী, কর্মজীবী নারী-পুরুষ) যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, তার প্রতি দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের আকার বিগত জোট সরকারের তুলনায় অনেক ছোট। আকারে ছোট হলেও এ সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা সংগত কারণেই অনেক বেশি। যাদের উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাদের কয়েকজন নিজ নিজ ক্ষেত্রে পেশাগতভাবে সৎ, সফল, দক্ষ মানুষ হিসেবে সমাজে পরিচিত। প্রধান উপদেষ্টাসহ এদের অনেকের ওপর একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার থাকায় কোনো কোনো মন্ত্রণালয় নিতান্তই অবহেলিত। উপদেষ্টাদের কয়েকজন স্বীয় নিষ্ঠা ও দক্ষতার ছাপ রেখেছেন নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীন জনস্বার্থবিষয়ক কিছু কার্যকর কর্মকাণ্ডে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার মধ্য দিয়ে।
রমজান মাসে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশামতো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে কম ছিল। এ সরকারের আমলে একাধিক বেদখল হওয়া নদী আইনসংগতভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বেশকিছু মেগা প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে স্বৈরশাসকরা যে বাজেট বরাদ্দ রেখেছিল তার ২০-২৫ শতাংশ হ্রাস করে একই কাজ মানসম্মতভাবে এ সরকার সমাপ্ত করতে পারবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার আমন্ত্রণে জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দল দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে থেকে বিগত স্বৈরশাসকদের গণনির্যাতন ও হত্যার তদন্ত করেছে এবং সেই প্রতিবেদন সরকার ও জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেছে। এ সরকারের গত আট মাসে বেশকিছু ভালো কাজের দৃষ্টান্তের মধ্যে এগুলো জনমনে ছাপ ফেলেছে।
কিন্তু অন্তর্বতী সরকারের যে মূল উদ্দেশ্য বা অঙ্গীকার তাতে এমন কিছু ভালো কাজের দৃষ্টান্ত কি যথেষ্ট? এ সরকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে রক্তাক্ত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার মূল স্লোগানই ছিল সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটাতে রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার করা, সবক্ষেত্রে গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জোরদার করা। জুলাই অভ্যুত্থানের শেষ দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন এলাকার দেয়ালসহ সারা দেশের ছোট-বড় প্রায় সব শহরের দেয়ালে যেসব গ্রাফিতি, দেয়াললিখন বা দেয়ালচিত্র এঁকেছে তা ছিল যেমনি হৃদয়স্পর্শী তেমনি নতুন প্রজন্মের আশা ও ভবিষ্যৎ রচনার অঙ্গীকারে সোচ্চার।
দেখুন, ‘কথা দিয়েছি দেশ গড়ার’
আমরা ‘সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটাব’। এ লক্ষ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে ১১টি কমিশন গঠন করেছে। সংস্কার কমিশনগুলোর সবই নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে জাতীয় অগ্রাধিকারভুক্ত। কিন্তু সমগুরুত্বপূর্ণ আরো অন্তত তিনটি সংস্কার কমিশন গঠনের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো উদ্যোগই আমরা এখনো দেখিনি।
একাধিকবার নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দাবি উত্থাপন করা সত্ত্বেও ভূমি ও কৃষি সংস্কার এবং পরিবেশ সুরক্ষা কমিশনের প্রস্তাবটি কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা সংস্কারের জন্য কোনো আলাদা কমিশন করা হয়নি। অথচ শিক্ষা সংস্কার ভূমি ও কৃষি সংস্কারের মতোই অত্যন্ত মৌলিক সংস্কারের বিষয়। শিক্ষাঙ্গনের বিপর্যয়ের কথা কাউকে বুঝিয়ে বলার দরকার আছে বলে মনে হয় না। আর অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য কোনো কমিশন করার কথাও অন্তর্বর্তী সরকারের দিক থেকে আলোচনায়ই আসেনি, গঠন করা তো দূরের কথা। তবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা সংস্কারের কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চরম সর্বনাশের কিনারে গিয়েও রক্ষা পেয়েছে। এটা প্রশংসনীয়। তবে ব্যাংক খাত অর্থনৈতিক সংস্কারের একমাত্র খাত নয়, যদিও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন না করায় সার্বিক অর্থনৈতিক সংকট, বিপর্যয়, বিগত স্বৈরশাসকদের সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটতরাজ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে কতটা নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে তার সামগ্রিক চিত্র এখনো জানা যায়নি। শ্বেতপত্র প্রকাশ কিংবা ব্যাংক খাতের অনিয়ম, লুট, অর্থ পাচারের যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তা অর্থনীতির আংশিক চেহারাকে উন্মোচিত করেছে মাত্র। শুধু ১৫ বছরের স্বৈরশাসন নয়, বিগত পাঁচ দশকজুড়ে যে বৈষম্য, অনাচার অর্থনৈতিক খাতসহ রাষ্ট্রের অন্য সব ক্ষেত্রে কমবেশি আমলাতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী লালন-পালন করে এসেছে সেই সত্যটিও কার্যত আড়ালেই থেকে গেছে।
এসবের ফলে যে বৈষম্যবিরোধী স্লোগানকে ঘিরে দেশের তরুণ-কিশোর শিক্ষার্থী তাদের মধ্য ও নিম্নবিত্ত অভিভাবক, শ্রমজীবী-পেশাজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একাংশ এবং সর্বস্তরের লাখ লাখ নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ নির্মম-পাশবিক বুলেট-বেয়নেটের আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞ উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে এসেছিলেন সেই প্রাণের স্লোগান—সব ধরনের বৈষম্যের অবসানের অঙ্গীকার এখন মূল আলোচ্যসূচির বাইরে। অথচ শত শত বছরের অসহনীয় বৈষম্যের শিকার ব্যাপক কৃষক সমাজ, গ্রামীণ নারী, বস্তির মানুষ এবং আদিজাতি গোষ্ঠী, জেলে, কামার, কুমার, প্রতিবন্ধী, হিজড়াসহ সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমিহারা, নাগরিক অধিকারহারা মানুষের দুরবস্থার মৌলিক কারণগুলো দূর করতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ভূমি-কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে যে কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক, মনোজাগতিক, আইন ও বিধির সংস্কার জরুরি তা একেবারেই তলানির বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।
যদিও কয়েকটি সংস্কার কমিশন বেশকিছু ভালো প্রস্তাব উত্থাপন করেছে কিন্তু তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মেঘ ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছে। পক্ষান্তরে স্বৈরশাসকদের একমাত্র মেগা প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন দর্শনের পরিবর্তে এখন মনে হয় প্রধানত ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচিভিত্তিক ও সামাজিক ব্যবসাকেন্দ্রিক উন্নয়ন চমকের দাওয়াই দেয়ার যুগে দেশকে নিয়ে যাওয়া হবে। যার সঙ্গে বৈষম্য বা দারিদ্র্য নির্মূলের তেমন কোনো সম্পর্ক আছে বলে এখন আর কেউ বিশ্বাস করে না। আশি ও নব্বই দশক থেকে শুনে এসেছি যে ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচির ব্যাপক প্রসার ঘটলে দেশ থেকে দারিদ্র্য দূরীভূত হবে। তখন দারিদ্র্য চলে যাবে বিশেষ কোনো জাদুঘরে। দারিদ্র্য এখনো সেই অজানা জাদুঘরে যায়নি। দেশের রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন শুমারি, বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট এবং আমাদের বিশিষ্ট গবেষকদের গবেষণা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায় ১৮ কোটি মানুষের এ দেশে এখনো কমবেশি প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যেই বসবাস করছেন গ্রামে ও নগরে।
এ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে কারা আছেন? রয়েছেন গ্রামীণ জনসংখ্যার প্রায় ৫৬ শতাংশ ভূমিহীন, প্রান্তিক ও পারিবারিক কৃষক, বর্গাচাষী, জেলে, গ্রামীণ দরিদ্র নারী কৃষক যাদের সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ শতাংশ, আদি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সমতল ও পাহাড়ি জেলাগুলোয়, চা বাগান ও কারখানার শ্রমিক, দলিত, প্রতিবন্ধী, হিজড়াসহ অন্যান্য প্রান্তিক জনেরা। যারা সবাই মিলে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ। এমন প্রেক্ষাপটেই ঘোষিত হতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় বাজেট। এ বাজেটে কি দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের জীবন থেকে বঞ্চনা-বৈষম্য নিরসনের এবং ভূমিহারা, অধিকারহারা জনগোষ্ঠীর সম্পদে ন্যায্য হিস্যার অধিকার সুপ্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান উদ্যোগ, বরাদ্দ ও নির্দেশনা থাকবে? আগাম কোনো মন্তব্য করা অনুচিত। তবে একটি কথা বলতেই হবে, সব ধরনের বৈষম্যের অবসানের অঙ্গীকার শুধু রাজপথের স্লোগান মাত্র ছিল না। বরং স্বৈরশাসকদের নজিরহীন বর্বরতার শিকার দেড় সহস্রাধিক শহীদের রক্ত, অমূল্য জীবন এবং আরো ১৫ সহস্রাধিক আহত শিক্ষার্থী, তরুণ ও সাধারণ মানুষের চোখ হারানো, হাত-পা হারানো কষ্টের জীবনের মূল্যে প্রতিষ্ঠিত জাতির দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও অসম সাহসী প্রত্যয়ের নাম। ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, ভবিষ্যতের রাজনীতিবিদ, আমলা কিংবা সুবিধাভোগী এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী এসব কথা ভুলে যেতে পারেন। এসব স্লোগান কোনো গুরুত্ব বহন করে না হয়তো তাদের কাছে। কিন্তু কোটি হৃদয়ে যে স্লোগান খোদিত হয়ে আছে তা মুছে ফেলার সাধ্য কিংবা অধিকার কারো নেই।
শামসুল হুদা: নির্বাহী পরিচালক, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)